৬৪/৩০. অধ্যায়ঃ
সহীহ বুখারী হাদিস ৪১১৪ - আল্লাহ একাই আহযাবকে পরাজিত করেছেন
খন্দকের যুদ্ধ। এ যুদ্ধকে আহযাবের যুদ্ধও বলা হয়
৩৬ মুসলিমদের সামরিক তৎপরতা চালানোর ফলে জাজিরাতুল আরবে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। চারিদিকে মুসলিমদের প্রভাব প্রতিপত্তির বিস্তার ঘটে। এ সময় ইয়াহূদীরা তাদের জঘন্য আচরণ, ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসঘাতকতার নানা ধরনের অবমাননা ও অসম্মানের সম্মুখীন হয়। কিন্তু তবু তাদের ‘আকল হয়নি। খায়বারে নির্বাসনের পর ইয়াহূদীরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে, কিন্তু উত্তরোত্তর দূর দুরান্তে ইসলামের জয়জয়কার ছড়িয়ে পড়ার ফলে ইয়াহূদীরা হিংসার জ্বলে পুড়ে ছারখার হতে লাগল।হিজরী পঞ্চম সনের ঘটনা। যেহেতু বনূ নাযীর খায়বারে নির্বাসিত হয়ে নিশ্চুপে বসে ছিল না সেহেতু তারা মুসলিমদের মূলোৎপাটনের জন্য এক সম্মিলিত চেষ্টা চালাবার দৃঢ় সংকল্প করেছিল, যার মধ্যে আরবের সমস্ত গোত্র-উপগোত্রের বীর যোদ্ধা শামিল থাকে।তারা বিশ জন নেতার উপর এই দায়িত্ব অর্পণ করে যে, তারা সমস্ত গোত্রকে আক্রমণের জন্যে উত্তেজিত করবে। এই চেষ্টার ফল এই দাঁড়াল যে, হিজরী পঞ্চম সনের যুলকা‘দাহ মাসে (য়াদুল মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৩৬৭ পৃষ্ঠা) দশ হাজার রক্ত পিপাসু সৈন্য, যাদের মধ্যে মূর্তিপূজক, ইয়াহূদী প্রভৃতি সবাই শামিল ছিল, মদীনার উপর আক্রমণ করে। কুরআর মাজীদে এই যুদ্ধের নাম হচ্ছে আহযাবের যুদ্ধ। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী গোত্রগুলি হল:১। কুরাইশ, বনূ কিনানা, আহলে তিহামা- সেনাপতি সুফইয়ান ইবন হারব।২। বনূ ফাযারা- সেনাপতি উকবা ইবন হুসায়ন।৩। বনূ মুররা- সেনাপতি হারিস ইবন ‘আওফ।৪। বনূ আশজা’ ও আহলি নাজদ- সেনাপতি মাস‘ঊদ ইবন দাখীলা।মুসলিমরা যখন দেখলেন যে, এই সেনাবাহিনীর সাথে মুকাবালা করার শক্তি তাদের নেই তখন তারা শহরের চতুর্দিকে খন্দক খনন করলেন। দশ দশজন লোক চল্লিশ গজ করে খন্দক খনন করেছিলেন। (তবারী, ২য় খণ্ড)মুসলিমদের সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার। ইসলামী সেনাবাহিনী মদীনার ভিতরেই এভাবে অবস্থান করলেন যে, সামনে ছিল খন্দক এবং পিছনে ছিল সালা (য়াদুল মা‘আদ, ৩৬৭ পৃষ্ঠা) পর্বত। আর ইয়াহূদী, বনূ কুরাইযা- যারা মদীনায় বসবাস করত এবং যাদের চুক্তি অনুযায়ী মুসলিমদের সাথে যোগ দেয়া একান্ত যরূরী ছিল- তাদের সাথে রাত্রির অন্ধকারে বনূ নাযীর ইয়াহূদীদের নেতা হুউয়াই ইবন আখতাব মিলিত হলো এবং চুক্তি ভঙ্গ করার জন্যে উত্তেজিত করে নিজের দিকে ডেকে নিলো।রাসূল (ﷺ) তাদেরকে বুঝাবার জন্যে নিজের কয়েকজন দলপতিকে তাদের নিকট বার বার প্রেরণ করলেন। কিন্তু তারা পরিষ্কারভাবে বলে দিল: “মুহাম্মাদ (ﷺ) কে যে, আমরা তাঁর কথা মেনে চলব? তাঁর সাথে আমাদের কোনোই চুক্তি ও অঙ্গীকার নেই। (ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ১৪১ পৃষ্ঠা)এরপর বনূ কুরাইযা শহরের নিরাপত্তা বা য সৃষ্টি করল এবং মুসলিম মহিলা ও শিশুদেরকে বিপদে ফেলে দিল। সুতরাং বাধ্য হয়ে তিন হাজার মুসলিম সৈন্যের মধ্য হতেও একটি অংশকে শহরের সাধারণ নিরাপত্তা রক্ষার জন্যে পৃথক করতে হলো। বনূ কুরাইযা মনে করেছিল যে, যখন বাহির হতে শত্রু পক্ষের দশ হাজার বীর যোদ্ধার আক্রমণ সংঘটিত হবে এবং তারা শহরের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা ছড়িয়ে দিয়ে মুসলিমদের নিরাপত্তা নষ্ট করে দিবে তখন দুনিয়ায় মুসলিমদের নাম নিশানাও বাকী থাকবে না।