সাহরির দোয়া ও সুন্নাহ সম্মত নিয়ম: ইসলাম ও হাদীসের আলোকপাত

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১০ জুন, ২০২৬·৬

রমজানুল মুবারক মুমিন জীবনের সবচেয়ে বরকতপূর্ণ মাস। এ মাসের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি ইবাদত আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতে পরিপূর্ণ। রোজা রাখার উদ্দেশ্যে ফজরের পূর্বে শেষ রাতে যে খাবার গ্রহণ করা হয়, তাকে ইসলামি পরিভাষায় সাহরি (বা সেহরি) বলা হয়। সাহরি শুধু শরীরকে শক্তি যোগানোর মাধ্যম নয়, বরং এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ এবং বরকতময় আমল। অনেকেই সাহরি খাওয়ার সময় সুনির্দিষ্ট কোনো দোয়া রয়েছে কি না তা জানতে চান। এই নিবন্ধে আমরা সাহরির দোয়া, নিয়ত এবং সুন্নাহ সম্মত নিয়মাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

সাহরির কি নির্দিষ্ট কোনো দোয়া আছে?

আমাদের সমাজে সাহরি খাওয়ার জন্য একটি বিশেষ দোয়া বহুল প্রচলিত— "নাওয়াইতু আন আসূমা গাদান..."। তবে হাদীস ও ফিকহের নির্ভরযোগ্য উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে সাহরি খাওয়ার জন্য বিশেষ কোনো আরবি বাক্য সংবলিত দোয়া প্রমাণিত নয়। অর্থাৎ সাহরি খাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাদের শেখাননি।

সাহরি খাওয়ার শুরু ও শেষের আমল মূলত সাধারণ খাবার গ্রহণের মতোই। খাবার শুরুর আগে বিসমিল্লাহ বলা এবং খাওয়া শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা— এটাই সুন্নাহ সম্মত নিয়ম। তবে সাহরির সময়ে বা শেষ রাতে দোয়া কবুলের এক মহিমান্বিত সুযোগ থাকে, যা আমাদের কোনোভাবেই হাতছাড়া করা উচিত নয়।

খাবার গ্রহণের সাধারণ দোয়া

সাহরি খাওয়ার শুরুতে আপনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো সাধারণ খাওয়ার দোয়াটি পাঠ করবেন:

بِسْمِ اللَّهِ

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহ।

অর্থ: আল্লাহর নামে (শুরু করছি)।

আর খাবার শেষে আল্লাহর অশেষ নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে নিচের দোয়াটি পাঠ করতে পারেন:

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنَا وَسَقَانَا وَجَعَلَنَا مُسْلِمِينَ

উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আতআমানা ওয়া সাক্বানা ওয়া জাআলানা মুসলিমীন।

অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের খাইয়েছেন, পান করিয়েছেন এবং মুসলিম বানিয়েছেন।

রোজা বা সাওমের নিয়ত করার নিয়ম

অনেকের মনে সংশয় থাকে যে মুখে নিয়ত উচ্চারণ না করলে হয়তো রোজা হবে না। ইসলামে ‘নিয়ত’ শব্দের অর্থ হলো ‘সংকল্প’ বা ‘মনে মনে ইচ্ছা করা’। এটি অন্তরের সাথে সম্পর্কিত বিষয়, মুখের উচ্চারণের সাথে নয়।

  • অন্তরের ইচ্ছাই যথেষ্ট: আপনি যখন শেষ রাতে রোজা রাখার উদ্দেশ্যে ঘুম থেকে উঠছেন এবং সাহরি খাচ্ছেন, তখন আপনার মনে মনে যে রোজা রাখার দৃঢ় ইচ্ছা রয়েছে, সেটাই মূলত আপনার নিয়ত। মুখে কোনো আরবি বা বাংলা বাক্য উচ্চারণ করা আবশ্যক বা বাধ্যতামূলক নয়।
  • প্রচলিত নিয়তের বিধান: আমাদের সমাজে যে "নাওয়াইতু আন আসূমা..." নিয়তটি প্রচলিত রয়েছে, তা মুখে বলা বাধ্যতামূলক নয়। তবে কেউ যদি নিজের মনের সংকল্পকে দৃঢ় করার জন্য সহজ কোনো ভাষায় নিয়ত প্রকাশ করতে চান, তবে তা করতে পারেন, তবে এটিকে দ্বীনের অপরিহার্য অংশ বা সুন্নত মনে করা যাবে না।

সাহরি খাওয়ার ফজিলত

রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহরি খাওয়ার প্রতি বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন এবং এর চমৎকার সব ফজিলতের কথা বর্ণনা করেছেন। নিম্নে কয়েকটি হাদীসের আলোকে তা উপস্থাপন করা হলো:

  1. সাহরিতে বরকত রয়েছে: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السَّحُورِ بَرَكَةً

    উচ্চারণ: তাসাহহারূ ফাইন্না ফিস সাহূরি বারাকাতান।

    অর্থ: তোমরা সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯২৩)

  2. ফেরেশতাগণ রহমতের দোয়া করেন: অপর এক হাদীসে এসেছে, যারা সাহরি খায় তাদের জন্য আল্লাহ তাআলা রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ ক্ষমার দোয়া করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, "আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর ফেরেশতাগণ সাহরি গ্রহণকারীদের জন্য রহমত কামনা করেন।" (মুসনাদে আহমাদ)
  3. অমুসলিমদের সাথে আমাদের পার্থক্যের প্রতীক: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আমাদের রোজা এবং আহলে কিতাবদের (ইহুদি ও খ্রিস্টান) রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরি খাওয়া।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৯৬)

