সন্তান মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে দেওয়া অত্যন্ত বড় একটি নিয়ামত এবং শ্রেষ্ঠ উপহার। নবজাতক শিশুর জন্মের পর পিতা-মাতা ও পরিবারের প্রধান দায়িত্ব হলো আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য দোয়া ও আমল করা। একটি নবজাতক শিশুর আগমন যেমন আনন্দের, তেমনই তাকে নেককার ও সুস্থ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তুতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে শিশুর জন্মের প্রথম দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী জীবন পর্যন্ত সুন্দর দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই গাইডটিতে আমরা নবজাতক শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় দোয়া, সুন্নাহ আমল এবং আকিকার সহজ নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
নবজাতকের প্রথম মুহূর্তের সুন্নাহ আমল
শিশুর জন্মের পর পরই বেশ কিছু সুন্দর আমল রয়েছে, যা আল্লাহর রহমত ও বরকত নিয়ে আসে। শিশুর ডান কানে আজান দেওয়া এবং তাহনীক করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আমল। আজান দেওয়ার মাধ্যমে শিশুর কানে সর্বপ্রথম আল্লাহর মহত্ত্ব ও তাওহীদের বাণী প্রবেশ করে। আর তাহনীক হলো— খেজুর চিবিয়ে নরম করে তা দিয়ে নবজাতকের তালু আলিশ করে দেওয়া, যা রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে করতেন ও উৎসাহ দিয়েছেন।
নবজাতক শিশুর সুরক্ষায় দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রিয় নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর সুরক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে বিশেষভাবে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। আমাদেরও উচিত সন্তানদের সব ধরনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার জন্য নিয়মিত এই দোয়াটি পাঠ করা। বিশেষ করে কোনো আত্মীয় বা শুভাকাঙ্ক্ষী নবজাতককে দেখতে আসলে নিচের দোয়াটি পড়ে ফুঁ দেওয়া উত্তম:
উচ্চারণ: উইজুকা বিকালিমাাতিল্লাহিত তা-ম্মাতি মিং কুল্লি শায়ত্বা-নিওঁ ওয়া হা-ম্মাতিওঁ ওয়া মিং কুল্লি ‘আইনিল লা-ম্ম্মাহ।
অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের মাধ্যমে তোমার জন্য আশ্রয় চাচ্ছি সব ধরনের শয়তান, বিষাক্ত ক্ষতিকর জীবজন্তু এবং সমস্ত কুদৃষ্টির অনিষ্ট থেকে। (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৩৩৭১)
নেক ও পরহেজগার সন্তান হওয়ার দোয়া
শিশুর চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য এবং উত্তম মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পিতা-মাতা নিয়মিত এই দোয়াটি পড়তে পারেন। এটি শিশুর উত্তম লালন-পালনের ক্ষেত্রে এক দারুণ বরকতময় দোয়া:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাজ‘আলহু বাররান তাক্বিয়্যান ওয়া আমবিতহু নাবাতান হাসানান।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি একে সৎকর্মশীল ও পরহেজগার হিসেবে কবুল করুন এবং তাকে উত্তম রূপে গড়ে তুলুন।
আকিকা ও সুন্নাহর নির্দেশনা
আকিকা হলো নবজাতক শিশুর জন্মের শুকরিয়া স্বরূপ আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কুরবানি করা। এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ মুয়াক্কাদা (তাগিদপূর্ণ সুন্নাত)। আকিকার মাধ্যমে শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর থেকে আল্লাহর রহমতে নানা বিপদ-আপদ দূর হয়ে যায়।
আকিকার নিয়ম ও পশু নির্ধারণ:
- সময়: সাধারণত শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা সবচেয়ে উত্তম। কোনো কারণে সপ্তম দিনে সম্ভব না হলে ১৪ বা ২১ তম দিনেও করা যায়।
- পুত্র সন্তান: পুত্র সন্তানের জন্য দুটি সমমানের ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কুরবানি করতে হয়।
- কন্যা সন্তান: কন্যা সন্তানের জন্য একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কুরবানি করা সুন্নাহ।
আকিকার গোশত নিজেদের পরিবারে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের বণ্টন করা এবং গরিব-দুঃখীদের দান করা সুন্নাহসম্মত। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এর মাধ্যমে সমাজে আনন্দ ও সৌহার্দ্য ছড়িয়ে পড়ে এবং শিশুর জন্য পরম কল্যাণ বয়ে আনে।
অভিভাবকদের জন্য ইসলামিক প্যারেন্টিং পরামর্শ
সন্তানকে কেবল বৈষয়িক শিক্ষায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি একজন আদর্শ মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলা পিতা-মাতার প্রধান দায়িত্ব। সন্তানের শৈশব থেকেই তাদের অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ এবং নৈতিকতার বীজ বুনে দিতে হবে। আপনার ধৈর্য, সুন্দর ব্যবহার এবং আল্লাহর কাছে সার্বক্ষণিক দোয়াই পারবে সন্তানকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
নবজাতক শিশুর জন্য কোন দোয়া পড়া উত্তম?
আকিকা কখন করা উচিত?
আকিকা কি ফরজ নাকি সুন্নাহ?
শিশুর কানে আজান দেওয়ার বিধান কী?
আকিকার গোশত কি পিতা-মাতা খেতে পারেন?
রেফারেন্স
- সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নম্বর: ৩৩৭১
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ২৮৫৮
- রিয়াদুস সালেহীন, হাদিস অধ্যায়: নবজাতকের দোয়া

