তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম, সময় ও ফজিলত: শেষ রাতের অলৌকিক ইবাদত

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১০ জুন, ২০২৬·১৩৯

ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো সালাত বা নামাজ। আর ফরজ নামাজের পর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ সালাত হলো তাহাজ্জুদ। শেষ রাতের নির্জনতায় যখন পুরো পৃথিবী গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন বান্দা যখন পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, তখন এক স্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তাহাজ্জুদ কেবল একটি নফল নামাজ নয়, এটি হলো মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম, মনের আশা পূরণের চাবিকাঠি এবং মানসিক প্রশান্তি লাভের এক অব্যর্থ মহৌষধ।

তাহাজ্জুদ নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসূল (সা.)-কে লক্ষ্য করে বলেন, "আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন, এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রশংসিত স্থানে (মাকামে মাহমুদ) অধিষ্ঠিত করবেন।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৭৯)।

তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত সম্পর্কে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ (তাহাজ্জুদ)।" (সহিহ মুসলিম)। শেষ রাতে আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাদের ডাকতে থাকেন। হাদিসে এসেছে:

"আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন—কে আমাকে ডাকছ, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাচ্ছ, আমি তাকে দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছ, আমি তাকে ক্ষমা করব?" (সহিহ বুখারী)।

তাহাজ্জুদ নামাজের সঠিক সময়

এশার নামাজের পর থেকে শুরু করে সুবহে সাদেক বা ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া যায়। তবে তাহাজ্জুদ আদায়ের সর্বোত্তম সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ।

কীভাবে শেষ তৃতীয়াংশ হিসাব করবেন? সূর্যাস্ত (মাগরিবের ওয়াক্তের শুরু) থেকে সুবহে সাদেক (ফজরের ওয়াক্তের শুরু) পর্যন্ত সময়কে তিন ভাগে ভাগ করুন। এর শেষ ভাগটিই হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। উদাহরণস্বরূপ, যদি মাগরিব সন্ধ্যা ৬টায় এবং ফজর ভোর ৫টায় হয়, তবে মোট সময় ১১ ঘণ্টা। একে তিন ভাগ করলে প্রতি ভাগে প্রায় ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট পড়ে। সে হিসেবে রাত ১টা ২০ মিনিটের পর থেকে ফজরের আজানের পূর্ব পর্যন্ত সময়টিই হলো তাহাজ্জুদের সবচেয়ে মোক্ষম সময়।

তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম ও রাকাত সংখ্যা

তাহাজ্জুদ নামাজ অন্যান্য নফল বা সুন্নত নামাজের মতোই আদায় করতে হয়। দুই রাকাত করে করে এই নামাজ আদায় করা উত্তম।

  • রাকাত সংখ্যা: তাহাজ্জুদ নামাজের কোনো নির্দিষ্ট বা সর্বোচ্চ সীমা নেই। তবে নূন্যতম দুই রাকাত এবং সাধারণত আট রাকাত পড়া সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাধারণত বিতরসহ ১১ বা ১৩ রাকাত নামাজ পড়তেন। অর্থাৎ ৮ রাকাত তাহাজ্জুদ এবং ৩ রাকাত বিতর। আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী ২, ৪, ৬, ৮ বা তার চেয়ে বেশি রাকাত পড়তে পারেন।
  • নিয়ত: মুখে কোনো বিশেষ আরবি নিয়ত উচ্চারণ করা জরুরি নয়। মনের ইচ্ছাই নিয়তের জন্য যথেষ্ট। অন্তরে এই সংকল্প রাখাই যথেষ্ট যে, "আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুই রাকাত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করছি।"
  • সূরা কিরাত: তাহাজ্জুদ নামাজে যেকোনো সূরা পড়া যায়। তবে শেষ রাতের নিরিবিলি পরিবেশে একটু দীর্ঘ কিরাত ও ধীরস্থিরভাবে কুরআন তিলাওয়াত করা অত্যন্ত সওয়াব ও হৃদয়ের আর্দ্রতা বাড়াতে সহায়ক।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় তাহাজ্জুদের দোয়া

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন শেষ রাতে তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য দাঁড়াতেন, তখন এই বরকতময় দোয়াটি পাঠ করতেন:

اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ نُورُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ قَيَّامُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ وَلَكَ الْحَمْدُ أَنْتَ الْحَقُّ وَوَعْدُكَ الْحَقُّ وَلِقَاؤُكَ حَقٌّ وَقَوْلُكَ حَقٌّ وَالْجَنَّةُ حَقٌّ وَالنَّارُ حَقٌّ وَالنَّبِيُّونَ حَقٌّ وَمُحَمَّدٌ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَقٌّ وَالسَّاعَةُ حَقٌّ اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ وَبِكَ خَاصَمْتُ وَإِلَيْكَ حَاكَمْتُ فَاغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَّرْتُ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ لا إِلَهَ إِلا أَنْتَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু আনতা নূরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি ওয়া মান ফীহিন্না, ওয়া লাকাল হামদু আনতা কাইয়্যামুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি ওয়া মান ফীহিন্না, ওয়া লাকাল হামদু আনতাল হাক্কু, ওয়া ওয়া‘দুকা আল-হাক্কু, ওয়া লিকাউকা হাক্কুন, ওয়া কাওলুকা হাক্কুন, ওয়াল জান্নাতু হাক্কুন, ওয়ান নারু هাক্কুন, ওয়ান নাবিয়্যুনা হাক্কুন, ওয়া মুহাম্মাদুন্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা হাক্কুন, ওয়াস সা‘আতু হাক্কুন। আল্লাহুম্মা লাকা আসলামতু, ওয়াবিকা আমান্তু, ওয়া আলাইকা তাওয়াক্কালতু, ওয়া ইলাইকা আনাবতু, ওয়াবিকা খাসামতু, ওয়া ইলাইকা হাকামতু, ফাগফিরলী মা কাদ্দামতু ওয়া মা আখখারতু, ওয়া মা আসরারতু ওয়া মা আ‘লানতু, আনতাল মুকাদ্দিমু ওয়া আনতাল মুআখখিরু, লা ইলাহা ইল্লা আনতা।

