যারা প্রথমবার পবিত্র উমরাহ পালন করতে যাচ্ছেন, তাদের মনের মধ্যে এক ধরনের আবেগ ও সামান্য দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা খুব স্বাভাবিক। এই পবিত্র সফরের সঠিক প্রস্তুতি এবং সহজ নিয়মাবলি জানা থাকলে পুরো ইবাদতটি অত্যন্ত সাবলীল ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তিময় হয়ে ওঠে। প্রথমবার উমরাহ পালনকারীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ, সহজ ও বাস্তবসম্মত নির্দেশিকা এখানে আলোচনা করা হলো, যাতে আপনি কোনো বিভ্রান্তি ছাড়াই আত্মবিশ্বাসের সাথে আল্লাহর ঘরে ইবাদত সম্পন্ন করতে পারেন।
উমরাহ পালনের মূল বিষয় ও প্রস্তুতি
উমরাহ হলো একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত যা পবিত্র মক্কাতুল মুকাররমায় সম্পাদন করা হয়। হজের মতো এটি নির্দিষ্ট সময়ে সীমাবদ্ধ নয় এবং বাধ্যতামূলক না হলেও এটি আদায় করার মাধ্যমে বিপুল সওয়াব অর্জন করা যায়। এই বরকতময় সফরের প্রধান প্রস্তুতি হলো সঠিক নিয়ত, ইহরামের নিয়মাবলি জানা এবং প্রতিটি ধাপের জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। প্রথমবার উমরাহ যাত্রীদের জন্য আগে থেকেই নিয়মগুলো ভালোভাবে জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যাতে আল্লাহর ঘরে গিয়ে বিভ্রান্ত হতে না হয়।
ধাপে ধাপে উমরাহ পালনের ৪টি প্রধান কাজ
উমরাহ মূলত ৪টি প্রধান কাজের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো নিচে ক্রমানুসারে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. ইহরাম ধারণ ও নিয়ত করা
উমরাহর প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো মিকাত (নির্দিষ্ট সীমানা) অতিক্রম করার পূর্বেই ইহরাম পরিধান করা এবং উমরাহর নিয়ত করা। নিয়ত করার পর পুরুষদের জন্য জোরে এবং নারীদের জন্য নিচু স্বরে তালবিয়া পাঠ করা সুন্নত।
উচ্চারণ: লাব্বাইকাল্লা-হুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা-শারি-কা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা-শারি-কা লাক।
অর্থ: আমি হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই যাবতীয় প্রশংসা, নিয়ামত এবং রাজত্ব একমাত্র আপনারই, আপনার কোনো শরিক নেই।
২. পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ করা
কাবা শরিফের হাজরে আসওয়াদ কোণ থেকে শুরু করে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে পবিত্র কাবার চারপাশে সাতবার প্রদক্ষিণ করাকে তাওয়াফ বলা হয়। তাওয়াফ শুরু করার সময় ইশারা করে বা স্পর্শ করে চুমু খাওয়ার মাধ্যমে হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন বা ইশতিলাম করতে হয়।
৩. সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাঈ করা
তাওয়াফ শেষ করে মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দুই রাকাত ওয়াজিব সালাত আদায় এবং জমজমের পানি পান করার পর সাঈ করতে হয়। সাফা পাহাড় থেকে শুরু করে মারওয়া পাহাড়ে গিয়ে একবার এবং মারওয়া থেকে সাফায় ফিরে এলে দ্বিতীয়বার—এভাবে মোট সাতবার এই দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে হাঁটা বা দ্রুত গতিতে চলাকে সাঈ বলে (সাফা থেকে মারওয়া ১, মারওয়া থেকে সাফা ২, এভাবে মারওয়া পাহাড়ে গিয়ে ৭ম বার সাঈ শেষ হবে)।
