ইসলামে সন্তানের অধিকার: বাবা-মায়ের দায়িত্ব ও করণীয়

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
ইসলামে সন্তানের অধিকার নিয়ে সহজ ইসলামিক নির্দেশিকা

ইসলামে সন্তানের অধিকার নিয়ে সহজ ইসলামিক নির্দেশিকা

ইসলামে সন্তানের অধিকার শুধু খাবার, পোশাক বা পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুর সুন্দর নাম, নিরাপত্তা, আদর, দ্বীনি শিক্ষা, ন্যায়বিচার ও সুন্দর চরিত্র গড়ে তোলা—সবই বাবা-মায়ের বড় দায়িত্ব। চলুন সহজ ভাষায় কুরআন-হাদিসের আলোকে বিষয়টি বুঝে নেই।

ইসলামে সন্তানের অধিকার বলতে কী বোঝায়?

ইসলামে সন্তানের অধিকার বলতে বোঝায় শিশুর প্রতি বাবা-মায়ের সেই দায়িত্বগুলো, যেগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আদায় করতে হয়। সন্তান শুধু পরিবারের আনন্দ নয়, বরং সে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত। আর প্রতিটি আমানতেরই নির্দিষ্ট হক বা অধিকার থাকে।

অনেক সময় আমরা ভাবি, সন্তানকে খাওয়ানো, ভালো স্কুলে পাঠানো আর অসুস্থ হলে চিকিৎসা করানোই যথেষ্ট। এগুলো অবশ্যই অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ইসলাম এর চেয়েও গভীরে যায়। শিশুর মন, ঈমান, চরিত্র, নিরাপত্তা ও সম্মান—সব কিছুর যত্ন নিতে তাগিদ দেয় ইসলাম।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নিজেদের এবং পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে বলেছেন। এর মানে হলো সন্তানকে শুধু দুনিয়ার কাজের জন্য তৈরি করলেই হবে না, তাকে আল্লাহকে চিনতে শেখাতে হবে, হালাল-হারাম বোঝাতে হবে এবং ভালোবাসা দিয়ে ইসলামের পথে চালিত করতে হবে।

জন্মের আগেই সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের দায়িত্ব

ইসলামে সন্তানের অধিকার জন্মের পর থেকে শুরু হয় না। আসলে বিয়ে, সুন্দর পরিবার গঠন ও হালাল উপার্জনের চিন্তা থেকেই এই দায়িত্বের সূচনা হয়। কারণ একটি পবিত্র ও শান্ত পরিবেশ শিশুর সুস্থ মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।

বাবা-মায়ের উচিত নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ককে শান্ত, নিরাপদ ও সম্মানপূর্ণ রাখা। শিশুরা কথা কম বুঝলেও ঘরের পরিবেশ ও মা-বাবার আচরণ খুব দ্রুত আয়ত্ত করে। ঘরে যদি সারাক্ষণ গালিগালাজ, চিৎকার আর অবহেলা থাকে, তবে শিশুর মনে ভয় ও হীনমন্যতা তৈরি হয়।

আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হালাল রিযিক। হারাম উপার্জন দিয়ে সন্তানকে বড় করলে বাহ্যিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্য মিললেও তাতে কোনো বরকত থাকে না। তাই বাবা-মায়ের ঐকান্তিক চেষ্টা থাকতে হবে যেন উপার্জন কম হলেও তা হালাল হয়। এই পবিত্র চিন্তাই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য দোয়ার মতো কাজ করে।

সন্তানের ভালো নাম রাখা ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার

সন্তানের জন্মের পর তার ওপর বাবা-মায়ের প্রথম প্রকাশ্য দায়িত্ব হলো একটি সুন্দর নাম রাখা। নাম শুধু একটি পরিচয় নয়, বরং নামের অর্থ শিশুর আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই ইসলামে ভালো অর্থবহ নাম পছন্দ করা সুন্দর একটি সুন্নাহ।

অর্থহীন, নেতিবাচক অর্থ বহনকারী, অহংকার প্রকাশ করে এমন বা ইসলামের ভাবধারার সাথে মেলে না—এমন নাম এড়িয়ে চলা উচিত। নাম রাখার সময় শুধু তা শুনতে কতটা আধুনিক লাগছে, সেটি না দেখে তার আসল অর্থ কী, তা যাচাই করা আবশ্যক।

