আমাদের সন্তানদের হৃদয়ে ছোটবেলা থেকেই ইসলামের প্রতি ভালোবাসা বপন করা প্রতিটি মুসলিম পিতা-মাতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবে অনেক সময় প্রথাগত মুখস্থ বা কঠোর নিয়মের কারণে শিশুরা দ্বীন শিক্ষাকে একঘেয়ে বা কঠিন মনে করতে পারে। কিন্তু ইসলাম অত্যন্ত সহজ, সুন্দর এবং আনন্দময় একটি জীবনব্যবস্থা। যদি আমরা কিছু সৃজনশীল ও আকর্ষণীয় পদ্ধতি অবলম্বন করি, তবে শিশুরা আনন্দের সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দ্বীনের আলো নিজেদের জীবনে ধারণ করবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) শিশুদের সাথে অত্যন্ত কোমল আচরণ করতেন এবং খেলার ছলে তাদের সুন্দর শিক্ষা দিতেন। আল্লাহর বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের দায়িত্বের কথা:
উচ্চারণ: কুল্লুকুম রা'ইন ওয়া কুল্লুকুম মাসউ্লুন 'আন রা'ইয়্যাতিহি।
অর্থ: তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (সহীহ বুখারী: ৮৯৩)
চলুন জেনে নেওয়া যাক কীভাবে অত্যন্ত সহজ ও আনন্দদায়ক উপায়ে শিশুদের মনে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা যায়, তার ১৫টি সৃজনশীল উপায়:
শিশুদের দ্বীনী শিক্ষাকে সহজ ও আনন্দময় করার ১৫টি চমৎকার উপায়
১. নবী-রাসূলদের গল্পের আসর
শিশুরা স্বভাবতই গল্প শুনতে ভালোবাসে। প্রতি সপ্তাহে বা রাতে ঘুমানোর আগে তাদের সাথে নবী-রাসূল বা সাহাবিদের বীরত্ব ও ধৈর্যের গল্প নিয়ে আড্ডা দিন। ইউনুস (আ.)-এর তিমির পেটে থাকার ঘটনা কিংবা মূসা (আ.)-এর নীলনদ পার হওয়ার ঘটনাগুলো সুন্দর অভিনয়ের ঢঙে তাদের বলুন। গল্প শেষে তাদের মতামত জানতে চান যে তারা এই গল্প থেকে কী শিখল।
২. ধিকর পাত্র বা তাসবিহ বয়াম তৈরি
একটি খালি কাচের বা প্লাস্টিকের বয়াম নিন। সেটিকে রঙিন কাগজ, পাথর বা চুমকি দিয়ে সাজাতে বলুন। যখনই শিশু কোনো ভালো কাজ করবে বা আলহামদুলিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ পড়বে, তখন এই পাত্রে একটি করে রঙিন মার্বেল বা পাথর রাখুন। সপ্তাহ শেষে পাত্রটি পূর্ণ হলে তাকে পুরস্বৃত করুন। এটি শিশুদের মনে ভালো কাজের উদ্দীপনা জোগাবে।
৩. শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় ইসলামি হস্তশিল্প
কাগজ, আঠা ও কাঁচি দিয়ে শিশুদের নিয়ে রমজানের রঙিন ফানুস, কাবার মডেল কিংবা রঙিন কার্ডবোর্ড দিয়ে ছোট মসজিদ তৈরি করুন। এই কাজগুলো করার সময় তাদের কাবার ইতিহাস বা মসজিদের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করুন। এতে তাদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দ্বীনী জ্ঞানও বৃদ্ধি পাবে।
৪. নিজেদের জায়নামাজ সাজানো
একটি সাদা বা একরঙা সাধারণ সুতি জায়নামাজ কিনে দিন। এরপর কাপড়ের রঙ দিয়ে শিশুকে তার নিজের জায়নামাজটি নিজের মতো করে সাজাতে দিন। চাঁদ-তারা, ফুল বা মসজিদের ছবি এঁকে যখন সে নিজের তৈরি জায়নামাজে সালাত আদায় করতে দাঁড়াবে, তখন তার মনের আনন্দ অনেক গুণ বেড়ে যাবে।
৫. কুরআনের শব্দ খোঁজার খেলা
ছোট ছোট এবং পরিচিত সূরাগুলো (যেমন সূরা ফাতিহা বা সূরা ইখলাস) বড় বড় অক্ষরে লিখে নিন। এরপর শিশুকে বলুন সেখানে কয়টি 'আল্লাহ' বা 'কুল' শব্দ আছে তা খুঁজে গোল দাগ দিতে। এই খেলার মাধ্যমে শিশুরা খুব দ্রুত কুরআনের শব্দ চিনতে শেখে এবং তাদের পড়ার আগ্রহ বাড়ে।
৬. দোয়া ও কৃতজ্ঞতার দিনলিপি বা ডায়েরি
শিশুদের একটি সুন্দর ডায়েরি উপহার দিন। প্রতিদিন ঘুমানোর আগে তাকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে অন্তত তিনটি ভালো জিনিস ডায়েরিতে লিখতে বা আঁকতে বলুন। এর পাশাপাশি ছোট ছোট প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় দোয়াগুলো লিখে রাখার অভ্যাস করুন। এটি তাদের মনে কৃতজ্ঞতাবোধ জাগিয়ে তুলবে।
৭. ইসলামি কুইজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা
ছুটির দিনে পুরো পরিবার মিলে ইসলামি কুইজ বা জ্ঞানভিত্তিক পারিবারিক খেলায় মেতে উঠুন। সঠিক উত্তরের জন্য ছোট মিষ্টি বা উপহারের ব্যবস্থা রাখুন। এতে পরিবারের বন্ধন যেমন দৃঢ় হবে, তেমনি খেলার ছলে শিশুরা অনেক অজানা বিষয় খুব সহজে শিখে যাবে।
