যুহদের উপকারিতা মানে শুধু দারিদ্র্য বেছে নেওয়া নয়। ইসলামে যুহদ (দুনিয়াবিমুখতা) হলো দুনিয়াকে হাতে রাখা, কিন্তু হৃদয়ে না বসানো। এই গুণটি মানুষের লোভ, অহংকার, হিংসা ও অস্থিরতা কমায়। তাই জীবন সহজ ও হালকা লাগে, ইবাদত মধুর হয় এবং রিজিক নিয়ে ভয় দূর হয়। এখানে সহজ ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে কীভাবে যুহদ অন্তর পরিষ্কার করে এবং প্রতিদিনের আমলে এটি আনা যায়।
যুহদ কী এবং কেন এটি হৃদয়ের বিষয়
যুহদ মানে দুনিয়া ছেড়ে জঙ্গলে চলে যাওয়া নয়। যুহদ মানে হলো হালাল রিজিক গ্রহণ করা, পরিবারের দেখাশোনা করা, কাজ করা—কিন্তু এগুলোকে আল্লাহর ভালোবাসার চেয়ে বড় না বানানো। সহজ কথায়, পার্থিব সম্পদ আপনার হাতে থাকবে; কিন্তু হৃদয়ের সিংহাসনে থাকবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি।
অনেক মানুষ যুহদ শুনলেই মনে করে, তাহলে কি ভালো খাবার, সুন্দর কাপড় বা আরামদায়ক ঘর রাখা যাবে না? অবশ্যই যাবে, যদি তা হালাল উপায়ে অর্জিত হয় এবং অন্তরে অহংকার না বাড়ে। আসল পরীক্ষা হলো মন কোথায় বাঁধা রয়েছে। সম্পদ হারালে আপনি ভেঙে পড়েন কি না, আর সম্পদ পেলে অন্যকে ছোট ভাবেন কি না—এখানেই হৃদয়ের প্রকৃত অবস্থা ধরা পড়ে।
যুহদের উপকারিতা তাই শুধু বাহ্যিক আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের ভেতরের আত্মিক রোগ দূর করে। এর ফলে অন্তরের লোভ কমে, শুকরিয়া বাড়ে এবং সবর করা সহজ হয়। মানুষ তখন দুনিয়াকে ব্যবহার করে আখিরাতের পাথেয় অর্জনের জন্য, দুনিয়ার দাস হয় না।
কুরআন-সুন্নাহর আলোকে যুহদের গুরুত্ব ও ফজিলত
পবিত্র কুরআন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে দুনিয়ার জীবন অত্যন্ত अस्थায়ী। সূরা আল-আলা-এর ১৬-১৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ দুনিয়ার জীবনকে বেশি প্রাধান্য দেয়, অথচ আখিরাত উত্তম ও চিরস্থায়ী। এই আয়াতটি যুহদের মূল শিক্ষা স্পষ্ট করে দেয়—স্থায়ী নিয়ামতকে রেখে অস্থায়ী জিনিসের পেছনে অন্ধ হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
আবার সূরা আল-হাদীদের ২৩ নম্বর আয়াত আমাদের শেখায়, যা হাতছাড়া হয়েছে তা নিয়ে যেন আমরা অতিরিক্ত ভেঙে না পড়ি এবং যা পেয়েছি তা নিয়ে যেন অহংকার না করি। যুহদ অর্জিত হৃদয়ের অবস্থা এমনই হয়। সে দুঃখ পায়, কিন্তু আল্লাহকে ভুলে যায় না; সে আনন্দিত হয়, কিন্তু নিজেকে বড় মনে করে অহংকার করে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তুমি দুনিয়ায় এমনভাবে থাকো, যেন তুমি একজন অপরিচিত মুসাফির বা পথচারী। এই মহান শিক্ষা সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে। তাই যুহদ হলো জীবনকে ঘৃণা করা নয়; বরং নিজের আসল গন্তব্যের কথা ভুলে না যাওয়া। আর আমাদের আসল গন্তব্য হলো মহান আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া।
যুহদের উপকারিতা: হৃদয় পবিত্র করার ১০টি অনন্য পথ
এখন আমরা মূল আলোচনায় আসি। যুহদ অন্তরে কীভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে? নিচের ১০টি দিক অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। এগুলো পড়ে শুধু তথ্য হিসেবে মাথায় রাখবেন না, বরং নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখুন। অন্তরে কোন আত্মিক রোগটি বেশি আছে—লোভ, অহংকার, হিংসা, নাকি অস্থিরতা?
