সন্তানের উত্তরাধিকার ইসলামে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। অনেক পরিবারে পারস্পরিক গভীর ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও সঠিক নিয়ম না জানার কারণে উত্তরাধিকার বণ্টনের সময় বড় ধরনের ভুল হয়ে যায়। পবিত্র কুরআন এই ভাগ বা হিস্যা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে, যাতে ছেলে-মেয়ে, বাবা-মা কিংবা স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও হক নষ্ট না হয়। তাই উত্তরাধিকার বণ্টনে কোনো আবেগ নয়, বরং শরিয়তি নিয়ম মেনে চলাই একমাত্র নিরাপদ ও সঠিক পথ। এখানে অত্যন্ত সহজ ভাষায় সন্তানের অংশ, বণ্টন করার পূর্বে কোন বিষয়গুলো মেটাতে হবে এবং উত্তরাধিকার হিসাবের মূল নিয়মগুলো আলোচনা করা হলো।
সন্তানের উত্তরাধিকার বুঝতে আগে যা জানা দরকার
সন্তানের উত্তরাধিকার মানে কেবল মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া টাকা-পয়সা বা জমিজমা ভাগাভাগি করা নয়। এটি মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদের ওপর মহান আল্লাহর নির্ধারিত একটি অলঙ্ঘনীয় অধিকার। এখানে আবেগ, রাগ, পারিবারিক চাপ কিংবা বড় সন্তানের অযৌক্তিক দাবি খাটিয়ে আল্লাহর নির্ধারিত নিয়ম পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই।
ইসলামি পরিভাষায় উত্তরাধিকারকে "মীরাস" বা "ফরায়েজ" বলা হয়। পবিত্র কুরআনে নির্দিষ্ট কিছু আত্মীয়ের ভাগের কথা সরাসরি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সন্তানদের অধিকার বা হিস্যাও এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সন্তানরাই মৃত ব্যক্তির প্রধান উত্তরাধিকারী হয়ে থাকে।
একটি বিষয় শুরুতেই মনে রাখা জরুরি—বাস্তবিক উত্তরাধিকারের হিসাব সবসময় সম্পদের পূর্ণ তালিকা, মৃত ব্যক্তির ঋণ, ওসিয়ত, জীবিত নিকটাত্মীয় এবং সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা করে করতে হয়। তাই এই লেখাটি মূলত শেখার জন্য একটি প্রাথমিক দিকনির্দেশিকা মাত্র। চূড়ান্তভাবে সম্পদ বণ্টনের জন্য কোনো নির্ভরযোগ্য আলেম বা ফরায়েজ শাস্ত্রে অভিজ্ঞ কোনো আইনবিদের সরাসরি সাহায্য নেওয়া আবশ্যক।
সন্তানের উত্তরাধিকার ইসলামে ছেলে ও মেয়ের মূল ভাগ
পবিত্র কুরআনের মূল ঘোষণা অনুযায়ী, ছেলে ও মেয়ে একসঙ্গে থাকলে ছেলে সবসময় মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পেয়ে থাকে। সহজ কথায় বলতে গেলে, এক ছেলে পাবে দুই অংশ এবং এক মেয়ে পাবে এক অংশ। এই অনুপাত তখনই প্রযোজ্য হয়, যখন একই স্তরের ছেলে ও মেয়ে যৌথভাবে উত্তরাধিকারী হিসেবে উপস্থিত থাকে।
তবে সন্তানের উত্তরাধিকার বণ্টনের পরিস্থিতি সবসময় একরকম থাকে না। কখনো হয়তো পরিবারে শুধু কন্যা সন্তান থাকে, কখনো আবার শুধু পুত্র সন্তান থাকে; আবার কখনো স্বামী, স্ত্রী, পিতা-মাতা এবং সন্তান সবাই একত্রে উপস্থিত থাকে। এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে অন্যান্য অংশীদারদের নির্ধারিত অংশ বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং অবশিষ্ট অংশ সন্তানদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
