ভূমিকা: হজরত ইদ্রিস (আঃ)-এর অনন্য মর্যাদা
ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে যে কজন মহান নবী মানবজাতিকে সত্য, সুন্দর ও একত্ববাদের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে হজরত ইদ্রিস (আলাইহিস সালাম) অন্যতম। তিনি ছিলেন আদি পিতা হজরত আদম (আঃ) এবং হজরত শীষ (আঃ)-এর পরবর্তী যুগের একজন অন্যতম মহান রাসূল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রশংসা করে তাঁকে পরম সত্যবাদী ও ধৈর্যশীল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন。 তাঁর জীবনের নানা অলৌকিক ঘটনা এবং জ্ঞানচর্চায় তাঁর অনন্য অবদান কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য এক উজ্জ্বল অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে বিরাজ করবে। বিশেষ করে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে তাঁর ইতিহাস আমাদের কর্মস্পৃহা ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যকে আরও সুদৃঢ় করে তোলে।
পবিত্র কুরআনে হজরত ইদ্রিস (আঃ)-এর উল্লেখ
পবিত্র কুরআনে হজরত ইদ্রিস (আলাইহিস সালাম)-এর নাম অত্যন্ত মর্যাদার সাথে স্মরণ করা হয়েছে। সূরা মারইয়াম-এ আল্লাহ তাআলা তাঁর সুуচ্চ অবস্থান ও সত্যবাদিতা নিয়ে ঘোষণা করেছেন:
উচ্চারণ: ওয়াযকুর ফিল কিতাবি ইদরীসা, ইন্নাহূ কানা সিদ্দীক্বান নাবিয়্যা।
অর্থ: আর এই কিতাবে ইদ্রিসের কথা আলোচনা করুন, তিনি ছিলেন একজন পরম সত্যবাদী নবী। (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৫৬)
উচ্চারণ: ওয়া রাফা’নাহু মাকানান ‘আলিয়্যা।
অর্থ: এবং আমি তাকে উন্নীত করেছিলাম এক উচ্চ মর্যাদায়। (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৫৭)
এছাড়াও সূরা আল-আম্বিয়ায় আল্লাহ তাআলা হজরত ইদ্রিস (আঃ)-এর ধৈর্যের প্রশংসা করে বলেন:
উচ্চারণ: ওয়া ইসমাঈলা ওয়া ইদরীসা ওয়া যাল-কিফলি, ওয়ামিনাশ-শাবিরীন।
অর্থ: এবং স্মরণ করুন ইসমাইল, ইদ্রিস ও যুল-কিফলের কথা; তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল। (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৮৫)
হজরত ইদ্রিস (আঃ)-এর জীবনের অলৌকিক ও ঐতিহাসিক অবদান
ইসলামী রেওয়ায়েত এবং প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে হজরত ইদ্রিস (আলাইহিস সালাম)-এর জীবন থেকে বেশ কিছু চমৎকার ও শিক্ষণীয় অধ্যায় আমাদের সামনে উঠে আসে। তিনি শুধু একজন নবীই ছিলেন না, বরং মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে তাঁর অবদান ছিল যুগান্তকারী।
১. লিখনশিল্প ও জ্ঞানের সূচনা
ইসলামী ঐতিহাসিকদের মতে, হজরত ইদ্রিস (আঃ) ছিলেন মানব ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি, যিনি কলম দিয়ে লেখালেখির সূচনা করেছিলেন। তাঁর পূর্বে মানুষ কেবল মৌখিক ভাষা ও সাংকেতিক চিহ্নের ওপর নির্ভরশীল ছিল। আল্লাহ তাআলা তাঁকে যে সহীফা বা ঐশী বাণীসমূহ প্রদান করেছিলেন, তিনি তা লিপিবদ্ধ করে মানুষের মাঝে প্রচার করেন। এ ছাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গণিতশাস্ত্রেও তিনি অসাধারণ বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। তাঁর এই জীবনবৃত্তান্ত আমাদের শেখায় যে, জ্ঞান অন্বেষণ এবং তা মানুষের কল্যাণের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া ইসলামের অন্যতম মৌলিক মূলনীতি।