শিশুর নাম এমন হওয়া উচিত, যা বলতে সহজ, শ্রুতিমধুর এবং তাকে একটি ইতিবাচক পরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়। আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান, নবীদের নাম, সাহাবিদের নাম বা ভালো অর্থপূর্ণ যেকোনো সুন্দর নাম রাখা যেতে পারে। মূল কথা হলো নামের অর্থ যেন কল্যাণকর হয়।

খাবার, পোশাক ও নিরাপত্তা: সন্তানের মৌলিক অধিকার

ইসলামে সন্তানের অধিকার এর মধ্যে তার খাবার, পোশাক, বাসস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। শিশু নিজের জন্য উপার্জন করতে পারে না; সে সম্পূর্ণভাবে বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল। তাই তার প্রয়োজনগুলো পূরণ করা ইবাদতের অংশ।

এখানে বিলাসিতা প্রদর্শনের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন হলো আন্তরিক যত্ন। সন্তান যেন ক্ষুধার্থ না থাকে, চরম আবহাওয়া থেকে সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পোশাক পায়, অসুস্থ হলে সঠিক চিকিৎসা পায় এবং ঘরে সম্পূর্ণ নিরাপদ বোধ করে—এসব নিশ্চিত করা বাবা-মায়ের প্রধান কর্তব্য।

নিরাপত্তা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক নিরাপত্তাও এর অন্তর্ভুক্ত। শিশুকে বারবার অপমান করা, অন্যের সামনে ছোট করা বা সারাক্ষণ ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা তার মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ইসলাম আমাদের দয়া শেখায়, আর সন্তানই এই দয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার।

দ্বীনি শিক্ষা ও সুন্দর চরিত্র গঠন

সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্বগুলোর একটি। এর মানে শুধু আরবি অক্ষর চেনানো নয়; বরং আল্লাহ কে, রাসূলুল্লাহ ﷺ কে, সালাত কেন পড়তে হয়, সত্য কথা বলার গুরুত্ব কী—এসব সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় শিশুর মনে গেঁথে দেওয়া।

শিশুকে ছোটবেলা থেকেই ঈমান, আদব, সালাম বিনিময়, ছোট ছোট দোয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বড়দের শ্রদ্ধা ও ছোটদের প্রতি স্নেহ করার শিক্ষা দেওয়া উচিত। এর জন্য কোনো কঠিন লেকচারের প্রয়োজন নেই, বাবা-মায়ের নিজস্ব আচরণই এখানে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হিসেবে কাজ করে। আপনি নিজে যা করবেন, সন্তান অবচেতনভাবেই তা শিখে নেবে।

সুন্দর চরিত্র গঠনে অপরিসীম ধৈর্যের প্রয়োজন। শিশু স্বভাবসুলভভাবেই ভুল করবে এবং তা থেকে শিখবে। তাই ভুল করলে শুধু বকাঝকা না করে শান্তভাবে বুঝিয়ে বলুন এবং ভালো কোনো কাজ করলে মন খুলে তার প্রশংসা করুন। এতে তার মনে দ্বীন ও ভালো কাজের প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি হবে।

সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা কেন জরুরি?

বাবা-মায়ের জন্য সব সন্তানের সাথে সমান ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা অত্যন্ত জরুরি। একজনকে সব সময় বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া এবং অন্যজনকে অবহেলা করা—পরিবারে চরম অশান্তি ডেকে আনে। এর ফলে শিশুদের মনে একে অপরের প্রতি হিংসা, ক্ষোভ ও দূরত্বের সৃষ্টি হয়।

ন্যায়বিচার করার অর্থ এই নয় যে সব বয়সের সন্তানকে অবিকল এক জিনিস দিতে হবে। বরং যার যেমন প্রয়োজন, তাকে সে অনুযায়ী দেওয়া। তবে ভালোবাসা প্রকাশ, উপহার প্রদান এবং দৈনন্দিন আচরণের ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব না থাকে, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ সন্তানদের মাঝে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন। উপহার, স্নেহ ও সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে মা-বাবার সমতা বজায় রাখা উচিত, কারণ অবহেলার একটি ছোট ক্ষতও শিশুর মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

