৬৪/৩৯. অধ্যায়ঃ

সহীহ বুখারী হাদিস ৪২৪০ - নবীগণের মীরাস ও সদকার বিধান

খাইবারের যুদ্ধ

৪৭ সপ্তম হিজরী, মুহাররম মাস। খাইবার ছিল সিরিয়া প্রান্তরে এক বিশাল শ্যামল ভূখণ্ডের নাম। এটা মদীনা হতে তিন মঞ্জিলের (প্রায় এক শ’ মাইল) পথ। ক্ষুদ্র বৃহৎ বহু দুর্গ দ্বারা এই স্থানটি সুরক্ষিত ছিল। মদীনার বনূ কাইনুকা ও বনূ নাযীর গোত্রের ইয়াহূদীরা এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। নবী (ﷺ)-এর হুদাইবিয়ার সফর হতে ফিরে আসা অল্প দিন মাত্র (এক মাসেরও কম) গত হয়েছে।এমন সময় শোনা গেল যে, খাইবারের ইয়াহূদীরা মদীনার উপর আক্রমণ চালাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে- (তবকাতে কাবীর, ইবন সা‘দ, ৭ পৃষ্ঠা)। তারা আহযাবের যুদ্ধে অকৃতকার্যতার প্রতিশোধ গ্রহণ এবং নিজেদের হারানো সামরিক মর্যাদা ও শক্তিকে গোটা রাজ্যে পুনর্বহাল করার জন্য এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।তারা বনূ গাতফান গোত্রের চার হাজার জঙ্গী বীর পুরুষকেও নিজেদের সাথে যুক্ত করে নিয়েছে। তারা এ চুক্তি করেছে যে, যদি মদীনা বিজিত হয় তাহলে খাইবারের উৎপাদিত শস্যের অর্ধাংশ তারা বনূ গাতফানকে চিরস্থায়ীভাবে দিতে থাকবে।ইতোপূর্বে আহযাবের যুদ্ধে মুসলিমদেরকে খাইবারের দুর্গ অবরোধ করতে যে কঠিন বেগ পেতে হয়েছিল তা তারা ভুলেনি। সুতরাং সবাই এ ব্যাপারে এক মত হলেন যে, এই আক্রমণোদ্যত শত্রুদেরকে সামনে অগ্রসর হয়ে প্রতিরোধ করতে হবে।নবী (ﷺ) শুধু মাত্র ঐ সাহাবীদেরকে এই যুদ্ধে গমনের অনুমতি দান করেছিলেন যাদেরকে শুভ সংবাদ দিতে গিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করেন: لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ (১৮ : (سورة الفتح“আল্লাহ অবশ্যই মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নীচে তোমার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেছে, তাদের অন্তরে যা আছে আল্লাহ তা জানেন।” (সূরা ফাতহ ৪৮/১৮)আর যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (২০ : وَعَدَكُمُ اللَّهُ مَغَانِمَ كَثِيرَةً تَأْخُذُونَهَا (سورة الفتح“আল্লাহ তোমাদের সাথে বড় বড় বিজয়ের ও গানীমাতের ওয়াদা করেছেন যা তোমরা লাভ করবে।” (সূরা ফাতহ ৪৮/২০)তারা সংখ্যায় চৌদ্দ‘শ জন ছিলেন। তাদের মধ্যে দু’শজন ছিলেন অশ্বারোহী।সেনাবাহিনীর সম্মুখ ভাগের নেতা বা সেনাপতি ছিলেন উকাশা ইবন মুহসিন আসাদী (রাঃ) [উকাশা ইবন মুহসিন (রাঃ) মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবীদের অন্যতম ছিলেন। তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সুসংবাদ দান করেছিলেন যে, তিনি বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবেন। বদর, উহুদ, খন্দক এবং অন্যান্য যুদ্ধে তিনি হাজির হন। সিদ্দীকে আকবার (রাঃ)-এর খিলাফাত কালে ৪৫ বছর বয়সে তিনি শহীদ হন।]।