ইসলামে তাওরাত বিষয়টি বুঝলে আমরা জানি, তাওরাত আল্লাহর নাজিল করা আসল কিতাবগুলোর একটি, যা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজকের তাওরাত, কুরআনের বর্ণনা, আর মুসলিম ঈমানের অবস্থান এক নয়। এই লেখায় সহজ ভাষায় আসল ওহি, কুরআনের দৃষ্টি, আর আমাদের করণীয় পরিষ্কার হবে, ইনশাআল্লাহ। তাই ধীরে পড়ুন।
ইসলামে তাওরাত বলতে কী বোঝায়?
ইসলামে তাওরাত বলতে মুসলিম বিশ্বাসে তাওরাতকে বোঝায়। তাওরাত আল্লাহর পক্ষ থেকে মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর উপর নাজিল করা এক আসল কিতাব। এটি মানুষের বানানো কোনো শিক্ষা ছিল না। এটি ছিল হিদায়াত, আইন, নৈতিকতা, আর বান্দাকে আল্লাহর দিকে ফেরানোর পথ।
তবে এখানে একটি বিষয় খুব জরুরি। ইসলাম যে তাওরাতের কথা বলে, তা মূল ওহি। আজ মানুষের হাতে থাকা তাওরাত বা পুরাতন নিয়ম-এর সব লেখা সেই আসল অবস্থায় আছে, এমন বিশ্বাস মুসলিমরা রাখে না। তাই ইসলামে তাওরাত বুঝতে হলে আসল তাওরাত, বর্তমান লেখা, আর কুরআনের বিচার আলাদা করে দেখতে হয়।
তাওরাত কি সত্যিই আল্লাহর নাজিল করা আসল ওহি?
হ্যাঁ, তাওরাত ছিল আল্লাহর নাজিল করা কিতাব। কুরআনে আল্লাহ বলেন, তিনি তাওরাত নাজিল করেছেন, তাতে ছিল হিদায়াত ও আলো। সহজ কথায়, তাওরাত ছিল বনী ইসরাঈলের জন্য আল্লাহর বিধান শেখার বড় উৎস। সেখানে তাওহীদ, ন্যায়, ইবাদত, হালাল ও হারাম-এর শিক্ষা ছিল।
ইসলামে তাওরাত নিয়ে কথা বললে এই সম্মান রাখা জরুরি। আমরা তাওরাতকে অবহেলা করি না, কারণ তার আসল উৎস আল্লাহর ওহি। কিন্তু আমরা এটাও বলি, শেষ ও পূর্ণ হিদায়াত হলো কুরআন। আগের কিতাবগুলোকে সম্মান করা ঈমানের অংশ, আর কুরআনকে চূড়ান্ত মাপকাঠি মানা একই ঈমানের আরেক অংশ।
কুরআন ইসলামে তাওরাত সম্পর্কে কী বলে?
কুরআন আগের আসমানি কিতাবগুলোকে অস্বীকার করে না। বরং কুরআন জানায়, আল্লাহ তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল এবং শেষে কুরআন নাজিল করেছেন। কুরআন আগের সত্য ওহির মূল বার্তা নিশ্চিত করে। আবার কুরআন নিজেকে রক্ষক ও বিচারক হিসেবে তুলে ধরে। মানে, কোনো কথা কুরআনের সঙ্গে মেলে কি না, সেটাই মুসলিমের মাপকাঠি।
এই কারণে ইসলামে তাওরাত মানে অন্ধভাবে বর্তমান তাওরাত গ্রহণ করা নয়। আবার সবকিছু হেসে উড়িয়ে দেওয়াও নয়। যে কথা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর সঙ্গে মেলে, আমরা সেটাকে সত্য হিসেবে মানি। যে কথা স্পষ্ট বিরোধী, আমরা তা গ্রহণ করি না। আর যেটা পরিষ্কার নয়, সেখানে চুপ থাকা নিরাপদ ও আদবের কাছাকাছি।
আজকের তাওরাত নিয়ে মুসলিম অবস্থান কী?
মুসলিম অবস্থান খুব ভারসাম্যপূর্ণ। কুরআন জানায়, আহলে কিতাবের কিছু লোক আল্লাহর বাণীর অর্থ বদলাত, শব্দ সরাত, বা নিজেদের লেখা আল্লাহর নামে চালাত। তাই বর্তমান তাওরাতকে আমরা পুরোপুরি আসল ওহি বলি না। এটি একটি বড় পার্থক্য।
তবে এর মানে এই নয় যে বর্তমান তাওরাতের প্রতিটি বাক্য মিথ্যা। সেখানে কিছু সত্য ইতিহাস, কিছু নবীদের নাম, কিছু নৈতিক শিক্ষা থাকতে পারে। কিন্তু মুসলিমের জন্য নিশ্চিত সত্য জানতে কুরআনই শেষ ভরসা। ইসলামে তাওরাত তাই সম্মান, সতর্কতা, আর কুরআনের সামনে বিনয়ী থাকার শিক্ষা দেয়।
ইসলামে তাওরাত আর ইহুদি ধর্মের তাওরাত কি এক?
