কুরবানির নিয়ত কি মুখে বলা জরুরি নাকি অন্তরের সংকল্পই যথেষ্ট?

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১০ জুন, ২০২৬·৩

ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত হলো কুরবানি বা উদহিয়া। এটি কেবল একটি পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং বান্দার হৃদয়ের তাকওয়া প্রকাশ করা। কুরবানির গ্রহণযোগ্যতার পেছনে অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নিয়ত বা সংকল্প। তবে আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত প্রশ্ন রয়েছে—কুরবানির নিয়ত কি মুখে উচ্চারণ করে নির্দিষ্ট বাক্যে বলতে হবে, নাকি কেবল অন্তরের ইচ্ছা থাকলেই তা যথেষ্ট হবে?

কুরবানির নিয়ত: এটি কি অন্তরের কাজ নাকি মুখের?

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ‘নিয়ত’ শব্দের অর্থ হলো সংকল্প, ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য। ফিকহবিদদের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী, যেকোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে নিয়ত মূলত অন্তরের কাজ। অর্থাৎ, আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরবানি করছেন—এই সচেতন ইচ্ছাটি আপনার হৃদয়ে জাগ্রত থাকাই হলো নিয়ত। মুখে কোনো নির্দিষ্ট বাক্য উচ্চারণ করা কুরবানির নিয়ত শুদ্ধ হওয়ার জন্য বাধ্যতামূলক বা কোনো শর্ত নয়। অন্তরের দৃঢ় সংকল্পই কুরবানির নিয়ত হিসেবে শতভাগ গ্রহণযোগ্য ও যথেষ্ট।

নিয়ত মুখে বলা কি জরুরি? ফিকহের দৃষ্টিকোণ

হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি ও হাম্বলি—চার মাজহাবের ফিকহ শাস্ত্র অনুযায়ী, যেকোনো ইবাদত শুরু করার সময় অন্তরে তার সুনির্দিষ্ট সংকল্প থাকাই নিয়তের মূল ভিত্তি। তবে কেউ যদি অন্তরের ইচ্ছাকে আরও দৃঢ় করতে জবাইয়ের সময় বা তার আগে মুখেও উচ্চারণ করে, তবে সেটিকে সহায়তাকারী হিসেবে দেখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, অনেকে বলেন—

إِنِّي أُرِيدُ أَنْ أُضَحِّيَ لِلَّهِ تَعَالَى

উচ্চারণ: ইন্নি উরিদু আন উদাহহি লিল্লাহি তাআলা।

অর্থ: নিশ্চয়ই আমি মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানি করার সংকল্প করছি।

তবে মনে রাখতে হবে, এটি মুখে উচ্চারণ করা কুরবানি কবুল হওয়ার জন্য আবশ্যক বা বাধ্যতামূলক কোনো শর্ত নয়। কারণ, যখন আপনি একটি পশু ক্রয় করছেন এবং তা কুরবানির নিয়তেই লালন-পালন বা জবাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখনই আপনার অন্তরের নিয়ত সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবিদের আমল

রাসূলুল্লাহ ﷺ কিংবা তাঁর সম্মানিত সাহাবিদের থেকে কুরবানির সময় মুখে কোনো বিশেষ নিয়ত বা বাক্য জোর গলায় উচ্চারণ করার কোনো বাধ্যতামূলক প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন কুরবানি করতেন, তখন আল্লাহর নাম নিয়ে এবং তাকবির পাঠ করে সরাসরি জবাই করতেন। তাই সুন্নাহর অনুসরণে কুরবানির মূল নীতি হলো: কাজটি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হচ্ছে—এই সচেতনতা হৃদয়ে লালন করা।

কুরবানির পশু জবাই করার দোয়া

কুরবানির পশু জবাই করার সময় নিয়ত মুখে বলা জরুরি না হলেও, আল্লাহর নাম নেওয়া এবং তাকবির পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। পশু জবাই করার সময় নিম্নের দোয়াটি পাঠ করা আবশ্যক:

بِسْمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبَرُ

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার।

অর্থ: আল্লাহর নামে এবং আল্লাহ সবচেয়ে মহান।

এছাড়াও জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ ﷺ কুরবানির পশু জবাই করার সময় আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের দীর্ঘ দোয়া পাঠ করতেন। তবে সাধারণ ও ন্যূনতম সুন্নাহ হলো আল্লাহর নামে তাকবির পাঠ করে ছুরি চালানো।

সারকথা ও আমাদের করণীয়

কুরবানি মূলত আল্লাহর দরবারে বান্দার তাকওয়া পৌঁছানোর একটি মাধ্যম। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, "আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।" (সূরা হজ: ৩৭)। তাই লোকদেখানো মানসিকতা পরিহার করে বিশুদ্ধ অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসায় কুরবানির নিয়ত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। মুখে নিয়ত উচ্চারণ না করলেও আপনার কুরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হবে, ইনশাআল্লাহ।

কুরবানির পশু জবাই করার সময় কার নাম নিতে হয়?
কুরবানির পশু সর্বদা আল্লাহর নামে জবাই করতে হবে। মুখে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলতে হবে। যার পক্ষ থেকে কুরবানি করা হচ্ছে, জবাই করার সময় বা আগে মনে মনে তার নাম স্মরণ করা যথেষ্ট, মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক নয়।
কুরবানির নিয়ত মুখে না বললে কি কুরবানি সহিহ হবে?
হ্যাঁ, অবশ্যই সহিহ হবে। নিয়ত মূলত অন্তরের কাজ। পশুর মালিক যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরবানির পশু ক্রয় করেন বা প্রস্তুত করেন, তখনই তার নিয়ত হয়ে যায়। মুখে মুখে আরবি বা বাংলায় নিয়ত বলা ঐচ্ছিক, বাধ্যতামূলক নয়।
কুরবানির পশুর গলায় ছুরি চালানোর সময় কোন দোয়া পড়তে হয়?
কুরবানির পশু জবাই করার সময় ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ (আল্লাহর নামে, আল্লাহ মহান) বলা আবশ্যক। এই তাকবির পাঠ করেই ছুরি চালাতে হবে।
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না