ভূমিকা: রজব মাস ২০২৬ ও এর গুরুত্ব
ইসলামি বর্ষপঞ্জির সপ্তম মাস হলো পবিত্র রজব মাস। এই মাসটি অত্যন্ত সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বছরের যে চারটি মাসকে 'আশহুরুল হুরুম' বা সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন, রজব তার অন্যতম। ২০২৬ সালের ইসলামি দিনপঞ্জিতে রজব মাসের আগমন আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধি এবং ইবাদত-বন্দেগির এক সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাস থেকেই মূলত পবিত্র রমজান মাসের চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করতেন।
পবিত্র কুরআনে সম্মানিত মাসসমূহের বিবরণ
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সম্মানিত চার মাসের কথা উল্লেখ করেছেন। সূরা আত-তাওবাহ-তে এর বিশদ বিবরণ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
অর্থ: "নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও কিতাবে মাসসমূহের সংখ্যা বারোটি, যেদিন তিনি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত; এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম। সুতরাং তোমরা এই মাসগুলোতে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।" (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩৬)
রজব মাসের ফজিলত ও সুন্নাহভিত্তিক আমল
রজব মাস আসার সাথে সাথেই মুমিন মুসলমানরা নফল ইবাদত ও দোয়ার মাধ্যমে নিজেদের আমলনামা সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেন। তবে সমাজে রজব মাস নিয়ে কিছু অতিশয়োক্তি এবং জাল হাদিসও প্রচলিত রয়েছে। ইসলাম আমাদেরকে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষা দেয়। আসুন জেনে নেওয়া যাক এই মাসে একজন মুমিনের করণীয় সুন্নাহভিত্তিক আমলসমূহ:
- রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ: রজব হলো বীজ বপনের মাস, শাবান হলো গাছে পানি দেওয়ার মাস এবং রমজান হলো ফসল কাটার মাস। তাই এই মাস থেকেই আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রস্তুতি শুরু করা উচিত।
- বেশি বেশি ইস্তিগফার করা: বিগত দিনের পাপ মোচন এবং আত্মশুদ্ধির জন্য আল্লাহর দরবারে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তিগফার করতে হবে।
- নফল রোজা পালন: সোমবার, বৃহস্পতিবার এবং আইয়ামে বিয (চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) নফল রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
- নফল সালাত ও কুরআন তিলাওয়াত: প্রতিদিনের ফরজ সালাতসমূহের পাশাপাশি রাতে নফল তাহাজ্জুদ আদায় এবং নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
- দোয়া করা: রজব ও শাবান মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বরকত কামনা করে একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করতেন বলে হাদিসে বর্ণিত আছে।
রজব ও শাবান মাসের বরকতের দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) রজব মাস আসলে নিচের দোয়াটি বেশি বেশি পড়তেন বলে দুর্বল সূত্রে বর্ণিত হলেও মুমিনরা বরকতের আশায় এই দোয়াটি করতে পারেন:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাবা ওয়া শা'বানা, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান।
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন (অর্থাৎ রমজান পাওয়ার তাওফিক দিন)।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৫৯)
রজব মাস নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও কুসংস্কার
আমাদের সমাজে রজব মাসকে কেন্দ্র করে কিছু ভিত্তিহীন আমল ও ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যা সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। ইসলামি শরিয়তের পবিত্রতা রক্ষার্থে এবং বিদআত থেকে বাঁচতে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সজাগ থাকা প্রয়োজন:
- विशेष সালাত (সালাতুর রাগায়েব): রজব মাসের প্রথম জুমার রাতে 'সালাতুর রাগায়েব' নামক বিশেষ নামাজ পড়ার নিয়ম সমাজে প্রচলিত আছে। তবে নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসগণের মতে, এই নামাজের কোনো সহিহ ভিত্তি হাদিসে নেই।
- নির্দিষ্ট ২৬ বা ২৭ রজবের রোজা: মিরাজের রাত মনে করে ২৭ শে রজব সুনির্দিষ্টভাবে রোজা রাখাকে আবশ্যক মনে করা ভুল। নফল রোজা হিসেবে যেকোনো দিন রাখা যায়, তবে ২৭ রজবকে বিশেষভাবে ফজিলতপূর্ণ মনে করে রোজা রাখার কোনো সহিহ দলিল পাওয়া যায় না।
- শবে মেরাজ পালন: শবে মেরাজ বা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঊর্ধ্বগমন একটি সত্য ঘটনা। কিন্তু এই রাতে আনন্দ উৎসব করা বা সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে রাতভর ইবাদত করার কোনো বিশেষ নির্দেশ রাসুল (সা.) বা তাঁর সাহাবিগণ থেকে প্রমাণিত নয়।
উপসংহার: ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি
রজব মাস ২০২৬ আমাদের সামনে ইবাদতের নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে। এই পবিত্র মাসে বাড়াবাড়ি কিংবা অবহেলা কোনোটিই কাম্য নয়। আমাদের উচিত বিদআত বা কুসংস্কারমুক্ত থেকে বিশুদ্ধ সুন্নাহসম্মত উপায়ে আমল করা। রমজানের আগমনী বার্তাকে বুকে ধারণ করে নিজের গুনাহ মাফের জন্য ইস্তিগফার করুন এবং একজন আদর্শ মুসলিম হিসেবে জীবনযাপন করার সংকল্প নিন।

