অসুস্থ ব্যক্তির জন্য ৭টি শিফা ও আরোগ্যের শক্তিশালী দোয়া

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
২ জুল, ২০২৬·৪.৩ হা

মানবজীবনে রোগ-ব্যাধি বা অসুস্থতা আসা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। ইসলামে অসুস্থতাকে কেবল কষ্ট হিসেবে দেখা হয়নি, বরং মুমিনের জন্য এটি গুনাহ মাফ ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য মাধ্যম। অসুস্থতার সময় সুচিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি মহান আল্লাহর দরবারে আরোগ্য বা শিফা কামনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে অসুস্থ হলে কিংবা কোনো সাহাবি অসুস্থ হলে বিভিন্ন দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে শিফা চাইতেন। এই গাইডে আমরা পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিস থেকে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য ৭টি অত্যন্ত কার্যকরী ও আরোগ্যের দোয়া আলোচনা করব, যা নিয়মিত পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা দ্রুত সুস্থতা দান করতে পারেন, ইন শা আল্লাহ।

ইসলামে অসুস্থতা ও ধৈর্যের ফজিলত

ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় যে, রোগ ও আরোগ্য দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। অসুস্থ অবস্থায় ধৈর্য ধারণ করলে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলে অফুরন্ত সওয়াব পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে সব কষ্ট, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা ও সামান্য কষ্ট আসে, এমনকি তার শরীরে যে কাঁটাটি ফোটে—তার বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।" (সহীহ বুখারী)। তাই অসুস্থতায় ভেঙে না পড়ে চিকিৎসার পাশাপাশি দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া মুমিনের প্রধান হাতিয়ার।

অসুস্থ ব্যক্তির রোগমুক্তির ৭টি শক্তিশালী দোয়া

রোগীর পাশে গিয়ে অথবা নিজের অসুস্থতায় পড়ার জন্য অত্যন্ত অর্থপূর্ণ ৭টি দোয়া নিচে দেওয়া হলো:

১. কষ্ট দূর করা ও আরোগ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হলে তাঁর ডান হাত রোগীর দেহে বোলাতেন এবং এই দোয়াটি পড়তেন:

اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَأْسَ وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বান-নাসি আযহিবিল বা’সা, ইশফি আন্তাশ-শাফী, লা শিফা-আ ইল্লা শিফা-উকা, শিফা-আল লা ইয়ুগাদিরু সাক্বামা।

অর্থ: হে আল্লাহ, মানুষের প্রতিপালক! আপনি কষ্ট দূর করে দিন এবং আরোগ্য দান করুন। আপনিই আরোগ্যদানকারী, আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দান করুন যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না। (সহীহ বুখারী)

২. কুদৃষ্টি ও অনিষ্ট থেকে ঝাড়ফুঁকের দোয়া (রুকইয়া)

হযরত জিবরাইল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ হলে এই দোয়াটি পড়ে ফু দিয়েছিলেন:

بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আরক্বীকা, মিন কুল্লি শাইয়িন ইউ’যীকা, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও ‘আইনি হাসিদ, আল্লাহু ইয়াশফীকা, বিসমিল্লাহি আরক্বীকা।

অর্থ: আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি এমন সব কষ্টদায়ক বিষয় থেকে, যা আপনাকে কষ্ট দেয়; প্রতিটি ঈর্ষাপরায়ণ আত্মা বা কুদৃষ্টির অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন; আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি। (সহীহ মুসলিম)

৩. রোগীকে সান্ত্বনা ও পবিত্রতার দোয়া

রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো রোগীকে দেখতে যেতেন, তখন তাকে সান্ত্বনা দিয়ে এই দোয়াটি বলতেন:

لَا بَأْسَ طَهُورٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ

উচ্চারণ: লা বা’সা ত্বাহুরুন ইনশাআল্লাহ।

অর্থ: কোনো ভয় নেই, আল্লাহর ইচ্ছায় এই অসুস্থতা আপনার গুনাহসমূহ থেকে পবিত্রকারী হবে। (সহীহ বুখারী)

৪. নিজের শরীরের যেকোনো ব্যথার জন্য আমল ও দোয়া

শরীরের কোনো অংশে ব্যথা বা কষ্ট হলে ব্যথার জায়গায় ডান হাত রেখে ৩ বার "বিসমিল্লাহ" বলতে হয় এবং এরপর নিচের দোয়াটি ৭ বার পাঠ করতে হয়:

أَعُوذُ بِعِزَّةِ اللَّهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَأُحَاذِرُ

উচ্চারণ: আউযু বি’ইযযাতিল্লাহি ওয়া ক্বুদরাতিহী মিন শাররি মা আজিদু ওয়া উহাযিরু।

অর্থ: আমি আল্লাহর মর্যাদা ও কুদরতের আশ্রয় প্রার্থনা করছি সেই অনিষ্ট থেকে যা আমি অনুভব করছি এবং যার ভয় করছি। (সহীহ মুসলিম)

৫. রোগীর সুস্থতা কামনায় ৭ বার পড়ার বিশেষ দোয়া

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো রোগীকে দেখতে গিয়ে মৃত্যুর সময় উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত এই দোয়াটি ৭ বার পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা তাকে আরোগ্য দান করবেন:

أَسْأَلُ اللَّهَ الْعَظِيمَ رَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ أَنْ يَشْفِيَكَ

উচ্চারণ: আসআলাল্লাহাল ‘আযীম, রাব্বাল ‘আরশিল ‘আযীম, আই ইয়াশফিয়াকা।

অর্থ: আমি মহান আরশের মালিক মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আপনাকে আরোগ্য দান করেন। (সুনান আবু দাউদ)