ডান দিকের সেনাবাহিনীর সরদার ছিলেন ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)— (মাদারিজুন নুবুওয়াহ, ২৯০ পৃষ্ঠা।) বাম দিকের সেনাবাহিনীর নেতা অন্য একজন সাহাবী (রাঃ) ছিলেন। বিশজন মহিলাও (রাদিয়াল্লাহু আনহুন্না) সেনাবাহিনীর মধ্যে ছিলেন যারা রুগ্ন ও আহতদের দেখাশুনা ও সেবা শুশ্রূষা করার জন্য সাথে এসেছিলেন।ইসলামের সেনাবাহিনী রাত্রিকালে খাইবারের বসতি সংলগ্ন জায়গায় পৌঁছে গেল। কিন্তু নবী (ﷺ)-এর কল্যাণময় অভ্যাস এই ছিল যে, তিনি রাত্রে যুদ্ধ শুরু করতেন না- [বুখারী, আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত]। এজন্যে ইসলামের সেনাবাহিনী ময়দানে শিবির স্থাপন করে। যুদ্ধের জন্য এ স্থানটি যুদ্ধ অভিজ্ঞ ব্যক্তি হাব্বাব ইবনুল মুনযির (রাঃ) নির্বাচন করেছিলেন। এ জায়গাটি খাইবারবাসী ও বনূ গাতফান গোত্রের মধ্যস্থলে ছিল। এই কৌশল অবলম্বনের উপকার এই ছিল যে, বনূ গাতফান গোত্র যখন খাইবারের ইয়াহূদীদের সাহায্যের জন্য বের হয় তখন তারা ইসলামের সেনাবাহিনীকে প্রতিবন্ধকরূপে পায়। এ কারণে তারা চুপচাপ নিজেদের বাড়ীতে ফিরে যায়।রাসূল (ﷺ) হুকুম দেন যে, সেনাবাহিনীর বড় ক্যাম্প এখানেই থাকবে এবং আক্রমণমুখী সৈন্যদের দল এই ক্যাম্প থেকে যেতে থাকবে। সৈন্যদের মাঝে তৎক্ষণাৎ মসজিদ নির্মাণ করে নেয়া হয়। আর যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে ইসলামের তাবলীগের ধারাও জারী রাখা হয়।‘উসমান (রাঃ) ঐ ক্যাম্পের প্রধান দায়িত্বশীল নির্বাচিত হন।খাইবারের জন বসতির ডানে-বামে যে দুর্গ অবস্থিত ছিল ঐগুলি সংখ্যায় ছিল দশটি। ঐ দুর্গগুলোর মধ্যে দশ হাজার করে বীর যোদ্ধা অবস্থান করত।খাইবারের জনবসতি ডানে ও বামে দু’টি ভাগে বিভক্ত ছিল। একভাগে ছিল নিতান্ত দুর্গ নামে পরিচিত চারটি দুর্গ- (১) না‘য়িম (২) নিতাত (৩) সা‘আব ইবন মু‘আয (৪) কিল্লা‘আতুয যুবাইর এবং শান্না দুর্গ নামে পরিচিত তিনটি দুর্গ- (১) শান্না (২) বার (৩) উবাই। অপর পাশে ছিল আরও তিনটি দুর্গ যা কুতাইবা দুর্গ নামে পরিচিত ছিল। তা হচ্ছে- (১) কামূস তাবারী (২) অতীহ (৩) সালিম বা নাবউইন হাকীক।মাহমূদ ইবন মাসলামা (রাঃ) পাঁচ দিন পর্যন্ত ক্রমাগত আক্রমণ চালাতে থাকেন। কিন্তু দুর্গ বিজিত হলো না। পঞ্চম বা ষষ্ঠ দিনের বর্ণনা এই যে, মাহমূদ (রাঃ) যুদ্ধ ক্ষেত্রের গরমের প্রখরতায় ক্লান্ত হয়ে দুর্গ প্রাচীরের ছায়ায় কিছু সময় বিশ্রাম গ্রহণের জন্য শুয়ে পড়েন। ইত্যবসরে কিনানা ইবন হাকীক নামক এক ইয়াহূদী তাকে গাফেল দেখে তার মাথায় এক পাথর মেরে দেয়। এতেই তিনি শহীদ হয়ে যান।সেনাবাহিনীর পতাকা মাহমূদ ইবন মাসলামা (রাঃ)-এর ভাই মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রাঃ) ধারণ করেন এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে থাকেন। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রাঃ) এই মত প্রদান করেন যে, ইয়াহূদীদের খেজুর বাগানের খেজুর গাছগুলি কেটে ফেলা হোক। কেননা, তাদের নিকট এক একটি খেজুর গাছ এক একটি ছেলের মতই প্রিয়। এই কৌশল অবলম্বন করলে দুর্গবাসীর উপর প্রভাব ফেলা যাবে। এই কৌশলের উপর কাজ শুরু হয়েই গিয়েছিল।