কুরবানি কেবল একটি পশু জবাইয়ের নাম নয়, এটি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য ইবাদত এবং হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আত্মত্যাগের স্মৃতিচারণ। কুরবানির ঈদ বা ঈদুল আযহা এলেই আমাদের মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে—কুরবানির সময় কি নির্দিষ্ট কোনো দোয়া পড়া ফরজ বা ওয়াজিব? বিশেষ করে যারা নতুন করে কুরবানি দিচ্ছেন, তাদের মনে এই ফিকহি মাসআলা বা বিধান নিয়ে দ্বিধা কাজ করে। আসুন, ইসলামী শরিয়ত ও বিভিন্ন মাযহাবের আলোকে এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জেনে নিই।
কুরবানির দোয়া কি ফরজ নাকি ওয়াজিব?
ইসলামী ফিকহ ও শরিয়তের দৃষ্টিতে কুরবানির জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট দীর্ঘ দোয়া পড়া ফরজ বা ওয়াজিব নয়। তবে পশু জবাই করার সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ যিকির ও বাক্য উচ্চারণ করা সুন্নাহ এবং আবশ্যকীয় শর্ত হিসেবে প্রমাণিত। কুরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাকওয়া বা আল্লাহভীতি প্রদর্শন করা।
পশু জবাই করার সময় ন্যূনতম কোন দোয়াটি পড়তে হবে?
পশু জবাই করার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যকীয় বিষয় হলো আল্লাহর নাম স্মরণ করা। আপনি যদি লম্বা কোনো দোয়া মুখস্থ না-ও পারেন, তবে শুধুমাত্র বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে জবাই করলেও আপনার কুরবানি সম্পূর্ণরূপে শুদ্ধ ও সহীহ হয়ে যাবে।
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার
অর্থ: আল্লাহর নামে এবং আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।
বিভিন্ন মাযহাবের ফিকহি বিধান
ইসলামের প্রধান চারটি মাযহাব (হানাফি, শাফিঈ, মালিকি এবং হাম্বলি) অনুযায়ী কুরবানির পশুর রক্ত প্রবাহিত করার সময় আল্লাহর নাম নেওয়ার বিষয়ে কী বিধান রয়েছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
হানাফি মাযহাব: হানাফি ফিকহ অনুযায়ী জবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ বলা শর্ত বা ওয়াজিব। যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ বলা ছেড়ে দেয়, তবে সেই পশুর গোশত খাওয়া হালাল হবে না। তবে ভুলে গেলে তা মাফযোগ্য।
শাফিঈ মাযহাব: ইমাম শাফিঈ (রহ.)-এর মতে, জবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ বলা সুন্নাত। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে না বললেও কুরবানি বাতিল হবে না, যদিও তা অনুচিত।
মালিকি ও হাম্বলি মাযহাব: এই দুই মাযহাবেও হানাফি মাযহাবের অনুরূপ মত পোষণ করা হয়েছে, অর্থাৎ আল্লাহর নাম স্মরণ করা আবশ্যক।
কুরবানির নিয়ত ও ইখলাস
অনেকে মনে করেন কুরবানির জন্য মুখে উচ্চারণ করে আরবিতে আলাদা একটি নির্দিষ্ট নিয়ত পড়া বাধ্যতামূলক, কিন্তু এটি সহীহ দলিল দ্বারা প্রমাণিত নয়। কুরবানির মূল বিষয় হলো মনের ইচ্ছা বা সংকল্প। আপনি কার সন্তুষ্টির জন্য সম্পদ ব্যয় করছেন, আল্লাহ মূলত সেটাই দেখেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও কুরবানির সময় আল্লাহর নাম নিতেন এবং উম্মতকে সহজ পথ শিক্ষা দিয়েছেন। তাই নির্দিষ্ট কোনো শব্দ মুখস্থ করার চেয়ে আত্মত্যাগের মানসিকতা ও ইখলাস বজায় রাখা বেশি জরুরি।