১. অন্তরের লোভ কমে ও তুষ্টি বাড়ে
যুহদ অন্তরকে শেখায় যে, সবকিছুই পেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দুনিয়ার সবকিছু পাওয়ার প্রয়োজনও নেই। আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন, সেটার মধ্যেই বরকত চাইতে শিখলে মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়। তখন অন্যের বাড়ি, চাকরি, দামি ফোন বা গাড়ি দেখে অন্তরে হিংসার আগুন জ্বলে না।
অতিরিক্ত লোভ মানুষকে ক্লান্ত ও অস্থির করে তোলে। আজ এক জিনিস পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হলে কাল আরেক জিনিসের প্রতি লোভ জন্মায়। কিন্তু যুহদ আমাদের শেখায়—হালাল উপায়ে চেষ্টা করো, তারপর আল্লাহর ফয়সালাতেই সন্তুষ্ট থাকো। এতে রিজিকের দরজা বন্ধ হয় না; বরং অন্তরের প্রশান্তির দুয়ার খুলে যায়।
২. অহংকার ভাঙে
মানুষ যখন নিজের সম্পদ, জ্ঞান, সৌন্দর্য বা পদমর্যাদাকে নিজের কৃতিত্ব মনে করে, তখন অন্তরে অহংকার বাসা বাঁধে। যুহদ এই ভুল ধারণা ভেঙে দেয়। এটি প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় যে, সব কিছুই আল্লাহর দেওয়া আমানত। আজ যা আছে, কাল তা নাও থাকতে পারে।
এই উপলব্ধিটাই মানুষের অন্তরকে নরম ও বিনীত করে। তখন আপনি মানুষের সামনে নিজেকে জাহির বা লোকদেখানো কাজে ব্যস্ত থাকেন না। বরং মনে মনে ভাবেন, আল্লাহ আমাকে যে নিয়ামত দিয়েছেন, সেটার জন্য একদিন হিসাব দিতে হবে। কথাটি ছোট হলেও এর গভীরতা অনেক বেশি।
৩. হিংসা কমে
হিংসার একটি বড় কারণ হলো দুনিয়ার জীবনকে একমাত্র ও শেষ লক্ষ্য মনে করা। অন্যের বেশি সম্পদ বা সুযোগ-সুবিধা দেখলে মনে হয় আমি পিছিয়ে পড়লাম। যুহদ আমাদের এই চিন্তার হিসাব বদলে দেয়। কারণ আসল সাফল্য তো লুকিয়ে আছে ঈমান, হালাল আমল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির মাঝে।
তখন অন্যের নিয়ামত দেখে হিংসা না করে আপনি তার জন্য কল্যাণ কামনা করতে পারেন। মনে মনে বলতে পারেন, আল্লাহ তাকে বরকত দিন এবং আমাকেও হালাল উপায়ে দান করুন। এই উদার মনটিই হলো পবিত্র মন। এতে সামাজিক সম্পর্ক সুন্দর থাকে এবং নিজের মনও হালকা থাকে।
৪. ইবাদতে মন বসে
হৃদয় যখন দুনিয়াবি নানা চিন্তায় মগ্ন থাকে, সালাতে (নামাজে) মন বসানো কঠিন হয়ে পড়ে। সিজদায় গিয়েও মাথায় আসে টাকা-পয়সা, ব্যবসা, কে কী বলল কিংবা কী কেনাকাটা করব। যুহদ অন্তরের এসব অপ্রয়োজনীয় চিন্তার কোলাহল কমিয়ে দেয়। একেবারে বন্ধ না করলেও তা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
যে মানুষ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, সে নামাজে দাঁড়ালে সহজে অনুভব করতে পারে যে সে পরম করুণাময় আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েছে। তাই যুহদের অন্যতম বড় ফল হলো ইবাদতের মিষ্টতা বা স্বাদ লাভ করা। তখন মুখে অপ্রয়োজনীয় কথা কমে যায় এবং ইবাদতে একাগ্রতা বাড়ে।
৫. বিপদে সবর সহজ হয়
যুহদ মানুষকে বাস্তববাদী হতে শেখায়। সে খুব ভালো করেই জানে যে, দুনিয়ার জীবনে সুখ যেমন থাকবে, তেমনি কষ্টও আসবে। তাই কোনো আকস্মিক বিপদ এলে সে হাহাকার করে বলে না যে আমার সব শেষ হয়ে গেল। বরং ভাবে, এই কঠিন পরীক্ষাও আল্লাহর হেকমত ও জ্ঞানের বাইরে নয়।
এমন অন্তরের মানুষ কষ্ট পায় ঠিকই, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে না। দুঃখের আতিশয্যে চোখে পানি আসতে পারে, কিন্তু তার মুখ বা জিহ্বা কখনো আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগে লিপ্ত হয় না। এটাই হলো সবর বা ধৈর্যের সবচেয়ে সুন্দর রূপ।
৬. শোক ও আনন্দে ভারসাম্য আসে
