রমজান ২০২৬ ক্যালেন্ডার: সেহরি, ইফতারের সময়সূচি ও প্রয়োজনীয় দোয়া

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১০ জুন, ২০২৬·৫

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে প্রতি বছর আমাদের মাঝে ফিরে আসে পবিত্র মাহে রমজান। আত্মশুদ্ধি, সংযম ও ইবাদতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য রমজান মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। ২০২৬ সালের (১৪৪৭ হিজরি) পবিত্র রমজান মাসের রোজা পালনের জন্য সঠিক সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি এবং দোয়া জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই নিবন্ধে আমরা রমজান ২০২৬ এর ক্যালেন্ডার, সেহরি ও ইফতারের সময় এবং প্রয়োজনীয় দোয়া ও আমলসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

রমজান ২০২৬ এবং এর তাৎপর্য

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হলো রোজা রাখা। প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ প্রতিজন মুসলিমের জন্য পবিত্র রমজান মাসের রোজা রাখা ফরজ। এই মাসে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক। রমজান আমাদের মাঝে শুধু ক্ষুধার অনুভূতি তৈরি করে না, বরং এটি আমাদের আত্মিক ও নৈতিক পরিশুদ্ধি অর্জনে সহায়তা করে। ২০২৬ সালের রমজান মাসকে কেন্দ্র করে আমাদের নিজেদের আধ্যাত্মিক ও শারীরিক প্রস্তুতি এখন থেকেই শুরু করা উচিত।

রমজান ২০২৬: সেহরি ও ইফতারের সম্ভাব্য সময়সূচি

চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে হিজরি সন গণনা করা হয়। বাংলাদেশে চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম রমজান পালিত হয়েছে। সে অনুযায়ী সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক নির্ধারিত হয়েছে। নিচে ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য একটি সংক্ষিপ্ত নির্দেশক সময়সূচি দেওয়া হলো। মনে রাখবেন, জেলাভেদে এই সময়ের সাথে কয়েক মিনিট যোগ বা বিয়োগ করতে হবে।

  • রমজান ১ম দিন (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার): সেহরির শেষ সময় ভোর ৫:১২ মিনিট, ইফতারের সময় সন্ধ্যা ৫:৫৮ মিনিট।
  • রমজান ১০ম দিন (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, শনিবার): সেহরির শেষ সময় ভোর ৫:০৫ মিনিট, ইফতারের সময় সন্ধ্যা ৬:০২ মিনিট।
  • রমজান ২০তম দিন (১০ মার্চ ২০২৬, মঙ্গলবার): সেহরির শেষ সময় ভোর ৪:৫৭ মিনিট, ইফতারের সময় সন্ধ্যা ৬:০৭ মিনিট।
  • রমজান ৩০তম দিন (১৯ মার্চ ২০২৬, বৃহস্পতিবার): সেহরির শেষ সময় ভোর ৪:৪৯ মিনিট, ইফতারের সময় সন্ধ্যা ৬:১০ মিনিট।

উল্লেখ্য, চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে রমজান মাস ২৯ বা ৩০ দিন হতে পারে। তাই সেহরি ও ইফতারের দৈনিক সঠিক সময় নিশ্চিত করতে স্থানীয় মসজিদের আজান ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যমসমূহ অনুসরণ করা সবচেয়ে নিরাপদ।

সেহরির নিয়ত ও ইফতারের দোয়া

রোজার প্রধান শর্ত হলো নিয়ত করা। নিয়ত মানে মূলত মনের দৃঢ় ইচ্ছা বা সংকল্প। তবে মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত পড়া বাধ্যতামূলক নয়, মন থেকে সংকল্প করলেই নিয়ত হয়ে যায়। তারপরও রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের অনুসরণে অনেকে মুখে নিয়ত পড়তে পছন্দ করেন।

১. সেহরির নিয়ত (আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ)

نَوَيْتُ اَنْ اَصُوْمَ غَدًا مِّنْ شَهْرِ رَمَضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضًا لَّكَ يَا اللهُ فَتَقَبَّلْ مِنِّيْ اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ

উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আসুমা গাদাম মিন শাহরি রামাদ্বানাল মুবারাকি ফারদ্বাল্লাকা ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলিম।

অর্থ: হে আল্লাহ! আগামীকাল পবিত্র রমজান মাসে আপনার পক্ষ থেকে ফরজ করা রোজা রাখার নিয়ত করলাম। অতএব, আপনি আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা।

২. ইফতারের দোয়া

রোজা ভাঙার সময় অর্থাৎ ইফতারের মুহূর্তে দোয়া করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। হাদিসে এসেছে, ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ইফতারের সময় এই দোয়াটি পড়া সুন্নাহসম্মত:

ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ

উচ্চারণ: জাহাবাজ জামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরুকু ওয়া ছাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।

