উঁচু ভবন নির্মাণের হাদিস: কিয়ামতের আলামত ও এর গভীর তাৎপর্য

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
২০ মে, ২০২৬·২৮

উঁচু ভবন বা অট্টালিকা নির্মাণের হাদিসটি নিয়ে অনেকেই বিস্তারিত জানতে চান। এটি কি সত্যিই কিয়ামতের অন্যতম একটি আলামত? হাদিসে এসেছে, শেষ জমানায় এক সময় জুতোহীন, বস্ত্রহীন ও দরিদ্র মেষপালকেরা উঁচু উঁচু অট্টালিকা বানাতে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করবে। এই লেখায় সহজ ও সাবলীল ভাষায় হাদিসটির অর্থ, প্রেক্ষাপট, সমসাময়িক বিশ্বের সাথে এর সম্পর্ক, ভুল ব্যাখ্যা এবং একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো, ইন শা আল্লাহ।

উঁচু ভবন নির্মাণের হাদিসটি আসলে কোনটি?

উঁচু ভবন নির্মাণের হাদিসটি মূলত হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালামের বিখ্যাত হাদিসের একটি অংশ [1, 2]। একদিন তিনি মানুষের রূপ ধারণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে হাজির হলেন [2]। তিনি ইসলাম, ঈমান, ইহসান এবং কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন [1, 2]। সবশেষে তিনি কিয়ামতের আলামত বা লক্ষণগুলো জানতে চাইলেন [2]। তখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের কয়েকটি লক্ষণের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে অন্যতম একটি ছিল উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতা [1, 2]।

أَنْ تَرَى الْحُفَاةَ الْعُرَاةَ الْعَالَةَ رِعَاءَ الشَّاءِ يَتَطَاوَلُونَ فِي الْبُنْيَانِ

অর্থ: তুমি দেখবে, খালি পায়ে, অর্ধনগ্ন, দরিদ্র ছাগল বা ভেড়ার রাখালরা উঁচু উঁচু অট্টালিকা নির্মাণে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করছে [1, 2]।

রেফারেন্স: সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৫০ [1]; সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ৮ [2]

এখানে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দিষ্ট কোনো শহরের নাম বা কোনো নির্দিষ্ট বছরের কথা উল্লেখ করেননি। বরং তিনি একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। দরিদ্র ও অতি সাধারণ জীবনযাপনকারী মানুষ হঠাৎ প্রচুর ধনসম্পদ, ক্ষমতা ও বাহ্যিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জনের পর কীভাবে বিলাসবহুল জীবন ও লোকদেখানো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে, এখানে মূলত সেই চিত্রটিই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত গভীর ও চিন্তার খোরাক জোগায়।

উঁচু ভবন নির্মাণের হাদিসটি কিয়ামতের কোন ধরনের আলামত?

উঁচু ভবন নির্মাণের হাদিসটি কিয়ামতের ছোট আলামত বা অপ্রধান লক্ষণের সাথে সম্পর্কিত। ছোট আলামত বলতে এমন কিছু লক্ষণকে বোঝায়, যা কিয়ামত কায়েম হওয়ার দীর্ঘ সময় আগে থেকে সমাজে ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে। এসব লক্ষণ দেখা দেওয়ার অর্থ এই নয় যে কিয়ামত আজ বা কালই হয়ে যাবে। বরং এগুলো মানুষকে আখেরাতমুখী করার জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। কিয়ামতের প্রকৃত সময় একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।

হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম যখন কিয়ামতের সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিয়েছিলেন যে, এ বিষয়ে যাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে (অর্থাৎ স্বয়ং নবীজি) তিনি প্রশ্নকারীর (অর্থাৎ জিবরাইল আ.) চেয়ে বেশি জানেন না [2]। সহজ কথায়, কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে তার সুনির্দিষ্ট সময় নবীজিকেও জানানো হয়নি। তাই কোনো মানুষ যদি এই হাদিসটি দেখিয়ে কিয়ামতের সুনির্দিষ্ট তারিখ বা বছর নির্ধারণ করতে চায়, তবে সে মারাত্মক ভুল করবে। এটি কোনো ভীতি ছড়ানোর বিষয় নয়, বরং মানুষকে জাগ্রত ও সতর্ক করার একটি ঐশী মাধ্যম।

এই হাদিসটি আমাদের স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, শেষ জমানায় মানুষের নৈতিক মূল্যবোধে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। মানুষের কাছে পরকালের চেয়ে পার্থিব সম্পদ, বড় বড় অট্টালিকা, সামাজিক মর্যাদা ও বাহ্যিক প্রতিযোগিতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একজন প্রকৃত মুমিন এ থেকে গভীর শিক্ষা গ্রহণ করবে, নিজের মন থেকে অহংকার দূর করবে এবং নিজের আমল সংশোধনে মনোযোগী হবে।

উঁচু ভবন বানানোর প্রতিযোগিতা বলতে কী বোঝায়?

