রুকইয়াহ ইন ইসলাম: সুরক্ষা ও শিফা অর্জনের চূড়ান্ত গাইড

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
২ জুল, ২০২৬·৩০

রুকইয়াহ বা শরিয়তসম্মত ঝাড়ফুঁক হলো মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে পবিত্র কুরআনের আয়াত ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো সহিহ দোয়াগুলোর মাধ্যমে যেকোনো শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক অসুস্থতার প্রতিকার চাওয়া। ইসলামে রুকইয়াহ হলো একটি অত্যন্ত বরকতময় ও সুন্নাহভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি। জাদু-টোনা, বদনজর (আল-আইন), জিন-শয়তানের আছর অথবা যেকোনো মানসিক দুশ্চিন্তা ও শারীরিক কষ্টের সময় রুকইয়ার মাধ্যমে মুমিন তার ঈমানকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে এবং আল্লাহর অনন্য সাহায্য লাভ করতে পারে। এই গাইডে আমরা রুকইয়ার গুরুত্ব, কুরআন-হাদিসের দলিল, আমলের সঠিক নিয়ম এবং কিছু সাধারণ ভুল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

রুকইয়াহ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

রুকইয়াহ মূলত আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো ঝাড়ফুঁক বা তিলাওয়াত করা। ইসলামে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ বলতে সেই ঝাড়ফুঁককে বোঝায়, যা সম্পূর্ণ শিরকমুক্ত এবং যেখানে কেবল আল্লাহর পবিত্র কালাম ও সহিহ সুন্নাহর দোয়াগুলো ব্যবহার করা হয়। এটি কোনো কুসংস্কার বা অতিপ্রাকৃতিক ভেলকিবাজি নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত ও আত্মিক শক্তির এক অপূর্ব সমন্বয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই নিজের ওপর এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের ওপর বিভিন্ন অসুস্থতায় রুকইয়াহ করেছেন।

বর্তমান ব্যস্ত ও যান্ত্রিক জীবনে মানুষ যখন তীব্র মানসিক চাপ, ডিপ্রেশন, বিষণ্ণতা কিংবা নেতিবাচক শক্তির প্রভাবে জর্জরিত, তখন রুকইয়াহ অন্তরে এক পরম প্রশান্তি ও নির্ভরতা এনে দেয়। তবে মনে রাখতে হবে, রুকইয়ার মাধ্যমে আরোগ্য লাভের মূল চাবিকাঠি হলো আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাস। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ রোগ থেকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না—এই আকিদা পোষণ করা রুকইয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত।

রুকইয়ার কুরআনিক ও হাদিস ভিত্তি

ইসলামে রুকইয়ার মূল ভিত্তি কুরআনুল কারিম এবং প্রিয় নবীর হাদিস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:

وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ

উচ্চারণ: ওয়া নুনাজ্জিলু মিনাল কুরআনি মা হুয়া শিফাউও ওয়া রাহমাতুল লিলমু’মিনীন।

অর্থ: আর আমি কুরআন অবতীর্ণ করি যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত। (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৮২)

সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবি আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) সূরা ফাতেহা পাঠ করে এক গোত্রপতিকে সাপের বিষ থেকে আরোগ্য করেছিলেন, যা পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহ (সা.) অনুমোদন করেছিলেন এবং একে রুকইয়াহ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এ ছাড়া আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রাতে ঘুমানোর সময় তাঁর পবিত্র দুই হাতে ফুঁ দিয়ে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করে সম্পূর্ণ শরীরে হাত বুলাতেন।

রুকইয়ার সহজ আমলি নিয়ম (সেলফ-রুকইয়াহ)

রুকইয়াহ করার জন্য কোনো বড় তান্ত্রিক বা পীরের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের রুকইয়াহ নিজে করা (সেলফ-রুকইয়াহ) সবচেয়ে বেশি উত্তম ও সুন্নাহসম্মত। নিচে রুকইয়ার সহজ নিয়ম দেওয়া হলো:

