আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত বহু রকমের দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান অনিষ্ট ছড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সূক্ষ্ম অথচ মারাত্মক একটি বিষয় হলো ‘বদ নজর’ বা মন্দ দৃষ্টি (যাকে আরবিতে ‘আল-আইন’ বলা হয়)। অনেকে মনে করেন বদ নজর কেবল একটি কুসংস্কার, কিন্তু ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ সত্য এবং এর বাস্তব প্রভাব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, \"বদ নজর লাগা সত্য।\" (সহীহ বুখারী)। হিংসা, অহংকার বা অতিরিক্ত মুগ্ধতা থেকে এই বদ নজরের উৎপত্তি হতে পারে, যা মানুষের জীবনযাপন, মানসিক প্রশান্তি এবং শারীরিক সুস্থতাকে বিপর্যস্ত করে দেয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা অত্যন্ত দয়ালু। তিনি আমাদের যেকোনো অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকার জন্য পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর মাধ্যমে চমৎকার সব উপায় শিখিয়ে দিয়েছেন। এই প্রবন্ধে আমরা বদ নজর, হিংসা ও শয়তানের ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য কয়েকটি অত্যন্ত প্রভাবশালী কুরআনি আয়াত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. বদ নজর ও অনিষ্ট থেকে সুরক্ষায় পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ
কুরআনুল কারীম হচ্ছে মুমিনদের জন্য শিফা বা নিরাময় এবং রহমত। আল্লাহ তাআলা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আমাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। নিচে বদ নজর ও অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার প্রধান আয়াতগুলো উল্লেখ করা হলো:
ক. আয়াতুল কুরসি (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৫)
আয়াতুল কুরসি কুরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন ঘুমানোর আগে এটি পাঠ করতে, কারণ এটি পাঠ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক ফেরেশতা নিযুক্ত হন এবং শয়তান সকাল পর্যন্ত কাছে ঘেঁষতে পারে না। এটি সব ধরনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এক মহৌষধ।
উচ্চারণ: আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম। লা তা’খুযুহু সিনাতুওঁ ওয়া লা নাওম। লাহু মা ফিসসামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরয। মান যাল্লাযী ইয়াশফাউ ‘ইনদাহু ইল্লা বিইযনিহ। ইয়া’লামু মা বাইনা আইদীহিম ওয়া মা খালফাহুম। ওয়া লা ইউহীতুনা বিশাইইম মিন ‘ইলমিহী ইল্লা বিমা শা-আ। ওয়াসি‘আ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরয; ওয়া লা ইয়াউদুহু হিফযুহুমা ওয়া হুওয়াল ‘আলিইয়ুল ‘আযীম।
অর্থ: আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশসমূহে যা রয়েছে এবং পৃথিবীতে যা রয়েছে সব তাঁরই। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর নিকট সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। আর তাঁর ইচ্ছের বাইরে তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছু তারা আয়ত্ত করতে পারে না। তাঁর কুরসি আকাশসমূহ ও পৃথিবীকে পরিবেষ্টন করে আছে এবং এ দুটোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। আর তিনি মহোচ্চ, মহামহিম।
খ. সূরা আল-ফালাক (সূরা নম্বর: ১১৩)
সূরা আল-ফালাক মানুষের হিংসা ও জাদুটোনার অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার সরাসরি মাধ্যম। বিশেষ করে এই সূরার শেষ আয়াতে হিংসুকের হিংসার ক্ষতি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে, যা বদ নজরের অন্যতম প্রধান কারণ।
উচ্চারণ: কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক। মিন শাররি মা খালাক। ওয়া মিন শাররি গাসিকিন ইযা ওয়াকাব। ওয়া মিন শাররিন নাফফাসাতি ফিল উকাদ। ওয়া মিন শাররি হাসিদিন ইযা হাসাদ।
অর্থ: বলুন, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঊষার রবের। তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে। আর অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে যখন তা গভীর হয়। আর গ্রন্থিতে ফুঁৎকারদানকারী নারীদের (জাদুকরদের) অনিষ্ট থেকে। এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।
গ. সূরা আন-নাস (সূরা নম্বর: ১১৪)
সূরা আন-নাস মানুষের মনের অবচেতন স্তরে শয়তানের কুপ্ররোচনা এবং জিন ও মানুষের কুদৃষ্টি ও মন্দ প্রভাব থেকে বাঁচতে আল্লাহর এক অনন্য উপহার। সূরা ফালাক ও সূরা নাসকে একত্রে ‘মুআউবিজাতাইন’ বা আশ্রয় প্রার্থনার দুই সূরা বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে এই দুই সূরা পাঠ করে নিজের দেহে ফুঁ দিতেন।
