১১/০. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ২৫০৫-[১] - হজ্জ ফরজ ও প্রশ্নের আদব
হজ্জ - প্রথম অনুচ্ছেদ
مناسكশব্দটি বহুবচন, এর একবচনمنسك। ইবনু জারীর বলেনঃ ‘আরাবীمنسكঐ স্থানকে বলা হয় যেখানে লোকজন কল্যাণের উদ্দেশে একত্রিত হয়। হজের কার্যসমূহকেمناسكএজন্যই বলা হয়ে থাকে যে, হজ্জের কাজ সম্পাদনের জন্য লোকজন একই জায়গায় বারবার একত্রিত হয়।الحج-এর শাব্দিক অর্থ হলো ‘কোন কিছুকে উদ্দেশ্য করা’। ইসলামী শারী‘আতের পরিভাষায় নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে, নির্দিষ্ট কাজের মাধ্যমে, কাবা ঘরের সম্মানের উদ্দেশে তা যিয়ারত করাকে হজ্জ/হজ বলে।কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা হজ্জ/হজ ফরয হওয়া প্রমাণিত। এর অস্বীকারকারী কাফির এতে কোন দ্বিমত নেই। জীবনে তা শর্তসাপেক্ষে মাত্র একবারই ফরয।হজ্জ/হজ ফরয হওয়ামাত্রই তা সম্পাদন করা ওয়াজিব না-কি তা বিলম্বে পালন করার অবকাশ রয়েছে- এ বিষয়ে ‘উলামাগণের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। ইমাম মালিক, আহমাদ, আবূ ইউসুফ এবং মুযানী-এর মতে তা ফরয হওয়ামাত্রই আদায় করা ওয়াজিব, বিলম্ব করার অবকাশ নেই। পক্ষান্তরে ইমাম শাফি‘ঈ, সাওরী, আওযা‘ঈ ও মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান এর মতে তা বিলম্বে আদায় করার অবকাশ রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)-এর মতে ওজর ব্যতীত বিলম্বকারী গুনাহগার হবে।উত্তম কথা হলো এই যে, যথাসম্ভব দ্রুত হজ্জ/হজ সম্পাদন করা উচিত। কেননা মৃত্যু কখন আসবে তা কেউ জানে না, তাই ফরয হওয়ার পরে তা বিলম্বে আদায় করতে গিয়ে তা আদায় করার পূর্বেই মৃত্যু উপস্থিত হলে, আর তার পক্ষ থেকে তা আদায় করা না হলে নিশ্চিত গুনাহের মধ্যে নিপতিত হতে হবে। আর তা দ্রুত আদায় করা মধ্যেই তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার একমাত্র উপায়। হজ্জ কখন ফরয হয়েছে তা নিয়েও ‘আলিমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ অভিমত হলো নবম হিজরী সালে হজ্জ ফরয করা হয়েছে।
হজ্জ ফরজ: নির্দেশ মানা ও অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন থেকে বাঁচা
মিশকাতুল মাসাবীহ : ২৫০৫-[১]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ২৫০৫-[১]
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ:: خَطَبَنَا رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ فَقَالَ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ فُرِضَ عَلَيْكُمُ الْحَجُّ فَحُجُّوْا» فَقَالَ رَجُلٌ: أَكُلَّ عَامٍ يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ؟ فَسَكَتَ حَتّٰى قَالَهَا ثَلَاثًا فَقَالَ: لَوْ قُلْتُ: نَعَمْ لَوَجَبَتْ وَلَمَا اسْتَطَعْتُمْ ثُمَّ قَالَ: ذَرُوْنِىْ مَا تَرَكْتُكُمْ فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِكَثْرَةِ سُؤَالِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ عَلَى انْبِيَائِهِمْ فَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَىْءٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَىْءٍ فَدَعُوْهُ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
একবার রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দানকালে বললেন, হে মানবমণ্ডলী! আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের ওপর হজ্জ ফরজ করেছেন, সুতরাং তোমরা হজ্জ পালন করবে। তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! এটা (হজ্জ পালন) কি প্রত্যেক বছরই? তিনি (ﷺ) চুপ থাকলেন। লোকটি এভাবে তিনবার জিজ্ঞেস করলো। অতঃপর তিনি (ﷺ) বললেন, আমি যদি হ্যাঁ বলতাম, তবে তা (হজ্জ প্রতি বছর) ফরজ হয়ে যেতো, যা তোমরা (প্রতি বছর হজ্জ পালন করতে) পারতে না।অতঃপর তিনি (ﷺ) বললেন, যে ব্যাপারে আমি তোমাদেরকে কিছু বলিনি সে ব্যাপারটি সেভাবে থাকতে দাও। কেননা তোমাদের পূর্বের লোকেরা বেশি বেশি প্রশ্ন করে ও তাদের নবীদের সাথে মতবিরোধ করার কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তাই আমি যখন তোমাদেরকে কোন বিষয়ে নির্দেশ করবো তা যথাসাধ্য পালন করবে এবং যে বিষয়ে নিষেধ করবো তা পরিত্যাগ করবে।(মুসলিম)[১]
[১] সহীহ : মুসলিম ১৩৩৭, নাসায়ী ২৬১৯, আহমাদ ১০৬০৭, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ২৫০৮, সহীহ ইবনু হিব্বান ৩৭০৪, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮৬১৫, ইরওয়া ৯৮০।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ২৫০৫-[১]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন যে আল্লাহ মানুষের ওপর হজ্জ ফরজ করেছেন, তাই হজ্জ পালন করতে হবে। এক ব্যক্তি জানতে চাইলেন, প্রতি বছর কি হজ্জ করতে হবে? তিনি বারবার প্রশ্ন করলেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে চুপ থাকেন। পরে বলেন, যদি তিনি হ্যাঁ বলতেন, তবে তা ফরজ হয়ে যেত এবং মানুষ তা করতে পারত না। এরপর তিনি একটি বড় নীতি শেখালেন: যেসব বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি, সেগুলো নিয়ে বেশি প্রশ্ন না করা। আর যখন কোনো নির্দেশ দেন, সাধ্য অনুযায়ী পালন করা; আর কোনো বিষয়ে নিষেধ করলে তা ছেড়ে দেওয়া। হজ্জ ফরজের হাদিসে ইবাদতের সহজ পথ ও আনুগত্যের শিক্ষা আছে।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- হজ্জ ফরজ হলে সামর্থ্য অনুযায়ী তা পালন করা মুসলিমের দায়িত্ব।
- অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন কখনো মানুষের ওপর কঠিনতা বাড়াতে পারে।
- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নির্দেশ করেছেন, তা সাধ্য অনুযায়ী পালন করতে হবে।
- নিষেধ করা বিষয় থেকে বিরত থাকা স্পষ্ট আনুগত্যের অংশ।