হাদিসে বলা হয়েছে, মানুষ অট্টালিকা উঁচু করার প্রতিযোগিতা করবে [1, 2]। এখানে মূল বিষয়টি কেবল ইট, সিমেন্ট বা বহুতল ভবনের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আসল বিষয় হলো মানুষের পারস্পরিক প্রতিযোগিতার মানসিকতা। কে কার চেয়ে বেশি উঁচু ভবন তৈরি করতে পারল, কে কত বেশি ব্যয়বহুল স্থাপত্য গড়ল, কার শহর কত বেশি ঝলমলে ও চাকচিক্যময় হলো—এই ধরনের অহংকার ও লোকদেখানো মানসিকতাই এই হাদিসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

তাহলে কি উঁচু ভবন বা বহুতল ইমারত নির্মাণ করা সম্পূর্ণ হারাম? বিষয়টিকে সরাসরি এভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। মানুষের জীবনের নানা প্রয়োজনে বহুতল ভবনের দরকার হতে পারে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে শহরগুলো সম্প্রসারিত হচ্ছে; ফলে বাসস্থান, হাসপাতাল, প্রশাসনিক কার্যালয় কিংবা মসজিদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু যখন এই স্বাভাবিক প্রয়োজনের জায়গায় অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার প্রবৃত্তি ভর করে, তখনই তা বিপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামে অপচয়, অহংকার এবং লোকদেখানো যেকোনো কাজকেই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, হাদিসে যাদের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তারা একসময় অত্যন্ত দরিদ্র ও সাধারণ মেষপালক ছিল [1, 2]। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে তারা এমন এক অবস্থায় পৌঁছাবে যে, অট্টালিকা নির্মাণ নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠবে [1, 2]। সমাজের এই আমূল পরিবর্তন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার বিষয়টির দিকেই হাদিসটিতে অত্যন্ত চমৎকার ও শক্তিশালী ইশারা করা হয়েছে।

সমসাময়িক বিশ্বে উঁচু ভবন নির্মাণের হাদিসটির প্রতিফলন

আজকের আধুনিক যুগে আকাশচুম্বী অট্টালিকা, বিলাসবহুল বহুতল ভবন এবং মেগাসিটি বা মহাসহর অত্যন্ত পরিচিত বিষয়। বিশেষ করে মরুভূমির সাধারণ জীবনযাত্রা ও বেদুইন সংস্কৃতি থেকে অতি দ্রুত আধুনিক ও চোখ ধাঁধানো প্রযুক্তিনির্ভর নগরে রূপান্তরিত হওয়ার যে বাস্তব চিত্র আমরা দেখতে পাই, তা মানুষকে নির্দ্বিধায় এই হাদিসের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এই কারণে অনেকেই কিয়ামতের আলামত সম্পর্কিত এই হাদিসটি পড়ে বিস্মিত হন। হ্যাঁ, বাহ্যিক পরিস্থিতির সাথে এর চমৎকার মিল রয়েছে। তবে এই মিলের ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে আমাদের যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

আমরা বলতে পারি যে, বর্তমান যুগের বাস্তবতায় এই হাদিসের মর্মার্থ অনুধাবন করা আমাদের জন্য অনেক সহজ হয়ে গেছে। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট বহুতল ভবন, নির্দিষ্ট কোনো দেশ কিংবা নির্দিষ্ট কোনো নির্মাণ প্রকল্পকে চূড়ান্তভাবে এই হাদিসের একমাত্র বা একমাত্র বাস্তব রূপ বলে দাবি করা সমীচীন নয়। প্রকৃত সত্য কেবল মহান আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের মূল দায়িত্ব হলো হাদিস থেকে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন চাঞ্চল্যকর বা ভাইরাল দাবি ছড়ানো নয়।

