ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি অত্যন্ত আনন্দময় ও আধ্যাত্মিক ইবাদতের দিন। কুরবানি কেবল একটি পশু জবেহ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি মহান আল্লাহ তাআলার প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও আনুগত্যের এক অনন্য নিদর্শন। ইসলামের মহান নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক ও চরম ত্যাগের স্মৃতিকে স্মরণ করে প্রতি বছর জিলহজ মাসে মুসলিমরা কুরবানি সম্পন্ন করে থাকেন।
কুরবানির এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি যাতে মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হয়, সেজন্য এর সঠিক নিয়মাবলি ও মাসায়েল জানা অত্যন্ত জরুরি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেছেন:
অর্থ: আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (পরহেজগারি)। (সূরা আল-হজ, আয়াত: ৩৭)
কুরবানির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া ও খোদাভীতি অর্জন করা। নিয়তের বিশুদ্ধতাই কুরবানি কবুল হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। এই নিবন্ধে আমরা কুরবানির নিয়মাবলি, পশুর যোগ্যতা, মাসায়েল এবং গোশত বণ্টনের সুন্নাত পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. কুরবানি কাদের ওপর ওয়াজিব? (সাহেবে নিসাব)
ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ফজর থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে ব্যক্তি প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকবেন, তাঁর ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব।
কুরবানির নিসাব কী?
- সোনা: সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি বা তোলা।
- রুপা: সাড়ে বাহান্ন (৫২.৫) ভরি বা তোলা।
- নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য: সাড়ে বাহান্ন ভরি রুপার মূল্যের সমপরিমাণ টাকা।
যেহেতু সোনা ও রুপার দামের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে, তাই সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য রুপার নিসাবকে ভিত্তি ধরে হিসাব করা হয়। যদি কারো কাছে এই তিন দিন জীবনযাত্রার মৌলিক প্রয়োজন ও ঋণ বাদে সাড়ে বাহান্ন ভরি রুপার বাজারমূল্যের সমপরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ বা সম্পদ থাকে, তবে তাঁর ওপর কুরবানি করা আবশ্যক বা ওয়াজিব।
২. কুরবানির পশু কেমন হতে হবে? (পশুর বয়স ও গুণাবলি)
কুরবানি আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত একটি বিশেষ উপহার। তাই পশুর শারীরিক সৌন্দর্য, সুস্থতা এবং নিখুঁত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু যেমন—উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা ছাড়া অন্য কোনো বন্য বা হিংস্র পশু দিয়ে কুরবানি করা জায়েজ নয়।
পশুর ন্যূনতম বয়সসীমা:
- উট: ন্যূনতম ৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।
- গরু ও মহিষ: ন্যূনতম ২ বছর পূর্ণ হতে হবে।
- ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা: ন্যূনতম ১ বছর পূর্ণ হতে হবে। তবে ৬ মাস বা তার বেশি বয়সের দুম্বা বা ভেড়া যদি দেখতে হৃষ্টপুষ্ট ও এক বছর বয়সের মতো মনে হয়, তবে তা দিয়ে কুরবানি করা যাবে (ছাগলের ক্ষেত্রে ১ বছর পূর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক)।
যেসব ত্রুটির কারণে পশু কুরবানি হবে না:
রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরবানির পশুর খুঁত বা ত্রুটি সম্পর্কে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। নিম্নলিখিত ত্রুটিযুক্ত পশু দিয়ে কুরবানি আদায় হবে না:
- যে পশুর দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ বা আংশিক নষ্ট বা চোখ অন্ধ।
- যে পশুটি চরমভাবে রোগাক্রান্ত ও দুর্বল।
- যে পশু এতখানি খুঁড়িয়ে চলে যে, জবেহ করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না।
- যে পশুর কান বা লেজের অধিকাংশ বা এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অংশ কাটা।
- যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে গেছে (তবে স্বাভাবিকভাবে শিং না উঠলে বা সামান্য ভাঙা হলে সমস্যা নেই)।
- যে পশুর অধিকাংশ দাঁত পড়ে গেছে বা নেই।
৩. ভাগে কুরবানি দেওয়ার নিয়মাবলি
