১৪/১. অধ্যায়ঃ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন,﴾ وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمَاً ﴾ ﴿অর্থাৎ, বল, হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি কর। (ত্বা-হা ১১৪)তিনি সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা অন্যত্র বলেন,﴿قُلْ هَلْ يَسْتَوي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لاَ يَعْلَمُونَ ﴾অর্থাৎ, বল, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান? (যুমার ৯)আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আরো বলেন,﴿يَرْفَعِ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا العِلْمَ دَرَجَاتٍ﴾অর্থাৎ, যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন। (মুজাদালা ১১)।তিনি অন্য জায়গায় বলেন,﴿إنَّمَا يَخْشَى اللهَ مِنْ عِبَادِهِ العُلَمَاءُ﴾অর্থাৎ, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে থাকে। (ফাত্বের ২৮)আর এ কথা বিদিত যে, মহানবী (ﷺ) বলেছেন, “ইল্ম অনুসন্ধান করা প্রত্যেক (নর-নারী) মুসলিমের জন্য আবশ্যক।” (সঃ জামে‘২৯১৩, সঃ তারগীব ৭২)
وَعَن مُعَاوِيةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَنْ يُرِدِ اللهُ بِهِ خَيْراً يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ متفقٌ عَلَيْهِ
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকেই দ্বীনী জ্ঞান দান করেন।”
(বুখারী ৭১, ৩১১৬, ৭৩১২, মুসলিম ২৪৩৬, ২৪৩৯, ইবনে মাজাহ)
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ لاَ حَسَدَ إِلاَّ فِي اثْنَتَيْنِ : رَجُلٌ آتَاهُ اللهُ مَالاً، فَسَلَّطَهُ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الحَقِّ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللهُ الحِكْمَةَ فَهُوَ يَقْضِي بِهَا وَيُعَلِّمُهَا متفقٌ عَلَيْهِ
তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “কেবল দু’জন ব্যক্তি ঈর্ষার পাত্র। সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেছেন এবং তাকে তা সৎপথে ব্যয় করার শক্তিও দিয়েছেন। আর সেই লোক যাকে আল্লাহ জ্ঞান-বুদ্ধি দান করেছেন, যার বদৌলতে সে বিচার-ফায়সালা ক’রে থাকে ও তা অপরকে শিক্ষা দেয়।”
* এখানে ঈর্ষা বলতে, অপরের ধন ও জ্ঞান দেখে মনে মনে তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা। সেই সাথে এই কামনা থাকে না যে, অপরের ধ্বংস হয়ে যাক। (বুখারী ৭৩, ১৪০৯, মুসলিম ১৯৩৩)
وَعَن أَبي مُوسَى قَالَ : قَالَ النَّبِيُّ ﷺ مَثَلُ مَا بَعَثَنِي الله بِهِ مِنَ الهُدَى وَالعِلْمِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَصَابَ أَرْضاً؛ فَكَانَتْ مِنْهَا طَائِفَةٌ طَيِّبةٌ قَبِلَتِ المَاءَ فَأَنْبَتَتِ الكَلأَ وَالعُشْبَ الكَثِيرَ وَكَانَ مِنْهَا أَجَادِبُ أَمْسَكَتِ المَاءَ فَنَفَعَ اللهُ بِهَا النَّاسَ فَشَرِبُوا مِنْهَا وَسَقَوْا وَزَرَعُوا، وَأَصَابَ طَائِفَةً مِنْهَا أُخْرَى إِنَّمَا هِيَ قِيعَانٌ؛ لاَ تُمْسِكُ مَاءً وَلاَ تُنْبِتُ كَلأً فَذَلِكَ مَثَلُ مَنْ فَقُهَ فِي دِينِ اللهِ وَنَفَعَهُ مَا بَعَثَنِي اللهُ بِهِ فَعَلِمَ وَعَلَّمَ وَمَثَلُ مَنْ لَمْ يَرْفَعْ بِذَلِكَ رَأساً وَلَمْ يَقْبَلْ هُدَى اللهِ الَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِمتفقٌ عَلَيْهِ
