যিলহজ্জ মাসের রোজা: তারিখ, ফজিলত ও সুন্নাহ আমল

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১০ জুন, ২০২৬·৬

হিজরি ক্যালেন্ডারের সর্বশেষ এবং বরকতময় মাস হলো যিলহজ্জ। এই পবিত্র মাসের প্রথম ১০ দিন মহান আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও মর্যাদাবান। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, এই দিনগুলোতে সম্পাদিত নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো আমল নেই। এই ১০ দিনের মধ্যে প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বরকতময় সুন্নাহ আমল হিসেবে গণ্য করা হয়।

যিলহজ্জ মাসের রোজা রাখার তারিখ ও সময়

সাধারণত যিলহজ্জ মাসের ১ তারিখ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখা উত্তম। এই দিনগুলোতে রোজা রাখার মাধ্যমে একজন মুমিন বান্দা আল্লাহর অশেষ রহমত লাভ করতে পারেন। তবে এই ৯ দিনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ দিন হলো ৯ই যিলহজ্জ বা আরাফাতের দিন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, যারা হজ পালন করছেন এবং আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছেন, তাদের জন্য এই রোজা রাখা সুন্নাহ নয়, বরং এটি তাদের ব্যতীত বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল।

আরাফার দিনের রোজার অসীম ফজিলত

যিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখের রোজা অর্থাৎ আরাফার দিনের রোজা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশাল নিয়ামত। এই একটি মাত্র রোজা বান্দার পেছনের এবং সামনের জীবনের গুনাহ মোচনের কারণ হতে পারে। হাদিস শরিফে এ সম্পর্কে অত্যন্ত চমৎকার বর্ণনা এসেছে:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তা পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা (ক্ষতিপূরণ) হিসেবে গণ্য হবে।" (সহিহ মুসলিম)

যিলহজ্জ মাসের সুন্নাহ ও নফল আমলসমূহ

যিলহজ্জের প্রথম ১০ দিন কেবল রোজা রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এই সময়ে বেশি বেশি যিকির, তওবা, ইস্তিগফার এবং নফল ইবাদত করা উচিত। এই দিনগুলোতে আল্লাহর তাসবিহ বা প্রশংসা করা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দিনগুলোতে বেশি বেশি নিম্নোক্ত দোয়া বা তাসবিহ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন:

اللَّهُ أَكْبَرُ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ

উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।

অর্থ: আল্লাহ মহান, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই।

এছাড়াও এই দিনগুলোতে করণীয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু আমল নিচে দেওয়া হলো:

  • বেশি বেশি নফল নামাজ আদায় করা এবং রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া।
  • পবিত্র কুরআন নিয়মিত তিলাওয়াত করা এবং এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করা।
  • অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মাঝে দান-সদকাহ করা।
  • যিলহজ্জের ৯ তারিখের ফজর থেকে ১৩ তারিখের আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর উচ্চস্বরে তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা।

যিলহজ্জের রোজা রাখার ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ ভুল ও সতর্কতা

যিলহজ্জের বরকতময় দিনগুলোতে আমল করার ক্ষেত্রে কিছু ভুলত্রুটি পরিহার করা জরুরি:

  1. নিয়তের ক্ষেত্রে ভুল ধারণা: অনেকেই মনে করেন রোজার নিয়ত মুখে উচ্চারণ করে বলতে হবে। আসলে নিয়ত হলো অন্তরের গভীর ইচ্ছা বা সংকল্প। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মনে মনে রোজা রাখার ইচ্ছা করলেই নিয়ত হয়ে যাবে।
  2. নিষিদ্ধ দিনে রোজা রাখা: ১০ই যিলহজ্জ হলো ঈদুল আজহার দিন। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী ঈদের দিন রোজা রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা হারাম। তাই ১০ই যিলহজ্জ কোনোভাবেই রোজা রাখা যাবে না।
  3. খাদ্যাভ্যাস ও অলসতা: অনেকে রোজা রেখে সারাদিন ঘুমিয়ে কাটান বা অলসতায় সময় পার করেন, যা রোজার আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। রোজা রেখে বেশি বেশি ইবাদতে মগ্ন থাকা উচিত।
যিলহজ্জের রোজা কি পুরো ৯ দিনই রাখতে হবে?
না, পুরো ৯ দিন রোজা রাখা বাধ্যতামূলক নয়। ১ থেকে ৯ যিলহজ্জ পর্যন্ত যেকোনো দিন বা কয়েকটি দিনও রোজা রাখা যায়। তবে ৯ দিনই রোজা রাখা অনেক বেশি উত্তম ও সওয়াবের কাজ।
আরাফার দিনের রোজার প্রধান ফজিলত কী?
আরাফার দিনের (৯ যিলহজ্জ) একটি রোজার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা বান্দার পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের ছোট ছোট গুনাহ ক্ষমা করে দেন।
মহিলারা কি যিলহজ্জ মাসের রোজা রাখতে পারবেন?
হ্যাঁ, মহিলারা শারীরিকভাবে সক্ষম ও পবিত্র অবস্থায় থাকলে অবশ্যই যিলহজ্জের রোজা রাখতে পারবেন। এটি তাদের জন্যও অত্যন্ত সওয়াবের আমল।
ঈদের দিন কি রোজা রাখা জায়েজ আছে?
না, ঈদুল আজহা অর্থাৎ ১০ই যিলহজ্জ এবং এর পরবর্তী তাশরিকের দিনগুলোতে (১১, ১২ ও ১৩ যিলহজ্জ) রোজা রাখা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বা হারাম করা হয়েছে।
যিলহজ্জের নফল বা সুন্নাহ রোজার নিয়ত কীভাবে করব?
রোজার নিয়ত মূলত অন্তরের ইচ্ছা। মুখে কোনো নির্দিষ্ট আরবি বা বাংলা বাক্য পড়ার প্রয়োজন নেই। আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আগামীকালের রোজা রাখছেন—মনে মনে এই সংকল্প করাই যথেষ্ট।
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না