ভালোবাসা, আদর ও কোমল আচরণ সন্তানের হক

ইসলামে সন্তানের অধিকার এর একটি সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা। সন্তানকে জড়িয়ে ধরা বা আদর করা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা রহমত। আমাদের প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ ﷺ শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন, তাদের কোলে নিতেন, চুমু দিতেন এবং তাদের সাথে চমৎকার কোমল আচরণ করতেন।

অনেক পরিবারে ভুল ধারণা আছে যে, বেশি আদর করলে সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। আসলে অন্যায় আবদার বা অন্ধ প্রশ্রয় ক্ষতিকর হতে পারে, কিন্তু অকৃত্রিম ভালোবাসা ও স্নেহ কখনোই ক্ষতিকর নয়। মা-বাবার ভালোবাসা শিশুকে মানসিকভাবে সুরক্ষিত রাখে, যা তাদের অবাধ্যতা থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে।

শাসনের প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই সম্মানের সীমা বজায় রেখে করতে হবে। গালি দেওয়া, মারধর করা বা অন্যের সাথে তুলনা করে লজ্জিত করা শিশুকে ভেতর থেকে জেদি ও বিদ্রোহী করে তোলে। কোমল ও আন্তরিক ভাষায় বুঝিয়ে বলা কথা অনেক সময় কঠোর শাস্তির চেয়েও বেশি কার্যকর হয়।

সন্তানের বয়স অনুযায়ী শিক্ষা ও শাসন

সব বয়সের সন্তানের সাথে একই পদ্ধতিতে আচরণ করা সমীচীন নয়। ছোট শিশু খেলতে খেলতে অনেক কিছু শেখে, একটু বড় হলে সে কাজের পেছনের কারণ বুঝতে চায়, আর কৈশোরে পদার্পণ করলে সে সবার কাছে সম্মান ও গুরুত্ব পেতে চায়। তাই সন্তানের বয়স ও মানসিক অবস্থা বুঝে মা-বাবার শাসনপদ্ধতি পরিবর্তন করা দরকার।

শৈশবে মজার মজার গল্প, ছোট ছোট দোয়া, সালাম ও খাবারের আদবের মাধ্যমে সুন্দর অভ্যাসের সূচনা করুন। সাত বছর বয়সের কাছাকাছি পৌঁছালে তাকে সালাতের প্রতি অভ্যস্ত করার বিষয়ে বিশেষ যত্নবান হতে হবে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি হতে হবে পরম মমতা ও ধৈর্য সহকারে।

সন্তান যখন কৈশোরে পৌঁছায়, তখন কেবল আদেশ-নিষেধের মাধ্যমে তাকে পরিচালনা করা যায় না। তার কথা ও মতামত মনোযোগ দিয়ে শুনুন। সে কোনো ভুল করলে তাকে শত্রু না ভেবে পরম বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়িয়ে সঠিক পথ দেখান। এই বন্ধুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভারসাম্যই হলো সুন্দর প্যারেন্টিং বা সন্তান প্রতিপালন।

সন্তানের জন্য দোয়া: বাবা-মায়ের নীরব শক্তি

সন্তানের কল্যাণে দোয়া করা বাবা-মায়ের জন্য এক অনন্য আমল। শুধু পরীক্ষার আগে বা বিপদে পড়লেই নয়, প্রতিদিন সন্তানের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করুন। আল্লাহর কাছে তার সুন্দর ঈমান, সুন্দর চরিত্র, নিরাপত্তা, হালাল রিযিক এবং সৎ সঙ্গের জন্য প্রার্থনা করুন।

১. সন্তানের জন্য নেক হওয়ার দোয়া

رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ

উচ্চারণ: রাব্বি হাব লি মিনাস-সালিহীন।

অর্থ: হে আমার রব, আমাকে নেককারদের মধ্য থেকে সন্তান দান করুন।

রেফারেন্স: সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০০

কখন পড়বেন: সন্তান কামনার সময়, গর্ভাবস্থায় কিংবা সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের প্রার্থনায় এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়া যায়।

