যুহদ ও সন্তুষ্টি: দুনিয়ার মোহ ছেড়ে অন্তরের প্রশান্তি লাভের উপায়

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
২০ মে, ২০২৬·১৭

যুহদ ও সন্তুষ্টি মানুষকে দুনিয়ার সীমাহীন দৌড় থেকে বাঁচিয়ে অন্তরে প্রকৃত প্রশান্তি ও মানসিক শান্তি এনে দেয়। এর মানে দুনিয়া ছেড়ে বৈরাগ্য অবলম্বন করা বা পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং দুনিয়াকে নিজের হাতে রাখা, হৃদয়ে স্থান না দেওয়া। যখন মানুষের রিজিক কম-বেশি হয় কিংবা অন্যের সাথে নিজের জীবনের তুলনা করার কারণে মন অস্থির হয়ে ওঠে, তখন ইসলামের এই মহান শিক্ষা মুমিনকে স্থির ও অবিচল রাখে। এই লেখায় আমরা সহজ ও সাবলীল ভাষায় জানব যুহদ কী, কানাআহ বা সন্তুষ্টি কী, কুরআন ও হাদিসে এর শিক্ষা কী এবং কীভাবে প্রতিদিনের জীবনে এই গুণগুলো গড়ে তুলবেন।

যুহদ ও সন্তুষ্টি আসলে কী?

যুহদ (দুনিয়াবিমুখতা): যুহদ মানে দুনিয়ার সব নিয়ামতকে নিজের জন্য হারাম করে নেওয়া নয়। যুহদ হলো আল্লাহ তাআলা আপনাকে যা দিয়েছেন তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা, কিন্তু সেটাকে জীবনের একমাত্র বা আসল লক্ষ্য না বানানো। আপনার হাতে প্রচুর অর্থসম্পদ থাকতে পারে, চমৎকার বাড়ি থাকতে পারে, ভালো পেশা থাকতে পারে; তবে এগুলো যদি আপনার অন্তরের মালিক হয়ে বসে, তবেই আধ্যাত্মিক বিপর্যয় শুরু হয়।

সন্তুষ্টি (কানাআহ): সন্তুষ্টি বা কানাআহ মানে অলস হয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। এটি হলো নিজের সর্বোচ্চ হালাল চেষ্টা করার পর আল্লাহ তাআলার ফয়সালার ওপর মন থেকে সন্তুষ্ট থাকা। আপনি পরিশ্রম করবেন, দোয়া করবেন, সুন্দর পরিকল্পনা করবেন; অতঃপর যা অর্জিত হবে, তা-ই আল্লাহর হিকমত ও অনুগ্রহ মনে করে শান্ত থাকবেন। সহজ কথায়, যুহদ দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি কমায়, আর সন্তুষ্টি অন্তরের সব অভিযোগ দূর করে দেয়।

এই দুটি মহৎ গুণ যখন একসঙ্গে কোনো মুমিনের জীবনে যুক্ত হয়, তখন সে দুনিয়াতে অবস্থান করেও দুনিয়ার দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকে। সে পরিবার দেখাশোনা করে, চাকরি বা ব্যবসা করে, হালাল উপার্জন করে, কিন্তু পরকালকে কখনো ভুলে যায় না। এটাই ইসলামের সুন্দর ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা।

কুরআনের আলোকে যুহদ ও সন্তুষ্টির পথ

পবিত্র কুরআন আমাদের দুনিয়াকে পুরোপুরি বর্জন করতে শেখায় না। বরং এটি দুনিয়ার প্রকৃত স্বরূপ ও অবস্থান আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয়। যেমন আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:

اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ

অর্থ: "তোমরা জেনে রাখো, পার্থিব জীবন তো কেবল খেলাধুলা, তামাশা, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক অহংকার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে একে অপরের চেয়ে বেশি হওয়ার প্রতিযোগিতা মাত্র।" (সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ২০)

অর্থাৎ দুনিয়ার সবকিছু দ্রুত পরিবর্তনশীল। আজ যা নিয়ে মানুষ সবচেয়ে বেশি গর্ব করে, কাল হয়তো সেটাই হাতছাড়া হয়ে যায়। অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন দুনিয়া ও আখিরাতের ভারসাম্য রক্ষা করতে:

وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ ۖ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا

অর্থ: "আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে আখিরাতের কল্যাণ অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না।" (সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৭৭)