সুন্নাহ সম্মত উপায়ে সাহরি গ্রহণের নিয়মাবলী

সাহরি খাওয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ সওয়াব ও বারাকাহ অর্জনের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। সুন্নাহ সম্মত নিয়মগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. শেষ সময়ে সাহরি খাওয়া (বিলম্বে সাহরি করা)

সাহরি রাতের একেবারে শেষ ভাগে খাওয়া সুন্নাহ। ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে সাহরি শেষ করা উত্তম। রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণ অত্যন্ত দেরিতে সাহরি খেতেন। সাহরি খাওয়া শেষ হওয়া এবং ফজরের সালাত শুরু হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে মাত্র ৫০টি আয়াত তেলাওয়াত করার মতো সময় থাকত। (সহীহ বুখারী)

২. খেজুর দিয়ে সাহরি করা

সাহরির খাদ্য তালিকায় খেজুর রাখা একটি অতি চমৎকার সুন্নাহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

نِعْمَ سَحُورُ الْمُؤْمِنِ التَّمْرُ

উচ্চারণ: নি'মা সাহূরুল মু'মিনিত তামরু।

অর্থ: মুমিনের সর্বোত্তম সাহরি হলো খেজুর। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২৩৪৫)

৩. সামান্য হলেও সাহরি খাওয়া

ক্ষুধা না থাকলেও বা খাওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও সুন্নাহ পালনের উদ্দেশ্যে অন্তত এক ঢোক পানি বা সামান্য একটি খেজুর খেয়ে হলেও সাহরির ফজিলত অর্জন করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "সাহরি হলো একটি বরকতময় খাবার, তাই তোমরা তা ত্যাগ করো না; এমনকি তোমাদের কেউ যদি এক ঢোক পানিও পান করে (তবুও সে যেন সাহরি করে)।" (মুসনাদে আহমাদ)

সাহরির সময়ে দোয়া কবুলের সুবর্ণ সুযোগ

সাহরির সময়টি হলো রাতের শেষ এক-তৃতীয়াংশ। এই সময়টিকে বলা হয় তাহাজ্জুদের সময় বা নূরের সময়। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, প্রতি রাতের এই শেষ ভাগে মহান আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বান্দাদের ডেকে ডেকে বলেন: "কে আছো আমার কাছে দোয়া করবে, আমি তার দোয়া কবুল করব? কে আছো আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?" (সহীহ বুখারী)

তাই সাহরি খাওয়ার আগে বা পরে অন্তত কয়েক মিনিট হাত তুলে আল্লাহর দরবারে নিজের মনের নেক আকুতিগুলো প্রকাশ করা উচিত। এই সময়ে চোখের পানি ফেলে নিজের গুনাহের জন্য ইস্তিগফার (ক্ষমাপ্রার্থনা) করা অত্যন্ত বরকতময় আমল।

উপসংহার

সাহরি শুধু শারীরিক শক্তির উৎস নয়, এটি একটি জীবন্ত ইবাদত। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী দেরিতে সাহরি খাওয়া, খেজুর খাওয়া এবং শেষ রাতের মহামূল্যবান সময়টিতে আল্লাহর কাছে দোয়া করার মাধ্যমে আমরা আমাদের রোজা এবং জীবনকে আরও বেশি পুণ্যময় করে তুলতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্নাহ সম্মত উপায়ে সাহরি পালন করার এবং রমজানের ফজিলত পূর্ণমাত্রায় অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

সাহরি খাওয়া কি ফরজ না কি সুন্নাত?
সাহরি খাওয়া রোজা শুদ্ধ হওয়ার জন্য ফরজ বা রুকন নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাকীদপূর্ণ সুন্নাত। কেউ যদি সাহরি না খেয়েও রোজা রাখেন, তবে তার রোজা হয়ে যাবে, কিন্তু তিনি সাহরির বিশাল বরকত ও সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন।
সাহরির শেষ সময় কখন এবং কখন খাওয়া বন্ধ করতে হবে?
সুবহে সাদিক বা ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সাথে সাথেই সাহরির সময় শেষ হয়ে যায়। আযান শুরু হওয়ার পর বা ফজরের ওয়াক্ত হয়ে যাওয়ার পর কোনো কিছু খাওয়া বা পান করা যাবে না। তাই সতর্কতামূলকভাবে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার ২-৩ মিনিট আগেই খাবার খাওয়া শেষ করা উত্তম।
সাহরির মুখে পড়ার নির্দিষ্ট দোয়া কোনটি?
রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে সাহরির জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ দোয়া বর্ণিত হয়নি। খাবার শুরু করার সাধারণ দোয়া 'বিসমিল্লাহ' বলাই সুন্নাহ সম্মত নিয়ম। অন্তরের রোজার সংকল্প বা নিয়ত রাখাই যথেষ্ট।
সাহরিতে খেজুর খাওয়ার উপকারিতা কী?
সাহরিতে খেজুর খাওয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ। বৈজ্ঞানিকভাবেও খেজুর শক্তির এক চমৎকার উৎস, যা দীর্ঘক্ষণ শরীরকে হাইড্রেটেড ও কর্মক্ষম রাখতে সাহায্য করে এবং ক্ষুধাভাব দূর করে।
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না