হিজর ইসমাইল ইসলামিক ইতিহাসে কাবার পাশে থাকা অত্যন্ত বরকতময় ও পবিত্র একটি স্থান। হিজর ইসমাইল এর অর্থ, ইতিহাস এবং সেখানে ইবাদত ও নামাজ আদায়ের বিধান জানা প্রতিটি মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি মূলত কাবারই অংশ হিসেবে গণ্য হয় এবং আমাদের প্রিয় নবীজির ইবাদতের স্মৃতিবিজড়িত এক পুণ্যময় স্থান।
হিজর ইসমাইল কী ও এর পরিচয়
হিজর ইসমাইল (যা সাধারণ মানুষের কাছে হাতিমে কাবা বা হাতীম নামেও পরিচিত) হলো কাবা শরিফের উত্তর পাশে অবস্থিত একটি অর্ধবৃত্তাকার অংশ। এটি একটি নিচু সাদা দেয়াল দিয়ে কাবার মূল ভবন থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। ইসলামী ঐতিহ্য ও নির্ভরযোগ্য বিশুদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, এই স্থানটি মূলত কাবারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, কিন্তু কুরাইশরা কাবা ঘর পুনর্নির্মাণের সময় আর্থিক সংকটের কারণে এটিকে মূল ভবনের বাইরে রেখে দেয়। তাই এটি এখনো কাবারই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হয়।
হিজর ইসমাইল এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহর নির্দেশে কাবা গৃহ নির্মাণ করেন, তখন তাঁর আদরের পুত্র হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামের আশ্রয়ের জন্য এই বরকতময় স্থানটি কাবার অন্তর্ভুক্ত রেখেছিলেন। পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত লাভের পূর্বে কুরাইশরা যখন কাবা শরিফ পুনর্নির্মাণ করতে যায়, তখন তারা প্রতিজ্ঞা করেছিল যে এই পবিত্র কাজে কোনো হারাম অর্থ স্পর্শ করতে দেবে না। হালাল অর্থের স্বল্পতা বা সংকটের কারণে তারা পুরো কাবা কাঠামোটি তৈরি করতে পারেনি এবং বর্তমানের এই হিজর অংশটিকে মূল দেয়ালের বাইরে রেখে দেয়। তবে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটিকে সর্বদা কাবার অংশ হিসেবেই ঘোষণা করেছেন এবং এর পবিত্রতা রক্ষা করেছেন।
হিজর ইসমাইল এ নামাজ ও ইবাদতের বিধান
হিজর ইসমাইলের ভেতরে নামাজ আদায় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও সওয়াবের কাজ। যেহেতু এটি কাবার ভেতরের অংশ, তাই এখানে নামাজ পড়া মানে সরাসরি কাবার ভেতরে প্রবেশ করে নামাজ পড়ার সমতুল্য। মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা একবার কাবার ভেতরে প্রবেশ করে নামাজ পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে হিজরের ভেতরে নামাজ পড়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, "তুমি হিজরে (হাতিমে) প্রবেশ করে নামাজ আদায় করো, কারণ এটি কাবারই অংশ।"
তবে নামাজের ক্ষেত্রে আলেমদের কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে:
- নফল নামাজ: হিজর ইসমাইলের ভেতরে নফল নামাজ এবং দোয়া আদায় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও সুন্নাহসম্মত। কাবার ভেতরে নফল নামাজ আদায়ের যে সওয়াব, এখানেও ঠিক একই সওয়াব পাওয়া যায়।
- ফরজ নামাজ: বেশির ভাগ ফকিহ ও আলেমের মতে, ফরজ নামাজ সাধারণত কাবা শরিফের বাইরে নির্ধারিত স্থানে আদায় করা উত্তম। হিজরের ভেতরে ফরজ নামাজ আদায় করার ব্যাপারে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
হিজর ইসমাইলের পবিত্র আদব ও সতর্কতা
কাবা শরিফের এই পুণ্যময় অংশে প্রবেশ করার সময় একজন মুমিনকে অত্যন্ত ধীরস্থির ও বিনয়ী হতে হবে। হিজর ইসমাইলে অবস্থানের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব মেনে চলা আবশ্যক:
- পবিত্রতা বজায় রাখা: সম্পূর্ণ পবিত্র ও ওজু অবস্থায় এই পুণ্যময় স্থানে প্রবেশ করা উচিত।
- অন্যকে কষ্ট না দেওয়া: হিজর ইসমাইল একটি ছোট জায়গা হওয়ায় সেখানে সবসময় উপচে পড়া ভিড় থাকে। নামাজ পড়া বা দোয়া করার সময় কখনোই ধাক্কাধাক্কি করা বা অন্য কোনো মুসলিম ভাইকে কষ্ট দেওয়া যাবে না।
- অহেতুক কথা পরিহার করা: সেখানে গিয়ে দুনিয়াবি আলাপচারিতা বা ছবি তুলতে ব্যস্ত না হয়ে পুরোটা সময় ইবাদত, জিকির ও কান্নাকাটিতে মশগুল থাকা উচিত।
FAQ
হিজর ইসমাইল কি কাবার অংশ?
হিজর ইসমাইল এ নামাজ পড়া কি জায়েজ?
কুরাইশরা কেন হিজর ইসমাইলকে আলাদা রেখেছিল?
মহিলাদের জন্য কি হিজর ইসমাইলে নামাজ পড়ার বিশেষ সুন্নাহ রয়েছে?
এখানে ফরজ নামাজ পড়ার বিধান কী?
উপসংহার
হিজর ইসমাইল হলো মহান আল্লাহর অসীম দয়ার অন্যতম এক নিদর্শন। কাবার ভেতরে সাধারণ মানুষের প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব, কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ হাতিম বা হিজর ইসমাইলকে উন্মুক্ত রেখে সাধারণ মুমিনদের জন্য কাবার ভেতরে নামাজ পড়ার অনন্য সুযোগ করে দিয়েছেন। আল্লাহর ঘরের এই বরকতময় অংশে ইবাদত করার তাওফিক পাওয়া প্রতিটি মুসলিমের জন্য জীবনের পরম সৌভাগ্য।
তথ্যসূত্র
- সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং: ১৫৮৪
- সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৩৩৩
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ২০২৮