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হাদীদের শিক্ষা এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট। কোনো কিছু হারালে অতিরিক্ত হতাশা প্রকাশ না করা এবং কিছু পেলে অতিরিক্ত আনন্দে মেতে অহংকারী না হওয়া। যুহদ মানুষের মনকে সবসময় একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রাখে। জীবন তখন আবেগহীন ও যান্ত্রিক হয় না; বরং সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।
আজ হয়তো আপনি প্রিয় কোনো বস্তু হারিয়েছেন, কিন্তু কাল আল্লাহ আপনার জন্য আরও উত্তম কোনো দরজা খুলে দিতে পারেন। আবার আজ আপনি কোনো বড় নিয়ামত পেলেন, কাল হয়তো সেটার মাধ্যমে আপনার পরীক্ষা শুরু হতে পারে। এই গভীর বোধ মানুষকে মানসিকভাবে পরিণত করে তোলে।
৭. দান করা সহজ হয়
যে অন্তর দুনিয়ার সম্পদকে খুব শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, তার পক্ষে দান-সদকাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু যুহদ আমাদের শেখায় যে, সমস্ত সম্পদ আসলে আল্লাহর দেওয়া। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করলে সম্পদ কমে না, বরং তাতে বরকত বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
দান করা মানেই যে সবসময় বিপুল পরিমাণ অর্থ দিতে হবে, তা নয়। ক্ষুধার্তকে খাবার কিনে দেওয়া, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে সময় দেওয়া কিংবা মসজিদে সাধ্যমতো সাহায্য করা—এগুলোও এক একটি নেক আমল। যুহদ মানুষের অন্তরকে উদার করে তোলে এবং কৃপণতা দূর করে।
৮. হারাম থেকে বাঁচা সহজ হয়
সমাজ ও জীবনে বহু হারাম কাজের পেছনে থাকে দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত লোভ ও আসক্তি। বেশি বেশি টাকা-পয়সা উপার্জনের লোভ, দ্রুত নাম কামানোর বাসনা কিংবা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যায়। যুহদ অন্তরের এই বাড়তি চাপ কমিয়ে দেয়। তখন মানুষ স্বস্তির সাথে বলে—পরিমাণে কম হলেও আমার হালাল রিজিকই যথেষ্ট।
এটি মানুষের জন্য এক পরম মুক্তি। কারণ হারাম উপার্জন বা কাজ বাহ্যিকভাবে আনন্দদায়ক বা লাভজনক মনে হলেও তা মানুষের আত্মাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলে। যুহদ অন্তরকে মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রহমত হারিয়ে দুনিয়ার কোনো লাভই আসলে লাভ নয়।
৯. মানুষের প্রশংসার নেশা কমে
যুহদ কেবল টাকা-পয়সা বা ধনসম্পদের ব্যাপার নয়। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লাইক-কমেন্ট কিংবা লোকমুখে প্রশংসা শোনার আকাঙ্ক্ষা—এগুলোও দুনিয়ার মোহেরই অংশ। কেউ যদি সবসময় কেবল মানুষকে খুশি করতে ব্যস্ত থাকে, তবে তার অন্তর চিরকাল অস্থিরতায় ভুগবে।
যুহদ আমাদের শেখায়—মানুষের ভালো কথা বা প্রশংসা পেলে বলুন 'আলহামদুলিল্লাহ', আর না পেলেও কোনো আক্ষেপ বা আফসোস নেই। আমার কাজটি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয়েছে কি না, সেটিই সবচেয়ে বড় কথা। এর মাধ্যমে রিয়া বা লোকদেখানোর প্রবণতা দূর হয় এবং মনের নিয়ত খাঁটি হয়।
১০. আখিরাতের চিন্তা জীবন্ত থাকে
যুহদ বা দুনিয়াবিমুখতার সবচেয়ে বড় উপকার হলো আখিরাত বা পরকালের জীবনকে খুব কাছে মনে হওয়া। মৃত্যু তখন কেবল ভয়ের কোনো বিষয় থাকে না, বরং এটিকে জীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে স্মরণ রাখা সহজ হয়। ফলে মানুষ নিজের মূল্যবান সময়, কথাবার্তা, অর্থসম্পদ ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে নতুন ও সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করতে পারে।
