ইসলামী জীবনব্যবস্থায় পবিত্রতা অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। ঈমানের অন্যতম অংশ হলো বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিক নিয়মে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মিলন (সহবাস), স্বপ্নদোষ কিংবা নারীদের মাসিক বা ঋতুস্রাব-পরবর্তী সময়ে গোসল করা ফরজ বা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় এই অবস্থাকে 'জানাবাত' বা অপবিত্র অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে 'জুনুবী' বলা হয়।
অনেকের মনেই এই প্রশ্ন জাগে যে, গোসল ফরজ হওয়ার সাথে সাথেই কি গোসল করা আবশ্যক? নাপাক অবস্থায় কি ঘুমানো, খাওয়া-দাওয়া করা কিংবা ঘরের অন্যান্য সাধারণ কাজ করা যায়? আমাদের সমাজে এই বিষয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। সহীহ মুসলিমের ৩০৫ নম্বর হাদিসটি আমাদের এই বিষয়ে অত্যন্ত সহজ, বাস্তবমুখী ও চমৎকার দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
সহীহ মুসলিম: হাদিস ৩০৫
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবন ও সুন্নাহ আমাদের প্রতিটি জটিল সমস্যার সমাধান দেয়। জানাবাত বা গোসল ফরজ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা.) কীভাবে সময় অতিবাহিত করতেন, তা উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।
অর্থ: হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন জুনুবী (গোসল ফরজ) অবস্থায় থাকতেন, অতঃপর তিনি পানাহার করার কিংবা ঘুমানোর ইচ্ছা করতেন, তখন তিনি সালাতের (নামাজের) অজুর ন্যায় অজু করে নিতেন।
হাদিসের মান: সহীহ হাদিস (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৩০৫, অধ্যায়: ঈমান)
হাদিসের বাস্তব শিক্ষা ও ফিকহি মাসায়েল
সহীহ মুসলিমের এই গুরুত্বপূর্ণ হাদিস থেকে আমরা কয়েকটি অতি প্রয়োজনীয় এবং বাস্তবসম্মত ফিকহি শিক্ষা অর্জন করতে পারি, যা আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করে তোলে:
১. মানসিক প্রশান্তি ও ইসলামে সহজতা
অনেকে মনে করেন, গোসল ফরজ হওয়ার পর শরীর স্পর্শ করলে ঘরদোর বা আসবাবপত্র নাপাক হয়ে যায়। এই ভুল ধারণার কারণে অনেকেই তীব্র মানসিক চাপ ও অস্থিরতায় ভোগেন। কিন্তু ইসলাম অত্যন্ত সহজ ও যুক্তিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'মুমিন কখনো (সত্তা হিসেবে) নাপাক হয় না' (সহীহ বুখারী)। অতএব, নাপাক অবস্থায় ঘরদোরের কাজ করা বা চলাফেরা করায় কোনো গুনাহ নেই।
২. ঘুমানোর পূর্বে অজুর গুরুত্ব
যদি কোনো কারণে তাৎক্ষণিকভাবে গোসল করা সম্ভব না হয় বা আলস্য লাগে, তবে ঘুমানোর আগে অন্তত হাত-মুখ ধুয়ে নামাজের মতো অজু করে নেওয়া সুন্নাহ। এর ফলে অপবিত্রতার তীব্রতা হ্রাস পায় এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রশান্তি লাভ করা যায়।
৩. নাপাক অবস্থায় পানাহার করা
গোসল ফরজ থাকা অবস্থায় কোনো কিছু খাওয়া বা পান করার প্রয়োজন হলে, প্রথমে হাত ধুয়ে ও কুলি করে নেওয়া উচিত। সম্ভব হলে অজু করে নেওয়া সবচেয়ে উত্তম, যা সহীহ মুসলিমের এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
গোসল ফরজ অবস্থায় কোন কোন কাজ করা জায়েজ?
ইসলামী শরিয়তের নিয়মানুযায়ী, গোসল ফরজ অবস্থায় নিম্নোক্ত কাজগুলো করা সম্পূর্ণ বৈধ ও জায়েজ:
- দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও সাধারণ চলাফেরা করা।
- ঘরের রান্নাবান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা ঘরের অন্যান্য স্বাভাবিক কাজকর্ম করা।
- মায়েদের ক্ষেত্রে সন্তানকে দুধ পান করানো (তবে স্তন ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া এবং অজু করে নেওয়া উত্তম)।
- মনে মনে বা মুখে জিকির-আজকার করা, তাসবিহ পাঠ করা কিংবা আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করা (তবে কুরআন তিলাওয়াত ব্যতীত)।
- মোবাইল বা অন্য কোনো ডিজিটাল স্ক্রিনে সরাসরি স্পর্শ না করে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত শোনা।
গোসল ফরজ অবস্থায় কোন কাজগুলো করা হারাম?
জানাবাত বা অপবিত্র অবস্থায় ইসলামী শরিয়তে কিছু কাজ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে:
- যেকোনো ধরনের সালাত বা নামাজ আদায় করা (ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত কিংবা নফল)।
- পবিত্র কুরআন সরাসরি হাত দিয়ে স্পর্শ করা বা তিলাওয়াত করা।
- পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ করা।
- विशेष জরুরি প্রয়োজন বা ওজর ছাড়া মসজিদে প্রবেশ করা কিংবা অবস্থান করা।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা
ইসলাম যদিও অলসতা বা বিশেষ প্রয়োজনে গোসল বিলম্ব করার অনুমতি দিয়েছে, তবে তার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। কোনো অবস্থাতেই অলসতা করে ওয়াক্তের নামাজ কাজা করা যাবে না। পরবর্তী নামাজের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাওয়ার পূর্বেই গোসল করে পবিত্র হওয়া প্রতিটি মুসলিমের জন্য ফরজ। নামাজ কাজা করা মারাত্মক কবিরা গুনাহ, যা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

