আরাফার দিনের রোজা: গুরুত্ব, অফুরন্ত ফজিলত ও আমল

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
২০ মে, ২০২৬·৫

আরাফার দিনের রোজা: গুরুত্ব ও ফজিলত

ইসলামের অন্যতম একটি বরকতময় ও মহিমান্বিত দিন হলো জিলহজ মাসের ৯ তারিখ তথা 'আরাফার দিন'। এই বিশেষ দিনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বান্দার ওপর তাঁর অসীম রহমত ও মাগফিরাত বর্ষণ করেন। আর এই পবিত্র দিনের একটি অন্যতম সেরা ইবাদত হলো রোজা রাখা। আরাফার দিনের রোজা মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধি এবং তাকওয়া অর্জনের এক মহা সুযোগ এনে দেয়। এটি অত্যন্ত চমৎকার একটি সুন্নাহ আমল যা আমাদের যাপিত জীবনের ভুলত্রুটি সংশোধনে ভূমিকা রাখে।

বিশেষ করে যারা হজে যেতে পারেননি, সেইসব মুসলিমদের জন্য আরাফার দিনের রোজা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সুপারিশ করা হয়েছে। এই আমলটি মুমিনের হৃদয়কে আল্লাহর ভয়ে নরম করে তোলে এবং বিগত ও আগামী দিনের পাপমোচনের চমৎকার এক উপায় হিসেবে কাজ করে।

হাদিসের আলোতে আরাফার রোজার গুরুত্ব

রাসূলুল্লাহ ﷺ আরাফার দিনের রোজার ফজিলত সম্পর্কে উম্মতকে বিশেষ সুসংবাদ দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আরাফা দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ، وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ

উচ্চারণ: সিয়ামু ইয়াওমি ‘আরাফাতা আহতাসিবু ‘আলাল্লাহি আই-ইউকাফফিরাস্ সানাতাল্লাতী ক্বাবলাহু ওয়াস্ সানাতাল্লাতী বা‘দাহু।

অর্থ: "আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি যে, তা বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের গুনাহের কাফফারা (ক্ষমা) হিসেবে গণ্য হবে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)

সুবহানাল্লাহ! মাত্র একটি দিনের নফল রোজার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা আমাদের দুই বছরের (বিগত এক বছর ও আগামী এক বছর) ছোট ছোট গুনাহ বা সগিরা গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন। এটি আল্লাহর এক পরম অনুগ্রহ ও মেহেরবানি ছাড়া আর কিছুই নয়।

আরাফার দিনের রোজা কখন এবং কীভাবে রাখবেন?

হিজরি বর্ষের জিলহজ মাসের ৯ তারিখে আরাফার দিনের রোজা রাখা হয়। যারা নিজ নিজ দেশে অবস্থান করছেন, তারা তাদের স্থানীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৯ জিলহজে এই রোজা রাখবেন। সাহরির শেষ সময় থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত তথা ইফতারের সময় পর্যন্ত সাধারণ রোজার নিয়মেই এই রোজা পালন করতে হয়।

এই বরকতময় দিনে রোজা রাখার পাশাপাশি কিছু বিশেষ আমল করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ:

  • বেশি বেশি ইস্তিগফার করা: নিজের জানা-অজানা সকল ভুলের জন্য আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
  • দোয়া ও জিকির করা: আরাফার দিনের সর্বোত্তম দোয়া হলো: "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।"
  • তাকবিরে তাশরিক আদায় করা: ৯ জিলহজ ফজর থেকে শুরু করে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর তাকবিরে তাশরিক পড়া আবশ্যক।

আরাফার রোজা নিয়ে কিছু সাধারণ ভুল ধারণা

আমাদের সমাজে এই অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ রোজাটি নিয়ে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যা দূর করা প্রয়োজন:

  • ফরজ মনে করা: অনেকেই এটিকে বাধ্যতামূলক বা ফরজ রোজা মনে করেন। মূলত এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নফল বা সুন্নাহ রোজা, যা পালন করলে অফুরন্ত সওয়াব রয়েছে তবে কোনো কারণে বাদ পড়লে গুনাহ হবে না।
  • শুধুমাত্র উপবাস থাকা: অনেকে রোজা রাখলেও পুরো দিনটি অবহেলায় কিংবা অতিরিক্ত ঘুমে পার করে দেন। রোজা রাখার পাশাপাশি কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ায় সময় অতিবাহিত করাই হলো আসল সার্থকতা।
  • হাজিদের রোজা রাখা: যারা সরাসরি আরাফার ময়দানে হজে অবস্থান করছেন, তাদের জন্য রোজা না রাখাটাই সুন্নাহ। কারণ রোজা রাখলে হজের দীর্ঘ আমল ও দোয়া করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ হজের সময় আরাফায় রোজা রাখেননি।

FAQ

আরাফার দিনের রোজা কি ফরজ?
না, আরাফার দিনের রোজা ফরজ নয়, এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নির্দেশিত সুন্নত বা নফল রোজা। তবে এর সওয়াব ও ফজিলত অন্যান্য সাধারণ নফল রোজার চেয়ে অনেক বেশি।
আরাফার রোজা রাখলে কী ধরনের গুনাহ মাফ হয়?
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস অনুযায়ী, আরাফার রোজা রাখলে বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের সগিরা (ছোট) গুনাহসমূহ মাফ হয়ে যায়। কবিরা বা বড় গুনাহ মাফের জন্য খাঁটি তাওবার প্রয়োজন।
হজের দিন আরাফায় অবস্থানরত হাজিরা কি রোজা রাখবেন?
না, হজে অংশগ্রহণকারী হাজিদের জন্য আরাফার দিন রোজা রাখা সুন্নাহসম্মত নয়। তারা রোজা না রেখে পূর্ণ শক্তি নিয়ে দোয়া, জিকির ও ইবাদতে মশগুল থাকবেন, এটাই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শিক্ষা।
বাংলাদেশে অবস্থানকারীরা কখন আরাফার রোজা রাখবেন?
বাংলাদেশ বা বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের মুসলিমরা তাদের নিজস্ব জিলহজ মাসের ৯ তারিখে আরাফার রোজা পালন করবেন। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে নিজ দেশের তারিখ অনুযায়ী এই ইবাদত সম্পন্ন করা উত্তম।
এই দিনে সর্বোত্তম আমল কোনটি?
আরাফার দিনে রোজা রাখার পাশাপাশি সর্বোত্তম আমল হলো বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার করা, আল্লাহর একত্ববাদের জিকির করা এবং একনিষ্ঠ মনে দোয়া করা।

উপসংহার

মহিমান্বিত আরাফার দিনটি আমাদের জীবনে প্রতি বছর একবারই আসে। অলসতা বা গাফিলতির কারণে এই অফুরন্ত কল্যাণের দিনটি হাতছাড়া করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মাত্র একটি দিনের সংযম ও ইবাদত আমাদের সারা বছরের গুনাহের কালিমা দূর করে আল্লাহর রহমতের চাদরে আবৃত করতে পারে। আসুন, আমরা নিয়ত করি এবং জিলহজের এই পুণ্যময় দিনে রোজা রেখে ও পুণ্য কাজে যুক্ত হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করি। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন।

আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না