বড় পশু অর্থাৎ গরু, মহিষ ও উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক বা ভাগে কুরবানি দেওয়া সম্ভব। তবে ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে কোনো শরিকানা চলে না; একটি পশু কেবল একজনের পক্ষ থেকেই কুরবানি করা যায়।
ভাগে কুরবানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলি:
- সকল শরিকের নিয়ত বা উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হতে হবে। কোনো একজন শরিকের নিয়ত যদি কেবল গোশত খাওয়ার বা লোকদেখানো হয়, তবে কারো কুরবানিই কবুল হবে না।
- ভাগে কুরবানি করার সময় হিস্যা বা অংশ সমান হতে হবে। অর্থাৎ প্রত্যেকের অংশ সমান (যেমন সাত ভাগের এক ভাগ) হতে হবে। কারও অংশ যদি এক সপ্তমাংশের চেয়ে কম হয়, তবে কুরবানি শুদ্ধ হবে না।
- গরু বা মহিষে কুরবানির সাথে আকিকার অংশ যোগ করা জায়েজ রয়েছে। তবে এক্ষেত্রেও নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়া আবশ্যক।
৪. কুরবানির সময়সীমা
কুরবানি করার জন্য নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদের নামাজ আদায়ের পর থেকে শুরু করে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই তিন দিন কুরবানি করা যায়। তবে প্রথম দিন (১০ জিলহজ) কুরবানি করা সবচেয়ে উত্তম।
শহর বা যে সমস্ত এলাকায় ঈদের নামাজ ওয়াজিব, সেখানে ঈদের নামাজের জামাত শেষ হওয়ার পূর্বে পশু জবেহ করলে কুরবানি সহিহ হবে না। গ্রামীণ এলাকা যেখানে ঈদের নামাজ পড়ার ব্যবস্থা নেই, সেখানে ১০ জিলহজ ফজর বা সুবহে সাদিকের পর থেকেই কুরবানি করা সম্ভব।
৫. কুরবানির সুন্নাত ও আদবসমূহ
কুরবানির দিনগুলোতে কিছু সুন্নাত ও আদব অনুসরণ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ:
- নখ ও চুল না কাটা: যারা কুরবানি করার ইচ্ছা রাখেন, তাঁদের জন্য জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকে কুরবানি সম্পন্ন করা পর্যন্ত শরীরের চুল, নখ বা চামড়া না কাটা মুস্তাহাব বা সুন্নাত।
- ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকা: ঈদের দিন সকালে কিছু না খেয়ে প্রথমে নিজের কুরবানির পশুর গোশত দিয়ে খাবার শুরু করা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত ছিল।
- পশুর প্রতি দয়া প্রদর্শন: পশুকে জবেহ করার পূর্বে ভালো খাদ্য ও পানি দেওয়া, ধারালো ছুরি দিয়ে দ্রুত জবেহ করা যাতে পশু বেশি কষ্ট না পায় এবং এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবেহ না করা ইসলামি নৈতিকতার অংশ।
জবেহ করার দোয়া:
পশু জবেহ করার সময় কুরবানিদাতার নিজের হাতে জবেহ করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্য কাউকে দিয়ে জবেহ করাতে পারেন, তবে নিজে সামনে উপস্থিত থাকা ভালো। জবেহ করার সময় এই তাসমিয়াহ বলা জরুরি:
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার।
অর্থ: আল্লাহর নামে, এবং আল্লাহ সবচেয়ে মহান।
৬. কুরবানির গোশত ও চামড়ার বিধান
কুরবানি কেবল একটি ত্যাগ নয়, এটি পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সামাজিক সমতা রক্ষার এক অনন্য মাধ্যম। কুরবানির গোশত কীভাবে বণ্টন করতে হবে, সে সম্পর্কে ইসলামে চমৎকার নির্দেশনা রয়েছে।
গোশত বণ্টনের সুন্নাত নিয়ম:
কুরবানির গোশত সাধারণত তিনটি সমান ভাগে বণ্টন করা মুস্তাহাব:
- প্রথম অংশ: নিজের ও নিজের পরিবারের সদস্যদের জন্য।
- দ্বিতীয় অংশ: আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের জন্য।
- তৃতীয় অংশ: অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের জন্য।
তবে পরিবারের सदस्य সংখ্যা বেশি হলে বা বিশেষ প্রয়োজনে নিজেরা সবটুকু গোশত রেখে দিলে বা অন্য কোনো উপায়ে বণ্টন করলেও কুরবানি নষ্ট হবে না, তবে তিন ভাগে বণ্টন করাই উত্তম ও সুন্নাত সম্মত।
চামড়ার বিধান:
কুরবানির পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করতে পারেন (যেমন জায়নামাজ বা ঘরের কাজে)। তবে যদি চামড়া বিক্রি করা হয়, তাহলে সেই বিক্রয়লব্ধ অর্থ সম্পূর্ণভাবে গরিব ও এতিমদের মাঝে সদকা বা দান করে দিতে হবে। চামড়া বিক্রির টাকা মসজিদের নির্মাণ কাজে বা ইমামের বেতন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। এমনকি জবেহকারী বা কসাইয়ের পারিশ্রমিক হিসেবেও কুরবানির গোশত বা চামড়ার টাকা দেওয়া নিষিদ্ধ; কসাইয়ের মজুরি সম্পূর্ণ আলাদাভাবে নিজের তহবিল থেকে দিতে হবে।

