৬৪/৩৯. অধ্যায়ঃ

সহীহ বুখারী হাদিস ৪২০৩ - বাহ্যিক আমল ও শেষ পরিণতির শিক্ষা

খাইবারের যুদ্ধ

৪৭ সপ্তম হিজরী, মুহাররম মাস। খাইবার ছিল সিরিয়া প্রান্তরে এক বিশাল শ্যামল ভূখণ্ডের নাম। এটা মদীনা হতে তিন মঞ্জিলের (প্রায় এক শ’ মাইল) পথ। ক্ষুদ্র বৃহৎ বহু দুর্গ দ্বারা এই স্থানটি সুরক্ষিত ছিল। মদীনার বনূ কাইনুকা ও বনূ নাযীর গোত্রের ইয়াহূদীরা এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। নবী (ﷺ)-এর হুদাইবিয়ার সফর হতে ফিরে আসা অল্প দিন মাত্র (এক মাসেরও কম) গত হয়েছে।এমন সময় শোনা গেল যে, খাইবারের ইয়াহূদীরা মদীনার উপর আক্রমণ চালাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে- (তবকাতে কাবীর, ইবন সা‘দ, ৭ পৃষ্ঠা)। তারা আহযাবের যুদ্ধে অকৃতকার্যতার প্রতিশোধ গ্রহণ এবং নিজেদের হারানো সামরিক মর্যাদা ও শক্তিকে গোটা রাজ্যে পুনর্বহাল করার জন্য এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।তারা বনূ গাতফান গোত্রের চার হাজার জঙ্গী বীর পুরুষকেও নিজেদের সাথে যুক্ত করে নিয়েছে। তারা এ চুক্তি করেছে যে, যদি মদীনা বিজিত হয় তাহলে খাইবারের উৎপাদিত শস্যের অর্ধাংশ তারা বনূ গাতফানকে চিরস্থায়ীভাবে দিতে থাকবে।ইতোপূর্বে আহযাবের যুদ্ধে মুসলিমদেরকে খাইবারের দুর্গ অবরোধ করতে যে কঠিন বেগ পেতে হয়েছিল তা তারা ভুলেনি। সুতরাং সবাই এ ব্যাপারে এক মত হলেন যে, এই আক্রমণোদ্যত শত্রুদেরকে সামনে অগ্রসর হয়ে প্রতিরোধ করতে হবে।নবী (ﷺ) শুধু মাত্র ঐ সাহাবীদেরকে এই যুদ্ধে গমনের অনুমতি দান করেছিলেন যাদেরকে শুভ সংবাদ দিতে গিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করেন: لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ (১৮ : (سورة الفتح“আল্লাহ অবশ্যই মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নীচে তোমার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেছে, তাদের অন্তরে যা আছে আল্লাহ তা জানেন।” (সূরা ফাতহ ৪৮/১৮)আর যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (২০ : وَعَدَكُمُ اللَّهُ مَغَانِمَ كَثِيرَةً تَأْخُذُونَهَا (سورة الفتح“আল্লাহ তোমাদের সাথে বড় বড় বিজয়ের ও গানীমাতের ওয়াদা করেছেন যা তোমরা লাভ করবে।” (সূরা ফাতহ ৪৮/২০)তারা সংখ্যায় চৌদ্দ‘শ জন ছিলেন। তাদের মধ্যে দু’শজন ছিলেন অশ্বারোহী।সেনাবাহিনীর সম্মুখ ভাগের নেতা বা সেনাপতি ছিলেন উকাশা ইবন মুহসিন আসাদী (রাঃ) [উকাশা ইবন মুহসিন (রাঃ) মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবীদের অন্যতম ছিলেন। তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সুসংবাদ দান করেছিলেন যে, তিনি বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবেন। বদর, উহুদ, খন্দক এবং অন্যান্য যুদ্ধে তিনি হাজির হন। সিদ্দীকে আকবার (রাঃ)-এর খিলাফাত কালে ৪৫ বছর বয়সে তিনি শহীদ হন।]।