২. পোশাক পরিচ্ছদ ও সূচিশিল্পের প্রবর্তন
হজরত ইদ্রিস (আঃ)-এর পূর্বে মানুষ সাধারণত পশুর চামড়া বা অমসৃণ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে শরীর আবৃত করত। তিনি প্রথম কাপড় সেলাই করার শিল্প বা দর্জিবিদ্যার প্রবর্তন করেন। ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, তিনি পেশায় ছিলেন একজন দর্জি। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, তিনি যখনই কাপড়ে সূঁচ ঢুকাতেন এবং বের করতেন, প্রতিটা ফোঁড়ের সাথে সাথে মুখে তাসবীহ পড়তেন: "সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার।" তাঁর এই আমল আমাদের শেখায় কীভাবে কর্মব্যস্ততার মধ্যেও জিহ্বাকে আল্লাহর স্মরণে সিক্ত রাখা যায়।
৩. উচ্চ স্থানে আরোহণ ও মিরাজের রাতে সাক্ষাৎ
সূরা মারইয়ামের ৫৭ নম্বর আয়াতে বর্ণিত "আমি তাকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছিলাম"-এর তাফসীরে আলেমদের একাধিক অভিমত রয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এর অর্থ হলো আল্লাহ তাআলা তাঁকে জীবিত অবস্থায় চতুর্থ আসমানে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিখ্যাত ‘মিরাজ’-এর দীর্ঘ হাদীসে উল্লেখ আছে যে, নবীজী (সাঃ) যখন চতুর্থ আসমানে আরোহণ করেন, তখন সেখানে হজরত ইদ্রিস (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং হজরত ইদ্রিস (আঃ) তাঁকে ভ্রাতৃসুলভ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।
আধুনিক জীবনে হজরত ইদ্রিস (আঃ)-এর জীবন থেকে শিক্ষণীয়
হজরত ইদ্রিস (আঃ)-এর জীবনী কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং এটি বাস্তব জীবনের এক দিকনির্দেশনা। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা তাঁর শিক্ষাগুলো এভাবে প্রয়োগ করতে পারি:
- জ্ঞানের মর্যাদা ও কলম ব্যবহারের দায়িত্ব: বর্তমান ডিজিটাল যুগে যখন কলম ও কী-বোর্ড দিয়ে মুহূর্তেই অনেক কথা ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তখন আমাদের সত্যবাদী হতে হবে। হজরত ইদ্রিস (আঃ) যেমন তাঁর লেখনীকে দ্বীনের প্রসারে ব্যবহার করেছেন, আমাদেরও উচিত আমাদের লেখনীকে ন্যায়ের পথে ব্যবহার করা।
- কাজে বরকত ও জিকির: আমরা যখন কোনো পেশাদার কাজ করব—তা অফিসিয়াল কম্পিউটারে টাইপ করা হোক কিংবা ঘরকন্নার কাজ—তখন কাজের ফাঁকে ফাঁকে জিকিরের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি। এতে কাজে এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও বরকত লাভ হয়।
- ধৈর্য ও সত্যবাদিতা: জীবনে যত কঠিন পরিস্থিতিই আসুক না কেন, আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস রেখে ধৈর্য ধারণ করা এবং সর্বদা সত্যের পক্ষে থাকা সফলতার একমাত্র চাবিকাঠি।
তথ্যসূত্র ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের মতামত
হজরত ইদ্রিস (আঃ)-এর জীবনকাহিনি প্রধানত পবিত্র কুরআন, তাফসীরে ইবনে কাসীর এবং বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য হাদীসগ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। বিশেষ করে সাহাবী ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর তাফসীর এবং ইবনে ইসহাক-এর সীরাত গ্রন্থসমূহে তাঁর জীবনী অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