  1. পবিত্রতা অর্জন ও নিয়ত ঠিক করা: প্রথমে সুন্দরভাবে ওজু করে পরিচ্ছন্ন স্থানে বসুন। মনে মনে নিয়ত করুন যে আপনি আল্লাহর কালামের মাধ্যমে রোগ থেকে আরোগ্য ও আল্লাহর দয়া কামনা করছেন।
  2. সূরা ফাতেহা পাঠ: রুকইয়ার সবচেয়ে প্রধান হাতিয়ার হলো সূরা ফাতেহা। এই সূরাটিকে সূরাতুশ শিফা বা আরোগ্যের সূরাও বলা হয়। এটি অন্তত ৩ বা ৭ বার পাঠ করুন।
  3. আয়াতুল কুরসি ও শেষ দুই আয়াত: সূরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত (আয়াতুল কুরসি) এবং এই সূরার শেষ দুটি আয়াত (আমানার রাসুলু...) পাঠ করুন।
  4. সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস (মুআওবিযাতাইন): এই তিনটি সূরা ৩ বার করে পাঠ করে নিজের দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরো শরীরে যতটুকু সম্ভব হাত বুলিয়ে নিন।
  5. পানিতে বা তেল ফুঁ দিয়ে ব্যবহার: এই আয়াতগুলো পাঠ করার পর এক গ্লাস পরিষ্কার পানি বা জয়তুনের তেলে ফুঁ দিতে পারেন। এরপর সেই পানি পান করা এবং তেল সারা শরীরে মালিশ করা অত্যন্ত কার্যকর একটি আমল।

রুকইয়ার জন্য কয়েকটি নবীজী (সা.)-এর সহিহ দোয়া

শারীরিক ও মানসিক রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) নিচের দোয়াগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পড়তেন:

১. রোগ মুক্তির নববী দোয়া

أَذْهِبِ الْبَاسَ رَبَّ النَّاسِ وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا

উচ্চারণ: আযহিবিল বা’সা রাব্বান নাসি, ওয়াশফি আন্তাশ শাফী, লা শিফায়া ইল্লা শিফাউকা, শিফায়ান লা ইয়ুগাদিরু সাকামা।

অর্থ: হে মানুষের প্রতিপালক! আপনি রোগ দূর করে দিন এবং আরোগ্য দান করুন। আপনিই আরোগ্য দানকারী, আপনার আরোগ্য ব্যতীত অন্য কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দান করুন যা কোনো ব্যাধিকে অবশিষ্ট রাখে না। (সহিহ বুখারি)

২. জিবরাইল (আ.)-এর রুকইয়ার দোয়া

بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহи আরক্বীকা, মিন কুল্লি শাইয়িন ইয়ু’যীকা, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও ‘আইনি হাসিদিল্লাহু ইয়াশফীকা, বিসমিল্লাহি আরক্বীকা।

অর্থ: আল্লাহর নামে আমি আপনার ওপর রুকইয়াহ করছি—এমন প্রতিটি বিষয় থেকে যা আপনাকে কষ্ট দেয়; প্রতিটি ক্ষতিকর প্রাণ বা হিংসুকের কুদৃষ্টির অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন। আল্লাহর নামে আমি আপনার ওপর রুকইয়াহ করছি। (সহিহ মুসলিম)

রুকইয়াহ করার সময় সাধারণ কিছু ভুল

রুকইয়াহ করার সময় অসচেতনতার কারণে অনেক মুমিন বেশ কিছু ভুল করে বসেন, যা তাদের ঈমান ও আমলকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে:

  • শির্কি তাবিজ ও মন্ত্র ব্যবহার: রুকইয়ার নামে অনেক ভণ্ড কবিরাজ এমন সব তাবিজ, সুতা বা অজ্ঞাত আরবি ও কুফরি হরফ লিখে দেয় যা সরাসরি শিরকের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে এমন ঝাড়ফুঁক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
  • রাকি বা মাধ্যমকে মূল ক্ষমতার অধিকারী ভাবা: অনেক সময় রুকইয়াহকারীকে (রাকি) অনেক বড় ক্ষমতাবান মনে করা হয়, যা ঈমানের পরিপন্থী। রাকি কেবল একটি অসিলা মাত্র, আরোগ্যকারী একমাত্র আল্লাহ।
  • ধৈর্যহারা হওয়া: দুই-একদিন রুকইয়াহ করার পর আশানুরূপ ফল না পেয়ে অনেকেই হতাশ হয়ে কবিরাজি চিকিৎসায় ফিরে যান। রুকইয়াহ হলো ধৈর্য ও ঈমানের পরীক্ষা, তাই আল্লাহর ওপর অবিচল বিশ্বাস রেখে আমল জারি রাখতে হবে।

