৬৪/৩০. অধ্যায়ঃ

সহীহ বুখারী হাদিস ৪১০০ - খন্দক যুদ্ধে ত্যাগ ও আখিরাতের কল্যাণ

খন্দকের যুদ্ধ। এ যুদ্ধকে আহযাবের যুদ্ধও বলা হয়

৩৬ মুসলিমদের সামরিক তৎপরতা চালানোর ফলে জাজিরাতুল আরবে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। চারিদিকে মুসলিমদের প্রভাব প্রতিপত্তির বিস্তার ঘটে। এ সময় ইয়াহূদীরা তাদের জঘন্য আচরণ, ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসঘাতকতার নানা ধরনের অবমাননা ও অসম্মানের সম্মুখীন হয়। কিন্তু তবু তাদের ‘আকল হয়নি। খায়বারে নির্বাসনের পর ইয়াহূদীরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে, কিন্তু উত্তরোত্তর দূর দুরান্তে ইসলামের জয়জয়কার ছড়িয়ে পড়ার ফলে ইয়াহূদীরা হিংসার জ্বলে পুড়ে ছারখার হতে লাগল।হিজরী পঞ্চম সনের ঘটনা। যেহেতু বনূ নাযীর খায়বারে নির্বাসিত হয়ে নিশ্চুপে বসে ছিল না সেহেতু তারা মুসলিমদের মূলোৎপাটনের জন্য এক সম্মিলিত চেষ্টা চালাবার দৃঢ় সংকল্প করেছিল, যার মধ্যে আরবের সমস্ত গোত্র-উপগোত্রের বীর যোদ্ধা শামিল থাকে।তারা বিশ জন নেতার উপর এই দায়িত্ব অর্পণ করে যে, তারা সমস্ত গোত্রকে আক্রমণের জন্যে উত্তেজিত করবে। এই চেষ্টার ফল এই দাঁড়াল যে, হিজরী পঞ্চম সনের যুলকা‘দাহ মাসে (য়াদুল মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৩৬৭ পৃষ্ঠা) দশ হাজার রক্ত পিপাসু সৈন্য, যাদের মধ্যে মূর্তিপূজক, ইয়াহূদী প্রভৃতি সবাই শামিল ছিল, মদীনার উপর আক্রমণ করে। কুরআর মাজীদে এই যুদ্ধের নাম হচ্ছে আহযাবের যুদ্ধ। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী গোত্রগুলি হল:১। কুরাইশ, বনূ কিনানা, আহলে তিহামা- সেনাপতি সুফইয়ান ইবন হারব।২। বনূ ফাযারা- সেনাপতি উকবা ইবন হুসায়ন।৩। বনূ মুররা- সেনাপতি হারিস ইবন ‘আওফ।৪। বনূ আশজা’ ও আহলি নাজদ- সেনাপতি মাস‘ঊদ ইবন দাখীলা।মুসলিমরা যখন দেখলেন যে, এই সেনাবাহিনীর সাথে মুকাবালা করার শক্তি তাদের নেই তখন তারা শহরের চতুর্দিকে খন্দক খনন করলেন। দশ দশজন লোক চল্লিশ গজ করে খন্দক খনন করেছিলেন। (তবারী, ২য় খণ্ড)মুসলিমদের সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার। ইসলামী সেনাবাহিনী মদীনার ভিতরেই এভাবে অবস্থান করলেন যে, সামনে ছিল খন্দক এবং পিছনে ছিল সালা (য়াদুল মা‘আদ, ৩৬৭ পৃষ্ঠা) পর্বত। আর ইয়াহূদী, বনূ কুরাইযা- যারা মদীনায় বসবাস করত এবং যাদের চুক্তি অনুযায়ী মুসলিমদের সাথে যোগ দেয়া একান্ত যরূরী ছিল- তাদের সাথে রাত্রির অন্ধকারে বনূ নাযীর ইয়াহূদীদের নেতা হুউয়াই ইবন আখতাব মিলিত হলো এবং চুক্তি ভঙ্গ করার জন্যে উত্তেজিত করে নিজের দিকে ডেকে নিলো।রাসূল (ﷺ) তাদেরকে বুঝাবার জন্যে নিজের কয়েকজন দলপতিকে তাদের নিকট বার বার প্রেরণ করলেন। কিন্তু তারা পরিষ্কারভাবে বলে দিল: “মুহাম্মাদ (ﷺ) কে যে, আমরা তাঁর কথা মেনে চলব? তাঁর সাথে আমাদের কোনোই চুক্তি ও অঙ্গীকার নেই। (ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ১৪১ পৃষ্ঠা)এরপর বনূ কুরাইযা শহরের নিরাপত্তা বা য সৃষ্টি করল এবং মুসলিম মহিলা ও শিশুদেরকে বিপদে ফেলে দিল। সুতরাং বাধ্য হয়ে তিন হাজার মুসলিম সৈন্যের মধ্য হতেও একটি অংশকে শহরের সাধারণ নিরাপত্তা রক্ষার জন্যে পৃথক করতে হলো। বনূ কুরাইযা মনে করেছিল যে, যখন বাহির হতে শত্রু পক্ষের দশ হাজার বীর যোদ্ধার আক্রমণ সংঘটিত হবে এবং তারা শহরের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা ছড়িয়ে দিয়ে মুসলিমদের নিরাপত্তা নষ্ট করে দিবে তখন দুনিয়ায় মুসলিমদের নাম নিশানাও বাকী থাকবে না।নবী (ﷺ) যেহেতু স্বভাবিক যুদ্ধকে ঘৃণার চোখে দেখতেন, সেহেতু তিনি সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন যে, উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ প্রদানের শর্তে আক্রমণমুখী গাতফান নেতৃবর্গের সাথে সন্ধি করে নেয়া হোক। কিন্তু আনসার দল যুদ্ধকেই প্রাধান্য দিলেন। সা‘দ ইবন মু‘আয (রাঃ) এবং সা‘দ ইবন উবাদা (রাঃ) এই প্রস্তাব সম্পর্কে ভাষণ দিতে দিয়ে বলেন: “যে সময় এই আক্রমণমুখী গোত্রগুলো শিরকের পঙ্কিল ও মূর্তি পূজার মধ্যে নিমজ্জিত ছিল ঐ সময়েও আমরা তাদেরকে একটা ছড়া পর্যন্ত প্রদান করিনি। আর আজ যখন মহান আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় দান করেছেন তখন কী করে আমরা তাদেরকে আমাদের উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ প্রদান করতে পারি? তাদের জন্যে আমাদের কাছে তরবারি ছাড়া কিছুই নেই।” আক্রমণকারী সৈন্যদের অবরোধ এক মাস বা এক মাসের কাছাকাছি পর্যন্ত ছিল। মাঝে মাঝে দু’একটি খণ্ডযুদ্ধও সংঘটিত হয়। ‘আমর ইবন আবদে ওদ, যে নিজেকে এক হাজার বীর পুরুষের সমান মনে করত, আল্লাহর সিংহ, আলীর (রাঃ) হাতে নিহত হয়।মূসা ইবন ‘উকবা (রহঃ) বর্ণনা করেছেন যে, এ যুদ্ধ ৪র্থ হিজরী সনের শাওয়াল মাসে হয়েছিল।"