রাসূল (ﷺ) বলেন, “যে সরল পথ ও জ্ঞান দিয়ে আমাকে পাঠানো হয়েছে তা ঐ বৃষ্টি সদৃশ যা যমীনে পৌঁছে। অতঃপর তার উর্বর অংশ নিজের মধ্যে শোষণ করে। অতঃপর তা ঘাস এবং প্রচুর শাক-সব্জি উৎপন্ন করে। এবং তার এক অংশ চাষের অযোগ্য (খাল জমি); যা পানি আটকে রাখে। ফলে আল্লাহ তাআলা তার দ্বারা মানুষকে উপকৃত করেন। সুতরাং তারা তা হতে পান করে এবং (পশুদেরকে) পান করায়, জমি সেচে ও ফসল ফলায়। তার আর এক অংশ শক্ত সমতল ভূমি; যা না পানি শোষণ করে, না ঘাস উৎপন্ন করে।এই দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির যে আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে জ্ঞানার্জন করল এবং আমি যে হিদায়াত ও জ্ঞান দিয়ে প্রেরিত হয়েছি, তার দ্বারা আল্লাহ তাকে উপকৃত করলেন। সুতরাং সে (নিজেও) শিক্ষা করল এবং (অপরকেও) শিক্ষা দিল। আর এই দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তিরও যে এ ব্যাপারে মাথাও উঠাল না এবং আল্লাহর সেই হিদায়াতও গ্রহণ করল না, যা দিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি।”
(বুখারী ৭৯, মুসলিম ৬০৯৩)
وَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ لِعَلِيٍّ فَوَاللهِ لأَنْ يَهْدِيَ اللهُ بِكَ رَجُلاً وَاحِداً خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ متفقٌ عَلَيْهِ
নবী (ﷺ) (খায়বার যুদ্ধের সময়) আলী (রাঃ) কে সম্বোধন করে বললেন, “আল্লাহর শপথ! তোমার দ্বারা একটি মানুষকেও যদি আল্লাহ সৎপথ দেখান, তবে তা (আরবের মহামূল্যবান) লাল উট অপেক্ষা উত্তম হবে।”
(বুখারী ৩০০৯, ৩৭০১, ৪২১০, মুসলিম ৬৩৭৬)
وَعَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمرِو بنِ العَاصِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا: أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً وَحَدِّثُوا عَنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلاَ حَرَجَ وَمَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّداً فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ رواه البخاري
নবী (ﷺ) বলেছেন, “আমার পক্ষ থেকে জনগণকে (আল্লাহর বিধান) পৌঁছে দাও, যদিও একটি আয়াত হয়। বনী-ইস্রাঈল থেকে (ঘটনা) বর্ণনা কর, তাতে কোন ক্ষতি নেই। আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যা (বা জাল হাদীস) আরোপ করল, সে যেন নিজ আশ্রয় জাহান্নামে বানিয়ে নিল।”
** (প্রকাশ থাকে যে, বনী-ইস্রাঈল হতে কেবল ইসলাম সমর্থিত হাদীস বর্ণনা করতে পারা যায়। ব্যাপকভাবে তাদের সব রকম হাদীস গ্রহণ করা সমীচীন নয়। আর রসূল (ﷺ) এর নামে মিথ্যা আরোপ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ফলে হাদীস অতি সতর্কভাবে বর্ণনা করা আবশ্যক এবং জাল ও দুর্বল হাদীস থেকে বিরত থাকা নৈতিক কর্তব্য। সহীহ-যয়ীফ হাদীসের গ্রন্থ ও কম্পিউটার প্রোগ্রাম বর্তমানে প্রায় সর্বত্র সুলভ। সুতরাং হাদীস সম্বন্ধেও যাচাই-বাছাই করা মুসলিমদের একটি দ্বীনী কর্তব্য।)(বুখারী ৩৪৬১)
عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِى بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلاَّ نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلاَئِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ وَمَنْ بَطَّأَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسَبُهُ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি এমন পথ অবলম্বন করে চলে যাতে সে ইলম (শরয়ী জ্ঞান) অন্বেষণ করে, আল্লাহ তার বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতে যাওয়ার পথ সহজ করে দেন। যখনই কোন একদল মানুষ আল্লাহর গৃহসমূহের কোন এক গৃহে (মসজিদে) সমবেত হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং আপোসে তা অধ্যয়ন করে তখনই ফেরেশতাবর্গ তাদেরকে পরিবেষ্টিত করে নেন, তাদের উপর প্রশান্তি অবতীর্ণ হয়, করুণা তাদেরকে আচ্ছাদন করে নেয় এবং তাদের কথা আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাবর্গের মধ্যে আলোচনা করেন। আর যাকে তার আমল পশ্চাদ্বর্তী করেছে, তাকে তার বংশ অগ্রবর্তী করতে পারে না।”