এই হাদিসটি মূলত আমাদের অন্তরচক্ষু খুলে দেয়। পার্থিব পৃথিবী অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তনশীল। গতকাল যে মানুষটি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করত, আজ সে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে যেতে পারে। কিন্তু সম্পদ অর্জনের পর মানুষের অন্তরের অবস্থা কেমন থাকে, সে কি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে নাকি অহংকারী হয়ে ওঠে—সেটিই হচ্ছে আসল পরীক্ষা। মহান আল্লাহ যেন আমাদের সদাসর্বদা বিনয়ী ও কৃতজ্ঞ থাকার তাওফিক দান করেন।

এই হাদিসে মুসলিমদের জন্য কী শিক্ষা আছে?

প্রথম শিক্ষা: পার্থিব জগতের সাময়িক চাকচিক্য ও মোহে হারিয়ে না যাওয়া। ইসলামে সুন্দর ও পরিপাটি বাসস্থান থাকা দোষের কিছু নয়, কিংবা হালাল উপায়ে সম্পদ অর্জন করাও নিষিদ্ধ নয়। তবে বাড়ি, গাড়ি, নামী-দামী ব্র্যান্ড কিংবা বিলাসবহুল জীবনযাপনই যদি মানুষের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও ধ্যান-জ্ঞান হয়ে দাঁড়ায়, তবে মানুষের অন্তর ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে এবং ঈমানের আলো নিভে যেতে শুরু করে।

দ্বিতীয় শিক্ষা: পরকাল ও কিয়ামতের ভয়াবহতা সম্পর্কে সবসময় সচেতন থাকা। কিয়ামতের আলামতগুলো জানার মূল উদ্দেশ্য সমাজে আতঙ্ক বা ভীতি সৃষ্টি করা নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হলো নিজের গুনাহের জন্য খাঁটি অন্তরে তাওবা করা, নিয়মিত সালাত বা নামাজ আদায় করা, সর্বদা হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা এবং মানুষের অধিকার বা হক যথাযথভাবে আদায় করা। ফেতনা-ফাসাদের এই যুগে আমাদের ছোট ছোট নেক আমলও আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।

তৃতীয় শিক্ষা: যেকোনো ধরনের অহংকার ও আত্মতুষ্টি থেকে বেঁচে থাকা। আজকের ধনী ব্যক্তি আগামীকাল যেকোনো মুহূর্তে দরিদ্র হয়ে যেতে পারেন। আজ যার আকাশচুম্বী অট্টালিকা রয়েছে, আগামীকাল হয়তো মাটির অন্ধকার কবরেই হবে তার শেষ ঠিকানা। এই চিরন্তন সত্যটি অত্যন্ত কঠিন হলেও বাস্তব। তাই একজন মুমিনের আসল সৌন্দর্য হলো তার বিনয়, আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা বা শোকরগোজারি এবং অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় বজায় রাখা।

উঁচু ভবন নির্মাণের হাদিসটি নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই হাদিসটি নিয়ে নানাবিধ বিভ্রান্তিকর আলোচনা ও পোস্ট দেখতে পাওয়া যায়। কেউ কেউ সুনির্দিষ্ট কোনো ভবনের ছবি শেয়ার করে দাবি করেন যে, এটিই হাদিসে বর্ণিত সেই শেষ নিদর্শন। আবার কেউ কেউ কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ বা তারিখ ঘোষণা করা শুরু করেন। এই ধরনের মনগড়া ও কাল্পনিক ব্যাখ্যা থেকে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, হাদিস হলো আমাদের দায়িত্ব ও कर्तव्य সচেতন করার জন্য, কেবল সস্তা চমক সৃষ্টির জন্য নয়।

একটি বড় ভুল ধারণা হলো, সব ধরনের উঁচু ভবন নির্মাণ করাই বুঝি গুনাহ বা নিষিদ্ধ কাজ। বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। যদি বাস্তব প্রয়োজন থাকে, রাষ্ট্রের আইনি নিয়মকানুন মেনে পরিবেশের ক্ষতি না করে তৈরি করা হয়, অপচয় বর্জন করা হয় এবং মানুষের কল্যাণ সাধিত হয়—তবে তা অবশ্যই দোষের কিছু নয়। আরেকটি বড় ভুল হলো, এই হাদিসের নির্দেশনাকে কেবল সুনির্দিষ্ট একটি দেশের বা অঞ্চলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীর পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত ও সার্বজনীন। তাই কোনো বিষয়ে অতিমাত্রায় নিশ্চিত হয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের মনে রাখা আবশ্যক; কিয়ামতের আলামত বা পরকালের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা বলার জন্য অবশ্যই নির্ভরযোগ্য ও সহিহ সুত্রের প্রয়োজন। কোনো দুর্বল কিচ্ছা-কাহিনী, ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা সূত্রহীন ভিডিও বা খণ্ডিত তথ্যচিত্রের ওপর ভিত্তি করে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস বা আকিদা গড়ে তোলা মোটেও সমীচীন নয়। আমাদের জন্য সহিহ বুখারি [1] এবং সহিহ মুসলিম [2] শরিফে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদিসের অংশটুকুই যথেষ্ট ও নিরাপদ।