খন্দকের যুদ্ধ: ত্যাগ, ক্ষুধা ও আখিরাতের কল্যাণের শিক্ষা

সহীহ বুখারীহাদিস নম্বর ৪১০০

أَبُوْ مَعْمَرٍ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ عَنْ عَبْدِ الْعَزِيْزِ عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ جَعَلَ الْمُهَاجِرُوْنَ وَالأَنْصَارُ يَحْفِرُوْنَ الْخَنْدَقَ حَوْلَ الْمَدِيْنَةِ وَيَنْقُلُوْنَ التُّرَابَ عَلَى مُتُوْنِهِمْ وَهُمْ يَقُوْلُوْنَ:نَحْنُ الَّذِيْنَ بَايَـعُوْا مُحَـمّـَدَا عَـلَى الإِسْـلَامِ مَـا بـَقِيْنَا أَبَـدَا.قَالَ يَقُوْلُ النَّبِيُّ ﷺ وَهُوَ يُجِيْبُهُمْ اللهُمَّ إِنَّهُ لَا خَيْرَ إِلَّا خَيْرُ الْآخِرَهْ فَبَارِكْ فِي الْأَنْصَارِ وَالْمُهَاجِرَهْ قَالَ يُؤْتَوْنَ بِمِلْءِ كَفِّيْ مِنْ الشَّعِيْرِ فَيُصْنَعُ لَهُمْ بِإِهَالَةٍ سَنِخَةٍ تُوْضَعُ بَيْنَ يَدَيْ الْقَوْمِ وَالْقَوْمُ جِيَاعٌ وَهِيَ بَشِعَةٌ فِي الْحَلْقِ وَلَهَا رِيْحٌ مُنْتِن