ডান দিকের সেনাবাহিনীর সরদার ছিলেন ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)— (মাদারিজুন নুবুওয়াহ, ২৯০ পৃষ্ঠা।) বাম দিকের সেনাবাহিনীর নেতা অন্য একজন সাহাবী (রাঃ) ছিলেন। বিশজন মহিলাও (রাদিয়াল্লাহু আনহুন্না) সেনাবাহিনীর মধ্যে ছিলেন যারা রুগ্ন ও আহতদের দেখাশুনা ও সেবা শুশ্রূষা করার জন্য সাথে এসেছিলেন।ইসলামের সেনাবাহিনী রাত্রিকালে খাইবারের বসতি সংলগ্ন জায়গায় পৌঁছে গেল। কিন্তু নবী (ﷺ)-এর কল্যাণময় অভ্যাস এই ছিল যে, তিনি রাত্রে যুদ্ধ শুরু করতেন না- [বুখারী, আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত]। এজন্যে ইসলামের সেনাবাহিনী ময়দানে শিবির স্থাপন করে। যুদ্ধের জন্য এ স্থানটি যুদ্ধ অভিজ্ঞ ব্যক্তি হাব্বাব ইবনুল মুনযির (রাঃ) নির্বাচন করেছিলেন। এ জায়গাটি খাইবারবাসী ও বনূ গাতফান গোত্রের মধ্যস্থলে ছিল। এই কৌশল অবলম্বনের উপকার এই ছিল যে, বনূ গাতফান গোত্র যখন খাইবারের ইয়াহূদীদের সাহায্যের জন্য বের হয় তখন তারা ইসলামের সেনাবাহিনীকে প্রতিবন্ধকরূপে পায়। এ কারণে তারা চুপচাপ নিজেদের বাড়ীতে ফিরে যায়।রাসূল (ﷺ) হুকুম দেন যে, সেনাবাহিনীর বড় ক্যাম্প এখানেই থাকবে এবং আক্রমণমুখী সৈন্যদের দল এই ক্যাম্প থেকে যেতে থাকবে। সৈন্যদের মাঝে তৎক্ষণাৎ মসজিদ নির্মাণ করে নেয়া হয়। আর যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে ইসলামের তাবলীগের ধারাও জারী রাখা হয়।‘উসমান (রাঃ) ঐ ক্যাম্পের প্রধান দায়িত্বশীল নির্বাচিত হন।খাইবারের জন বসতির ডানে-বামে যে দুর্গ অবস্থিত ছিল ঐগুলি সংখ্যায় ছিল দশটি। ঐ দুর্গগুলোর মধ্যে দশ হাজার করে বীর যোদ্ধা অবস্থান করত।খাইবারের জনবসতি ডানে ও বামে দু’টি ভাগে বিভক্ত ছিল। একভাগে ছিল নিতান্ত দুর্গ নামে পরিচিত চারটি দুর্গ- (১) না‘য়িম (২) নিতাত (৩) সা‘আব ইবন মু‘আয (৪) কিল্লা‘আতুয যুবাইর এবং শান্না দুর্গ নামে পরিচিত তিনটি দুর্গ- (১) শান্না (২) বার (৩) উবাই। অপর পাশে ছিল আরও তিনটি দুর্গ যা কুতাইবা দুর্গ নামে পরিচিত ছিল। তা হচ্ছে- (১) কামূস তাবারী (২) অতীহ (৩) সালিম বা নাবউইন হাকীক।মাহমূদ ইবন মাসলামা (রাঃ) পাঁচ দিন পর্যন্ত ক্রমাগত আক্রমণ চালাতে থাকেন। কিন্তু দুর্গ বিজিত হলো না। পঞ্চম বা ষষ্ঠ দিনের বর্ণনা এই যে, মাহমূদ (রাঃ) যুদ্ধ ক্ষেত্রের গরমের প্রখরতায় ক্লান্ত হয়ে দুর্গ প্রাচীরের ছায়ায় কিছু সময় বিশ্রাম গ্রহণের জন্য শুয়ে পড়েন। ইত্যবসরে কিনানা ইবন হাকীক নামক এক ইয়াহূদী তাকে গাফেল দেখে তার মাথায় এক পাথর মেরে দেয়। এতেই তিনি শহীদ হয়ে যান।সেনাবাহিনীর পতাকা মাহমূদ ইবন মাসলামা (রাঃ)-এর ভাই মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রাঃ) ধারণ করেন এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে থাকেন। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রাঃ) এই মত প্রদান করেন যে, ইয়াহূদীদের খেজুর বাগানের খেজুর গাছগুলি কেটে ফেলা হোক। কেননা, তাদের নিকট এক একটি খেজুর গাছ এক একটি ছেলের মতই প্রিয়। এই কৌশল অবলম্বন করলে দুর্গবাসীর উপর প্রভাব ফেলা যাবে। এই কৌশলের উপর কাজ শুরু হয়েই গিয়েছিল।