ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন: অর্থ, গুরুত্ব ও ফজিলত

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
২ জুল, ২০২৬·১৫৮

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুখ ও দুঃখ পাশাপাশি চলে। একজন মুমিন হিসেবে জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং তাঁর প্রতি অটল আস্থা রাখাই হলো ঈমানের দাবি। কোনো বিপদ-আপদ, প্রিয়জন হারানো বা দুঃখজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে আমরা যে বাক্যটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারণ করি, তা হলো—‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। এটি কেবল শোক প্রকাশের বাক্য নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং তাওহিদের এক অনন্য ঘোষণা। ইসলামি পরিভাষায় একে ‘ইস্তিরজা’ (الاسترجاع) বলা হয়।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন-এর অর্থ ও উৎস

পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ১৫৬ নম্বর আয়াতে এই গভীর শিক্ষণীয় বাণীটি বর্ণিত হয়েছে। এর প্রতিটি শব্দের ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের অস্তিত্ব ও গন্তব্যের পরম সত্য।

আরবি টেক্সট

إِنَّا لِلَّٰهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

উচ্চারণ

উচ্চারণ: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

অর্থ

অর্থ: "নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।"

কুরআনের আলোকে এই দোয়ার পটভূমি

মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, দুনিয়ার জীবন এক পরীক্ষার ক্ষেত্র। আর এই কঠিন পরীক্ষার সময় যারা ধৈর্য (সবর) ধারণ করে, তাদের জন্যই রয়েছে সুসংবাদ। সূরা আল-বাকারার ১৫৫ ও ১৫৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ * الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

অর্থ: "আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতিের মাধ্যমে। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন—যারা কোনো বিপদে পড়লে বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাব।’"

কেবল মৃত্যুর সংবাদেই কি এটি পাঠ করতে হয়?

আমাদের সমাজে সাধারণ একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, কেউ মারা গেলেই কেবল ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়তে হয়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী, যেকোনো ছোট-বড় বিপদ, আর্থিক ক্ষতি, শারীরিক অসুস্থতা বা সামান্যতম কষ্টের মুখোমুখি হলেও ইস্তিরজা পাঠ করা উচিত। এটি মানুষের মনের অহংকার ও ক্ষোভ দূর করে এবং অন্তরকে প্রশান্ত করে। এর মাধ্যমে বান্দা স্বীকার করে যে, এই মহাবিশ্বের কোনো কিছুর ওপরই তার চূড়ান্ত অধিকার নেই; সবকিছুর প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ এবং সবাইকে একদিন তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।

বিপদে আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান পাওয়ার বিশেষ দোয়া

হাদিস শরিফে বিপদের মুহূর্তে ইস্তিরজা পাঠ করার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে উত্তম বিকল্প পাওয়ার জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী দোয়া পাঠ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, কোনো মুসলিম যখন বিপদে পড়ে আল্লাহর নির্দেশিত এই দোয়াটি পড়ে, আল্লাহ তাকে তার বিপদের জন্য সওয়াব দান করেন এবং তার চেয়েও উত্তম বিকল্প দান করেন:

আরবি দোয়া

اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا

উচ্চারণ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আজিরনি ফি মুসিবাতি ওয়া আখলিফলি খাইরাম মিনহা।

অর্থ

অর্থ: "হে আল্লাহ! আমাকে আমার এই বিপদে প্রতিদান বা সওয়াব দান করুন এবং এর চেয়ে উত্তম বস্তু আমাকে দান করুন।"

উম্মে সালামাহ (রা.)-এর জীবনের সত্য ঘটনা

হযরত উম্মে সালামাহ (রা.)-এর প্রথম স্বামী আবু সালামাহ (রা.) যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তিনি অত্যন্ত শোকাগ্রস্ত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো এই দোয়া পড়ার সময় তাঁর মনে একপ্রকার সংশয় জেগেছিল যে, আবু সালামাহর চেয়ে উত্তম ব্যক্তি আর কে হতে পারে? কিন্তু তিনি আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে দোয়াটি পাঠ করেন। ফলে আল্লাহ তাঁকে এর চেয়েও উত্তম প্রতিদান স্বরূপ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে বিবাহের মাধ্যমে উম্মুল মুমিনীন হওয়ার অনন্য মর্যাদা দান করেন।

ইস্তিরজার মানসিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা

নিয়মিত ইস্তিরজা পাঠের মাধ্যমে একজন মুমিনের জীবনে গভীর আধ্যাত্মিক পরিবর্তন আসে:

  • মালিকানার মোহমুক্তি: এটি মানুষের মন থেকে জাগতিক সম্পদের অতিরিক্ত মোহ দূর করে। আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের জীবন, পরিবার ও সম্পদ সবই আল্লাহর আমানত।
  • ধৈর্য ও মানসিক শান্তি: আকস্মিক যেকোনো আঘাতে মুষড়ে না পড়ে আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকার শক্তি জোগায় এই বাক্য।
  • পরকালের প্রস্তুতি: এটি প্রতিনিয়ত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী এবং আমাদের চিরস্থায়ী গন্তব্য হলো পরকাল।

উপসংহার

কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ উচ্চারণ করা মুমিনের অনন্য আত্মিক শক্তি ও বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। আসুন, যেকোনো দুঃখ ও কষ্টে আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থেকে নিজেদের জবানকে এই কল্যাণময় জিকিরে সিক্ত রাখি।

‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ কোন সূরার আয়াত?
এটি পবিত্র কুরআনের দ্বিতীয় সূরা ‘সূরা আল-বাকারা’-এর ১৫৬ নম্বর আয়াত。
কাউকে সান্ত্বনা দেওয়ার সময় কি এই দোয়া পড়া যায়?
হ্যাঁ, বিপদে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে যেমন এটি পড়বে, তেমনি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার সময় বা দুঃখের সংবাদ শোনার পরও এটি পড়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ。
সামান্য বা ছোটখাটো বিপদে কি এই দোয়া পড়া যায়?
হ্যাঁ, যেকোনো ছোটখাটো সমস্যা, যেমন—হঠাৎ কোনো জিনিস হারিয়ে যাওয়া বা সামান্য দুঃখজনক সংবাদ পাওয়ার মতো পরিস্থিতিতেও ইস্তিরজা পড়ার নির্দেশ হাদিসে রয়েছে。
বিপদের সময় উত্তম প্রতিদান পাওয়ার বিশেষ দোয়াটি কী?
বিপদের সময় ইস্তিরজার সাথে এই দোয়াটি পড়া সুন্নাহ: "আল্লাহুম্মা আজিরনি ফি মুসিবাতি ওয়া আখলিফলি খাইরাম মিনহা" (হে আল্লাহ! আমাকে আমার এই বিপদে সওয়াব দিন এবং এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন)。
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না