বিশেষ টিপস: দোয়ার পাশাপাশি নিজের আচরণও সংশোধন করুন। সন্তানকে নেককার বানাতে হলে মা-বাবার নিজেদের নেক আমল ও সুন্দর আচরণের অভ্যাস করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

২. পরিবারকে চোখের শীতলতা বানানোর দোয়া

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

উচ্চারণ: রাব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’য়ুনিও ওয়াজ’আলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা।

অর্থ: হে আমাদের রব, আমাদের স্ত্রী-স্বামী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন।

রেফারেন্স: সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪

অর্থের গভীরতা: এই প্রার্থনায় কেবল সন্তান ভালো হওয়ার আবেদনই নয়, বরং পুরো পরিবারকে তাকওয়া ও সুপথের পথিক বানানোর এক মহান আকুতি রয়েছে।

কখন পড়বেন: পারিবারিক শান্তি ও বরকত লাভ এবং সন্তানদের হেদায়েতের জন্য প্রতিদিন এই দোয়াটি নিয়মিত পাঠ করতে পারেন।

যেসব ভুল বাবা-মায়ের এড়িয়ে চলা উচিত

মানুষ হিসেবে সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে আমাদের কিছু ভুলভ্রান্তি হতেই পারে। তবে কিছু ভুল যদি প্রতিনিয়ত পুনরাবৃত্তি হতে থাকে, তবে তা শিশুর কোমল মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। তাই মা-বাবার আগে থেকেই এসব বিষয়ে সচেতন থাকা উচিত।

প্রথম প্রধান ভুল হলো সন্তানকে অন্যের সাথে তুলনা করা। যেমন—"দেখো ওর কত ভালো মেধা" কিংবা "পাশের বাসার ছেলেটি কত ভদ্র" ইত্যাদি বলা। এ ধরনের তুলনা শিশুকে সংশোধনের পরিবর্তে তার আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দেয় এবং সে নিজেকে ছোট ভাবতে শুরু করে।

দ্বিতীয় ভুল হলো সন্তানের কেবল পরীক্ষার ফলাফল বা জাগতিক সাফল্যকে একমাত্র লক্ষ্য মনে করা। ভালো ফলাফল বা সুন্দর ক্যারিয়ারের প্রয়োজন অবশ্যই আছে, তবে তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন হলো তার সুন্দর চরিত্র, সালাতের অভ্যাস, সত্যবাদিতা ও মানবিক গুণাবলি। তৃতীয় বড় ভুল হলো সন্তানের কথা না শোনা বা তার আবেগকে গুরুত্ব না দেওয়া। শিশু ছোট হলেও তার অনুভূতিগুলো সত্য। তার কথা মন দিয়ে শুনলে সে আপনাকে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মনে করবে।

আজ থেকেই যেভাবে শুরু করবেন

সন্তানের অধিকার আদায়ের জন্য খুব কঠিন কোনো পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করার প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট আন্তরিক পরিবর্তনই অনেক সময় সবচেয়ে বড় সুফল বয়ে আনে। আজ থেকেই সন্তানকে ভালোবেসে সালাম দিন, তার চোখে চোখ রেখে কথা শুনুন, সবাই মিলে একসাথে খেতে বসুন এবং নিয়মিত তার জন্য প্রাণখুলে দোয়া করুন।

পারিবারিক একটি সুন্দর রুটিন তৈরি করতে পারেন। প্রতিদিন মাত্র পাঁচ বা দশ মিনিট সময় বের করে ঘরের সবাই মিলে কুরআন-হাদিসের ছোট কোনো শিক্ষণীয় গল্প বা কোনো সুন্দর আদব নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। কোনো জোরজবরদস্তি ছাড়া অত্যন্ত আনন্দময় পরিবেশে এটি করুন।

মা-বাবা নিজেরাও কোনো ভুল করলে সন্তানের সামনে অকপটে তা স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করতে পারেন। এতে মা-বাবার প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা আরও বহু গুণ বেড়ে যায় এবং সন্তানও শেখে যে ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া ও তাওবা করে ফিরে আসা অত্যন্ত সম্মানের কাজ। এর ফলে পরিবারে এক জান্নাতি শান্তি নেমে আসে, আলহামদুলিল্লাহ।