নিজের জীবনে এই হাদিস কীভাবে কাজে লাগাবেন?

উঁচু ভবন নির্মাণের এই হাদিসটি পড়ে কেবল চারপাশের বাহ্যিক পরিবর্তন বা বস্তুগত উন্নয়ন অবলোকন করা খুবই সহজ। কিন্তু একজন মুমিনের আসল দায়িত্ব হলো নিজের অন্তরের দিকে তাকানো। নিজেকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমিও কি অলক্ষ্যে এই পার্থিব প্রতিযোগিতার মোহে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছি? আমি কি অন্যের ধনসম্পদ বা জৌলুস দেখে মনে মনে হিংসা লালন করছি? আমি কি আমার সালাত বা নামাজের চেয়ে নিজের বৈষয়িক ক্যারিয়ার ও সামাজিক মর্যাদাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি? এই আত্মানুসন্ধানমূলক প্রশ্নগুলো করা আজ অত্যন্ত জরুরি।

আসুন, আমরা প্রতিদিন নিজের কাজের একটি সংক্ষিপ্ত হিসাব নিই। আমাদের পাঁচ ওয়াক্ত সালাত বা নামাজ সময়মতো আদায় হচ্ছে কি না, আমাদের উপার্জনের উৎস সম্পূর্ণ হালাল কি না, পরিবারের সদস্যদের অধিকার বা হক আমরা যথাযথভাবে পূরণ করছি কি না এবং সমাজের অভাবী ও দরিদ্র মানুষদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করছি কি না—এগুলোই হলো আমাদের প্রকৃত আমল। কিয়ামতের আলামত বা হাদিস জানার আসল সার্থকতা ও সুফল এখানেই নিহিত রয়েছে।

একটি সুন্দর ও কল্যাণকর অভ্যাস হলো, পার্থিব কল্যাণের জন্য দোয়া করার পাশাপাশি পরকালের মুক্তির জন্য বেশি বেশি প্রার্থনা করা। মহান আল্লাহর দরবারে এই বলে প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের উত্তম রিজিক দান করেন, তবে সেই রিজিক যেন আমাদের অন্তরকে কঠোর বা অহংকারী বানিয়ে না ফেলে। এটিই একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও সুন্দর পথ, ইন শা আল্লাহ।

উঁচু ভবন নির্মাণের হাদিস সম্পর্কে সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসা (FAQ)