অর্থ: পিপাসা নিবারিত হয়েছে, শিরা-উপশিরা সিক্ত হয়েছে এবং আল্লাহর ইচ্ছায় পুরস্কার ও প্রতিদান নিশ্চিত হয়েছে। (সুনানে আবু دাউদ)

এছাড়াও বহুল প্রচলিত আরেকটি দোয়া পড়া যায়:

اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য রোজা রেখেছি এবং আপনার দেওয়া রিজিক দ্বারাই ইফতার করছি। (আবু দাউদ)

রমজানের তিন দশকের দোয়া

পবিত্র রমজান মাসকে মূলত তিনটি ভাগে বা দশকে ভাগ করা হয়েছে—রহমত (প্রথম ১০ দিন), মাগফিরাত (দ্বিতীয় ১০ দিন) এবং নাজাত (শেষ ১০ দিন)। প্রতিটি দশকের জন্য রয়েছে বিশেষ দোয়া ও আমল।

রহমতের দশকের দোয়া (১-১০ রমজান)

رَّبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ

উচ্চারণ: রাব্বিগফির ওয়ারহাম ওয়া আনতা খাইরুর রাহিমীন।

অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার প্রতি দয়া করুন, আপনিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সূরা মুমিনুন, আয়াত ১১৮)

মাগফিরাতের দশকের দোয়া (১১-২০ রমজান)

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ رَبِّي مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি জাম্বিও ওয়া আতুবু ইলাইহি।

অর্থ: আমি আমার প্রতিপালক আল্লাহর কাছে আমার সকল পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাচ্ছি।

নাজাতের দশকের দোয়া (২১-৩০ রমজান)

اللَّهُمَّ أَجِرْنِي مِنَ النَّارِ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান নার।

অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিন।

এছাড়াও শবে কদর বা লাইলাতুল কদরের রাতে ক্ষমা চাওয়ার জন্য মহানবী (সা.) এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়তে বলেছেন:

اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি।

অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি নিশ্চয়ই ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাকে আপনি ভালোবাসেন। অতএব, আমাকে ক্ষমা করুন। (তিরমিযী)

রমজানে উৎপাদনশীলতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা

রমজান মাস আমাদের অলসভাবে কাটানোর জন্য নয়, বরং এই সময়ে দ্বিগুণ উদ্যমে দুনিয়াবী কাজ ও আখিরাতের ইবাদত করা উচিত। আধুনিক ব্যস্ত জীবনে সঠিক নিয়মে সেহরি ও ইফতার গ্রহণ করা সুস্থতার অন্যতম চাবিকাঠি।

  1. সেহরিতে সুষম খাবার: সেহরিতে আঁশযুক্ত বা ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার যেমন লাল চালের ভাত, ওটস, রুটি, ডাল ও প্রচুর শাকসবজি রাখা উচিত। এগুলো ধীরে ধীরে হজম হয় এবং সারাদিন শরীরে শক্তি বজায় রাখে।
  2. পর্যাপ্ত পানি পান: ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত সময়ে অল্প অল্প করে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন। এটি ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা রোধ করতে সাহায্য করবে।
  3. অতিরিক্ত ভাজাপোড়া বর্জন: ইফতারে অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার, বেগুনি, পেঁয়াজু ইত্যাদি এড়িয়ে চলা ভালো। এর পরিবর্তে খেজুর, তাজা ফলের রস, ডাব এবং দই-চিঁড়ার মতো পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা উচিত যা পাকস্থলীকে ঠান্ডা রাখে।
  4. সময় ব্যবস্থাপনা: দিনের প্রথম ভাগে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করে ফেলুন, যখন এনার্জি লেভেল বেশি থাকে। দুপুরের পর হালকা কাজ করুন এবং শেষ বিকেলে ইবাদত ও জিকিরের জন্য সময় বরাদ্দ রাখুন।
রমজান ২০২৬ বাংলাদেশে কবে শুরু হয়েছিল?
বাংলাদেশে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম রমজানের রোজা শুরু হয়েছিল।
সেহরি শেষ সময় পার হয়ে গেলে রোজা হবে কি?
না, সেহরির শেষ সময় পার হয়ে যাওয়ার পর কোনো কিছু পানাহার করলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে সেহরি গ্রহণ করলে রোজা শুদ্ধ হবে না। রোজার জন্য সুবহে সাদিকের আগেই খাবার গ্রহণ সম্পন্ন করতে হবে।
ইফতারের সময় সবচেয়ে উত্তম খাবার কী?
সুন্নাহ অনুযায়ী ইফতারে খেজুর এবং পানি দিয়ে রোজা ভাঙা সবচেয়ে উত্তম। খেজুর দ্রুত শরীরের গ্লুকোজের ঘাটতি পূরণ করতে সাহায্য করে।
মুখ দিয়ে রোজার নিয়ত করা কি জরুরি?
না, মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করা বাধ্যতামূলক নয়। নিয়ত মূলত মনের সংকল্প। মনে মনে রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ করলেই নিয়ত হয়ে যাবে।
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না