৬. সূরা ফাতিহার মাধ্যমে আরোগ্যের আমল (সূরাতুশ শিফা)

পবিত্র কুরআনের প্রথম সূরা "সূরা আল-ফাতিহা"-কে আরোগ্যের সূরা বলা হয়। যেকোনো রোগমুক্তির নিয়তে এই সূরা পাঠ করে পানিতে বা রোগীর শরীরে ফুঁ দেওয়া অত্যন্ত ফলপ্রসূ আমল:

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ ۝ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ۝ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ ۝ مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ ۝ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ ۝ اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ ۝ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ

উচ্চারণ: সূরা আল-ফাতিহা

অর্থ: সূরা ফাতিহা হলো কুরআনের শ্রেষ্ঠ সূরা যা সকল রোগের মহৌষধ বা আরোগ্যকারী রুকইয়া হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। (সহীহ বুখারী)

৭. কঠিন রোগ থেকে মুক্তির জন্য হযরত আইয়ুব (আ.)-এর দোয়া

হযরত আইয়ুব (আ.) যখন কঠিন চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তখন তিনি অত্যন্ত কাতর হয়ে আল্লাহর দরবারে এই দোয়াটি করেছিলেন এবং আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করে সুস্থতা দান করেছিলেন:

أَنِّي مَسَّنيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ

উচ্চারণ: আন্নী মাসসানিয়াদ্দুররু ওয়া আন্তা আরহামুর রাহিমীন।

অর্থ: আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৮৩)

দোয়া কবুল ও আরোগ্যের কিছু নিয়ামক

দোয়ার মাধ্যমে পরিপূর্ণ শিফা বা আরোগ্য লাভের জন্য নিচের বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখা জরুরি:

  • পূর্ণ বিশ্বাস ও তাওয়াক্কুল: মনে দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ তাআলাই একমাত্র সুস্থতা দানকারী। ওষুধ বা ডাক্তার কেবল উসিলা মাত্র।
  • হালাল উপার্জন: দোয়া কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত হলো নিজের খাদ্য, পানীয় এবং পোশাক হালাল হওয়া।
  • ধৈর্য ও অবিচলতা: আরোগ্য পেতে দেরি হলেও আল্লাহর প্রতি কোনো ধরণের অভিযোগ আনা যাবে না, বরং নিয়মিত দোয়া চালিয়ে যেতে হবে।

উপসংহার

অসুস্থ অবস্থায় আল্লাহর স্মরণ ও দোয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়া প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এই ৭টি দোয়া অত্যন্ত বরকতময় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর প্রিয় সাহাবিদের পরীক্ষিত আমল। আসুন, আমরা নিজেরা কিংবা আমাদের প্রিয়জন কেউ অসুস্থ হলে এই দোয়াগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সমস্ত অসুস্থ মানুষকে দ্রুত ও স্থায়ীভাবে সুস্থতা ও শিফা দান করুন। আমীন।

প্রশ্নোত্তর (FAQ)

অসুস্থ ব্যক্তির রোগমুক্তির জন্য সর্বোত্তম আমল কোনটি?
সর্বোত্তম আমল হলো পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া পাঠ করা, বিশেষ করে রোগীকে দেখতে গিয়ে "আল্লাহুম্মা রাব্বান-নাসি" দোয়াটি পড়া এবং ব্যথার জায়গায় হাত রেখে ৩ বার বিসমিল্লাহ ও ৭ বার "আউযু বি'ইযযাতিল্লাহি..." দোয়াটি পড়া।
সূরা ফাতিহা দিয়ে কীভাবে ঝাড়ফুঁক (রুকইয়া) করা হয়?
অসুস্থ ব্যক্তির পাশে বসে বা নিজের জন্য সূরা ফাতিহা মনোযোগ দিয়ে পাঠ করে ফু দেওয়া যায়। এছাড়া এক গ্লাস পানিতে ফু দিয়ে সেই পানি রোগীকে পান করালেও আল্লাহ তাআলা আরোগ্য দান করতে পারেন।
রোগীকে দেখতে যাওয়ার সওয়াব কেমন?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম যখন অন্য কোনো অসুস্থ মুসলিমকে সকালে দেখতে যায়, তখন সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য রহমতের দোয়া করতে থাকে; আর সন্ধ্যায় দেখতে গেলে পরদিন সকাল পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করে।
সুস্থতার জন্য কি কেবল দোয়াই যথেষ্ট, ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন নেই?
ইসলামে চিকিৎসার গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো, কেননা আল্লাহ এমন কোনো রোগ তৈরি করেননি যার প্রতিষেধক সৃষ্টি করেননি।" অতএব, যথোপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি দোয়ার আমল চালিয়ে যেতে হবে।
অসুস্থতার সময় ছদকা বা দান করলে কি রোগ ভালো হয়?
হ্যাঁ, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা দানের (ছদকার) মাধ্যমে তোমাদের অসুস্থ ব্যক্তিদের রোগের চিকিৎসা করো।" সৎ উদ্দেশ্যে ছদকা করলে আল্লাহ মেহেরবানি করে রোগব্যাধি ও বিপদ-আপদ দূর করে দেন।

রেফারেন্স

  1. সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং: ৫৬৭৫, ৫৬৯৬, ৫7৩৮
  2. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২১৯১, ২২০২
  3. সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং: ৩১০৬
  4. আল-কুরআন, সূরা আল-আম্বিয়া (২১:৮৩)
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না