অর্থ: হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্য, আপনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী এবং এদের মাঝে যা কিছু আছে সবকিছুর জ্যোতি। সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্য, আপনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী এবং এদের মাঝে যা কিছু আছে সবকিছুর রক্ষক। সমস্ত প্রশংসা আপনারই জন্য, আপনিই সত্য, আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য, আপনার সাথে সাক্ষাৎ সত্য, আপনার বাণী সত্য, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, নবীগণ সত্য, মুহাম্মদ (সা.) সত্য এবং কিয়ামত সত্য। হে আল্লাহ! আপনার কাছেই আমি আত্মসমর্পণ করেছি, আপনার ওপর ঈমান এনেছি, আপনার ওপর ভরসা করেছি, আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তন করেছি, আপনার সাহায্যেই বিতর্ক করেছি এবং আপনার কাছেই বিচার সোপর্দ করেছি। অতএব, আমার অতীত, ভবিষ্যৎ, গোপন ও প্রকাশ্য সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিন। আপনিই অগ্রগামী করেন এবং আপনিই পশ্চাৎগামী করেন, আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং: ১১২০)

দৈনন্দিন জীবনে তাহাজ্জুদের প্রভাব ও মানসিক প্রশান্তি

আজকের ব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনে মানুষ প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশার সম্মুখীন হচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, শেষ রাতের নির্জনতা ও শান্ত পরিবেশ মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়াতে এবং মানসিক অবসাদ দূর করতে অত্যন্ত কার্যকর। একজন মুমিন যখন শেষ রাতে সিজদায় গিয়ে নিজের সব কষ্ট, অপ্রাপ্তি আর কান্নার কথা আল্লাহর কাছে ব্যক্ত করে, তখন তার মনের সব ভার হালকা হয়ে যায়। এটি কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতি দেয় না, বরং সারাদিনের কাজের জন্য এক অদ্ভুত শক্তি ও আত্মবিশ্বাস জুগিয়ে দেয়।

পারিবারিক জীবনেও তাহাজ্জুদের গুরুত্ব অপরিসীম। স্বামী-স্ত্রী যদি রাতে একে অপরকে তাহাজ্জুদের জন্য ডেকে তোলেন, তবে সেই পরিবারে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আল্লাহ সেই ব্যক্তির ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যে রাতে উঠে সালাত আদায় করে এবং তার স্ত্রীকেও জাগিয়ে তোলে।" (সুনানে আবু দাউদ)। তাই আমাদের উচিত অলসতা পরিহার করে সপ্তাহে অন্তত দুই বা তিন দিন হলেও শেষ রাতে জাগ্রত হয়ে এই মহান ইবাদতে শামিল হওয়া।

ঘুমানো ছাড়া কি তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া যায়?
হ্যাঁ, ঘুমানো ছাড়াও তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া জায়েজ। তবে রাতের ঘুম থেকে উঠে এই নামাজ পড়া অত্যন্ত উত্তম এবং এটিই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুপ্রতিষ্ঠিত সুন্নত। তবে কেউ যদি রাতে ঘুমাতে না পারে বা ঘুমালে জাগতে পারবে না বলে আশঙ্কা করে, তবে সে শোয়ার আগেই এশার পর তাহাজ্জুদ পড়ে নিতে পারে।
তাহাজ্জুদ নামাজের নূন্যতম রাকাত কত?
তাহাজ্জুদ নামাজের নূন্যতম রাকাত হলো দুই রাকাত। তবে দুই রাকাত করে করে আপনি আপনার সুবিধা অনুযায়ী যত খুশি তত রাকাত নামাজ পড়তে পারেন। সাধারণত রাসূলুল্লাহ (সা.) আট রাকাত তাহাজ্জুদ আদায় করতেন।
বিতর নামাজ কি তাহাজ্জুদের পর পড়তে হবে?
যদি আপনার শেষ রাতে জাগার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে, তবে রাতের শেষ নামাজ হিসেবে বিতরকে তাহাজ্জুদের পর পড়া উত্তম। আর যদি জাগ্রত হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ থাকে, তবে এশার নামাজের পরপরই বিতর আদায় করে নেওয়া নিরাপদ। পরবর্তীতে রাতে জাগলে শুধু তাহাজ্জুদ পড়লেই হবে, পুনরায় বিতর পড়তে হবে না।
তাহাজ্জুদ নামাজের শেষ সময় কখন?
সুবহে সাদেক বা ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার সময় থাকে। ফজরের আজান বা ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়ে গেলে আর তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার সুযোগ থাকে না।
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না