এক ছেলে ও এক মেয়ে থাকলে
ধরুন, কোনো মৃত ব্যক্তি উত্তরাধিকারী হিসেবে কেবল এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। সম্পদ বণ্টনের আগে মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের প্রয়োজনীয় খরচ, তাঁর কোনো ঋণ থাকলে তা এবং তাঁর বৈধ ওসিয়ত (যদি থাকে) পূরণ করতে হবে। এরপর যদি আর কোনো নির্দিষ্ট অংশের অংশীদার না থাকে, তবে বাকি সম্পদ সমান তিন ভাগে ভাগ করা হবে। যার মধ্যে ছেলে পাবে দুই ভাগ এবং মেয়ে পাবে এক ভাগ।
শুধু এক মেয়ে থাকলে
যদি মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে না থাকে এবং কেবল একটি মাত্র কন্যা সন্তান থাকে, তবে কুরআনের বিধান অনুযায়ী সে মোট সম্পদের অর্ধেক (দুই ভাগের এক ভাগ) পাবে। বাকি অংশ অন্যান্য জীবিত উত্তরাধিকারীদের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে বণ্টিত হবে। যেমন—পিতা-মাতা, স্বামী বা স্ত্রী থাকলে তাদের নির্ধারিত অংশ আগে আলাদা করা হবে।
শুধু দুই বা ততোধিক মেয়ে থাকলে
যদি কোনো পুত্র সন্তান না থাকে এবং কেবল দুই বা তার বেশি কন্যা সন্তান থাকে, তবে মেয়েরা যৌথভাবে মোট সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ (তিন ভাগের দুই ভাগ) পাবে। তারা এই অংশ নিজেদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেবে। কন্যা সন্তানের সংখ্যা তিন বা তার বেশি হলেও তাদের যৌথ অংশ দুই-তৃতীয়াংশই থাকবে এবং তা সকলের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হবে।
শুধু ছেলে থাকলে
যদি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কেবল পুত্র সন্তান থাকে (কোনো কন্যা সন্তান না থাকে), তবে তারা অবশিষ্ট বা সম্পূর্ণ সম্পদ নিজেদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেয়। কারণ তাদের মাঝে ছেলে-মেয়ের অনুপাত হিসাব করার প্রয়োজন হয় না। যদি কেবল একজন ছেলে থাকে, তবে সে অবশিষ্ট পুরো সম্পদ একাই পাবে এবং একাধিক ছেলে থাকলে তারা সকলে সমান অংশে তা ভাগ করে নেবে।
সন্তানের আগে কোন খরচ ও দেনা মেটাতে হবে
সন্তানের উত্তরাধিকার হিসাব করার পূর্বে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তিনটি বিষয় সম্পন্ন করা জরুরি। প্রথমে মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁর রেখে যাওয়া যাবতীয় ধারদেনা বা ঋণ পরিশোধ করতে হবে। তৃতীয়ত, তাঁর কোনো বৈধ ওসিয়ত থাকলে তা পূরণ করতে হবে।
ওসিয়ত নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। ইসলামি শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, ওসিয়ত সর্বমোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের (তিন ভাগের এক ভাগ) বেশি হতে পারে না। তাছাড়া, কোনো নিয়মিত উত্তরাধিকারীর অনুকূলে ওসিয়ত কার্যকর করতে হলে অন্য সকল উত্তরাধিকারীদের সম্মতি প্রয়োজন হয়। অতএব, কোনো পিতা-মাতা যদি জীবদ্দশায় বলে যান যে, "আমার মৃত্যুর পর সব সম্পদ শুধু এক সন্তান পাবে"—তবে তা শরিয়তসম্মতভাবে কঠোর পরীক্ষা-পরীক্ষার দাবি রাখে।