এখানেই নিহিত রয়েছে মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় দীক্ষা। মুমিন সংসারত্যাগী হয় না। সে দুনিয়াকে আখিরাতের পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে। তার অর্থসম্পদ অসহায়ের কল্যাণে ও সদকায় ব্যয় হয়, তার জ্ঞান মানুষের উপকারে আসে, এবং তার প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত হয় ইবাদত ও দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। হৃদয়ে থাকবে আল্লাহর ভালোবাসা, আর হাতে থাকবে দুনিয়ার সম্পদ—এটাই যুহদের মূল কথা।

হাদিসে যুহদ ও সন্তুষ্টির সরল শিক্ষা

রাসূলুল্লাহ ﷺ খুব সহজ ও চমৎকার উপমায় অন্তরের ঐশ্বর্য বা ধনী হওয়ার দীক্ষা দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন:

لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ، وَلَكِنَّ الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ

উচ্চারণ: লাইসাল গিনাহ আন কাছরাতিল আ'রাদ্বি, ওয়া লাকিননাল গিনাহ গিনান নাফস।

অর্থ: "পার্থিব সম্পদের প্রাচুর্যের নাম ধনাঢ্যতা নয়, বরং অন্তরের ধনাঢ্যতাই (সন্তুষ্টি) হচ্ছে প্রকৃত ধনাঢ্যতা।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৪৬)

এই হাদিসটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে দেয়। কারণ অনেক মানুষ অনেক সম্পদের মালিক হয়েও প্রতিনিয়ত অশান্তির আগুনে পোড়ে। অন্যদিকে, অতি সামান্য জীবনোপকরণ নিয়েও অনেকে "আলহামদুলিল্লাহ" বলে পরম শান্তিতে রাত কাটায়। দুনিয়ার সফরে আমাদের অবস্থান কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে প্রিয় নবী ﷺ বলেছেন:

كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ

উচ্চারণ: কুন ফিদ্দুন্‌য়া কাআন্নাকা গারীবুন আও আ-বিরু সাবীল।

অর্থ: "তুমি দুনিয়াতে একজন প্রবাসী অথবা পথচারীর মতো জীবনযাপন করো।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১৬)

একজন মুসাফির বা পথচারী যেভাবে পথ চলতে চলতে কোনো গাছের ছায়ায় সামান্য বিশ্রাম নেয় এবং আবার তার স্থায়ী গন্তব্যের দিকে রওনা হয়, মুমিনও ঠিক সেভাবে দুনিয়াকে ব্যবহার করে। সে ঘরবাড়ি বানাবে, পরিবার সামলাবে, তবে সদাসর্বদা মনে রাখবে যে তার আসল ও চিরস্থায়ী ঠিকানা হলো আখিরাত বা পরকাল।

মানসিক প্রশান্তি ও সন্তুষ্টি অর্জনের একটি বাস্তবসম্মত মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি শিখিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "দুনিয়ার বৈষয়িক ব্যাপারে তোমরা তোমাদের চেয়ে নিম্নাবস্থায় থাকা মানুষের দিকে তাকাও, তোমাদের চেয়ে ওপরে থাকা লোকদের দিকে তাকাবে না। এতে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতসমূহকে তোমরা তুচ্ছ মনে করবে না।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৬৩)। অন্যের সাথে নিজের তুলনা পরিহার করাই হলো অন্তরের শান্তি ফিরিয়ে আনার প্রধান উপায়।

যুহদ মানে কি দারিদ্র্য? ভুল ধারণা সংশোধন

আমাদের সমাজে অনেকের মাঝে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, যুহদ মানেই হচ্ছে জীর্ণশীর্ণ পোশাকে থাকা, দরিদ্র জীবনযাপন করা কিংবা সুস্বাদু খাবার বর্জন করা। ইসলাম বৈরাগ্যবাদ সমর্থন করে না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মার্জিত পোশাক, পুষ্টিকর খাবার এবং সৎ পথে হালাল উপার্জন করা ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় আমল। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন এই নিয়ামতগুলো মানুষের মনে অহংকার জন্মায়, অপচয়ের পথে ধাবিত করে কিংবা আল্লাহ তাআলার স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