৪. হলক বা তাকসির (চুল কাটা)
সাঈ শেষ করার পর পুরুষদের ক্ষেত্রে পুরো মাথা মুণ্ডন করা (হলক) অথবা চুল সমানভাবে ছোট করা (তাকসির) এবং নারীদের ক্ষেত্রে চুল আঙুলের এক কর পরিমাণ ছোট করার মাধ্যমে উমরাহর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। চুল কাটার পর ইহরামের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়ে যায়।
উমরাহ পালনের সময় সাধারণ ভুলত্রুটি
প্রথমবার উমরাহ করার সময় অনেকেই না বুঝে কিছু সাধারণ ভুল করে ফেলেন, যা এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি:
- মিকাত অতিক্রম করে ফেলা: ইহরাম না বেঁধে মিকাতের সীমানা পার হয়ে যাওয়া বড় একটি ভুল। এমনটি হলে দম (পশু কোরবানি) দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়।
- তাওয়াফের সময় মনোযোগ নষ্ট করা: তাওয়াফ করার সময় সেলফি তোলা, ভিডিও করা বা অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত হওয়া ইবাদতের গভীরতা ও মনোযোগ নষ্ট করে।
- সাঈর চক্কর গণনায় ভুল: সাফা থেকে মারওয়া যাওয়াকে একটি এবং মারওয়া থেকে সাফায় ফেরাকে আরেকটি চক্কর হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেকে সাফা থেকে মারওয়া গিয়ে আবার সাফায় ফিরে আসাকে এক চক্কর মনে করেন, যা ভুল।
- তাড়াহুড়ো করা: ভিড়ের মধ্যে ধৈর্য হারিয়ে ফেলা বা ধাক্কাধাক্কি করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, এটি আল্লাহর ঘর এবং এখানে বিনয় ও নম্রতা বজায় রাখা অপরিহার্য।
প্রথমবার উমরাহকারীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
উমরাহ যাত্রাকে সহজ ও আরামদায়ক করতে কিছু বাস্তবসম্মত পরামর্শ নিচে দেওয়া হলো:
- শারীরিক সক্ষমতা ও সুস্থতা: উমরাহতে প্রচুর হাঁটতে হয়। তাই সফরের আগে থেকেই হালকা হাঁটার অভ্যাস করুন এবং পর্যাপ্ত পানি (জমজমের পানি) পান করে নিজেকে হাইড্রেটেড রাখুন।
- গাইডবুক বা নির্ভরযোগ্য অ্যাপ ব্যবহার: নির্ভরযোগ্য কোনো আলেম বা গাইডের পরামর্শ অনুযায়ী উমরাহর ধাপগুলো অনুশীলন করে নিন।
- সহজ জুতো বা স্যান্ডেল ব্যবহার: তাওয়াফ ও সাঈর সময় খালি পায়ে থাকতে হলেও অন্যান্য সময় ব্যবহারের জন্য আরামদায়ক জুতো সাথে রাখুন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
উমরাহ করার জন্য ইহরাম পরিধান করা কি বাধ্যতামূলক?
উমরাহ সম্পন্ন করতে সাধারণত কত সময় লাগে?
মহিলাদের উমরাহ করার ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম কী?
উমরাহর সময় ভুলবশত কোনো নিয়ম ভঙ্গ হলে কী করণীয়?
উমরাহ করার সঠিক সময় কোনটি?
উপসংহার
প্রথমবারের উমরাহ সফর প্রতিটি মুমিনের জীবনের অন্যতম সেরা ও আবেগপূর্ণ মুহূর্ত। এই গাইডটি অনুসরণ করে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে প্রতিটি ধাপ ধৈর্য ও মনোযোগের সাথে সম্পন্ন করলে আপনার সফরটি অত্যন্ত সুন্দর ও বরকতময় হবে ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ আমাদের সকলের উমরাহ ও ইবাদত কবুল করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র
- সহিহ আল-বুখারি
- সহিহ মুসলিম
- রিয়াদুস সালিহীন