- প্রথম ধাপ: মৃত ব্যক্তির প্রয়োজনীয় দাফন-কাফনের খরচ সম্পন্ন করা।
- দ্বিতীয় ধাপ: প্রমাণিত যাবতীয় ঋণ ও দেনা দ্রুত পরিশোধ করা।
- তৃতীয় ধাপ: মৃত ব্যক্তির বৈধ ওসিয়ত (অনধিক এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ থেকে) পূরণ করা।
- চতুর্থ ধাপ: উপরোক্ত কাজগুলো সম্পন্ন করার পর অবশিষ্ট সম্পদ উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টন করা।
এখানে একটি সতর্কতা মনে রাখা উচিত—ঋণ গোপন রেখে সন্তানদের সম্পদ ভাগ করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া মায়ের স্বর্ণালংকার, বাবার একক ব্যবসা, যৌথ পারিবারিক সম্পদ—এসব বিষয় শুরুতেই আলাদা করে হিসাব না করলে বণ্টন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ভুল ও অবিচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্বামী-স্ত্রী ও পিতা-মাতা থাকলে সন্তানের উত্তরাধিকার কীভাবে পরিবর্তিত হয়
অনেকে মনে করে থাকেন যে, মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে সম্পূর্ণ সম্পদ কেবল সন্তানদের মধ্যেই ভাগ হবে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। ইসলামে স্বামী, স্ত্রী এবং পিতা-মাতার জন্যও নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সন্তান জীবিত থাকলে তাদের অংশ কিছুটা হ্রাস পায়, তবে তারা সম্পূর্ণ বঞ্চিত হন না।
মৃত ব্যক্তি যদি পুরুষ হন এবং তাঁর সন্তান থাকে, তবে তাঁর স্ত্রী মোট সম্পদের এক-অষ্টমাংশ (আট ভাগের এক ভাগ) পাবেন। একাধিক স্ত্রী থাকলে তাঁরা যৌথভাবে এই এক-অষ্টমাংশ নিজেদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেবেন। অপরদিকে, মৃত ব্যক্তি যদি নারী হন এবং তাঁর সন্তান থাকে, তবে তাঁর স্বামী পাবেন মোট সম্পদের এক-চতুর্থাংশ (চার ভাগের এক ভাগ)।
সন্তান জীবিত থাকলে মৃত ব্যক্তির মা সাধারণত মোট সম্পদের এক-ষষ্ঠাংশ (ছয় ভাগের এক ভাগ) পান। একইভাবে বাবাও পান এক-ষষ্ঠাংশ। তবে যদি কোনো পুত্র সন্তান না থাকে (কেবল কন্যা সন্তান থাকে), তবে বাবা এক-ষষ্ঠাংশ পাওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত অবশিষ্ট অংশও লাভ করতে পারেন। তাই সন্তানের উত্তরাধিকার হিসাব করার সময় পিতা-মাতার জীবিত থাকার বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা জরুরি।
সন্তানের উত্তরাধিকার হিসাবের সহজ উদাহরণ
উত্তরাধিকার বণ্টন পদ্ধতিটি সহজে বোঝার জন্য এখানে কয়েকটি কাল্পনিক উদাহরণ দেওয়া হলো। মনে রাখবেন, এগুলো কেবল বিষয়টি শেখার সুবিধার্থে দেওয়া হয়েছে, কোনো চূড়ান্ত ফতোয়া নয়। বাস্তব জীবনে সম্পদের ধরন (যেমন: ব্যাংক ব্যালেন্স, জমি, ব্যবসা, স্বর্ণ, পাওনা ইত্যাদি) অনুযায়ী হিসাব ভিন্ন হতে পারে।
উদাহরণ ১: এক ছেলে ও এক মেয়ে
