ইসলামের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো পবিত্র ঈদুল আজহা। আত্মত্যাগ, ভক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মহান বার্তা নিয়ে প্রতি বছর জিলহজ মাসে মুসলিম বিশ্বে এই উৎসব পালিত হয়। ২০২৬ সালে (১৪৪৭ হিজরি) বাংলাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা ২৮ মে বৃহস্পতিবার উদযাপিত হয়েছে। কুরবানির সঠিক নিয়মাবলী ও সুন্নাহসম্মত আমলগুলো জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই নিবন্ধে আমরা কুরবানির তাৎপর্য, ফিকহি মাসয়ালা এবং ঈদের দিনের সুন্নত আমলগুলো বিস্তারিত আলোচনা করব।
ঈদুল আজহার তাৎপর্য ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদের পেছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক ত্যাগ ও আনুগত্যের দৃষ্টান্ত। আল্লাহর নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পিতা ও পুত্র দুজনেই যখন এই কঠিন পরীক্ষায় নিজেদের সঁপে দিলেন, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন দয়া পরবশ হয়ে ইসমাইলের পরিবর্তে একটি দুম্বা কুরবানি করার ব্যবস্থা করেন। সেই মহান ত্যাগের স্মরণে কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য কুরবানির বিধান বজায় রাখা হয়েছে।
কুরবানি কেবল একটি পশু জবেহ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা পশুবৃত্তিকে বিসর্জন দিয়ে স্রষ্টার প্রতি চরম আত্মসমর্পণের প্রতীক। কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:
অর্থ: আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না ওগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং ওঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (সংযম ও আল্লাহর ভয়)। (সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩৭)
কুরবানির ফিকহ ও জরুরি নিয়মাবলী
কুরবানি আল্লাহর একটি মহান ইবাদত, তাই এটি সম্পন্ন করতে হবে শরিয়তের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী। নিচে কুরবানির প্রধান মাসয়ালা ও নিয়মগুলো তুলে ধরা হলো:
১. কুরবানি কার ওপর ওয়াজিব?
১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলিমের কাছে জীবিকা নির্বাহের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বাদে সাড়ে সাত তোলা সোনা (৮৭.৪৫ গ্রাম) বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা (৬১২.১৫ গ্রাম) অথবা সমমূল্যের নগদ অর্থ বা সম্পদ থাকে, তার ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব।
২. কুরবানির পশুর বয়স ও সুস্থতা
কুরবানির পশু সুস্থ, সবল ও ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। পশুদের বয়সসীমা নিম্নরূপ হতে হবে:
- উট: নূন্যতম ৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।
- গরু ও মহিষ: নূন্যতম ২ বছর পূর্ণ হতে হবে।
- ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা: নূন্যতম ১ বছর পূর্ণ হতে হবে। (তবে ৬ মাসের সুস্থ ও হৃষ্টপুষ্ট ভেড়া বা দুম্বা যদি দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয়, তাহলে তা দিয়ে কুরবানি করা যাবে)।
যেসব পশুর শিং গোড়া থেকে ভেঙে গেছে, চোখ অন্ধ, খোড়া, বা অত্যন্ত দুর্বল ও রোগাক্রান্ত—সেগুলো দিয়ে কুরবানি আদায় হবে না।
৩. কুরবানির অংশীদারিত্বের নিয়ম
ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কেবল ১ জনের পক্ষ থেকে কুরবানি করা যায়। তবে একটি উট, গরু বা মহিষে সর্বোচ্চ ৭ জন শরিক হতে পারে। শরিকদের প্রত্যেকের নিয়ত হতে হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। মাংস খাওয়ার নিয়তে কেউ শরিক হলে কারও কুরবানি কবুল হবে না।
ঈদুল আজহার দিনের সুন্নাহ আমলসমূহ
ঈদের দিনটি ইবাদত ও আনন্দের দিন। আল্লাহর রাসুল (সা.) এই দিনে নির্দিষ্ট কিছু কাজ গুরুত্বের সাথে করতেন। নিচে এই সুন্নত আমলগুলো আলোচনা করা হলো:
- খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা ও মেসওয়াক করা: ঈদের দিন সকালে দ্রুত ঘুম থেকে ওঠা এবং মেসওয়াক বা ব্রাশ করা সুন্নাহ।
- গোসল করা ও সুগন্ধি ব্যবহার করা: নামাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে উত্তমরূপে গোসল করা এবং আতর বা সুগন্ধি মাখা সুন্নত।
- উত্তম পোশাক পরিধান করা: নিজের সাধ্য অনুযায়ী পরিষ্কার ও সুন্দর পোশাক পরিধান করা সুন্নত।
- কিছু না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া: ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেয়ে নামাজে যাওয়া সুন্নাহ হলেও ঈদুল আজহার দিন কিছু না খেয়ে নামাজে যাওয়া এবং কুরবানির গোশত দিয়ে প্রথম আহার করা সুন্নাহ।
- আরাফাতের তাকবির পাঠ করা: ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর উচ্চস্বরে একবার তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব:
উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
অর্থ: আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান; আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
- ভিন্ন পথে যাতায়াত করা: ঈদগাহে যাওয়ার সময় এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং ফেরার সময় অন্য রাস্তা দিয়ে আসা সুন্নাহ।
কুরবানি করার আমল ও দোয়া
পশু জবেহ করার সময় নিজের হাতে করা উত্তম। যদি নিজে না পারেন, তবে জবেহ করার সময় সামনে উপস্থিত থাকা ভালো। পশু জবেহ করার আগে তার মুখে পানি দেওয়া এবং পশুকে আরামদায়কভাবে শোয়ানো উচিত। জবেহ করার সময় নিচের দোয়াটি পড়া সুন্নাহ:
উচ্চারণ: ইন্নি ওয়াঝঝাহতু ওয়াঝহিয়া লিল্লাযি ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকিন। ইন্না সালাতি ওয়া নুসুুুকি ওয়া মাহইয়াইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। লা শারিকা লাহু ওয়া বিযালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমিন। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা।
অতপর 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বলে পশু জবেহ করতে হবে।
কুরবানির গোশত ও চামড়ার বন্টন নীতি
কুরবানির গোশত সাধারণত তিন ভাগে বন্টন করা মুস্তাহাব। এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং বাকি এক ভাগ গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিতরণ করা উত্তম। তবে পরিবারের লোকসংখ্যা বেশি হলে সম্পূর্ণ গোশত নিজেরাও রেখে দিতে পারেন। কুরবানির পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করতে পারেন অথবা গরিব, এতিম বা মাদ্রাসার লিল্লাহ ফান্ডে দান করে দিতে হবে। চামড়ার টাকা বা চামড়া বিক্রির অর্থ কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসার নির্মাণ কাজে বা পারিশ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা জায়েজ নয়।

