ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ এবং মুমিনের চোখের আলো হলো সালাত বা নামাজ। সালাতের প্রতিটি রুকন বা অংশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং আধ্যাত্মিক দিক থেকে অনন্য। সালাতের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন বা ফরজ কাজ হলো রুকু করা। মহান আল্লাহর মহিমা প্রকাশ ও তাঁর সামনে নিজের বিনয় প্রকাশের এক পরম মুহূর্ত হলো এটি। রুকুতে কেবল শারীরিক অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করা যথেষ্ট নয়, বরং এই সময়ে অন্তরের গভীর থেকে আল্লাহর গুণগান ও প্রশংসা করা অপরিহার্য।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা রুকু করো ও সিজদা করো।’ (সূরা হজ, আয়াত: ৭৭)। রুকু করার সময় আমাদের শারীরিক ও মানসিক মনোযোগ যেন শতভাগ মহান রবের দিকে নিবদ্ধ থাকে, সেজন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বেশ কয়েকটি চমৎকার ও অত্যন্ত অর্থপূর্ণ দোয়া পাঠ করতেন। সাধারণ তাসবিহ ছাড়াও হাদিস শরিফে বর্ণিত রুকুর কিছু অত্যন্ত চমৎকার দোয়া নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
১. সাধারণ ও বহুল পঠিত তসবিহ: সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম
রুকুতে যাওয়ার পর আল্লাহর প্রশংসা করার জন্য সবচেয়ে সাধারণ এবং বহু পরিচিত আমল হলো রুকুর এই তসবিহ পাঠ করা। এটি সর্বনিম্ন তিনবার পাঠ করতে হয়, তবে পাঁচ বা সাতবার বা এর বেশি জোড়-বেজোড় সংখ্যায় পাঠ করা উত্তম।
উচ্চারণ: সুবহানা রব্বিয়াল আজিম।
অর্থ: আমি আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতা বর্ণনা করছি। (সুনান আবি দাউদ, হাদিস: ৮৭১)
২. নবীজি (সা.)-এর পঠিত বিশেষ দোয়া (ক্ষমা প্রার্থনা ও প্রশংসা)
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) রুকু এবং সিজদায় এই দোয়াটি খুব বেশি পাঠ করতেন। এটি আল্লাহর প্রশংসার পাশাপাশি অত্যন্ত কার্যকরী একটি ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া।
উচ্চারণ: সুবহানাকাল্লাহুম্মা রাব্বানা ওয়া বিহামদিকা; আল্লাহুম্মাগফিরলি।
অর্থ: হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করছি। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দিন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৬১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮৪)
৩. আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের দোয়া
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) রুকুতে গিয়ে নিজের গোটা সত্ত্বাকে আল্লাহর নিকট সঁপে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত আবেগঘন ও চমৎকার একটি দোয়া পড়তেন। এটি বান্দার বিনয় ও আন্তরিকতাকে বাড়িয়ে দেয়।
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা রাকাআতু, ওয়াবিকা আমানতু, ওয়ালাকা আসলামতু। খাশাআ লাকা সাময়ি, ওয়াবাসারি, ওয়া মুখখি, ওয়া আজমি, ওয়া আসাবি।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার জন্যই রুকু করলাম, আপনার ওপরই ঈমান এনেছি এবং আপনার কাছেই নিজেকে সঁপে দিয়েছি। আপনার নিকট অবনত হয়েছে আমার শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, মজ্জা, অস্থি এবং শিরা-উপশিরা। (সহিহ মুসলিম)
৪. ফেরেশতা ও রূহের প্রতিপালকের পবিত্রতা বর্ণনা
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর রুকু ও সিজদায় এই দোয়াটি প্রায়শই পাঠ করতেন। সৃষ্টিজগতের তাবৎ ফেরেশতা ও রূহের প্রতিপালকের স্তুতি প্রকাশের এটি একটি অনন্য উপায়।
উচ্চারণ: সুব্বুহুন কুদ্ধুসুন রব্বুল মালাইকাতি ওয়ার-রুহ।
অর্থ: তিনি অত্যন্ত পবিত্র ও মহিমান্বিত, ফেরেশতাকুল এবং রূহের প্রতিপালক। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮৭)
রুকু থেকে ওঠার পর পঠিত ফজিলতপূর্ণ দোয়াসমূহ
রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সময় এবং দাঁড়ানোর পর বেশ কিছু চমৎকার দোয়া রয়েছে। এগুলো নামাজের সৌন্দর্য ও মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
১. রুকু থেকে ওঠার তসবিহ:
উচ্চারণ: সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ্।
অর্থ: যে আল্লাহর প্রশংসা করে, আল্লাহ তার প্রশংসা শোনেন।
২. সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ার সাধারণ দোয়া:
উচ্চারণ: রব্বানা ওয়া লাকাল হামদ।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার জন্যই সমস্ত প্রশংসা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৬০)
৩. ফেরেশতাদের সওয়াব লেখার প্রতিযোগিতার বিশেষ দোয়া:
একবার আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর পেছনে সালাত আদায়ের সময় এক সাহাবি রুকু থেকে ওঠার পর এই দোয়াটি পাঠ করেন। সালাত শেষে নবীজি (সা.) জানালেন যে, তিনি তিরিশের বেশি ফেরেশতাকে এই দোয়ার সওয়াব কে আগে লিখবেন, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে দেখেছেন।
উচ্চারণ: হামদান কাছিরান ত্বায়্যিবান মুবারাকান ফিহি।
অর্থ: অগণিত, পবিত্র ও বরকতময় প্রশংসা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৬৩)
রুকুর সঠিক পদ্ধতি ও প্রশান্তির গুরুত্ব
রাসুলুল্লাহ (সা.) রুকু করার সময় তাড়াহুড়ো করাকে সালাতের ত্রুটি বা বড় অপূর্ণতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সঠিক ও বিশুদ্ধ সালাত আদায়ের জন্য রুকুর কিছু সুন্নাহ পদ্ধতি মেনে চলা আবশ্যক:
- রুকুতে গিয়ে পিঠ এমন সোজা ও সমান্তরাল রাখতে হবে যেন পিঠের ওপর পানির বাটি রাখলেও তা পড়ে না যায়।
- দুই হাত দিয়ে দুই হাঁটু শক্তভাবে চেপে ধরতে হবে এবং হাতের আঙুলগুলো ফাঁক করে রাখতে হবে।
- কনুই দুটিকে দুই পাশ থেকে একটু আলাদা রাখতে হবে।
- দৃষ্টি থাকবে সিজদার জায়গার দিকে। মাথা ও পিঠ সমান্তরাল রেখেই রুকু সম্পন্ন করতে হবে।
- রুকুতে ন্যূনতম তাসবিহ আদায়ের মতো সময় স্থির বা শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বা ঝুঁকে থাকা ওয়াজিব। তাড়াহুড়ো করে মাথা নামিয়ে সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়া সালাত নষ্ট করে দিতে পারে।