ধরে নেওয়া যাক, যাবতীয় দাফন-কাফন, ঋণ এবং ওসিয়ত মেটানোর পর মোট ৩ লাখ টাকা অবশিষ্ট রয়েছে। উত্তরাধিকারী হিসেবে কেবল এক ছেলে ও এক মেয়ে আছেন। এই ক্ষেত্রে মোট সম্পদকে ৩টি ভাগে ভাগ করা হবে। ছেলে পাবে ২ লাখ টাকা এবং মেয়ে পাবে ১ লাখ টাকা।
উদাহরণ ২: শুধু দুই মেয়ে
ধরা যাক, সমস্ত দায় মেটানোর পর অবশিষ্ট সম্পদের পরিমাণ ৬ লাখ টাকা। মৃত ব্যক্তি উত্তরাধিকারী হিসেবে কেবল দুই মেয়ে এবং অন্যান্য কয়েকজন নির্ধারিত অংশীদার রেখে গেছেন। এই অবস্থায় মেয়েরা যৌথভাবে মোট সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ পাবে। অর্থাৎ তারা পাবে ৪ লাখ টাকা, যা দুই বোনের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হয়ে প্রত্যেকে ২ লাখ টাকা করে পাবে। বাকি ২ লাখ টাকা অন্যান্য শরিয়তসম্মত অংশীদারদের নিকট চলে যাবে।
উদাহরণ ৩: স্ত্রী, পিতা-মাতা, এক ছেলে ও এক মেয়ে
এই হিসাবটি কিছুটা জটিল ও সূক্ষ্ম। এখানে প্রথমে স্ত্রী পাবেন এক-অষ্টমাংশ। পিতা ও মাতা প্রত্যেকে পাবেন এক-ষষ্ঠাংশ করে। এরপর অবশিষ্ট যে সম্পদ থাকবে, তা ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ২:১ অনুপাতে (ছেলে দ্বিগুণ, মেয়ে একগুণ) বণ্টন করা হবে।
নাতি-নাতনি, দত্তক সন্তান ও জীবিত অবস্থায় হেবা বা দান
সন্তানের উত্তরাধিকার বিষয়ে সমাজে সবচেয়ে বেশি জটিলতা ও প্রশ্ন তৈরি হয় নাতি-নাতনি এবং দত্তক সন্তানদের নিয়ে। ইসলামি উত্তরাধিকার আইন মূলত রক্তসম্পর্ক, বৈধ বৈবাহিক সম্পর্ক এবং কিছু নির্দিষ্ট শরিয়তসম্মত সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। কেবল লালন-পালন করার কারণেই কেউ উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হয় না।
কোনো এতিম বা দত্তক সন্তানকে ভালোবাসা, লালন-পালন করা এবং সুশিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত চমৎকার ও সওয়াবের কাজ তথা নেক আমল। কিন্তু এর মাধ্যমে সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিয়তসম্মত সন্তান বা উত্তরাধিকারী হয়ে যায় না। তবে তাকে জীবিত অবস্থায় সম্পদ "হেবা" (উপহার বা দান) করা যেতে পারে কিংবা শরিয়তের নির্দিষ্ট সীমার (এক-তৃতীয়াংশের) মধ্যে থেকে তার জন্য ওসিয়ত করা যেতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন এর ফলে মূল উত্তরাধিকারীদের অধিকার নষ্ট না হয়।
অপরদিকে, পিতা বা মাতার মৃত্যুর আগেই যদি কোনো সন্তানের মৃত্যু হয়, তবে সেই মৃত সন্তানের সন্তানদের (নাতি-নাতনিদের) উত্তরাধিকার পাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তারা সরাসরি বা সব অবস্থায় সম্পদ পাবে—এমন সাধারণ মন্তব্য করা সঠিক নয়। বিভিন্ন দেশের আইনি কাঠামো ও শরিয়তি ব্যাখ্যার ভিত্তিতে এই বণ্টন পরিবর্তিত হতে পারে। তাই এমন সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে স্থানীয় কোনো বিজ্ঞ আলেম ও যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
ভুল ধারণা: ছেলে বেশি পায় মানেই কি মেয়েদের প্রতি অন্যায়?