উচ্চারণ: কুল আউযু বিরাব্বিন নাস। মালিকিন নাস। ইলাহিন নাস। মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস। আল্লাযী ইউওয়াসউইসু فী সুদূরিন নাস। মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস।
অর্থ: বলুন, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের রবের। মানুষের মালিকের। মানুষের ইলাহের (উপাস্যের)। আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে। যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। জিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে।
২. বদ নজর ও ক্ষতি থেকে সুরক্ষার হাদিস নির্দেশিত দোয়া
কুরআনের পাশাপাশি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) নিজের পরিবার এবং নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে বদ নজর থেকে রক্ষা করার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু দোয়া পাঠ করতেন। এই দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও কার্যকরী আমল:
ক. বদ নজর থেকে শিশুদের সুরক্ষার দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) হাসান ও হুসাইনকে নিচের দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর আশ্রয়ে সঁপে দিতেন এবং বলতেন, \"তোমাদের আদি পিতা ইবরাহিম (আ.) ইসমাঈল ও ইসহাককে এই দোয়ার মাধ্যমেই আল্লাহর আশ্রয়ে রাখতেন।\"
উচ্চারণ: আউজু বি-কালিমাতিল্লাহিত তাম্মাহ, মিন কুল্লি শায়তানিওঁ ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিঁ লাম্মাহ।
অর্থ: আমি আল্লাহর নিখুঁত বাক্যসমূহের আশ্রয় প্রার্থনা করছি প্রতিটি শয়তান ও বিষাক্ত কীট-পতঙ্গ থেকে এবং প্রতিটি ক্ষতিকর ও হিংসুটে চোখ (বদ নজর) থেকে। (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৩৩৭১)
খ. সার্বিক অনিষ্ট থেকে হেফাজতের দোয়া
যেকোনো স্থানে বা ঘরে প্রবেশ করার পর কোনো ধরনের অনিষ্ট স্পর্শ না করার জন্য এই দোয়াটি অত্যন্ত দ্রুত কার্যকরী হয়:
উচ্চারণ: আউজু বি-কালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতী মিন শাররি মা খালাক।
অর্থ: আল্লাহর নিখুঁত বাণীসমূহের উসিলায় আমি তাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করছি তাঁরই সৃষ্টি করা সমস্ত অনিষ্ট ও ক্ষতি থেকে। (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৭০৮)
৩. বদ নজর প্রতিরোধে আমাদের করণীয় ও ইসলামি জীবনব্যবস্থা
ইসলাম কেবল দোয়ার ওপর নির্ভর করতে বলেনি, বরং এটি প্রতিরোধে কিছু বাস্তবমুখী জীবনযাপনের দিকনির্দেশনাও দিয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে আমরা নিচের অভ্যাসগুলো গড়ে তুলতে পারি:
- মাশাআল্লাহ ও বারাকাল্লাহ বলা: নিজের বা অন্যের কোনো সুন্দর জিনিস, সন্তান বা ভালো কিছু দেখে ঈর্ষা না করে ‘মাশাআল্লাহ’ (আল্লাহ যেমন চেয়েছেন) অথবা ‘বারাকাল্লাহু ফীক’ (আল্লাহ আপনাকে বরকত দিন) বলার অভ্যাস করা উচিত। এতে আমাদের নিজেদের অজান্তে লাগা বদ নজর থেকেও অন্যজন রক্ষা পায়।
- সকাল-সন্ধ্যার জিকির (আজকার): রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশিত সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকিরগুলো এক প্রকার অদৃশ্য দুর্গ হিসেবে কাজ করে। এগুলো নিয়মিত আমল করলে কোনো দুষ্টু জিন বা মানুষের বদ নজর ক্ষতি করতে পারে না।
- অতিরিক্ত প্রদর্শন পরিহার করা: সোশ্যাল মিডিয়া বা বাস্তব জীবনে নিজের ব্যক্তিগত জীবন, সুন্দর মুহূর্ত ও অর্জনের অতিরিক্ত প্রদর্শন বা শো-অফ পরিহার করা উচিত। প্রকাশ্য প্রদর্শন অনেক সময় মানুষের অন্তরে ঈর্ষার আগুন জ্বালিয়ে দেয়, যা বদ নজরের মূল কারণ।
- রুকইয়াহ বা ঝাড়ফুঁক করা: যদি কেউ ইতিমধ্যেই বদ নজরে আক্রান্ত হয়ে থাকে, তবে তার ওপর সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি এবং শেষ তিন সূরা পড়ে ফুঁ দেওয়া (যা ইসলামি পরিভাষায় রুকইয়াহ নামে পরিচিত) অত্যন্ত কার্যকরী চিকিৎসা।
পরিশেষে বলা যায়, বদ নজর ও দুনিয়াবি অনিষ্ট থেকে বাঁচতে আল্লাহর ওপর দৃঢ় ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখা জরুরি। আমরা যদি নিয়মিত পবিত্র কুরআনের এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াগুলো নিজের জীবনে প্রয়োগ করি, তবে আল্লাহ তায়ালা আমাদের সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপন অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন, ইনশাআল্লাহ।