ইসলামে সন্তানের अधिकार নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা

ইসলামে সন্তানের প্রধান অধিকারগুলো কী কী?
ইসলামে সন্তানের প্রধান অধিকারগুলো হলো—জন্মের পর সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখা, হালাল ও পুষ্টিকর খাবার, নিরাপদ বাসস্থান, স্নেহ-আদর, দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান, সবার সাথে সমান আচরণ এবং একজন সৎ ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
সন্তানের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব কি শুধু বাবার?
না, সন্তানের সামগ্রিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব বাবা ও মা উভয়েরই। তবে পরিবারের আর্থিক ভরণপোষণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব সাধারণত বাবার ওপর ন্যস্ত। আর মা প্রধানত শিশুর স্নেহ-মমতা, প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষা ও সুন্দর আচরণ গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া কি ফরজ?
হ্যাঁ, সন্তানকে তার জীবনের জন্য আবশ্যকীয় দ্বীনি জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া বাবা-মায়ের ওপর প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। এর মধ্যে রয়েছে শুদ্ধভাবে কুরআন পাঠ, সালাতের নিয়মাবলি, মৌলিক হালাল-হারামের জ্ঞান এবং দৈনন্দিন জীবনে পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ইসলামি আদব ও নৈতিকতা।
সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করার অপকারিতা কী?
সন্তানদের মাঝে আদর, ভালোবাসা বা উপহারের ক্ষেত্রে বৈষম্য করলে তা তাদের মনে হীনমন্যতা, একে অপরের প্রতি ক্ষোভ এবং মা-বাবার প্রতি অবাধ্যতার জন্ম দেয়। ইসলাম সব সন্তানের প্রতি সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার ও সমতা রক্ষা করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।
সন্তান ভুল করলে তাকে সংশোধনের ইসলামি পদ্ধতি কী?
সন্তান ভুল করলে প্রথমে তাকে পরম মমতায় আলাদাভাবে ডেকে শান্ত ভাষায় বুঝিয়ে বলতে হবে। তার ভুলের কারণ জানার চেষ্টা করতে হবে। শারীরিক আঘাত, গালিগালাজ বা সবার সামনে লজ্জিত করা কঠোরভাবে বর্জনীয়। ভালোবাসা ও ধৈর্যের মাধ্যমে বুঝিয়ে বললে শিশুরা তা সহজেই গ্রহণ করে।
সন্তানের কল্যাণ ও নেক আমল কামনায় কোন দোয়াটি সবচেয়ে উত্তম?
সন্তানের নেক আমল ও সুন্দর জীবন কামনায় পবিত্র কুরআনে বর্ণিত "রাব্বি হাব লি মিনাস-সালিহীন" এবং সম্পূর্ণ পরিবারের শান্তির জন্য "রাব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’য়ুনিও ওয়াজ’আলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা"—এই দোয়া দুটি নিয়মিত পড়া অত্যন্ত উত্তম।

শেষ কথা

ইসলামে সন্তানের অধিকার রক্ষা করা কেবল পারিবারিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি আল্লাহর দরবারে জবাবদিহিতার একটি বড় আমানত। সন্তানকে কেবল দুনিয়াবি দিক থেকে বড় করাই সফলতার পরিচয় নয়; বরং তাকে একজন ভালো মানুষ, একজন খাঁটি মুসলিম এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই আসল লক্ষ্য। ভালোবাসা, ন্যায়বিচার, সঠিক দ্বীনি শিক্ষা, দোয়া এবং কোমল আচরণের মাধ্যমে সন্তান লালন-পালন করলে পরিবারে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকত নেমে আসে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সন্তানের হকগুলো যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

রেফারেন্স

  1. আল-কুরআন, সূরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৬
  2. আল-কুরআন, সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪
  3. আল-কুরআন, সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০০
  4. সহীহ বুখারী
  5. সহীহ মুসলিম
  6. সুনান আবু দাউদ
  7. হিসনুল মুসলিম
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না