উঁচু ভবন বা অট্টালিকা নির্মাণের এই হাদিসটি কি সহিহ বা বিশুদ্ধ?
হ্যাঁ, উঁচু ভবন নির্মাণের এই হাদিসটি সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ বা সহিহ হাদিসের অন্তর্ভুক্ত। এটি মূলত ইসলামের ইতিহাসের অত্যন্ত বিখ্যাত "হাদিসে জিবরাইল"-এর একটি অংশ [1, 2]। নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স হিসেবে এটি সহিহ বুখারি [1] এবং সহিহ মুসলিম [2]—উভয় গ্রন্থেই অত্যন্ত বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে।
এটি কি কিয়ামতের বড় আলামতসমূহের অন্তর্ভুক্ত?
না, এটি মূলত কিয়ামতের ছোট আলামত বা অপ্রধান নিদর্শনগুলোর মধ্যে আলোচনা করা হয়। কিয়ামতের বড় আলামতসমূহ (যেমন: দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ, হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের পৃথিবীতে অবতরণ, ইয়াজুজ-মাজুজের আগমন ইত্যাদি) সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ভয়াবহ বিষয়। এই ছোট আলামতটি মানুষকে আগে থেকেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ দেয়।
উঁচু বা বহুতল ভবন নির্মাণ করা কি ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ বা হারাম?
নিছক উঁচু ভবন নির্মাণ করাকে ইসলামে সরাসরি হারাম বা নিষিদ্ধ বলা যাবে না। যদি বাস্তবসম্মত প্রয়োজন থাকে, ভবনের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়, হালাল উপার্জনের অর্থ দিয়ে তৈরি করা হয় এবং অপচয় পরিহার করা হয়—তবে তা অনুমোদিত। তবে লোকদেখানো প্রদর্শনীবাদ, অহংকার ও অপচয় ইসলামে কঠোরভাবে নিন্দনীয় ও বর্জনীয়।
এই হাদিসের ভবিষ্যৎবাণী কি কেবল আরব অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য?
হাদিসের মূল পাঠে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা ভৌগোলিক অঞ্চলের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে মরুভূমির অতি সাধারণ মেষপালক জীবন থেকে হঠাৎ করে আকাশচুম্বী অট্টালিকা নির্মাণের প্রতিযোগিতার দিকে ধাবিত হওয়ার দৃশ্যটি আরব অঞ্চলের আধুনিক রূপান্তরের সাথে অনেকেই মেলানোর চেষ্টা করেন। তা সত্ত্বেও, কোনো সুনির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর এর অর্থ সীমাবদ্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়। প্রকৃত জ্ঞান কেবল মহান আল্লাহর নিকটই রয়েছে।
কিয়ামতের বিভিন্ন আলামত প্রকাশ পেতে দেখলে একজন মুমিনের করণীয় কী?
কিয়ামতের আলামত দেখে আতঙ্কিত হয়ে গুজব ছড়ানো বা সোশ্যাল মিডিয়ায় চাঞ্চল্য তৈরি করা কোনো মুমিনের কাজ নয়। বরং আমাদের উচিত খাঁটি মনে আল্লাহর দরবারে তাওবা করা, নিয়মিত সালাত বা নামাজ কায়েম করা, হালাল উপার্জনে সচেষ্ট হওয়া, নিয়মিত পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা এবং মানুষের অধিকার বা হক যথাযথভাবে আদায় করা। এটাই হলো আলামতগুলো জানার প্রকৃত উদ্দেশ্য।
এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে কি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় বা তারিখ নির্ধারণ করা সম্ভব?
না, কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সুনির্দিষ্ট সময় একমাত্র মহান আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানেন না। খোদ জিবরাইলের হাদিসেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এ বিষয়ে যাকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, তিনি প্রশ্নকারীর চেয়ে অধিক কিছু জানেন না [2]। তাই কিয়ামতের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা বছরের অনুমান করা সম্পূর্ণ ভুল ও বিভ্রান্তিকর কাজ।

শেষ কথা: উঁচু ভবন নয়, অন্তর ঠিক করা জরুরি

উঁচু ভবন নির্মাণের এই হাদিসটি মূলত আমাদের স্পষ্ট অবয়বে দেখিয়ে দেয় যে—পার্থিব জগৎ পরিবর্তনশীল, মানুষের জীবনধারা বদলে যাবে এবং বস্তুগত প্রতিযোগিতার ধরনও পাল্টে যাবে। কিন্তু একজন নিষ্ঠাবান মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য কখনই বদলে যাওয়া উচিত নয়। আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, সততা ও হালাল উপায়ে জীবনযাপন, বিনয়ী অন্তরের অধিকারী হওয়া এবং পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করা।

আকাশচুম্বী বিলাসবহুল অট্টালিকা দেখে কেবল বিস্ময় প্রকাশ করলে আমাদের কোনো প্রকৃত ফায়দা হবে না। বরং আমাদের উচিত নিজের আমলের মানকে আরও উন্নত ও সুউচ্চ করা। নিয়মিত সালাতে মনোযোগী হওয়া, মন থেকে সব ধরনের অহংকার ও দেমাগ ঝেড়ে ফেলা এবং বেশি বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা বা তাওবা করা। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কিয়ামতের আলামত দেখে উপদেশ গ্রহণ ও সতর্ক হওয়ার তাওফিক দান করুন, কেবল তা নিয়ে নিষ্ফল তর্কে জড়ানোর জন্য নয়। আমীন।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

  1. সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৫০
  2. সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ৮
  3. হাদিসে জিবরাইল: ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও কিয়ামতের আলামত সংক্রান্ত অধ্যায়
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না