এমন সময় আবূ বকর (রাঃ) নবী (ﷺ)-এর খিদমতে হাজির হয়ে আরয করলেন: “এ এলাকা নিশ্চিতরূপে মুসলিমদের হাতে বিজিত হতে যাচ্ছে। সুতরাং আমরা এটাকে নিজেদের হাত নষ্ট করব কেন? রাসূল (ﷺ) আবূ বকরের (রাঃ) এই মতকে পছন্দ করলেন এবং ইবন মাসলামা (রাঃ)-এর নিকট খেজুর গাছগুলি কেটে ফেলার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা পাঠিয়ে দিলেন। সন্ধ্যার সময় মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রাঃ) স্বীয় ভ্রাতার নিষ্ঠুরভাবে শহীদ হওয়ার ঘটনাটি নবী (ﷺ)-এর খিদমতে এসে বর্ণনা করেন।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন বলেন: لا عطين(الولايتن)الراية غدا رجلا يحب الله ورسوله يفتح الله عليه“আগামী দিন পতাকা ঐ ব্যক্তিকে প্রদান করা হবে (অথবা ঐ ব্যক্তি পতাকা গ্রহণ করবে) যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) ভালবাসেন এবং তার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন।”এটা এমন এক প্রশংসা ছিল, যা শুনে বড় বড় বীর পুরুষ আগামী দিনের পতাকা লাভের আশায় আশান্বিত হয়ে থাকলেন।ঐ রাত্রে সেনাবাহিনীর পাহারা দেয়ার দায়িত্ব ‘উমার ইবনুল খাত্তাবের (রাঃ) উপর অর্পিত হয়েছিল। তিনি চক্কর দিতে দিতে একজন ইয়াহূদীকে গ্রেফতার করেন। তৎক্ষণাৎ তিনি তাকে নবী (ﷺ)-এর খিদমতে আনয়ন করেন। ঐ সময় রাসূল (ﷺ) তাহাজ্জুদের সালাতে ছিলেন। সালাত শেষে তিনি ইয়াহূদীর সাথে কথোপকথন করেন।ইয়াহূদী বলল: “যদি আমাকে এবং দুর্গে অবস্থানরত আমার স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে নিরাপত্তা দান করা হয় তাহলে আমি সামরিক গোপন বিষয়ের বহু কিছু প্রকাশ করে দিতে পারি।” ঐ ইয়াহূদীর সাথে নিরাপত্তার ওয়াদা করা হলে সে বলতে শুরু করে: “নিতাত দুর্গের ইয়াহূদীরা আজ রাত্রে তাদের স্ত্রী ও শিশু সন্তানদেরকে শান দুর্গে পাঠাচ্ছে এবং তাদের মালধন ও টাকা পয়সা নিতাত দুর্গের মধ্যে প্রোথিত করছে। ঐ জায়গা আমার জানা আছে। যখন মুসলিমরা নিতাত দুর্গদখল করে নিবেন তখন আমি ঐ জায়গাটি দেখিয়ে দিবো। শান্না দুর্গের নীচে ভূগর্ভে নির্মিত কুঠরিতে বহু মূল্যবান অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে। যখন মুসলমানরা শান্না দুর্গ জয় করে নিবেন তখন আমি তাদের কে ভূগর্ভে নির্মিত ঐ কুঠরিটিও দেখিয়ে দিবো।”‘আলী (রাঃ) নায়েম দুর্গের উপর আক্রমণের সূত্রপাত করলেন। মুকাবালার জন্যে দুর্গের বিখ্যাত সরদার মুরাহ্হাব ময়দানে বেরিয়ে এলো। সে নিজেকে হাজার বীরের সমান মনে করত।মুরাহ্হাব তাকে তরবারী দ্বারা আঘাত করে। ‘আমির (রাঃ) ওটাকে ঢাল দ্বারা প্রতিহত করেন এবং মুরাহ্হাবের দেহের নিম্নাঙ্গে আঘাত করেন। কিন্তু তার তরবারিটি যা দৈর্ঘ্যে ছোট ছিল, তার নিজেরই হাঁটুতে লেগে যায়, যার ফলে অবশেষে তিনি শহীদ হয়ে যান। অতঃপর ‘আলী (রাঃ) বেরিয়ে আসেন।