৮. আল্লাহর সৃষ্টি দেখতে প্রকৃতি ভ্রমণ
শিশুদের নিয়ে ঘরের বাইরে, পার্কে কিংবা গাছপালার মাঝে হাঁটতে যান। আকাশ, ফুল, পাখি এবং পিঁপড়েদের দেখিয়ে তাদের সাথে কথা বলুন। তাদের বোঝান যে এই সবকিছু মহান আল্লাহ কতটা নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছোট দোয়া করা শিশুর মনে আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও বিস্ময় তৈরি করে।
৯. ভালো কাজের সাপ্তাহিক চ্যালেঞ্জ চার্ট
একটি সুন্দর চার্ট তৈরি করুন, যেখানে প্রতিদিনের ভালো কাজের তালিকা থাকবে। যেমন: হাসিমুখে কথা বলা, মা-বাবাকে সাহায্য করা, নিজের ঘর গোছানো এবং পাখিকে পানি খাওয়ানো। প্রতিটি ভালো কাজ সম্পন্ন করার পর চার্টে একটি করে সোনার তারা চিহ্ন এঁকে দিন। এটি তাদের ইসলামি নৈতিকতা অর্জনে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করবে।
১০. মসজিদের মানচিত্র ও মডেল তৈরি
খেলনা ব্লক বা কার্ডবোর্ড দিয়ে একটি ছোট মসজিদ তৈরি করুন। সেখানে মিহরাব, মিম্বর এবং অজু করার জায়গা নির্দিষ্ট করে দেখান। এর মাধ্যমে শিশুরা মসজিদের আদব এবং নামাজের বিভিন্ন নিয়মকানুন বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে খুব সহজে আয়ত্ত করতে পারবে।
১১. খেলনা মাটি দিয়ে আরবি হরফ শেখা
খেলনা কাদা বা মাটি দিয়ে শিশুদের হাত ঘুরিয়ে আরবি হরফ যেমন- আলিফ, বা, তা বানাতে শেখান। এটি একটি চমৎকার স্পর্শভিত্তিক শিখন পদ্ধতি। শিশুরা খেলতে খেলতে খুব সহজেই কঠিন কঠিন আরবি হরফের আকৃতি মনে রাখতে পারে।
১২. সুমধুর ইসলামি নাসিদ বা গজল সেশন
শিশুদের জন্য সুন্দর সুর ও অর্থপূর্ণ ইসলামি নাসিদ বা গজল শুনতে দিন। বাদ্যযন্ত্রহীন এবং সুস্থ সংস্কৃতির এই গানগুলো তারা নিজেরাও গাইতে পারে। সুমধুর সুর শিশুদের মনে খুব দ্রুত প্রভাব ফেলে এবং তারা আনন্দের সাথে আল্লাহর গুণগান গাইতে শেখে।
১৩. নিজস্ব দানপাত্র বা সাদাকাহ বাক্স তৈরি
শিশুকে একটি সুন্দর কাগজের বাক্স বা কৌটো সাজাতে বলুন, যার নাম হবে 'সাদাকাহ বাক্স'। প্রতিদিন শিশুকে কিছু খুচরো কয়েন দিন যাতে সে নিজ হাতে সেই বাক্সে জমা করে। মাস শেষে সেই জমানো টাকা কোনো অসহায় বা গরিব শিশুর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য তাকে সাথে নিয়ে যান। এটি তাদের মনে সহানুভূতি এবং দানশীলতার গুণ গড়ে তুলবে।
১৪. পারিবারিক দোয়া ও মোনাজাত
প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও অন্তত একবার পুরো পরিবার একসাথে বসুন। খুব সহজ বাংলায় এবং আবেগ দিয়ে একে অপরের জন্য দোয়া করুন। সন্তানকে বলতে দিন সে আল্লাহর কাছে কী চায়। যখন শিশু দেখবে তার বাবা-মা আল্লাহর কাছে তার জন্য এবং সবার জন্য প্রার্থনা করছেন, তখন সে দোয়ার শক্তি ও আল্লাহর দয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে।
১৫. ঈদের ঘর সাজানো ও উপহার আদান-প্রদান
ঈদ বা অন্য কোনো খুশির দিনগুলোকে শিশুদের কাছে উৎসবমুখর করে তুলুন। ঘর সাজানো, মেহেদি লাগানো, নিজের হাতে ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড বানিয়ে বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের উপহার দেওয়ার কাজে তাদের সম্পৃক্ত করুন। এর মাধ্যমে শিশুরা নিজেদের ধর্মীয় উৎসবগুলোর প্রতি পরম গর্ব ও গভীর সংযোগ অনুভব করবে।
প্যারেন্টিং টিপস: কীভাবে কোমলভাবে শিশুদের দ্বীন শেখাবেন
- আদর্শ হোন নিজে: শিশুরা যা দেখে তা-ই শেখে। আপনি যদি নিয়মিত নামাজ পড়েন, সত্য কথা বলেন এবং ধৈর্যশীল হন, আপনার শিশুও তা নিজে থেকেই অনুসরণ করবে।
- জোরজবরদস্তি পরিহার করুন: দ্বীন শেখানোর ক্ষেত্রে কখনোই কঠোর বা রুক্ষ হবেন না। ভয় দেখানোর চেয়ে আল্লাহর ভালোবাসা এবং জান্নাতের সৌন্দর্য বর্ণনা করে তাদের উৎসাহিত করুন।
- ছোট সফলতায় প্রশংসা করুন: শিশু যদি একটি নতুন সূরা শেখে বা একটি ভালো কাজ করে, তবে সবার সামনে তার প্রশংসা করুন। এতে তার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যাবে।