(মুসলিম ৭০২৮, বুখারী শিরোনামে, আবু দাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম)
وَعَنه أَيضاً أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَمَنْ دَعَا إِلَى هُدىً كَانَ لَهُ مِنَ الأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئاً رواه مسلم
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি সৎপথের দিকে আহ্বান জানাবে, সে তার অনুসারীদের সমতুল্য নেকীর অধিকারী হবে; তাতে তাদের নেকীর কিছুই হ্রাস পাবে না।”
(মুসলিম ৬৯৮০)
وَعَنه قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا مَاتَ ابْنُ آدَمَ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاثٍ : صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ رواه مسلم
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “আদম সন্তান যখন মারা যায়, তখন তার তিন প্রকার আমল ছাড়া অন্য সব রকম আমলের ধারা বন্ধ হয়ে যায়; সাদকাহ জারিয়াহ (বহমান দান খয়রাত, মসজিদ নির্মাণ করা, কূপ খনন করে দেওয়া ইত্যাদি) অথবা ইলম (জ্ঞান সম্পদ) যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় অথবা সুসন্তান যে তার জন্য নেক দোয়া করতে থাকে।”
(মুসলিম ৪৩১০ প্রমুখ)
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ مِمَّا يَلْحَقُ الْمُؤْمِنَ مِنْ عَمَلِهِ وَحَسَنَاتِهِ بَعْدَ مَوْتِهِ عِلْمًا عَلَّمَهُ وَنَشَرَهُ وَوَلَدًا صَالِحًا تَرَكَهُ وَمُصْحَفًا وَرَّثَهُ أَوْ مَسْجِدًا بَنَاهُ أَوْ بَيْتًا لاِبْنِ السَّبِيلِ بَنَاهُ أَوْ نَهْرًا أَجْرَاهُ أَوْ صَدَقَةً أَخْرَجَهَا مِنْ مَالِهِ فِي صِحَّتِهِ وَحَيَاتِهِ يَلْحَقُهُ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهِ
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “মুমিনের মৃত্যুর পর তার আমল ও পুণ্যকর্মসমূহ হতে নিশ্চিতভাবে যা এসে তার সাথে মিলিত হয় তা হল; সেই ইলম, যা সে শিক্ষা করে প্রচার করেছে অথবা নেক সন্তান যাকে রেখে সে মারা গেছে, অথবা কোরআন শরীফ যা সে মীরাসরূপে ছেড়ে গেছে, অথবা মসজিদ যা সে নিজে নির্মাণ করে গেছে, অথবা মুসাফিরখানা যা সে মুসাফিরদের সুবিধার্থে নির্মাণ করে গেছে, অথবা পানির নালা যা সে (সেচ ইত্যাদির উদ্দেশ্যে) প্রবাহিত করে গেছে, অথবা সাদকাহ যা সে নিজের মাল থেকে তার সুস্থ ও জীবিতাবস্থায় বের (দান) করে গেছে এসব কর্মের সওয়াব তার মৃত্যুর পরও তার সাথে এসে মিলিত হবে।”
(ইবনে মাজাহ ২৪২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৩৪৪৮, ইবনে খুযাইমাহ ২৪৯০ ভিন্ন শব্দে, সহীহ তারগীব ১০৭)
وَعَنه قَالَ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَقُولُالدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ مَلْعُونٌ مَا فِيهَا إِلاَّ ذِكْرَ اللهِ تَعَالَى وَمَا وَالاَهُ وَعَالِماً أَوْ مُتَعَلِّماً رواه الترمذي وقالحديث حسن
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে বলতে শুনেছি, “পৃথিবী অভিশপ্ত এবং অভিশপ্ত তার সকল বস্তু। তবে আল্লাহর যিকর ও তার আনুষঙ্গিক বিষয়, এবং আলেম (দ্বীন শিক্ষক) ও তালেবে ইলম (দ্বীন শিক্ষার্থী অভিশপ্ত) নয়।”
(তিরমিযী ২৩২২, ইবনে মাজাহ ৪১১২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ১৭০৮, সহীহ তারগীব ৭০)