রুকইয়াহ সংক্রান্ত সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসা (FAQ)

রুকইয়াহ কি শুধুই জাদু বা জিন তাড়ানোর জন্য করা হয়?
না, রুকইয়াহ কেবল জাদু বা জিনের আছর কাটানোর জন্য নয়। এটি যেকোনো শারীরিক রোগ, মানসিক অবসাদ, অনিদ্রা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এবং বদনজরের অনিষ্টতা থেকে আরোগ্য লাভের জন্য একটি সার্বজনীন কুরআনিক ও সুন্নাহসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি।
রুকইয়াহ করার সঠিক বা ফজিলতপূর্ণ সময় কোনটি?
রুকইয়াহ দিনের যেকোনো সময়ই করা যায়। তবে ফজর ও মাগরিবের সালাতের পর, শেষ রাতে তাহাজ্জুদের সময় এবং রাতে ঘুমানোর পূর্বে এই আমলগুলো করা সবচেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ ও ফলপ্রসূ হিসেবে প্রমাণিত।
নিজের রুকইয়াহ কি নিজে করা যায়, নাকি কোনো হুজুর বা রাকি প্রয়োজন?
হ্যাঁ, নিজের রুকইয়াহ নিজে করা সবচেয়ে উত্তম এবং নিরাপদ। রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা নিজের রুকইয়াহ নিজেই করতেন। তবে সমস্যা অত্যন্ত জটিল হলে এবং নিজের একাগ্রতা কম থাকলে কোনো পরহেজগার ও যোগ্য শরিয়াহসম্মত রাকির সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
রুকইয়াহ কি আধুনিক চিকিৎসা বা মেডিসিনের বিকল্প?
না, ইসলাম আধ্যাত্মিক আরোগ্যের পাশাপাশি জাগতিক চিকিৎসা গ্রহণেরও কড়া তাগিদ দেয়। তাই যেকোনো শারীরিক বা মানসিক রোগের ক্ষেত্রে একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করার পাশাপাশি রুকইয়াহকে সহায়ক আমল হিসেবে চালিয়ে নেওয়া উচিত।
রুকইয়ার পানি বা তেল ব্যবহারের নিয়ম কী?
রুকইয়ার আয়াতসমূহ পাঠ করে বিশুদ্ধ পানিতে ও জয়তুনের তেলে ফুঁ দিন। অতঃপর সেই পানি প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় পান করুন এবং তেলটি পুরো শরীরে মালিশ করুন। এটি জাদুটোনা ও বদনজরের বিষাক্ত প্রভাব দূর করতে অত্যন্ত সাহায্য করে।

উপসংহার

রুকইয়াহ কেবল একটি চিকিৎসা নয়, এটি আল্লাহর কালামের জীবন্ত মোজেজা এবং আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ককে মজবুত করার এক অনন্য উপায়। নিয়মিত রুকইয়াহ করে আমাদের ঘরবাড়ি যেমন শয়তানের অনিষ্ট থেকে মুক্ত রাখতে পারি, তেমনি আমাদের মন ও শরীরে ফিরে আসে পরম শান্তি ও সুস্থতা। আসুন, যাবতীয় কুসংস্কার ও শিরক পরিহার করে সুন্নাহর এই আলোকময় পথ আঁকড়ে ধরি এবং যেকোনো মুসিবতে আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা বজায় রাখি।

তথ্যসূত্র

  1. সহিহ আল-বুখারি (চিকিৎসা অধ্যায়)
  2. সহিহ মুসলিম (সালাম ও ঝাড়ফুঁক অধ্যায়)
  3. সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৮২
  4. রিয়াদুস সালিহীন (ইмам নববী রহ.)
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না