নবী (ﷺ) যেহেতু স্বভাবিক যুদ্ধকে ঘৃণার চোখে দেখতেন, সেহেতু তিনি সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন যে, উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ প্রদানের শর্তে আক্রমণমুখী গাতফান নেতৃবর্গের সাথে সন্ধি করে নেয়া হোক। কিন্তু আনসার দল যুদ্ধকেই প্রাধান্য দিলেন। সা‘দ ইবন মু‘আয (রাঃ) এবং সা‘দ ইবন উবাদা (রাঃ) এই প্রস্তাব সম্পর্কে ভাষণ দিতে দিয়ে বলেন: “যে সময় এই আক্রমণমুখী গোত্রগুলো শিরকের পঙ্কিল ও মূর্তি পূজার মধ্যে নিমজ্জিত ছিল ঐ সময়েও আমরা তাদেরকে একটা ছড়া পর্যন্ত প্রদান করিনি। আর আজ যখন মহান আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় দান করেছেন তখন কী করে আমরা তাদেরকে আমাদের উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ প্রদান করতে পারি? তাদের জন্যে আমাদের কাছে তরবারি ছাড়া কিছুই নেই।” আক্রমণকারী সৈন্যদের অবরোধ এক মাস বা এক মাসের কাছাকাছি পর্যন্ত ছিল। মাঝে মাঝে দু’একটি খণ্ডযুদ্ধও সংঘটিত হয়। ‘আমর ইবন আবদে ওদ, যে নিজেকে এক হাজার বীর পুরুষের সমান মনে করত, আল্লাহর সিংহ, আলীর (রাঃ) হাতে নিহত হয়।মূসা ইবন ‘উকবা (রহঃ) বর্ণনা করেছেন যে, এ যুদ্ধ ৪র্থ হিজরী সনের শাওয়াল মাসে হয়েছিল।"
তাওহীদ ও বিজয়: আল্লাহ একাই সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেছেন
সহীহ বুখারী : ৪১১৪
সহীহ বুখারীহাদিস নম্বর ৪১১৪
قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيْدٍ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ عَنْ سَعِيْدِ بْنِ أَبِيْ سَعِيْدٍ عَنْ أَبِيْهِ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ كَانَ يَقُوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ أَعَزَّ جُنْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَغَلَبَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ فَلَا شَيْءَ بَعْدَهُ
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (খন্দকের যুদ্ধের সময়) বলতেন, এক আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার অর্থে কোন ইলাহ নেই। তিনিই তাঁর বাহিনীকে মর্যাদাবান করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই সম্মিলিত বাহিনীকে পরাভূত করেছেন। এরপর শত্রু ভয় বলতে কিছুই থাকল না।
সহীহ বুখারী হাদিস ৪১১৪-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم-এর একটি শক্তিশালী তাওহীদভিত্তিক ঘোষণা এসেছে। তিনি বলতেন, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই। তিনিই তাঁর বাহিনীকে সম্মান দিয়েছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই সম্মিলিত বাহিনীকে পরাভূত করেছেন। হাদিসে বিজয়ের কৃতিত্ব মানুষের শক্তি বা কৌশলের দিকে নয়, সরাসরি আল্লাহর সাহায্যের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। খন্দকের যুদ্ধ ও আহযাব যুদ্ধের প্রসঙ্গে এই দোয়া বা জিকির মুসলিমকে শেখায়, সাফল্যের পর অহংকার নয়; বরং তাওহীদ, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর সাহায্য স্বীকার করা দরকার। এখানে শত্রুভয় দূর হওয়ার কথাও এসেছে, তবে সব কিছুর কেন্দ্রে আছে এক আল্লাহর ক্ষমতা।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- বিজয়ের কৃতিত্ব আল্লাহর সাহায্যের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।
- তাওহীদ মুমিনের ভাষা ও মনোভাবের কেন্দ্রে থাকে।
- আল্লাহ তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেন—হাদিসে এ কথা সরাসরি এসেছে।
- সাফল্যের পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ।
