১/০. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ১২-[১১] - শাহাদাত সালাত যাকাতের নিরাপত্তা
ঈমান (বিশ্বাস) - প্রথম অনুচ্ছেদ
إِيْمَانِ (ঈমা-ন)-এর শাব্দিক অর্থ বিশ্বাস স্থাপন করা, সত্যায়ন করা ইত্যাদি। এর শার‘ঈ অর্থ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। হানাফীদের মতে : নাবী (ﷺ) দ্বীনের অত্যাবশ্যকীয় বিস্তারিত এবং সংক্ষিপ্ত যে বিধানাবলী নিয়ে এসেছেন সেগুলোর ক্ষেত্রে কোন দলীল না থাকলেও চূড়ান্তভাবে তাকে সত্যায়ন করা। ঈমানটি তাদের নিকট যৌগিক কোন বিষয় নয় বরং এটি (بَسِيْطٌ) বাসীত্ব (একক) যা পরিমাণের দৃষ্টিকোণ থেকে কম-বেশি গ্রহণ করে না।(অর্থাৎ- ঈমান কোন সৎকাজের মাধ্যমে বৃদ্ধি পায় না এবং পাপ কাজের মাধ্যমে হ্রাস পায় না)। মুরজিয়াহ্ সম্প্রদায়ের মতে : ঈমান হলো শুধুমাত্র বিশ্বাস স্থাপন করা। জিহবার স্বীকৃতি ঈমানের কোন রুকনও না, শর্তও না। ফলে হানাফীদের মতো তারাও ‘আমালকে ঈমানের প্রকৃত অর্থের বহির্ভূত গণ্য করেছে এবং ঈমানের আংশিকতাকে অস্বীকার করেছে। তবে হানাফীরা এর (‘আমালের) প্রতি গুরুত্বারোপ, এর প্রতি উদ্বুদ্ধ এবং ঈমান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটিকে একটি কারণ হিসেবে গণ্য করলেও মুরজিয়ারা এটিকে সমূলে ধ্বংস করে বলেছে ‘আমালের কোন প্রয়োজন নেই।শুধুমাত্র বিশ্বাস স্থাপন করলেই পরিত্রাণ মিলবে তাতে যে যত অপরাধই করুক না কেন। কার্রামিয়্যাহ্ সম্প্রদায়ের মতে : ঈমান হলো শুধুমাত্র উচ্চারণ করা। ফলে তাদের নিকট নাজাতের জন্য মৌখিক স্বীকৃতিই যথেষ্ট, চাই সত্যায়ন পাওয়া যাক বা না যাক।ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ, আহমাদসহ জমহূর ‘উলামাগণের মতে : ঈমান হলো অন্তরে বিশ্বাস করা, জিহবায় উচ্চারণ করা এবং রুকনসমূহের প্রতি ‘আমাল করা। তাদের নিকট ঈমান একটি যৌগিক বিষয় যা কমে এবং বৃদ্ধি পায়। এ বিষয়ে কুরআন সুন্নাহর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। এটিই হলো সর্বাধিক সঠিক অভিমত। মু‘তাযিলাহ্ এবং খারিজীগণের নিকট ঈমানের সংজ্ঞা জমহূরের মতই তবে উভয়ের মাঝে পার্থক্য হলো ঈমানের সকল অংশকে জমহূর সমান হিসেবে গণ্য করেননি। ফলে তাদের নিকট ‘আমালসমূহ যেমন সলাতের ওয়াজিব বিষয়গুলো তার রুকনের মতো নয়।অতএব ‘আমাল না থাকলে কোন ব্যক্তি ঈমানের গণ্ডী থেকে বের না হয়ে তার মধ্যেই থাকবে এবং ‘আমাল পরিত্যাগকারী অনুরূপ কাবীরাহ্ (কবিরা) গুনাহে জড়িত ব্যক্তি ফাসিক্ব-মু‘মিন থাকবে সে কাফির হয়ে যাবে না। পক্ষান্তরে কারো মাঝে যদি শুধু তাসদীক না পাওয়া যায় তাহলে সে মুনাফিক্ব আর ইক্বরার বা স্বীকৃতি না পাওয়া গেলে কাফির। কিন্তু যদি শুধুমাত্র ‘আমালগত ত্রুটি থাকে তাহলে সে ফাসিক্ব যে জাহান্নামে চিরদিন অবস্থান করা থেকে পরিত্রাণ পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর খারিজী এবং মু‘তাজিলীরা যৌগিক ঈমানের সকল অংশকে সমান হিসেবে গণ্য করে এভাবে যে, ঈমানের কিছু অংশ বাদ পড়লে সমস্তটাই বাদ বলে পরিগণিত হবে। আর ‘আমালটি তাদের নিকট ঈমানের একটি রুকন যেমনটি সলাতের বিভিন্ন রুকন রয়েছে।তাই ‘আমাল পরিত্যাগকারী তাদের নিকট ঈমান বহির্ভূত লোক। খারিজীদের মতে কাবীরাহ্ (কবিরা) গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি অনুরূপ ‘আমাল পরিত্যাগকারী ব্যক্তি কাফির যে জাহান্নামে চিরকাল অবস্থান করবে। আর মু‘তাজিলাদের মতে সে মু‘মিনও নয় কাফিরও নয় বরং তাকে ফাসিক্ব বলা হবে যে চিরস্থায়ী জাহান্নামী।