এই প্রশ্নটি আধুনিক সময়ে অনেকের মনেই উঁকি দেয় যে—কেন ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পাবে? ইসলামি জীবনব্যবস্থায় সম্পদ কেবল একটি অধিকার বা সুবিধা নয়, বরং এটি অনেক বড় দায়িত্ব ও কর্তব্যের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। ইসলামে পুরুষকে পরিবারের প্রধান অভিভাবক করা হয়েছে এবং স্ত্রীর ভরণপোষণ, সন্তানের যাবতীয় খরচ, মোহরানা প্রদান এবং আত্মীয়স্বজনের দেখাশোনার প্রধান দায়িত্ব পুরুষের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নারীর নিজের উপার্জিত বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ সম্পূর্ণভাবে তাঁর নিজস্ব সম্পত্তি। স্বামী বা ভাই জোরপূর্বক সেই সম্পদে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তাই ইসলামি আইনকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা না করে কেবল গাণিতিক অনুপাত দিয়ে বিচার করলে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। ইসলাম সম্পদের বণ্টনের পাশাপাশি দায়িত্ব ও ব্যয়ের বাধ্যবাধকতাও সমতা বজায় রেখে নির্ধারণ করেছে।
তবে এই নিয়মকে পুঁজি করে মেয়েদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা চরম জুলুম ও কবিরা গুনাহ। অনেক পরিবারে ভাইদের বলতে শোনা যায়, "তোমাকে তো বিয়েতে অনেক খরচ করে দেওয়া হয়েছে, তাই তুমি আর মিরাসের অংশ পাবে না।" এটি সম্পূর্ণ ভুল ও অবৈধ কথা। বিয়ের খরচ বা উপহার এবং মীরাসের শরিয়তি অংশ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়।
সন্তানের উত্তরাধিকার নিয়ে পরিবারে করণীয়
পারিবারিক শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য জীবিতাবস্থাতেই সম্পদের স্বচ্ছ হিসাব-নিকাশ রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। কার কোন সম্পদে কতটুকু অবদান রয়েছে, কোনটি বাবার একক সম্পদ, কোনটি মায়ের এবং কোনটি যৌথ সম্পত্তি—এসব বিষয় লিখিত আকারে সংরক্ষণ করলে পরবর্তী সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পারিবারিক কলহ এড়ানো সম্ভব হয়।
পিতা-মাতা যদি তাদের জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পদ দান (হেবা) করতে চান, তবে অবশ্যই সকল সন্তানের প্রতি ইনসাফ ও সমতা বজায় রাখা উচিত। কোনো বিশেষ কারণ বা যৌক্তিক প্রয়োজন ছাড়া এক সন্তানকে অঢেল সম্পদ দিয়ে অন্য সন্তানদের বঞ্চিত করা বা কম দেওয়া ইসলামে অত্যন্ত নিন্দনীয়।
- যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের লিখিত বিবরণী প্রস্তুত রাখুন।
- দেনা ও পাওনার হিসাব স্পষ্ট করে লিখে রাখুন।
- কন্যা সন্তানদের তাদের ন্যায্য শরিয়তি অধিকার থেকে কখনোই বঞ্চিত করবেন না।
- পরিবারের সকল সদস্যদের উপস্থিতিতে হিসাব-নিকাশ উন্মুক্ত ও স্পষ্ট রাখুন।
- কোনো ধরনের মতবিরোধ দেখা দিলে আবেগ বা জেদের বশে সিদ্ধান্ত না নিয়ে অভিজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন হোন।
সাধারণ প্রশ্ন
সন্তানের উত্তরাধিকার ইসলামে ছেলে ও মেয়ের ভাগ কীভাবে নির্ধারিত হয়?
পরিবারে কেবল একটি কন্যা সন্তান থাকলে সে কতটুকু পাবে?
দুই বা ততোধিক কন্যা সন্তান থাকলে তাদের ভাগ কত?
দত্তক নেওয়া সন্তান কি ইসলামি আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারী হতে পারে?
জীবিত থাকা অবস্থায় কোনো এক সন্তানকে বেশি সম্পদ দান করা কি জায়েজ?
উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে ঋণ নাকি ওসিয়ত—কোনটি আগে মেটাতে হবে?
শেষ কথা
সন্তানের উত্তরাধিকার ইসলামে আল্লাহর পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং ন্যায়ভিত্তিক একটি ব্যবস্থা। এখানে প্রত্যেকের হক ও অংশ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং, নিজের ইচ্ছামতো কাউকে খুশি করতে গিয়ে আল্লাহর নির্ধারিত সীমানা লঙ্ঘন করা এবং অন্যের হক নষ্ট করা থেকে আমাদের বিরত থাকা উচিত।
পারিবারিক সম্পত্তি সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করার জন্য প্রথমে সম্পদের সঠিক তালিকা তৈরি করুন, ঋণ ও ওসিয়ত পর্যালোচনা করুন এবং এরপর ফরায়েজ শাস্ত্রে পারদর্শী কোনো যোগ্য আলেমের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে চূড়ান্ত হিসাব সম্পন্ন করুন। এতে ভুলত্রুটির ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে এবং পারিবারিক বন্ধনও ইনশাআল্লাহ অটুট থাকবে।
তথ্যসূত্র
- আল-কুরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১১
- আল-কুরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১২
- আল-কুরআন, সূরা আন-নিসা ৪:১৭৬
- সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৩২
- সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬১৫