একজন অত্যন্ত সম্পদশালী মানুষও মনে 'যুহদ' ধারণ করতে পারেন, যদি তার অগাধ সম্পদ তাকে আল্লাহর বিধান প্রতিপালন, সঠিক নিয়মে যাকাত ও সদকা আদায় এবং বিনয়ী হতে বাধা না দেয়। অন্যদিকে, একজন দরিদ্র মানুষও অন্তরে দুনিয়ালোভী হতে পারে, যদি তার দিনরাত্রি কাটে অন্যের সম্পদের প্রতি হিংসা ও লোভের আগুনে। তাই যুহদের প্রকৃত পরিমাপ মানুষের পকেটে বা ব্যাংকে নয়, বরং তার হৃদয়ে।

দৈনন্দিন জীবনে যুহদ ও সন্তুষ্টি গড়ে তোলার ৭টি সহজ আমল

যুহদ ও সন্তুষ্টির মতো আত্মিক গুণাবলি একদিনে অর্জিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা ও সাধনা। নিচে এমন ৭টি ছোট অথচ অত্যন্ত কার্যকরী আমলের কথা উল্লেখ করা হলো, যা আপনার জীবনকে শান্তিময় করে তুলবে:

  • ১. ফরজ নামাজসমূহ সময়মতো আদায় করুন: নামাজ মানুষের মনকে দুনিয়ার কোলাহল থেকে সাময়িক বিরতি দিয়ে সরাসরি পরম করুণাময় আল্লাহর সাথে সংযুক্ত করে।
  • ২. প্রতিনিয়ত আলহামদুলিল্লাহ বলুন: প্রতিদিন আল্লাহর ছোট-বড় সব নিয়ামত মনে মনে হিসাব করুন। সুস্থতা, সুন্দর দৃষ্টিশক্তি, মাথার ওপর ছাদ, পরিবার—সবই আল্লাহর বিশেষ রিজিক।
  • ৩. অন্যের সাথে তুলনা পরিহার করুন: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যের প্রদর্শন করা জাঁকজমকপূর্ণ জীবন দেখে নিজের অবস্থানকে ছোট ভাববেন না। মনে রাখবেন, মানুষ সাধারণত তাদের জীবনের কেবল হাসিখুশি মুহূর্তগুলোই প্রকাশ করে, পেছনের দুঃখ-কষ্টগুলো আড়ালে রাখে।
  • ৪. নিয়মিত সদকা বা দান করার অভ্যাস গড়ুন: সাধ্যমতো সামান্য হলেও প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে দান করুন। দানশীলতা মানুষের মনের কৃপণতা ও সম্পদের লোভ দূর করে।
  • ৫. হালাল উপার্জনে বরকতের প্রার্থনা করুন: শুধু বিপুল পরিমাণ অর্থের পেছনে না ছুটে উপার্জনে বরকতের দোয়া করুন। বরকতপূর্ণ অল্প সম্পদও অন্তহীন মানসিক শান্তি দিতে পারে।
  • ৬. মৃত্যু এবং আখিরাতকে স্মরণ করুন: এটি মানুষের অন্তরের কঠোরতা দূর করে এবং জীবনের আসল অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে সাহায্য করে।
  • ৭. অন্তরের তৃপ্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন: নিয়মিত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন যেন তিনি আপনার মনকে তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট রাখেন। কারণ অন্তরের শান্তি একমাত্র আল্লাহ তাআলাই দান করতে পারেন।

এই আমলগুলোকে আপনার দৈনন্দিন রুটিন বা অভ্যাসে পরিণত করুন। খুব বড় কোনো কাজ দিয়ে শুরু করতে হবে না; আজ যেকোনো একটি অভ্যাস দিয়ে পথচলা শুরু করুন, ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে জীবনের আমূল পরিবর্তন দেখতে পাবেন।

পারিবারিক ও কর্মজীবনে এই শিক্ষার বাস্তবায়ন

পারিবারিক পরিমণ্ডলে যুহদ বা দুনিয়াবিমুখতার অর্থ এই নয় যে আপনি পরিবারের ন্যায়সংগত অধিকার বা প্রয়োজন পূরণ করবেন না। বরং এর অর্থ হলো ঘরে অপচয় ও লোকদেখানো বাহুল্য পরিহার করা এবং সন্তানদের দামি ব্র্যান্ডের আসক্তি না শিখিয়ে বরকত ও অল্পে তুষ্টির শিক্ষা দেওয়া। যে ঘরে আল্লাহর স্মরণ ও দ্বীনের চর্চা থাকে, সেখানে অতি সামান্য উপকরণেও অফুরন্ত শান্তি বজায় থাকে।