শাহাদাত সালাত যাকাত ও জান-মালের নিরাপত্তা
মিশকাতুল মাসাবীহ : ১২-[১১]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ১২-[১১]
وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتّى يَشْهَدُوا أَنْ لَّا إِلهَ اِلَّا اللّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَّسُوْلُ اللهِ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ فَإِذَا فَعَلُوا ذلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ اِلَّا بِحَقِّ الْإِسْلَامِ وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللهِ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ. اِلَّا أَنَّ مُسْلِمًا لَمْ يَذْكُرْ : اِلَّا بِحَقِّ الإِسْلَام
ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আল্লাহর পক্ষ হতে আমাকে হুকুম দেয়া হয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত লোকেরা এ কথা স্বীকার করে সাক্ষ্য না দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন মাবুদ নেই, আর মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল এবং সালাত আদায় করবে ও যাকাত আদায় করবে– ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার। যখন তারা এরূপ কাজ করবে আমার পক্ষ হতে তাদের জান ও মাল নিরাপদ থাকবে। কিন্তু ইসলামের বিধান অনুযায়ী কেউ যদি কোন দণ্ড পাওয়ার উপযোগী কোন অপরাধ করে, তবে সে দণ্ড তার উপর কার্যকর হবে। তারপর তার অদৃশ্য বিষয়ের (অন্তর সম্পর্কে) হিসাব ও বিচার আল্লাহর উপর ন্যস্ত। [১]
[১] সহীহ : বুখারী ২৫, মুসলিম ২২, সহীহ ইবনু হিব্বান ১৭৫, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫১৪১; মুসলিমের শব্দ হলো اِلَّا بِحَقِّهَا।তবে সহীহ মুসলিমে “কিন্তু ইসলামের বিধান অনুযায়ী” বাক্যটি উল্লেখ করেননি।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ১২-[১১]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে ইসলামের প্রকাশ্য পরিচয় ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা এসেছে। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) বলেছেন, তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (صلى الله عليه وسلم) আল্লাহর রাসূল, সালাত আদায় করে ও যাকাত দেয়। যখন তারা তা করবে, তখন তাদের জান-মাল তাঁর পক্ষ থেকে নিরাপদ থাকবে, তবে ইসলামের ন্যায্য বিধান অনুযায়ী কোনো হক থাকলে তা আলাদা। শেষে বলা হয়েছে, তাদের অন্তরের হিসাব আল্লাহর উপর। হাদিসটি শেখায়, বাহ্যিক ইসলামি পরিচয়ে শাহাদাত, সালাত ও যাকাত গুরুত্বপূর্ণ; আর মানুষের গোপন অবস্থা বিচার করার চূড়ান্ত দায়িত্ব আল্লাহর।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- শাহাদাত, সালাত ও যাকাত ইসলামের প্রকাশ্য পরিচয়ের বড় অংশ।
- মানুষের জান-মাল অন্যায়ভাবে আঘাতের বিষয় নয়।
- ইসলামের ন্যায্য বিধান আলাদা বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
- অন্তরের আসল হিসাব আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হয়।
