১৩/১১. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৩২৭৭-[৪] - হালালকে হারাম করলে কাফফারা
খুলা (খুলা তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে - প্রথম অনুচ্ছেদ
খুলা‘ শব্দটি ‘আরবীخُلْعُِ الثوبথেকে নেয়া হয়েছে, ‘আরবেরা এ কথা তখনই বলেاذا ازالهযখন কাপড় খুলে ফেলানো হয়। কেননা নারী পুরুষের পোষাক স্বরূপ, অনুরূপ পুরুষও নারীর পোষাক স্বরূপ। আল্লাহর বাণী : ’‘স্ত্রীগণ তোমাদের পোষাক স্বরূপ তোমরাও তাদের পোষাক।’’ (সূরা আল বাকারাহ্ ২ : ১৮৭)ইসলামের পরিভাষায় মহিলা তার স্বামীর নিকট থেকে কোনো কিছুর (মোহরের) বিনিময়ে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়াকে খুলা‘ বলা হয়।কুরআন ও সহীহ হাদীসে খুলা‘ করার বৈধতা রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ’‘অতঃপর যদি তোমাদের ভয় হয় যে, তারা উভয়েই আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে সেক্ষেত্রে স্ত্রী যদি কিছু বিনিময় দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় তবে উভয়ের কারো পাপ হবে না।’’ (সূরা আল বাকারহ্ ২ : ১২৯)নিম্নের বিশুদ্ধ হাদীসটিসহ একাধিক বিশুদ্ধ হাদীসও খুলা‘ বৈধ হওয়ার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। খুলা‘ তালাক কিনা? এ নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে ইখতিলাফ বিদ্যমান।ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-সহ কতিপয় ইমামের মতে খুলা‘ তালাক। পক্ষান্তরে ইমাম আহমাদসহ আরো কতিপয় ফকীহরে মতে খুলা‘ তালাক নয়। বরং ‘ফাস্খে নিকাহ’ বা বিবাহ বাতিল করা। পূর্বে উল্লেখিত আভিধানিক অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখেও বলা যায়। খুলা‘ হলো বিবাহ খুলে ফেলানো।মিশকাতের আধুনিক ভাষ্যগ্রন্থ আনোয়ারুল মিশকাতের ব্যাখ্যাকার ইমাম আহমাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তিনি বলেছেন, খুলা‘ তালাক নয়, বরং ‘বিচ্ছেদ।’ কেননা আল্লাহর কালামে বলা হয়েছে- অর্থাৎ ’‘তালাক দু’বার ..., অতঃপর সে যদি তালাক দেয়’’- (সূরা আত্ব তালাক ৬৫ : ২৯-৩০)। এ শেষ বাক্যের পূর্বে খুলা‘র কথা বর্ণনা করা হয়েছে।এতে বুঝা যায় যে, খুলা‘ তালাক নয়। কেননা প্রথমে ২ তালাক, খুলা‘কে যদি তালাক ধরা হয় তাহলে সেটা এক তালাক, পরের বাক্যে (এক) তালাক উল্লেখ হয়েছে, এতে মোট ৪ তালাক হয়। অথচ এটা কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং খুলা‘ তালাক নয় বরং ‘ফাসখে নিকাহ’ বা বিবাহ ভঙ্গ মাত্র। অবশ্য খুলা‘কে ত্বলাক (তালাক)ের বর্ণনার মধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র।তালাক ও তাহলীল গ্রন্থকার হাফিয ইবনু কইয়িম-এর বরাত দিয়ে লিখেছেন, তিনি বলেন, খুলা‘ যে তালাক নয়, তার প্রমাণ হলো ত্বলাক (তালাক)ের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা যে তিনটি বিধানের কথা বলেছেন, যেগুলোর সব কটি খুলা‘তে পাওয়া যায় না। সে তিনটি নিম্নরূপ :(১) ত্বলাক (তালাক)ে রজ্‘ই-এর পর স্বামী তার স্ত্রীকে ‘ইদ্দাতের মধ্যে বিনা বিবাহ ও (বিনা বাধায়) ফিরিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু খুলা‘ হলে স্ত্রীর সম্মতি ব্যতীত তা পারবে না।