আখিরাতের এই চিন্তা মানুষকে হতাশ বা জীবনবিমুখ করে না; বরং অনেক বেশি দায়িত্বশীল করে তোলে। আপনি হাসবেন, হালাল উপায়ে কাজ করবেন, পরিবারকে মন উজাড় করে ভালোবাসবেন—কিন্তু সবসময় মনে রাখবেন যে শেষ হিসাবটি কিন্তু আল্লাহর কাছে দিতে হবে। এই সদা জাগ্রত স্মরণই মানুষের অন্তরকে সবসময় নিষ্কলুষ ও পরিষ্কার রাখে।
যুহদ কি দারিদ্র্য, নাকি হৃদয়ের স্বাধীনতা
অনেকেই যুহদ বা দুনিয়াবিমুখতাকে দারিদ্র্য বা অভাবের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। অথচ একজন দরিদ্র মানুষও মনে মনে দুনিয়ার প্রতি চরম আসক্ত হতে পারে। আবার অনেক সম্পদশালী বা ধনী ব্যক্তিও যুহদের গুণে গুণান্বিত হতে পারেন, যদি তার বিপুল সম্পদ কেবল তার হাতের মুঠোয় থাকে—অন্তর বা হৃদয়ে স্থান না পায়। তাই যুহদের পরিমাপ কখনো ব্যাংকে জমানো সঞ্চয় বা সম্পদের পরিমাণ দিয়ে হয় না, বরং এর পরিমাপ হয় অন্তরের আসক্তি দিয়ে।
আপনি একটি ভালো মানের চাকরি করতে পারেন, বড় ব্যবসা করতে পারেন কিংবা সুন্দর পরিপাটি ঘরেও বসবাস করতে পারেন। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—এই সবকিছু কি আপনাকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অমান্য করতে বাধ্য করছে? এগুলো হারালে কি আপনার ঈমান ও আল্লাহর প্রতি ভরসা নড়ে যায়? এগুলো পেয়ে কি আপনার মনে অহংকার দানা বাঁধে? এই প্রশ্নগুলোর সততাপূর্ণ উত্তরই বলে দেবে আপনার অন্তরে যুহদের অবস্থান কেমন।
ইসলাম আমাদের অলস কিংবা সমাজবিমুখ হতে শেখায় না। বরং হালাল উপার্জন করা, পরিবারের দায়িত্ব পালন করা এবং সমাজের মানুষের উপকার করা—এসবই এক একটি উত্তম নেক আমল হতে পারে। যুহদের মূল কথা হলো, এই সব পার্থিব কাজের ভিড়েও সর্বদা আখিরাত ও পরকালের সাফল্যকে সবার আগে স্থান দেওয়া।
আজ থেকেই যুহদ চর্চার সহজ দৈনন্দিন নিয়ম
যুহদ বা দুনিয়াবিমুখতা অর্জন করা একদিনের কাজ নয়। তবে ছোট ছোট কিছু নিয়ম বা অভ্যাস নিয়মিত পালন করলে অন্তর ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্ন হয়। প্রথমে প্রতিদিন অন্তত একবার নিজেকে প্রশ্ন করুন—আজ আমি দুনিয়ার কোন জিনিসটি নিয়ে অকারণে অতিরিক্ত চিন্তা করেছি? প্রয়োজনে উত্তরটি লিখে রাখুন। এতে নিজের মনের আসক্তির দুর্বল জায়গাগুলো সহজে চিহ্নিত করা যায়।
দ্বিতীয়ত, বাজারে বা অনলাইনে কোনো কিছু কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটু থামুন। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করুন—এটি কি সত্যিই আমার প্রয়োজন, নাকি কেবল লোকদেখানোর জন্য কিনছি? তৃতীয়ত, প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার হলেও সম্পূর্ণ গোপনে কিছু দান করুন। দানের পরিমাণ যত ছোটই হোক না কেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। গোপন দান মানুষের অন্তরকে রিয়া বা লোকদেখানোর রোগ থেকে রক্ষা করে।
চতুর্থত, কবর, মৃত্যু ও আখিরাতের কথা মনে করিয়ে দেয় পবিত্র কুরআনের এমন কিছু আয়াত ও সূরা তিলাওয়াত করুন। যেমন সূরা আত-তাকাসুর, সূরা আল-আলা এবং সূরা আল-হাদীদের কিছু অংশ পড়া হৃদয়ের জন্য অত্যন্ত উপকারী। আর প্রতিদিনের সালাতকে (নামাজ) কেবল একটি যান্ত্রিক অভ্যাস না বানিয়ে আল্লাহর সাথে গভীর সাক্ষাৎ ভাবুন। ইনশাআল্লাহ, যুহদের এই অমূল্য উপকারিতা তখন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা আপনার প্রাত্যহিক জীবনের এক পরম মাধুর্য হয়ে উঠবে।
যুহদ বা দুনিয়াবিমুখতা নিয়ে কিছু সাধারণ ভুল ধারণা