এমন সময় আবূ বকর (রাঃ) নবী (ﷺ)-এর খিদমতে হাজির হয়ে আরয করলেন: “এ এলাকা নিশ্চিতরূপে মুসলিমদের হাতে বিজিত হতে যাচ্ছে। সুতরাং আমরা এটাকে নিজেদের হাত নষ্ট করব কেন? রাসূল (ﷺ) আবূ বকরের (রাঃ) এই মতকে পছন্দ করলেন এবং ইবন মাসলামা (রাঃ)-এর নিকট খেজুর গাছগুলি কেটে ফেলার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা পাঠিয়ে দিলেন। সন্ধ্যার সময় মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রাঃ) স্বীয় ভ্রাতার নিষ্ঠুরভাবে শহীদ হওয়ার ঘটনাটি নবী (ﷺ)-এর খিদমতে এসে বর্ণনা করেন।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন বলেন: لا عطين(الولايتن)الراية غدا رجلا يحب الله ورسوله يفتح الله عليه“আগামী দিন পতাকা ঐ ব্যক্তিকে প্রদান করা হবে (অথবা ঐ ব্যক্তি পতাকা গ্রহণ করবে) যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) ভালবাসেন এবং তার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন।”এটা এমন এক প্রশংসা ছিল, যা শুনে বড় বড় বীর পুরুষ আগামী দিনের পতাকা লাভের আশায় আশান্বিত হয়ে থাকলেন।ঐ রাত্রে সেনাবাহিনীর পাহারা দেয়ার দায়িত্ব ‘উমার ইবনুল খাত্তাবের (রাঃ) উপর অর্পিত হয়েছিল। তিনি চক্কর দিতে দিতে একজন ইয়াহূদীকে গ্রেফতার করেন। তৎক্ষণাৎ তিনি তাকে নবী (ﷺ)-এর খিদমতে আনয়ন করেন। ঐ সময় রাসূল (ﷺ) তাহাজ্জুদের সালাতে ছিলেন। সালাত শেষে তিনি ইয়াহূদীর সাথে কথোপকথন করেন।ইয়াহূদী বলল: “যদি আমাকে এবং দুর্গে অবস্থানরত আমার স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে নিরাপত্তা দান করা হয় তাহলে আমি সামরিক গোপন বিষয়ের বহু কিছু প্রকাশ করে দিতে পারি।” ঐ ইয়াহূদীর সাথে নিরাপত্তার ওয়াদা করা হলে সে বলতে শুরু করে: “নিতাত দুর্গের ইয়াহূদীরা আজ রাত্রে তাদের স্ত্রী ও শিশু সন্তানদেরকে শান দুর্গে পাঠাচ্ছে এবং তাদের মালধন ও টাকা পয়সা নিতাত দুর্গের মধ্যে প্রোথিত করছে। ঐ জায়গা আমার জানা আছে। যখন মুসলিমরা নিতাত দুর্গদখল করে নিবেন তখন আমি ঐ জায়গাটি দেখিয়ে দিবো। শান্না দুর্গের নীচে ভূগর্ভে নির্মিত কুঠরিতে বহু মূল্যবান অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে। যখন মুসলমানরা শান্না দুর্গ জয় করে নিবেন তখন আমি তাদের কে ভূগর্ভে নির্মিত ঐ কুঠরিটিও দেখিয়ে দিবো।”‘আলী (রাঃ) নায়েম দুর্গের উপর আক্রমণের সূত্রপাত করলেন। মুকাবালার জন্যে দুর্গের বিখ্যাত সরদার মুরাহ্হাব ময়দানে বেরিয়ে এলো। সে নিজেকে হাজার বীরের সমান মনে করত।মুরাহ্হাব তাকে তরবারী দ্বারা আঘাত করে। ‘আমির (রাঃ) ওটাকে ঢাল দ্বারা প্রতিহত করেন এবং মুরাহ্হাবের দেহের নিম্নাঙ্গে আঘাত করেন। কিন্তু তার তরবারিটি যা দৈর্ঘ্যে ছোট ছিল, তার নিজেরই হাঁটুতে লেগে যায়, যার ফলে অবশেষে তিনি শহীদ হয়ে যান। অতঃপর ‘আলী (রাঃ) বেরিয়ে আসেন।