ইহুদি ধর্মে তাওরাত সাধারণত মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সঙ্গে যুক্ত পাঁচটি বইকে বোঝায়। সেখানে সৃষ্টি, নবীদের কাহিনি, আইন, বংশপরিচয়, আর বনী ইসরাঈলের ইতিহাস আছে। ইসলাম এই বর্তমান বইগুলোকে ইতিহাস ও ধর্মীয় সাহিত্য হিসেবে চিনতে পারে, কিন্তু এগুলোকে পুরোপুরি অপরিবর্তিত ওহি বলে না।
ইসলামে তাওরাত বলতে মুসলিমরা মূল তাওরাত বোঝায়, যা আল্লাহ মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে দিয়েছিলেন। এই পার্থক্য না বুঝলে অনেক ভুল ধারণা তৈরি হয়। কেউ ভাবে মুসলিমরা তাওরাত মানে না। আবার কেউ ভাবে বর্তমান তাওরাতের সবকিছুই মুসলিমদের মানতে হবে। দুটো ধারণাই ঠিক নয়।
তাওরাতের প্রতি ঈমান রাখা মুসলিমের জন্য কীভাবে জরুরি?
ইসলামে আল্লাহর কিতাবসমূহে ঈমান রাখা ফরজ। এর মধ্যে আসল তাওরাতও আছে। একজন মুসলিম বিশ্বাস করে, আল্লাহ ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মানুষের হিদায়াতের জন্য কিতাব নাজিল করেছেন। এই বিশ্বাস আমাদের শেখায়, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের পথহারা রেখে দেননি।
তবে ঈমান রাখার মানে বর্তমান কপি অনুসরণ করা নয়। আমাদের শরিয়াহ এসেছে কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহর মাধ্যমে। তাই ইসলামে তাওরাত আমাদের অতীত ওহির সম্মান শেখায়, আর কুরআন আমাদের বর্তমান আমল, আকীদা, ইবাদত এবং জীবন চালানোর নিয়ম শেখায়। সহজ কথা, শেষ নির্দেশনা কুরআন।
এই বিষয়ে কথা বলার সময় কোন শিষ্টাচার রাখা দরকার?
আহলে কিতাব নিয়ে কথা বলার সময় মুসলিমের ভাষা ভদ্র হওয়া উচিত। আমরা সত্য বলব, কিন্তু তুচ্ছ করব না। কোনো ধর্মের মানুষকে অপমান করে দাওয়াহ সুন্দর হয় না। কুরআন আমাদের জ্ঞান, ন্যায়, আর ভালো কথার পথে ডাকতে শেখায়।
কেউ ইসলামে তাওরাত নিয়ে প্রশ্ন করলে আগে আসল তাওরাতের সম্মান বুঝিয়ে বলুন। তারপর বলুন, কুরআন শেষ কিতাব এবং এটি আগের বিকৃত অংশ থেকে সত্যকে আলাদা করে। আপনি চাইলে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করতে পারেন, কিন্তু নিজের আকীদা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর উপর রাখুন। এতে কথাও পরিষ্কার থাকে, মনও শান্ত থাকে।
ইসলামে তাওরাত নিয়ে সাধারণ ভুল ধারণা
প্রথম ভুল হলো, মুসলিমরা নাকি তাওরাতকে মোটেই মানে না। আসলে আমরা আসল তাওরাতকে আল্লাহর কিতাব হিসেবে মানি। দ্বিতীয় ভুল হলো, বর্তমান তাওরাত হুবহু সেই আসল তাওরাত। কুরআনের আলোকে এটি বলা নিরাপদ নয়।
তৃতীয় ভুল হলো, আগের কিতাবের কথা পড়লেই মুসলিমের ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে। বিষয়টি এমন নয়। জ্ঞানী আলেমের নির্দেশনা নিয়ে গবেষণা করা যায়। তবে সাধারণ মুসলিমের জন্য দরকারি হিদায়াত কুরআনেই যথেষ্ট আছে। তাই ইসলামে তাওরাত জানুন, কিন্তু কুরআনকে নিজের মূল পথপ্রদর্শক রাখুন।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
ইসলামে তাওরাত বলতে কী বোঝায়?
মুসলিমরা কি তাওরাতকে বিশ্বাস করে?
বর্তমান তাওরাত কি আসল তাওরাতের মতোই আছে?
ইসলামে তাওরাত আর কুরআনের সম্পর্ক কী?
তাওরাত কি শুধু বনী ইসরাঈলের জন্য ছিল?
একজন মুসলিম কি তাওরাত পড়তে পারে?
শেষ কথা
ইসলামে তাওরাত আমাদের দুইটি শিক্ষা দেয়। একদিকে আসল তাওরাত আল্লাহর ওহি, তাই তাকে সম্মান করতে হবে। অন্যদিকে আজকের লেখা যাচাই করার মাপকাঠি হলো কুরআন। এই ভারসাম্য রাখলে ভুল ধারণা কমে, ঈমান পরিষ্কার হয়, আর অন্যের সঙ্গে কথা বলাও সহজ হয়।
আল্লাহ আমাদের কুরআন বুঝে পড়ার তাওফিক দিন। আগের নবী ও কিতাবগুলোর প্রতি সঠিক ঈমান দিন। আর সত্যকে সুন্দর ভাষায় বলার শিষ্টাচার দিন। আমিন।
তথ্যসূত্র
- আল-কুরআন, সূরা আল-মায়িদা ৫:৪৪
- আল-কুরআন, সূরা আল-মায়িদা ৫:৪৮
- আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারাহ ২:৭৯
- আল-কুরআন, সূরা আন-নিসা ৪:৪৬
- সহিহ বুখারি ৪৪৮৫

