পবিত্র কুরআনের ১৭তম সূরা হলো 'সূরা আল-ইসরা' বা 'সূরা বনী ইসরাঈল'। এটি মক্কী যুগের এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ সূরা। এই সূরার প্রথম আয়াতেই মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর এক অলৌকিক ও ঐতিহাসিক ভ্রমণের কথা উল্লেখ করেছেন, যা ইসলামের ইতিহাসে 'ইসরা' ও 'মি'রাজ' নামে সুপরিচিত। ইসরা ও মি'রাজের এই অলৌকিক ঘটনা কেবল একটি সাধারণ ভ্রমণ ছিল না, বরং এটি ছিল ঈমানদারদের বিশ্বাসের পরীক্ষা, আল্লাহর অসীম কুদরতের প্রদর্শন এবং মানবজাতির জন্য অফুরন্ত হেদায়েতের উৎস। নিচে সূরা আল-ইসরা-এর তাফসির এবং মি'রাজের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
সূরা আল-ইসরা-এর প্রথম আয়াত ও অনুবাদ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাযী আসরা বিআবদিহী লাইলাম মিনাল মাসজিদিল হারামি ইলাল মাসজিদিল আক্বসাল্লাযী বারাকনা হাওলাহূ লিনুরিয়াহূ মিন আয়াতিনা, ইন্নাহূ হুওয়াস সামীউল বাসীর।
অর্থ: পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি করেছি বরকতময়, যাতে আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।
ইসরা ও মি'রাজ কী?
তাফসিরবিদগণের মতে, এই অলৌকিক ভ্রমণটি দুটি অংশে বিভক্ত ছিল:
- ইসরা (নৈশ ভ্রমণ): মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদুল আকসা (বায়তুল মাকদিস) পর্যন্ত বুরাক নামক বিশেষ বাহনে রাতের সফরকে 'ইসরা' বলা হয়। এটি কুরআনের অকাট্য আয়াত দ্বারা প্রমাণিত।
- মি'রাজ (ঊর্ধ্বগমন): বায়তুল মাকদিস থেকে সাত আসমান অতিক্রম করে সিদরাতুল মুনতাহা এবং সেখান থেকে আল্লাহর মহান আরশ ও নৈকট্য লাভ পর্যন্ত সফরকে 'মি'রাজ' বলা হয়। এটি সহিহ ও মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
মি'রাজ ও নৈশ ভ্রমণ থেকে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
সূরা আল-ইসরা এবং মি'রাজের ঘটনা থেকে মুসলিম উম্মাহর জন্য রয়েছে গভীর শিক্ষা ও হেদায়েত:
১. আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রতি অবিচল বিশ্বাস
মানুষের বুদ্ধি ও যুক্তির ঊর্ধ্বে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রসূলকে চোখের পলকে এই বিশাল পথ অতিক্রম করিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমস্ত সীমানার ওপরে আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো আল্লাহর কুদরত ও তাঁর বাণীর প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাস স্থাপন করা, যেমনটি করেছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।
২. সালাত বা নামাযের উপহার
মি'রাজের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাত। অন্যান্য সমস্ত বিধান জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে অবতীর্ণ হলেও, সালাতের বিধান আল্লাহ সরাসরি তাঁর প্রিয় নবীকে মেরাজের রাতে দান করেছিলেন। সালাত হলো একজন মুমিনের জন্য আধ্যাত্মিক মেরাজ, যার মাধ্যমে বান্দা প্রতিদিন সরাসরি স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করে।
৩. মসজিদুল আকসার মর্যাদা ও গুরুত্ব
এই সফরে মক্কা থেকে সরাসরি আসমানে না গিয়ে বায়তুল মাকদিস হয়ে যাওয়া এবং সেখানে সমস্ত নবী-রাসূলদের নিয়ে মহানবী (সা.)-এর সালাতে ইমামতি করার ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, মসজিদুল আকসা মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি মুসলিম উম্মাহর প্রথম কিবলা এবং বরকতময় ভূমি।
৪. নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও নবুয়তের ধারা
বায়তুল মাকদিসে সমস্ত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের ইমামতি করার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) হলেন 'সাইয়্যিদুল মুরসালীন' বা সকল নবী-রাসূলদের নেতা এবং তাঁর আনীত ইসলামই পূর্ববর্তী সকল ঐশী ধর্মের পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত রূপ।
সূরা আল-ইসরা-এ বর্ণিত সামাজিক ও নৈতিক নির্দেশনা
সূরা আল-ইসরা শুধু অলৌকিক ভ্রমণের বর্ণনাই নয়, বরং এতে একটি আদর্শ মুসলিম সমাজ বিনির্মাণের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এই সূরায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও পারিবারিক অধিকারের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
- পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার: মহান আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের পরেই পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সাথে নম্র আচরণ করা এবং তাঁদের জন্য দোয়া করার আদেশ রয়েছে।
- আত্মীয়স্বজন ও অভাবীদের অধিকার: সম্পদ কেবল নিজের কাছে কুক্ষিগত না রেখে আত্মীয়, মিসকিন ও মুসাফিরদের হক আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- অপচয় ও কৃপণতার বর্জন: অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একই সাথে অতিরিক্ত কৃপণতা ও অপচয়—উভয়টি পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
- ব্যভিচার ও অন্যায় হত্যাকাণ্ড রোধ: ব্যভিচারের কাছেও না যাওয়ার এবং কোনো প্রাণ অন্যায়ভাবে হত্যা না করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- এতিমের সম্পদ রক্ষা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা: এতিমের সম্পদের হেফাজত করা এবং যেকোনো ওয়াদা বা চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
উপসংহার
সূরা আল-ইসরা আমাদের আল্লাহর অসীম শক্তি ও ক্ষমতার প্রতি ঈমান দৃঢ় করতে শেখায়। একই সাথে এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ঈমানদারদের জন্য সালাত কত বড় নিয়ামত। মেরাজের অলৌকিক ঘটনার পাশাপাশি এই সূরাতে বর্ণিত সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধগুলো ধারণ করার মাধ্যমেই একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই সূরার শিক্ষাগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সূরা আল-ইসরা ও শবে মেরাজ সংক্রান্ত কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
সূরা আল-ইসরা-এর অন্য নাম কী এবং কেন?
মি'রাজ বা নৈশ ভ্রমণ কি সশরীরে হয়েছিল নাকি স্বপ্নে?
মি'রাজের রাতে উম্মতের জন্য কত ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়েছিল?
সূরা আল-ইসরা-এর মূল সামাজিক শিক্ষা কী?
তথ্যসূত্র
- তাফসিরে ইবনে কাসির (সূরা আল-ইসরা-এর তাফসির অংশ)
- তাফসিরে মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি শফী উসমানী রহ.)
- সহিহ বুখারি (কিতাবুল মি'রাজ)