‘আলী মুরতযা (রাঃ) এক হাতেই এমন জোরে তরবারীর আঘাত করেন যে, মুরাহ্হাবের শিরস্ত্রাণ কেটে পাগড়ী কর্তন করতঃ মাথাকে দু টুকরো করে গর্দান পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মুরাহ্হাবের ভাই বেরিয়ে আসলে যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ) তাকে মাটিতে শুইয়ে দেন। এরপর ‘আলী (রাঃ)-এর সাধারণ আক্রমণের মাধ্যমে নায়েম দুর্গটি বিজিত হয়।ঐ দিনই সা‘আব দুর্গটি হাব্বাব ইবনুল মুনযির (রাঃ) অবরোধ করে তৃতীয় দিনে জয় করে নেন। সা‘আব দুর্গটি জয় করার ফলে মুসলিমরা প্রচুর পরিমাণে যব, খেজুর, মাখন, রওগণ, যায়তুন এবং চর্বি লাভ করেন। এর ফলে মুসলিমদের ঐ কষ্ট দূরীভূত হয় যে কষ্ট তারা রসদের স্বল্পতার কারণে ভোগ করছিলেন। এই দুর্গ হতেই তারা বড় বড় গুপ্ত অস্ত্র লাভ করেন যার খবর ইয়াহূদী গুপ্তচর তাদেরকে প্রদান করেছিল। এর পূর্বদিন নিতাত দুর্গ বিজিত হয়েছিল।এখন যুবাইর দুর্গ, যা একটি পাহাড়ী টিলার উপর অবস্থিত ছিল এবং যুবাইরের নামে যার নামকরণ করা হয়েছিল, ওর উপর আক্রমণ করা হয়। দু’দিন পর একজন ইয়াহূদী ইসলামের সৈন্যদের মধ্যে আসে। সে বলে: “এ দুর্গটি তো এক মাস পর্যন্ত চেষ্টা চালালেও জয় করতে পারবেন না। আমি একটি গোপন কথা বলে দিচ্ছি। “এ দুর্গের মাটির নিচের নালা পথে পানি এসে থাকে। যদি পানির পথ বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে বিজয় সম্ভব।” তার এ কথা শুনে মুসলিমরা পানির উপর অধিকার লাভ করে নেন। তখন দুর্গবাসী দুর্গ হতে বের হয়ে খোলা ময়দানে এসে যুদ্ধ করে এবং মুসলিমরা তাদেরকে পরাজিত করেন।তারপর উবাই দুর্গের উপর আক্রমণ করা শুরু হয়। এই দুর্গবাসীরা কঠিন ভাবে প্রতিরোধ করে। তাদের মধ্যে গাযওয়্যান নামক একটি লোক ছিল। সে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের জন্যে বেরিয়ে আসে। হাব্বাব (রাঃ) তার সাথে মুকাবালার জন্য এগিয়ে যান। গাযওয়্যানের বাহু কেটে যায়। সে দুর্গের দিকে পালাতে থাকে। হাব্বাব (রাঃ) তার পশ্চাদ্ধাবন করেন। সে পড়ে যায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।দুর্গ হতে আর একজন যোদ্ধা বেরিয়ে আসে। একজন মুসলিম তার মুকামালা করলেন। কিন্তু মুসলিমটি তার হাতে শহীদ হয়ে যান। অতঃপর আবূ দাজনা (রাঃ) বেরিয়ে আসেন। তিনি এসেই তার পা কেটে দেন এবং পরে তাকে হত্যা করে ফেলেন।ইয়াহূদীরা ভীত সন্তস্ত হয়ে পড়ে এবং বাইরে বের হওয়া হতে বিরত থাকে। আবূ দাজনা (রাঃ) সামনে অগ্রসর হন। মুসলিমরা তার সঙ্গী হন। তারা তাকবীর পাঠ করতে করতে দুর্গের প্রাচীরের উপর চড়ে যান এবং দুর্গ জয় করে নেন। দুর্গবাসীরা পালিয়ে যায়। এই দুর্গ হতে প্রচুর বকরী, কাপড় এবং আসবাবপত্র পাওয়া যায়।এবার মুসলিমরা বার দুর্গ আক্রমণ করেন। এখানে দুর্গরক্ষীরা মুসলিমদের উপর এতো তীর ও পাথর বর্ষণ করে যে, তাদের মুকাবালা করার জন্য মুসলিমদেরকেও ভারী অস্ত্র ব্যবহার করতে হয় যে অস্ত্র তারা সা‘আব দুর্গ হতে গানীমাত স্বরূপ লাভ করেছিলেন। এই ভারী অস্ত্র দ্বারা এ দুর্গের প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলে তা জয় করা হয়। (রহমাতুল লিল ‘আলামীন-আল্লামা কাযী মুহাম্মাদ সুলাইমন মানসুর পুরী)"

