নতুনদের জন্য কুরবানির সহজ নিয়ম: কার ওপর ওয়াজিব এবং কীভাবে করবেন

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১০ জুন, ২০২৬·৬

কুরবানি ইসলামি শরিয়তের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য মাধ্যম। নতুনদের জন্য কুরবানির নিয়মাবলি প্রথমে কিছুটা জটিল মনে হতে পারে, তবে শরিয়তের সহজ নির্দেশনাসমূহ জানা থাকলে এটি পালন করা অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। ঈদুল আজহার এই পবিত্র সময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবেহ করার মাধ্যমে আমরা হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই মহান ত্যাগের স্মৃতি স্মরণ করি।

কার উপর কুরবানি ওয়াজিব? (যোগ্যতার শর্তাবলি)

ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী প্রতিটি স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন এবং নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক মুসলিমের উপর কুরবানি করা ওয়াজিব। এখানে 'নেসাব' বলতে বোঝায়—প্রয়োজনের অতিরিক্ত এমন পরিমাণ সম্পদ থাকা যা শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সীমার সমতুল্য।

ঈদের দিনগুলোতে (১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত) যদি কোনো ব্যক্তির কাছে সাড়ে সাত তোলা সোনা (৮৭.৪৫ গ্রাম) অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা (৬১২.১৫ গ্রাম) কিংবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসার পণ্য থাকে, তবে তার উপর কুরবানি করা ওয়াজিব বা আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে সম্পদের ওপর এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়, যা জাকাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।

কুরবানি করার সঠিক সময়

কুরবানি কেবল নির্দিষ্ট দিন ও সময়েই করা সম্ভব। ১০ জিলহজ ঈদের নামাজ আদায়ের পর থেকে জিলহজ মাসের ১২ তারিখের সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানি করা যায়। তবে প্রথম দিন অর্থাৎ ১০ জিলহজ কুরবানি করা সবচেয়ে উত্তম।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—ঈদের নামাজের পূর্বে কোনোভাবেই কুরবানি করা বৈধ নয়। যদি কেউ ভুলবশত নামাজের আগে পশু জবেহ করে ফেলেন, তবে তা সাধারণ মাংস হিসেবে গণ্য হবে, কুরবানি হিসেবে কবুল হবে না। তাকে পুনরায় আরেকটি পশু কুরবানি করতে হবে।

কুরবানির পশুর শর্তসমূহ

সব পশু দিয়ে কুরবানি করা যায় না। শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু গৃহপালিত পশু দ্বারাই কুরবানি সম্পন্ন করতে হয়। এগুলো হলো: গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা এবং উট।

পশুটি অবশ্যই নির্দিষ্ট বয়সের হতে হবে। যেমন—ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার বয়স অন্তত ১ বছর; গরু ও মহিষের বয়স অন্তত ২ বছর এবং উটের বয়স কমপক্ষে ৫ বছর হতে হবে। তবে যদি কোনো ৬ মাসের ভেড়া দেখতে ১ বছরের মতো হৃষ্টপুষ্ট দেখায়, তবে তা দিয়েও কুরবানি করা জায়েজ। এ ছাড়া পশুটি অবশ্যই সব ধরনের শারীরিক ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। অন্ধ, খোঁড়া, অত্যন্ত দুর্বল বা রোগাক্রান্ত পশু কুরবানির জন্য অনুপযুক্ত।

কুরবানির নিয়ত ও দোয়া

কুরবানি করার আগে মুখে বা মনে মনে নিয়ত করা আবশ্যক। পশুকে কিবলার দিকে শুইয়ে নিচের দোয়াটি পাঠ করা সুন্নত:

إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ، إِنَّ صَلاَتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، لاَ شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ، اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ

উচ্চারণ: ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকিন। ইন্না সালাতি ওয়া নুসুঁকি ওয়া মাহইয়াইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। লা শারিকা লাহু ওয়া বিজালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমিন। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা।

অর্থ: নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরালাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ একমাত্র সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই, আমি এটার জন্যই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের একজন। হে আল্লাহ! এটি আপনার পক্ষ থেকে এবং আপনারই সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত।

এরপর ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে পশু জবেহ করতে হবে।

কুরবানি করার সহজ ধাপসমূহ

কুরবানি সম্পন্ন করার জন্য কিছু ধারাবাহিক নিয়ম মেনে চলা উচিত, যা নিচে আলোচনা করা হলো:

  • দয়া ও সহানুভূতির সাথে জবেহ করা: পশুকে অযথা কষ্ট দেওয়া যাবে না। ধারালো ছুরি ব্যবহার করতে হবে এবং একটি পশুর সামনে অন্য পশু জবেহ করা এড়িয়ে চলতে হবে।
  • সঠিকভাবে চামড়া ছাড়ানো: জবেহ করার পর পশুর প্রাণ সম্পূর্ণ চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে এবং এরপর চামড়া ছাড়ানোর কাজ শুরু করতে হবে।
  • মাংস বণ্টন: কুরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব বা উত্তম। এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং বাকি এক ভাগ অভাবী ও গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিতরণ করতে হবে। তবে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হলে পুরো মাংস নিজেরাও রেখে দেওয়া জায়েজ আছে।

উপসংহার

কুরবানি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি বান্দার পক্ষ থেকে মহান আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণ এবং তাকওয়া বা খোদাভীতির প্রমাণ। কুরবানি করার সময় আমাদের নিয়ত যেন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়, লোকদেখানো বা সামাজিক মর্যাদা প্রকাশ যেন না হয়। সঠিক নিয়ম মেনে কুরবানি আদায় করার মাধ্যমে আমাদের জীবনে বরকত আসুক এবং আমাদের আত্মিক প্রশান্তি বৃদ্ধি পাক।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

কুরবানি নিয়ম অনুযায়ী কার উপর কুরবানি ফরজ বা ওয়াজিব?
যে মুসলিম প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন এবং নেসাব পরিমাণ সম্পদের (সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা অথবা সমমূল্যের অর্থ) মালিক, তার উপর কুরবানি করা ওয়াজিব।
কুরবানি কখন করতে হয়?
১০ জিলহজ ঈদের নামাজ আদায়ের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানি করা যায়। তবে ১০ জিলহজ কুরবানি করা সবচেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ।
নারীদের উপর কি কুরবানির নিয়ম প্রযোজ্য?
হ্যাঁ, যদি কোনো নারী এককভাবে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে তার উপরও কুরবানি করা ওয়াজিব হয়।
কোন কোন পশু কুরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য?
উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া এবং দুম্বা দিয়ে কুরবানি করা বৈধ। তবে এগুলোকে অবশ্যই নির্ধারিত বয়সের ও শারীরিক ত্রুটিমুক্ত হতে হবে।
কুরবানি নিয়ম অনুযায়ী মাংস কীভাবে ভাগ করতে হয়?
কুরবানির মাংস সাধারণত সমান তিন ভাগে ভাগ করা উত্তম। এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং এক ভাগ অসহায় ও গরিব মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতে হয়।

তথ্যসূত্র

  1. সহিহ আল-বুখারি
  2. সহিহ মুসলিম
  3. রিয়াদুস সালেহীন
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না