কর্মক্ষেত্রে বা কর্মজীবনে সন্তুষ্টির অর্থ এই নয় যে আপনি আপনার পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন বা উন্নতি চাইবেন না। আপনি অবশ্যই নিজের যোগ্যতা বৃদ্ধি করবেন এবং হালাল উপায়ে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। তবে পদবি, বেতন কিংবা মানুষের প্রশংসা যেন আপনার আত্মমর্যাদা পরিমাপের একমাত্র মানদণ্ড না হয়। একজন মুমিনের আসল মর্যাদা নিহিত রয়েছে তার তাকওয়া বা আল্লাহভীতির মধ্যে, কোনো সাময়িক পদবিতে নয়।

আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। অপ্রয়োজনীয় ঋণ নেওয়া, লোকদেখানো আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য অতিরিক্ত খরচ করা এবং অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা করার অভ্যাস মানুষের অন্তরকে ক্রমান্বয়ে কলুষিত ও অস্থির করে তোলে। আয়ের সুনির্দিষ্ট বাজেট প্রণয়ন, যাকাত প্রদান এবং হালাল-হারামের সীমারেখা কঠোরভাবে মেনে চলার মাধ্যমেই জীবনে প্রকৃত নিরাপত্তা নেমে আসে।

যুহদ ও সন্তুষ্টির অনুপস্থিতি অন্তরে যে ক্ষতি ডেকে আনে

যখন মানুষের অন্তর থেকে যুহদ ও সন্তুষ্টি বিদায় নেয়, তখন সে দুনিয়াকে জীবনের সবকিছু মনে করতে শুরু করে। সামান্য কোনো আর্থিক ক্ষতিতেই সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, আবার সামান্য সফলতায় সে চরম অহংকারী হয়ে ওঠে। তার মন অবিরত বলতে থাকে—"আরো চাই, আরো চাই।" এই সীমাহীন লোভের কারণে সে একসময় ইবাদতের মিষ্টতা ও একাগ্রতা হারিয়ে ফেলে।

সন্তুষ্টির অভাব হলে মানুষের মনে প্রতিনিয়ত অভিযোগের পাহাড় গড়ে ওঠে। নিজের কাছে থাকা হাজারো নিয়ামত তখন আর চোখে পড়ে না; কেবল অন্যের বাড়ি, অন্যের গাড়ি বা অন্যের সাফল্যই তাকে দগ্ধ করতে থাকে। এই মানসিকতা থেকে হিংসা-বিদ্বেষের জন্ম হয়, যা মানুষের নেক আমলসমূহকে ধ্বংস করে এবং অন্তরকে চিরতরে ক্লান্ত করে দেয়।

তাই একজন মুমিনের উচিত নিয়মিত নিজের অন্তরকে পরীক্ষা করা। নিজেকে প্রশ্ন করা—আমি কি দুনিয়াকে আখেরাতের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছি, নাকি দুনিয়াই আমাকে ব্যবহার করে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

তৃপ্ত ও সন্তুষ্ট হৃদয়ের প্রধান লক্ষণসমূহ

সন্তুষ্ট মনের অর্থ এই নয় যে সে কখনও দুঃখ পায় না বা তার চোখে পানি আসে না। মুমিনের জীবনেও দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন ও প্রিয়জন হারানোর ভয় আসে। তবে তৃপ্ত হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তি কখনও আল্লাহর ফয়সালার প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে না। সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, তার রব পরম দয়ালু ও প্রজ্ঞাময়; তিনি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল করেন না।

এমন ব্যক্তি রিজিক লাভ করলে কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়া আদায় করে, আর সংকটকালে সবর বা ধৈর্য ধারণ করে; কিন্তু কখনও কোনো হারাম উপায়ে উপার্জনের পথে পা বাড়ায় না। মানুষের কাছে হাত পাতার আগে সে নিজের অভাবের কথা মহান আল্লাহর দরবারে পেশ করে। সে তার পার্থিব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, কিন্তু ফলাফলের জন্য ব্যাকুল হয়ে নিজের শান্তি নষ্ট করে না। তার অন্তরে বিরাজ করে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি ও শক্তি।

যুহদ ও সন্তুষ্টি নিয়ে সাধারণ কিছু প্রশ্নোত্তর (FAQ)