প্রথম ভুল ধারণা হলো—যুহদ মানে দুনিয়ার সব আনন্দ একবারে বর্জন করা। বিষয়টি মোটেও তা নয়। ইসলাম আমাদের পবিত্র ও হালাল আনন্দ উপভোগ করতে নিষেধ করে না। পরিবারের সাথে ভালো মানের খাবার খাওয়া, মার্জিত ও সুন্দর পোশাক পরিধান করা কিংবা শরীর ও মনের ক্লান্তি দূর করতে আরাম করা—এগুলো হালাল উপায়ে হলে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা কেবল তখনই তৈরি হয়, যখন এই আনন্দগুলো আল্লাহর ইবাদত ও স্মরণকে পুরোপুরি আড়াল করে ফেলে।
দ্বিতীয় ভুল ধারণাটি হলো—যুহদ মানে কোনো কাজকর্ম বা দায়িত্ব পালন না করা। এটিও একটি ভুল চিন্তা। আল্লাহ তাআলার সমস্ত নবী-রাসূলগণ নিজে কাজ করেছেন, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সর্বাত্মকভাবে মানুষকে সাহায্য করেছেন। যুহদ মানুষকে কখনো কর্মবিমুখ বা অলস করে না; বরং কাজের নিয়তকে পবিত্র ও নিষ্কলুষ করে দেয়। তখন মানুষের কাজ কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য হয় না, বরং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি ইবাদতে পরিণত হয়।
তৃতীয় ভুল ধারণা হলো—যুহদ কেবল বড় কোনো আলেম, দরবেশ বা বুযুর্গ ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত। আসলে প্রতিটি সাধারণ মুসলিমের জীবনেই যুহদের গুণটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ দুনিয়ার माया ও আকর্ষণ কম-বেশি সবার অন্তরেই আঘাত হানে। তাই আমাদের প্রত্যেককে যার যার অবস্থান থেকে এই গুণের চর্চা করে যেতে হবে।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
যুহদের প্রকৃত উপকারিতা কী?
যুহদ কি গরিব হয়ে থাকার নাম?
যুহদ বা দুনিয়াবিমুখতা কি নামাজে মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে?
যুহদের চর্চা কীভাবে শুরু করব?
যুহদ ও তাওয়াক্কুল কি একই বিষয়?
যুহদের গুণ অন্তরে রেখে কি ভালো চাকরি বা ব্যবসা করা সম্ভব?
শেষ কথা: যুহদের মহৎ গুণ হৃদয়কে আল্লাহমুখী করে
যুহদের প্রকৃত গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে পারলে জীবনকে একেবারে নতুন এক ইতিবাচক কোণ থেকে দেখা যায়। তখন সম্পদকে মানুষের শত্রু নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া একটি পরীক্ষা হিসেবে মনে হয়। সাময়িক সুখ জীবনের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় না, বরং তা আল্লাহর একটি নিয়ামত মনে হয়। আবার যেকোনো কষ্টই জীবনের শেষ পরিণতি নয়, বরং তা সবর বা ধৈর্যের এক মহৎ দুয়ার খুলে দেয়। যুহদ মানুষের অন্তরকে দুনিয়ার অমূলক বোঝা থেকে মুক্ত করে হালকা করে দেয় এবং মনকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে ধাবিত করে।
আসুন আজ থেকেই আমরা ছোট একটি নেক আমল বেছে নিই। হতে পারে অপ্রয়োজনীয় কোনো কেনাকাটা বর্জন করব, কিংবা গোপনে সামান্য কিছু দান করব অথবা সালাতে দাঁড়ানোর আগে অন্তত এক মিনিট নিরব থেকে নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করব। এই ছোট একটি শুরুই হয়তো আমাদের জীবনে বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের দরজা খুলে দিতে পারে, ইনশাআল্লাহ।
সূত্র
- কুরআন, সূরা আল-আলা ৮৭:১৬-১৭
- কুরআন, সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২৩
- কুরআন, সূরা আল-কাসাস ২৮:৭৭
- সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৪১৬
- সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৪৪৬ এবং সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১০৫১
- রিয়াদুস সালেহীন, অধ্যায়: দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব ও যুহদ