‘আলী মুরতযা (রাঃ) এক হাতেই এমন জোরে তরবারীর আঘাত করেন যে, মুরাহ্হাবের শিরস্ত্রাণ কেটে পাগড়ী কর্তন করতঃ মাথাকে দু টুকরো করে গর্দান পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মুরাহ্হাবের ভাই বেরিয়ে আসলে যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ) তাকে মাটিতে শুইয়ে দেন। এরপর ‘আলী (রাঃ)-এর সাধারণ আক্রমণের মাধ্যমে নায়েম দুর্গটি বিজিত হয়।ঐ দিনই সা‘আব দুর্গটি হাব্বাব ইবনুল মুনযির (রাঃ) অবরোধ করে তৃতীয় দিনে জয় করে নেন। সা‘আব দুর্গটি জয় করার ফলে মুসলিমরা প্রচুর পরিমাণে যব, খেজুর, মাখন, রওগণ, যায়তুন এবং চর্বি লাভ করেন। এর ফলে মুসলিমদের ঐ কষ্ট দূরীভূত হয় যে কষ্ট তারা রসদের স্বল্পতার কারণে ভোগ করছিলেন। এই দুর্গ হতেই তারা বড় বড় গুপ্ত অস্ত্র লাভ করেন যার খবর ইয়াহূদী গুপ্তচর তাদেরকে প্রদান করেছিল। এর পূর্বদিন নিতাত দুর্গ বিজিত হয়েছিল।এখন যুবাইর দুর্গ, যা একটি পাহাড়ী টিলার উপর অবস্থিত ছিল এবং যুবাইরের নামে যার নামকরণ করা হয়েছিল, ওর উপর আক্রমণ করা হয়। দু’দিন পর একজন ইয়াহূদী ইসলামের সৈন্যদের মধ্যে আসে। সে বলে: “এ দুর্গটি তো এক মাস পর্যন্ত চেষ্টা চালালেও জয় করতে পারবেন না। আমি একটি গোপন কথা বলে দিচ্ছি। “এ দুর্গের মাটির নিচের নালা পথে পানি এসে থাকে। যদি পানির পথ বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে বিজয় সম্ভব।” তার এ কথা শুনে মুসলিমরা পানির উপর অধিকার লাভ করে নেন। তখন দুর্গবাসী দুর্গ হতে বের হয়ে খোলা ময়দানে এসে যুদ্ধ করে এবং মুসলিমরা তাদেরকে পরাজিত করেন।তারপর উবাই দুর্গের উপর আক্রমণ করা শুরু হয়। এই দুর্গবাসীরা কঠিন ভাবে প্রতিরোধ করে। তাদের মধ্যে গাযওয়্যান নামক একটি লোক ছিল। সে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের জন্যে বেরিয়ে আসে। হাব্বাব (রাঃ) তার সাথে মুকাবালার জন্য এগিয়ে যান। গাযওয়্যানের বাহু কেটে যায়। সে দুর্গের দিকে পালাতে থাকে। হাব্বাব (রাঃ) তার পশ্চাদ্ধাবন করেন। সে পড়ে যায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।দুর্গ হতে আর একজন যোদ্ধা বেরিয়ে আসে। একজন মুসলিম তার মুকামালা করলেন। কিন্তু মুসলিমটি তার হাতে শহীদ হয়ে যান। অতঃপর আবূ দাজনা (রাঃ) বেরিয়ে আসেন। তিনি এসেই তার পা কেটে দেন এবং পরে তাকে হত্যা করে ফেলেন।ইয়াহূদীরা ভীত সন্তস্ত হয়ে পড়ে এবং বাইরে বের হওয়া হতে বিরত থাকে। আবূ দাজনা (রাঃ) সামনে অগ্রসর হন। মুসলিমরা তার সঙ্গী হন। তারা তাকবীর পাঠ করতে করতে দুর্গের প্রাচীরের উপর চড়ে যান এবং দুর্গ জয় করে নেন। দুর্গবাসীরা পালিয়ে যায়। এই দুর্গ হতে প্রচুর বকরী, কাপড় এবং আসবাবপত্র পাওয়া যায়।এবার মুসলিমরা বার দুর্গ আক্রমণ করেন। এখানে দুর্গরক্ষীরা মুসলিমদের উপর এতো তীর ও পাথর বর্ষণ করে যে, তাদের মুকাবালা করার জন্য মুসলিমদেরকেও ভারী অস্ত্র ব্যবহার করতে হয় যে অস্ত্র তারা সা‘আব দুর্গ হতে গানীমাত স্বরূপ লাভ করেছিলেন। এই ভারী অস্ত্র দ্বারা এ দুর্গের প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলে তা জয় করা হয়। (রহমাতুল লিল ‘আলামীন-আল্লামা কাযী মুহাম্মাদ সুলাইমন মানসুর পুরী)"

