ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মুহাররম। এটি অত্যন্ত বরকতপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি মাস, যা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ‘আশহুরুল হুরুম’ বা চারটি সম্মানিত মাসের একটি। এই মুহাররম মাসের দশম দিনকে বলা হয় ‘আশুরা’। ইসলামের ইতিহাসে আশুরার দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও অলৌকিক সব ঘটনার সাক্ষী। ২০২৬ সালে মুহাররম ও আশুরার গুরুত্ব, এর পেছনের ইতিহাস এবং আশুরার রোজার ফিকহী নিয়মাবলি নিয়ে আমাদের আজকের এই বিস্তারিত আয়োজন।
মুহাররম মাসের বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা
মুহাররম কেবল বছরের প্রথম মাসই নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর মাস বা ‘শাহরুল্লাহ’। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:
অর্থ: "রমজানের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজাই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)
সম্মানিত এই মাসে অন্যায়-অপরাধ ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত আবশ্যক। এই মাসের বিশেষ আকর্ষণ হলো আশুরার দিন, যা উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য এক অপার রহমত ও ক্ষমাপ্রাপ্তির মাধ্যম।
আশুরার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: হযরত মুসা (আ.) ও ফেরাউনের পতন
আশুরার গুরুত্বের পেছনে রয়েছে এক মহিমান্বিত ঐতিহাসিক ঘটনা। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ যখন মদিনায় হিজরত করলেন, তখন দেখতে পেলেন যে মদিনার ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা এ দিনে কেন রোজা রাখো?" তারা উত্তর দিল, "এটি একটি মহান দিন। এই দিনে মহান আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা (আ.) রোজা রাখতেন, তাই আমরাও আশুরার রোজা পালন করে থাকি।"
ইহুদিদের এই কথা শুনে প্রিয় নবী ﷺ বললেন, "মুসা (আ.)-এর কৃতজ্ঞতার অনুসরণে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি যত্নশীল হওয়ার দাবিদার।" অতঃপর তিনি নিজে আশুরার রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন (সহিহ বুখারি: ৩৩৯৭)।
আশুরার রোজার অনন্য ফজিলত
আশুরার দিন রোজা রাখা একটি সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ বা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল。 সহিহ মুসলিম শরিফে আশুরার রোজার গুরুত্ব সম্পর্কে এসেছে:
অর্থ: "আশুরার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি, তিনি পূর্ববর্তী এক বছরের (ছোট) গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)
ছোট ছোট ভুলের কারণে আমাদের জীবনে যে পাপাচার জমে যায়, তা দূর করার জন্য মাত্র একদিনের নফল রোজা রাখা এক মহাসুযোগ। তবে মনে রাখতে হবে, কবিরা বা বড় গুনাহ থেকে মুক্তির জন্য আন্তরিক তওবা আবশ্যক।
আশুরার রোজা রাখার সঠিক নিয়ম
আশুরার রোজা পালনের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ ﷺ মুসলিম উম্মাহকে অনন্য এবং স্বতন্ত্র এক পদ্ধতির শিক্ষা দিয়েছেন। ইহুদিদের হুবহু অনুসরণ না করে মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে নবীজি ﷺ বলেন:
অর্থ: "আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই নবম (৯ই মুহাররম) তারিখেও রোজা রাখব।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪)
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এই নির্দেশ ও আকাঙ্ক্ষার কারণে ইসলামী ফিকহবিদগণ আশুরার রোজার ক্ষেত্রে কয়েকটি পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন:
- পদ্ধতি ১ (সর্বোত্তম): মুহাররমের ৯ ও ১০ তারিখ মিলিয়ে দুটি রোজা রাখা। এটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর সবচেয়ে কাছাকাছি।
- পদ্ধতি ২: যদি কোনো কারণে ৯ তারিখে রোজা রাখা সম্ভব না হয়, তবে ১০ ও ১১ তারিখ মিলিয়ে দুটি রোজা রাখা।
- পদ্ধতি ৩: শুধুমাত্র ১০ই মুহাররম একটি রোজা রাখা। ফকিহদের মতে এটি জায়েজ, তবে শুধু একটি রোজা রাখা মাকরূহে তানজিহী বা অনুত্তম, কারণ এতে ইহুদিদের সাথে বাহ্যিক সাদৃশ্য তৈরি হয়।
আশুরা থেকে আমাদের শিক্ষণীয় বিষয়
আশুরা কেবল উপবাস বা আনুষ্ঠানিকতার দিন নয়। এটি মুমিনদের জন্য অত্যন্ত গভীর কিছু বার্তা বহন করে:
- ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা: ফেরাউনের বিশাল সৈন্যবাহিনীর সামনে দাঁড়িয়েও হযরত মুসা (আ.) আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাস রেখেছিলেন। আশুরা আমাদের শেখায় যে, চরম সংকটেও মুমিন কখনো হতাশ হয় না।
- কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: আল্লাহ তাআলা কোনো বিপদ বা সংকট থেকে মুক্তি দিলে বেশি বেশি ইবাদত ও রোজার মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হয়।
- সুন্নাহর অনুকরণ: প্রতিটি কাজে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশিত পদ্ধতি অনুসরণ করাই মুমিনের কাম্য। ইহুদিদের থেকে পৃথক হয়ে আলাদা দিনগুলোতে রোজা রাখার নির্দেশনা আমাদের নিজস্ব ধর্মীয় স্বতন্ত্রতা বজায় রাখার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়।
আশুরার রোজা রাখা কি ফরজ?
শুধু ১০ তারিখে কি একটি রোজা রাখা যাবে?
আশুরার রোজা রাখার ফজিলত কী?
আশুরার দিন শোক প্রকাশ বা বুক চাপড়ে কান্না করার বিধান কী?
পরিশেষে বলা যায়, মুহাররম ও আশুরা আমাদের জীবনে আল্লাহর অসীম দয়া ও রহমতের বার্তা নিয়ে আসে। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশিত সুন্নাহ অনুযায়ী রোজা রাখা এবং আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকার মাধ্যমে আমরা নিজেদের আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে পারি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে মুহাররম ও আশুরার ফজিলতপূর্ণ আমলসমূহ সঠিকভাবে সম্পন্ন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