বাহ্যিক আমল নয়, শেষ পরিণতি গুরুত্বপূর্ণ—আত্মহত্যা নিয়ে হাদিস

সহীহ বুখারীহাদিস নম্বর ৪২০৩

قُتَيْبَةُ حَدَّثَنَا يَعْقُوْبُ عَنْ أَبِيْ حَازِمٍ عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ السَّاعِدِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ الْتَقَى هُوَ وَالْمُشْرِكُوْنَ فَاقْتَتَلُوْا فَلَمَّا مَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ إِلَى عَسْكَرِهِ وَمَالَ الْآخَرُوْنَ إِلَى عَسْكَرِهِمْ وَفِيْ أَصْحَابِ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ رَجُلٌ لَا يَدَعُ لَهُمْ شَاذَّةً وَلَا فَاذَّةً إِلَّا اتَّبَعَهَا يَضْرِبُهَا بِسَيْفِهِ فَقِيْلَ مَا أَجْزَأَ مِنَّا الْيَوْمَ أَحَدٌ كَمَا أَجْزَأَ فُلَانٌ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ أَمَا إِنَّهُ مِنْ أَهْلِ النَّارِفَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ أَنَا صَاحِبُهُ قَالَ فَخَرَجَ مَعَهُ كُلَّمَا وَقَفَ وَقَفَ مَعَهُ وَإِذَا أَسْرَعَ أَسْرَعَ مَعَهُ قَالَ فَجُرِحَ الرَّجُلُ جُرْحًا شَدِيْدًا فَاسْتَعْجَلَ الْمَوْتَ فَوَضَعَ سَيْفَهُ بِالأَرْضِ وَذُبَابَهُ بَيْنَ ثَدْيَيْهِ ثُمَّ تَحَامَلَ عَلَى سَيْفِهِ فَقَتَلَ نَفْسَهُ فَخَرَجَ الرَّجُلُ إِلَى رَسُوْلِ اللهِ ﷺ فَقَالَ أَشْهَدُ أَنَّكَ رَسُوْلُ اللهِ قَالَ وَمَا ذَاكَ قَالَ الرَّجُلُ الَّذِيْ ذَكَرْتَ آنِفًا أَنَّهُ مِنْ أَهْلِ النَّارِ فَأَعْظَمَ النَّاسُ ذَلِكَ فَقُلْتُ أَنَا لَكُمْ بِهِ فَخَرَجْتُ فِيْ طَلَبِهِ ثُمَّ جُرِحَ جُرْحًا شَدِيْدًا فَاسْتَعْجَلَ الْمَوْتَ فَوَضَعَ نَصْلَ سَيْفِهِ فِي الْأَرْضِ وَذُبَابَهُ بَيْنَ ثَدْيَيْهِ ثُمَّ تَحَامَلَ عَلَيْهِ فَقَتَلَ نَفْسَهُفَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ عِنْدَ ذَلِكَ إِنَّ الرَّجُلَ لَيَعْمَلُ عَمَلَ أَهْلِ الْجَنَّةِ فِيْمَا يَبْدُوْ لِلنَّاسِ وَهُوَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَعْمَلُ عَمَلَ أَهْلِ النَّارِ فِيْمَا يَبْدُوْ لِلنَّاسِ وَهُوَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ

সাহল বিন সা‘দ আস-সাঈদী (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

(খাইবারের যুদ্ধে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং মুশরিকরা মুখোমুখি হলেন। পরস্পরের মধ্যে তুমুল লড়াই হল। (দিনের শেষে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর সেনা ছাউনিতে ফিরে আসলেন আর অন্যপক্ষও তাদের ছাউনিতে ফিরে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবীগণের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি ছিলেন, যিনি তার তরবারি থেকে একাকী কিংবা দলবদ্ধ কোন শত্রু সৈন্যকেই রেহাই দেননি। বরং পিছু ধাওয়া করে তাকে তরবারির আঘাতে হত্যা করেছেন। তাদের কেউ বললেন, অমুক ব্যক্তি আজ যা করেছে আমাদের মধ্যে আর অন্য কেউ তা করতে সক্ষম হয়নি। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, কিন্তু সে তো জাহান্নামী। সাহাবীগণের একজন বললেন, (ব্যাপারটা দেখার জন্য) আমি তার সঙ্গী হব।সাহ্‌ল ইবনু সা'দ সা'ঈদী (রাঃ) বলেন, পরে তিনি ঐ লোকটির সঙ্গে বের হলেন, লোকটি থামলে তিনিও থামতেন, লোকটি দ্রুত চললে তিনিও দ্রুত চলতেন। বর্ণনাকারী বলেন, এক সময়ে লোকটি ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হল এবং (যন্ত্রণার চোটে) শীঘ্র মৃত্যু কামনা করল। তাই সে তার তরবারির গোড়ার অংশ মাটিতে রেখে এর ধারালো দিক বুকের মাঝে রাখল। এরপর সে তরবারির উপর নিজেকে জোরে চেপে ধরে আত্মহত্যা করল।তখন লোকটি (অনুসরণকারী সাহাবী) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহ্‌র রাসূল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ব্যাপার কী? তিনি বললেন, একটু আগে আপনি যে লোকটির কথা বলেছিলেন যে, লোকটি জাহান্নামী, তাতে লোকেরা আশ্চর্যান্বিত হয়েছিল। তখন আমি তাদেরকে বলেছিলাম, আমি লোকটির পিছু নিয়ে দেখব। কাজেই আমি ব্যাপারটির খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। এক সময় লোকটি মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হল এবং শীঘ্র মৃত্যু কামনা করল, তাই সে তার তরবারির হাতলের দিক মাটিতে বসিয়ে এর তীক্ষ্ম ভাগ নিজের বুকের মাঝে রাখল। এরপর নিজেকে তার উপর জোরে চেপে ধরে আত্মহত্যা করল।এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, অনেক সময় মানুষ জান্নাতীদের মত আমল করতে থাকে, যা দেখে অন্যরা তাকে জান্নাতীই মনে করে। অথচ সে জাহান্নামী। আবার অনেক সময় মানুষ জাহান্নামীদের মতো আমল করতে থাকে যা দেখে লোকজনও সেরূপই মনে করে থাকে, অথচ সে জান্নাতী।

সহীহ বুখারী হাদিস ৪২০৩-এর সারসংক্ষেপ

এই হাদিসে যুদ্ধের মাঠে এক ব্যক্তির ঘটনা এসেছে। বাহ্যিকভাবে সে খুব বীরত্ব দেখাচ্ছিল। সাহাবীদের কেউ বললেন, আজ তার মতো কাজ আর কেউ করতে পারেনি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم বললেন, সে জাহান্নামী। কথাটি শুনে মানুষ অবাক হয়। একজন সাহাবী তার পিছু নেন। পরে দেখা গেল, লোকটি মারাত্মকভাবে আহত হয়ে যন্ত্রণায় দ্রুত মৃত্যু চাইলো এবং নিজের তরবারির ওপর নিজেকে ফেলে আত্মহত্যা করল। এরপর নবী صلى الله عليه وسلم বলেন, কোনো মানুষ মানুষের চোখে জান্নাতীদের মতো আমল করতে পারে, অথচ সে জাহান্নামী হতে পারে; আবার কারো বাহ্যিক অবস্থা জাহান্নামীদের মতো মনে হলেও সে জান্নাতী হতে পারে। এই হাদিস বাহ্যিক বিচার, আত্মহত্যার ভয়াবহতা এবং শেষ পরিণতির গুরুত্ব স্মরণ করায়।

এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা

  • শুধু বাহ্যিক কাজ দেখে কারো শেষ পরিণতি নিশ্চিত বলা যায় না।
  • যন্ত্রণার মুহূর্তেও আত্মহত্যা বড় ভয়াবহ কাজ হিসেবে এসেছে।
  • মানুষের চোখে যা বড় মনে হয়, আল্লাহর কাছে তার পরিণতি ভিন্ন হতে পারে।
  • নিজের আমল নিয়ে সতর্ক থাকা এবং শেষ পর্যন্ত স্থির থাকা জরুরি।

সেটিংস

ভাষা

ফন্ট সেটিংস

আরবি ফন্ট ফেস

আরবি ফন্ট সাইজ

২৪

অনুবাদ ফন্ট সাইজ

১৮

রিডিং লেআউট

আল হাদিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন

App Banner

ইসলামের জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হোন

আপনার নিয়মিত সহায়তা আমাদের দ্বীনি ভাই-বোনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সাহয্য করবে। আমাদের মিশনে আপনিও অংশ নিন এবং বড় পরিবর্তনের অংশীদার হোন।

সাপোর্ট করুন