নবীগণের মীরাস, সদকা ও সাহাবীদের সমঝোতার শিক্ষা

সহীহ বুখারীহাদিস নম্বর ৪২৪০

يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ عَنْ عُقَيْلٍ عَنْ ابْنِ شِهَابٍ عَنْ عُرْوَةَ عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ فَاطِمَةَ عَلَيْهَا السَّلَام بِنْتَ النَّبِيِّ ﷺ أَرْسَلَتْ إِلَى أَبِيْ بَكْرٍ تَسْأَلُهُ مِيْرَاثَهَا مِنْ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ مِمَّا أَفَاءَ اللهُ عَلَيْهِ بِالْمَدِيْنَةِ وَفَدَكٍ وَمَا بَقِيَ مِنْ خُمُسِ خَيْبَرَ فَقَالَ أَبُوْ بَكْرٍ إِنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ لَا نُوْرَثُ مَا تَرَكْنَا صَدَقَةٌ إِنَّمَا يَأْكُلُ آلُ مُحَمَّدٍ فِيْ هَذَا الْمَالِ وَإِنِّيْ وَاللهِ لَا أُغَيِّرُ شَيْئًا مِنْ صَدَقَةِ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ عَنْ حَالِهَا الَّتِيْ كَانَ عَلَيْهَا فِيْ عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ وَلَأَعْمَلَنَّ فِيْهَا بِمَا عَمِلَ بِهِ رَسُوْلُ اللهِ ﷺفَأَبَى أَبُوْ بَكْرٍ أَنْ يَدْفَعَ إِلَى فَاطِمَةَ مِنْهَا شَيْئًا فَوَجَدَتْ فَاطِمَةُ عَلَى أَبِيْ بَكْرٍ فِيْ ذَلِكَ فَهَجَرَتْهُ فَلَمْ تُكَلِّمْهُ حَتَّى تُوُفِّيَتْ وَعَاشَتْ بَعْدَ النَّبِيِّ ﷺ سِتَّةَ أَشْهُرٍ فَلَمَّا تُوُفِّيَتْ دَفَنَهَا زَوْجُهَا عَلِيٌّ لَيْلًا وَلَمْ يُؤْذِنْ بِهَا أَبَا بَكْرٍ وَصَلَّى عَلَيْهَا وَكَانَ لِعَلِيٍّ مِنْ النَّاسِ وَجْهٌ حَيَاةَ فَاطِمَةَ فَلَمَّا تُوُفِّيَتْ اسْتَنْكَرَ عَلِيٌّ وُجُوْهَ النَّاسِ فَالْتَمَسَ مُصَالَحَةَ أَبِيْ بَكْرٍ وَمُبَايَعَتَهُ وَلَمْ يَكُنْ يُبَايِعُ تِلْكَ الْأَشْهُرَفَأَرْسَلَ إِلَى أَبِيْ بَكْرٍ أَنْ ائْتِنَا وَلَا يَأْتِنَا أَحَدٌ مَعَكَ كَرَاهِيَةً لِمَحْضَرِ عُمَرَ فَقَالَ عُمَرُ لَا وَاللهِ لَا تَدْخُلُ عَلَيْهِمْ وَحْدَكَ فَقَالَ أَبُوْ بَكْرٍ وَمَا عَسَيْتَهُمْ أَنْ يَفْعَلُوْا بِيْ وَاللهِ لآتِيَنَّهُمْ فَدَخَلَ عَلَيْهِمْ أَبُوْ بَكْرٍ فَتَشَهَّدَ عَلِيٌّ فَقَالَ إِنَّا قَدْ عَرَفْنَا فَضْلَكَ وَمَا أَعْطَاكَ اللهُ وَلَمْ نَنْفَسْ عَلَيْكَ خَيْرًا سَاقَهُ اللهُ إِلَيْكَ وَلَكِنَّكَ اسْتَبْدَدْتَ عَلَيْنَا بِالأَمْرِ وَكُنَّا نَرَى لِقَرَابَتِنَا مِنْ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ نَصِيْبًا حَتَّى فَاضَتْ عَيْنَا أَبِيْ بَكْرٍ فَلَمَّا تَكَلَّمَ أَبُوْ بَكْرٍ قَالَ وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ لَقَرَابَةُ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ أَحَبُّ إِلَيَّ أَنْ أَصِلَ مِنْ قَرَابَتِيْ وَأَمَّا الَّذِيْ شَجَرَ بَيْنِيْ وَبَيْنَكُمْ مِنْ هَذِهِ الْأَمْوَالِ فَلَمْ آلُ فِيْهَا عَنِ الْخَيْرِ وَلَمْ أَتْرُكْ أَمْرًا رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَصْنَعُهُ فِيْهَا إِلَّا صَنَعْتُهُ فَقَالَ عَلِيٌّ لِأَبِيْ بَكْرٍ مَوْعِدُكَ الْعَشِيَّةَ لِلْبَيْعَةِ فَلَمَّا صَلَّى أَبُوْ بَكْرٍ الظُّهْرَ رَقِيَ عَلَى الْمِنْبَرِ فَتَشَهَّدَ وَذَكَرَ شَأْنَ عَلِيٍّ وَتَخَلُّفَهُ عَنِ الْبَيْعَةِ وَعُذْرَهُ بِالَّذِي اعْتَذَرَ إِلَيْهِ ثُمَّ اسْتَغْفَرَ وَتَشَهَّدَ عَلِيٌّ فَعَظَّمَ حَقَّ أَبِيْ بَكْرٍ وَحَدَّثَ أَنَّهُ لَمْ يَحْمِلْهُ عَلَى الَّذِيْ صَنَعَ نَفَاسَةً عَلَى أَبِيْ بَكْرٍ وَلَا إِنْكَارًا لِلَّذِيْ فَضَّلَهُ اللهُ بِهِ وَلَكِنَّا نَرَى لَنَا فِيْ هَذَا الْأَمْرِ نَصِيْبًا فَاسْتَبَدَّ عَلَيْنَا فَوَجَدْنَا فِيْ أَنْفُسِنَا فَسُرَّ بِذَلِكَ الْمُسْلِمُوْنَ وَقَالُوْا أَصَبْتَ وَكَانَ الْمُسْلِمُوْنَ إِلَى عَلِيٍّ قَرِيْبًا حِيْنَ رَاجَعَ الْأَمْرَ الْمَعْرُوْفَ.

'আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

নাবী (ﷺ)-এর কন্যা ফাতেমাহ (রাঃ) আবূ বাকর (রাঃ)-এর নিকট রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরিত্যক্ত সম্পত্তি মদিনা ও ফাদাক-এ অবস্থিত ফাই (বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ) এবং খাইবারের খুমুসের (পঞ্চমাংশ) অবশিষ্ট থেকে মিরাসী স্বত্ব চেয়ে পাঠালেন।তখন আবূ বাকর (রাঃ) উত্তরে বললেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলে গেছেন, আমাদের (নাবীদের) কোন ওয়ারিশ হয় না, আমরা যা ছেড়ে যাব তা সদাকাহ হিসেবে গণ্য হবে। অবশ্য মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর বংশধরগণ এ সম্পত্তি থেকে ভরণ-পোষণ চালাতে পারবেন। আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সদাকাহ তাঁর জীবদ্দশায় যে অবস্থায় ছিল আমি সে অবস্থা থেকে এতটুকুও পরিবর্তন করব না। এ ব্যাপারে তিনি যেভাবে ব্যবহার করে গেছেন আমিও ঠিক সেভাবেই ব্যবহার করব। এ কথা বলে আবূ বাকর (রাঃ) ফাতেমাহ (রাঃ)-কে এ সম্পদ থেকে কিছু দিতে অস্বীকার করলেন।এতে ফাতিমা (রাঃ) (মানবোচিত কারণে) আবূ বাকর (রাঃ)-এর উপর নাখোশ হলেন এবং তাঁর থেকে সম্পর্কহীন থাকলেন। তাঁর মৃত্যু অবধি তিনি আবূ বাকর (রাঃ)-এর সঙ্গে কথা বলেননি। নবী (ﷺ)-এর পর তিনি ছয় মাস জীবিত ছিলেন। তিনি ইন্তিকাল করলে তাঁর স্বামী ‘আলী (রাঃ) রাতের বেলা তাঁকে দাফন করেন। আবূ বাকর (রাঃ)-কেও এ খবর দিলেন না এবং তিনি তাঁর জানাযার সালাত আদায় করে নেন।[১]ফাতেমাহ (রাঃ)-এর জীবিত অবস্থায় লোকজনের মনে ‘আলী (রাঃ)-এর মর্যাদা ছিল। ফাতিমা (রাঃ) ইন্তিকাল করলে ‘আলী (রাঃ) লোকজনের চেহারায় অসন্তুষ্টির চিহ্ন দেখতে পেলেন। তাই তিনি আবূ বাকর (রাঃ)-এর সঙ্গে সমঝোতা ও তাঁর কাছে বাইআতের ইচ্ছা করলেন। এ ছয় মাসে তাঁর পক্ষে বাই‘আত গ্রহণের সুযোগ হয়নি। তাই তিনি আবূ বাকর (রাঃ)-এর কাছে লোক পাঠিয়ে জানালেন যে, আপনি আমার কাছে আসুন। (এটা জানতে পেরে) ‘উমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! আপনি একা একা তাঁর কাছে যাবেন না। আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, তাঁরা আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করবে বলে তোমরা আশঙ্কা করছ? আল্লাহর কসম! আমি তাঁদের কাছে যাব।