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

আনসার ও মুহাজিরগণ মদীনার চারপাশে খাল খনন করছিলেন আর পিঠে মাটি বহন করছিলেন। আর (খুশিতে) আবৃত্তি করছিলেন- “আমরা সে সব লোক, যারা মুহাম্মদ (ﷺ)-এর হাতে বাই‘আত গ্রহণ করেছি, যতদিন আমরা জীবিত থাকি ইসলামের উপর।” বর্ণনাকারী বলেন, নবী (ﷺ) তাঁদের এ কথার উত্তরে বলতেন, হে আল্লাহ! আখিরাতের কল্যাণ ব্যতীত আর কোন কল্যাণ নেই, তাই আনসার ও মুহাজিরদের কাজে বারাকাত দান করুন। বর্ণনাকারী [আনাস (রাঃ)] বর্ণনা করছেন যে, তাঁদেরকে এক মুষ্টি ভরে যব দেয়া হত। তা বাসি, স্বাদবিকৃত চর্বিতে মিশিয়ে খাবার রান্না করে ক্ষুধার্ত লোকগুলোর সামনে পরিবেশন করা হত। যদিও এ খাদ্য ছিল একেবারে স্বাদহীন ও ভীষণ দুর্গন্ধময়।

সহীহ বুখারী হাদিস ৪১০০-এর সারসংক্ষেপ

এই হাদিসে খন্দকের যুদ্ধের কঠিন সময়ের একটি জীবন্ত ছবি এসেছে। আনসার ও মুহাজিরগণ মদিনার চারপাশে খাল খনন করছিলেন এবং নিজেদের পিঠে মাটি বহন করছিলেন। তারা ইসলামের উপর অটল থাকার কথা আবৃত্তি করছিলেন। নবী صلى الله عليه وسلم তাঁদের কথার জবাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন যে, আসল কল্যাণ আখিরাতের কল্যাণ, আর আনসার ও মুহাজিরদের কাজে বরকত দান করুন। এখানে খন্দকের যুদ্ধ, সাহাবীদের ত্যাগ, ক্ষুধা ও ধৈর্যের শিক্ষা স্পষ্ট। খাবার ছিল সামান্য, স্বাদহীন ও দুর্গন্ধযুক্ত; তবু তাঁরা কাজ থামাননি। এই বর্ণনা আমাদের শেখায়, দ্বীনের কাজে কষ্ট এলেও হৃদয় আখিরাতমুখী রাখা দরকার।

এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা

  • দ্বীনের কাজে কষ্ট এলে ধৈর্য ও একতা ধরে রাখা উচিত।
  • আসল কল্যাণ আখিরাতের কল্যাণ—এই ভাবনা মুমিনকে শক্তি দেয়।
  • সাহাবীরা ক্ষুধা ও কষ্টের মধ্যেও ইসলামের কাজে অটল ছিলেন।
  • নেক কাজে বরকতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা গুরুত্বপূর্ণ।

সেটিংস

ভাষা

ফন্ট সেটিংস

আরবি ফন্ট ফেস

আরবি ফন্ট সাইজ

২৪

অনুবাদ ফন্ট সাইজ

১৮

রিডিং লেআউট

আল হাদিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন

App Banner

ইসলামের জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হোন

আপনার নিয়মিত সহায়তা আমাদের দ্বীনি ভাই-বোনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সাহয্য করবে। আমাদের মিশনে আপনিও অংশ নিন এবং বড় পরিবর্তনের অংশীদার হোন।

সাপোর্ট করুন