যুহদ ও সন্তুষ্টি কি একই বিষয়?
বিষয় দুটি ভিন্ন হলেও অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। যুহদ বা দুনিয়াবিমুখতা মানুষের মন থেকে দুনিয়ার অন্ধ আসক্তি দূর করে, আর সন্তুষ্টি বা কানাআহ আল্লাহর দেওয়া রিজিকের ওপর মনকে স্থির রাখে। এই দুটি গুণের সমন্বয়ে একজন মানুষ দুনিয়ার মোহমুক্ত হয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হয়।
যুহদ অবলম্বন করতে কি সম্পদ বর্জন করতে হবে?
একেবারেই নয়। ইসলামে হালালভাবে অর্থ উপার্জন করা এবং তা ভালো কাজে ব্যয় করা প্রশংসনীয়। যুহদের অর্থ সম্পদ বর্জন করা নয়, বরং সম্পদের প্রতি অন্ধ মোহ ও আসক্তি থেকে নিজের অন্তরকে মুক্ত রাখা। সম্পদ থাকবে আপনার হাতে, হৃদয়ে নয়।
কানাআহ বা অল্পে তুষ্টির গুণটি কীভাবে অর্জন করব?
নিয়মিত আল্লাহর নিয়ামতগুলোর শুকরিয়া আদায় করা, পার্থিব বিষয়ে নিজের চেয়ে অসচ্ছল মানুষের দিকে তাকানো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যের জীবনের জাঁকজমকের সাথে নিজের তুলনা বন্ধ করা এবং আল্লাহর কাছে অল্পে তুষ্টির তাওফিক চেয়ে নিয়মিত দোয়া করার মাধ্যমে এই গুণ অর্জন করা যায়।
যুহদ কি কর্মজীবনে সফল হওয়ার পথে বাধা?
না, মোটেও বাধা নয়। একজন মুমিন পেশাগত জীবনে সর্বোচ্চ দক্ষতা ও সফলতার জন্য চেষ্টা করবে। তবে সে তার কর্মজীবনকে নিজের ঈমান, নামাজ এবং আখিরাতের চেয়ে কখনো বড় মনে করবে না। এই ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো যুহদ।
সন্তুষ্টি থাকলে কি আল্লাহর কাছে দোয়ার আগ্রহ কমে যায়?
না, বরং সন্তুষ্ট হৃদয়ের মানুষের দোয়া অত্যন্ত আন্তরিক ও সুন্দর হয়। তারা আল্লাহর কাছে গভীর আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রার্থনা করে, কিন্তু প্রার্থিত জিনিস না পেলেও আল্লাহর প্রতি অসন্তুষ্ট হয় না। তারা জানে যে আল্লাহ যা প্রদান করেন তাতে রহমত রয়েছে, আর যা প্রদান করেন না তাতেও কোনো কল্যাণ লুকিয়ে রয়েছে।
দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা কখন মানুষের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে?
যখন দুনিয়ার আসক্তির কারণে ফরজ সালাত ছুটে যায়, হারাম পথে উপার্জন সহজ মনে হয়, অন্তরে অহংকার বাসা বাঁধে কিংবা আখিরাতের স্মরণ মন থেকে একেবারে হারিয়ে যায়—তখন দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা মানুষের জন্য চরম ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে।

উপসংহার: হৃদয়ের সিংহাসন পরিবর্তনের মাধ্যমেই শান্তি লাভ সম্ভব

যুহদ ও সন্তুষ্টির পরম শিক্ষা হলো—দুনিয়া আমাদের সাময়িক প্রয়োজনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি আমাদের জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। আপনি কর্মক্ষেত্রে পরিশ্রম করবেন, সুখী পরিবারের স্বপ্ন দেখবেন এবং দুনিয়ার দায়িত্ব পালন করবেন; তবে আপনার হৃদয়ের সিংহাসনে কেবল মহান আল্লাহ তাআলাকেই স্থান দেবেন। যখন অন্তরের এই পরিবর্তন ঘটবে, তখন সামান্য সম্পদেও আপনি সুখ খুঁজে পাবেন এবং অতিরিক্ত প্রাচুর্যও আপনাকে অহংকারী বানাতে পারবে না। আসুন, আজ থেকেই ছোট কোনো ভালো অভ্যাস শুরু করি, অযথা তুলনা বন্ধ করি এবং প্রতিটি অবস্থায় আলহামদুলিল্লাহ বলার অভ্যাস গড়ে তুলি।

তথ্যসূত্র

  1. আল-কুরআন, সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ২০
  2. আল-কুরআন, সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৭৭
  3. সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৪৬
  4. সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৫১
  5. সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১৬
  6. সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৬৩
  7. সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৫৪
  8. জামে আত-তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৬
  9. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪১০২
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না