তারপর আবূ বাকর (রাঃ) তাঁদের কাছে গেলেন। ‘আলী (রাঃ) তাশাহুদ পাঠ করে বললেন, আমরা আপনার মর্যাদা এবং আল্লাহ আপনাকে যা কিছু দান করেছেন সে সম্পর্কে ওয়াকেবহাল। আর যে কল্যাণ (অর্থাৎ খিলাফাত) আল্লাহ আপনাকে দান করেছেন সে ব্যাপারেও আমরা আপনার উপর হিংসা পোষণ করি না। তবে খিলাফাতের ব্যাপারে আপনি আমাদের উপর নিজস্ব মতামতের প্রাধান্য দিচ্ছেন অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকটাত্মীয় হিসেবে খিলাফাতের কাজে আমাদেরও কিছু পরামর্শ দেয়ার অধিকার আছে। এ কথায় আবূ বাকর (রাঃ)-এর চোখ থেকে অশ্রু উপচে পড়ল।এরপর তিনি যখন আলোচনা আরম্ভ করলেন তখন বললেন, সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমার কাছে আমার নিকটাত্মীয় চেয়েও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আত্মীয়বর্গ অধিক প্রিয়। আর এ সম্পদগুলোতে আমার এবং আপনাদের মধ্যে যে মতবিরোধ হয়েছে সে ব্যাপারেও আমি কল্যাণকর পথ অনুসরণে পিছপা হইনি। বরং এ ক্ষেত্রেও আমি কোন কাজ পরিত্যাগ করিনি যা আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে করতে দেখেছি।তারপর ‘আলী (রাঃ) আবূ বাকর (রাঃ)-কে বললেনঃ যুহরের পর আপনার হাতে বাই‘আত গ্রহণের ওয়াদা রইল। যুহরের সালাত আদায়ের পর আবূ বাকর (রাঃ) মিম্বারে বসে তাশাহুদ পাঠ করলেন, তারপর ‘আলী (রাঃ)-এর বর্তমান অবস্থা এবং বাই‘আত গ্রহণে তাঁর দেরি করার কারণ ও তাঁর পেশকৃত আপত্তিগুলো তিনি বর্ণনা করলেন।এরপর ‘আলী (রাঃ) দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাশাহুদ পাঠ করলেন এবং আবূ বাকর (রাঃ)-এর মর্যাদার কথা উল্লেখ করে বললেন, তিনি যা কিছু করেছেন তা আবূ বাকর (রাঃ)-এর প্রতি হিংসা কিংবা আল্লাহ প্রদত্ত তাঁর মর্যাদাকে অস্বীকার করার জন্য করেননি। (তিনি বলেন) তবে আমরা ভেবেছিলাম যে, এ ব্যাপারে আমাদেরও পরামর্শ দেয়ার অধিকার থাকবে। অথচ তিনি [আবূ বাকর (রাঃ)] আমাদের পরামর্শ ত্যাগ করে স্বাধীন মতের উপর রয়ে গেছেন। তাই আমরা মানসিক কষ্ট পেয়েছিলাম। মুসলিমগণ আনন্দিত হয়ে বললেন, আপনি ঠিকই করেছেন। এরপর ‘আলী (রাঃ) আমর বিল মা‘রূফ-এর পানে ফিরে আসার কারণে মুসলিমগণ আবার তাঁর নিকটবর্তী হতে শুরু করলেন।