(২) ‘তালাক’ তিন পর্যন্ত সীমিত। তালাক সংখ্যা পূর্ণ হয়ে গেলে স্ত্রীর অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ ও মিলন না হওয়া পর্যন্ত প্রথম স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিতে পারবে না। কিন্তু খুলা‘য় স্ত্রীকে অপর কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েই প্রথম স্বামীর কাছে নতুন বিবাহের মাধ্যমে ফিরে যেতে পারবে।(৩) খুলা‘র ‘ইদ্দত হলো এক ঋতু। পক্ষান্তরে সহবাসকৃত স্ত্রীর ‘ইদ্দত হলো তিন তুহর।(‘তালাক ও তাহলীল’ ১১-১২ পৃঃ, ড. আসাদুল্লাহ আল গালীব)এ ছাড়াও ঋতুকালে কিংবা পবিত্রকালে, ঋতু পরবর্তী সহবাসকৃত কিংবা সহবাসহীন, সকল অবস্থায়ই খুলা‘ করতে পারে, কিন্তু ঋতুকালে তালাক দেয়ার বিধান নেই। অনুরূপ ঋতুর পর সহবাসের পূর্বে তালাক দিতে হবে সহবাসের পরে নয়।স্বামী স্ত্রী উভয়ের যদি দাম্পত্য জীবন মনোমালিন্য, অসহনীয় এবং অপছন্দনীয় হয়; স্বামী যদি বিচ্ছিন্ন হতে চায় তবে সেটা তার হাতে এবং সে তা প্রয়োগ করবে। আর যদি স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হতে চায়, তবে তার হাতে রয়েছে খুলা‘ এবং সে এটা প্রয়োগ করবে। সুতরাং খুলা‘ ও তালাক ভিন্ন বস্তু তা স্পষ্ট।(ফিকহুস্ সুন্নাহ্ ২য় খন্ড, পৃঃ ২৯৯, বৈরুত)
হালালকে হারাম করলে কাফফারার শিক্ষা
মিশকাতুল মাসাবীহ : ৩২৭৭-[৪]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৩২৭৭-[৪]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: فِي الْحَرَامِ يُكَفَّرُ لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ الله أُسْوَة حَسَنَة
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
কোনো ব্যাপারে (হালালকে হারাম করলে) কাফ্ফারা দিতে হবে, “নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মধ্যে (জীবনীতে) রয়েছে উত্তম আদর্শ”।
[১] সহীহ : বুখারী ৪৯১১, মুসলিম ১৪৭৩, ইবনু মাজাহ ২০৭৩, আহমাদ ১৯৭৬। তবে আহমাদ-এর সানাদটি মুনক্বতি‘।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৩২৭৭-[৪]-এর সারসংক্ষেপ
এই বর্ণনায় ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, কোনো হালাল বিষয়কে নিজের ওপর হারাম করলে কাফফারা দিতে হবে। এরপর তিনি বলেন, নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। হাদিসের পাঠ খুব সংক্ষিপ্ত, তাই ব্যাখ্যাও মূল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা দরকার। এখানে মূল বিষয় হলো, মানুষ কখনো নিজের কথা, শপথ বা সিদ্ধান্তের কারণে কোনো হালাল জিনিস নিজের ওপর নিষিদ্ধ করে ফেলে। এমন অবস্থায় কাফফারার আলোচনা এসেছে। একই সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর জীবনকে আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরের বর্ণনায় মধুর ঘটনার সঙ্গে এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। এই হাদিস কাফফারা, হালাল-হারাম এবং নবীজির আদর্শ অনুসরণের বিষয়ে সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- হালাল বিষয় নিজের ওপর হারাম করার ক্ষেত্রে কাফফারার কথা এসেছে।
- রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর জীবন মুমিনের জন্য আদর্শ।
- শপথ বা কথার বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার।
- হালাল-হারামের সীমা আল্লাহর বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