[১] ফাতিমা (রাঃ) মৃত্যুর পূর্বে ওয়াসিয়াত করেন যে, তাঁর মৃত্যু হলে যেন অনতিবিলম্বে দাফন করা হয়। লোকজন ডাকাডাকি করলে তাতে পর্দার ব্যাঘাত ঘটবে, সেজন্য ‘আলী (রাঃ) রাতের ভিতরেই সব কাজ সমাধা করেছেন।

সহীহ বুখারী হাদিস ৪২৪০-এর সারসংক্ষেপ

এই হাদিসে নবীজির সম্পত্তি, সদকা এবং সাহাবীদের পারস্পরিক সমঝোতার একটি স্পর্শকাতর ঘটনা এসেছে। ফাতিমা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর রেখে যাওয়া মদিনা, ফাদাক ও খাইবারের অংশ থেকে মীরাস চাইলে আবু বকর (রাঃ) নবীজির বাণী তুলে ধরেন—নবীগণ যা রেখে যান, তা সদকা। তিনি বলেন, এ সম্পদের ব্যবস্থাপনায় তিনি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর পথ বদলাবেন না। এতে ফাতিমা (রাঃ) কষ্ট পান। পরে আলী (রাঃ) আবু বকর (রাঃ)-এর সঙ্গে কথা বলেন, নিজের কষ্টের কারণ জানান এবং বাইআত করেন। এখানে মূল শিক্ষা হলো, মতভেদ হলেও নবীজির সুন্নাহকে মানা, আহলে বাইতের মর্যাদা রাখা এবং প্রকাশ্যভাবে ভুল বোঝাবুঝি দূর করা। বিষয়টি বিচার করতে হলে হাদিসের শব্দ ও সীমার মধ্যেই থাকা দরকার।

এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা

  • নবীজির সুন্নাহ অনুযায়ী সম্পদের ব্যবস্থাপনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
  • আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান রাখার শিক্ষা পাওয়া যায়।
  • মতভেদ হলে আলোচনা ও সমঝোতার পথ খোলা রাখা উচিত।
  • কোনো স্পর্শকাতর বিষয়ে হাদিসের সীমার বাইরে দাবি করা ঠিক নয়।

সেটিংস

ভাষা

ফন্ট সেটিংস

আরবি ফন্ট ফেস

আরবি ফন্ট সাইজ

২৪

অনুবাদ ফন্ট সাইজ

১৮

রিডিং লেআউট

আল হাদিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন

App Banner

ইসলামের জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হোন

আপনার নিয়মিত সহায়তা আমাদের দ্বীনি ভাই-বোনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সাহয্য করবে। আমাদের মিশনে আপনিও অংশ নিন এবং বড় পরিবর্তনের অংশীদার হোন।

সাপোর্ট করুন