১/০. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৮-[৭] - ঈমানের স্বাদ পাওয়ার তিন গুণ
ঈমান (বিশ্বাস) - প্রথম অনুচ্ছেদ
إِيْمَانِ (ঈমা-ন)-এর শাব্দিক অর্থ বিশ্বাস স্থাপন করা, সত্যায়ন করা ইত্যাদি। এর শার‘ঈ অর্থ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। হানাফীদের মতে : নাবী (ﷺ) দ্বীনের অত্যাবশ্যকীয় বিস্তারিত এবং সংক্ষিপ্ত যে বিধানাবলী নিয়ে এসেছেন সেগুলোর ক্ষেত্রে কোন দলীল না থাকলেও চূড়ান্তভাবে তাকে সত্যায়ন করা। ঈমানটি তাদের নিকট যৌগিক কোন বিষয় নয় বরং এটি (بَسِيْطٌ) বাসীত্ব (একক) যা পরিমাণের দৃষ্টিকোণ থেকে কম-বেশি গ্রহণ করে না।(অর্থাৎ- ঈমান কোন সৎকাজের মাধ্যমে বৃদ্ধি পায় না এবং পাপ কাজের মাধ্যমে হ্রাস পায় না)। মুরজিয়াহ্ সম্প্রদায়ের মতে : ঈমান হলো শুধুমাত্র বিশ্বাস স্থাপন করা। জিহবার স্বীকৃতি ঈমানের কোন রুকনও না, শর্তও না। ফলে হানাফীদের মতো তারাও ‘আমালকে ঈমানের প্রকৃত অর্থের বহির্ভূত গণ্য করেছে এবং ঈমানের আংশিকতাকে অস্বীকার করেছে। তবে হানাফীরা এর (‘আমালের) প্রতি গুরুত্বারোপ, এর প্রতি উদ্বুদ্ধ এবং ঈমান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটিকে একটি কারণ হিসেবে গণ্য করলেও মুরজিয়ারা এটিকে সমূলে ধ্বংস করে বলেছে ‘আমালের কোন প্রয়োজন নেই।শুধুমাত্র বিশ্বাস স্থাপন করলেই পরিত্রাণ মিলবে তাতে যে যত অপরাধই করুক না কেন। কার্রামিয়্যাহ্ সম্প্রদায়ের মতে : ঈমান হলো শুধুমাত্র উচ্চারণ করা। ফলে তাদের নিকট নাজাতের জন্য মৌখিক স্বীকৃতিই যথেষ্ট, চাই সত্যায়ন পাওয়া যাক বা না যাক।ইমাম মালিক, শাফি‘ঈ, আহমাদসহ জমহূর ‘উলামাগণের মতে : ঈমান হলো অন্তরে বিশ্বাস করা, জিহবায় উচ্চারণ করা এবং রুকনসমূহের প্রতি ‘আমাল করা। তাদের নিকট ঈমান একটি যৌগিক বিষয় যা কমে এবং বৃদ্ধি পায়। এ বিষয়ে কুরআন সুন্নাহর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। এটিই হলো সর্বাধিক সঠিক অভিমত। মু‘তাযিলাহ্ এবং খারিজীগণের নিকট ঈমানের সংজ্ঞা জমহূরের মতই তবে উভয়ের মাঝে পার্থক্য হলো ঈমানের সকল অংশকে জমহূর সমান হিসেবে গণ্য করেননি। ফলে তাদের নিকট ‘আমালসমূহ যেমন সলাতের ওয়াজিব বিষয়গুলো তার রুকনের মতো নয়।অতএব ‘আমাল না থাকলে কোন ব্যক্তি ঈমানের গণ্ডী থেকে বের না হয়ে তার মধ্যেই থাকবে এবং ‘আমাল পরিত্যাগকারী অনুরূপ কাবীরাহ্ (কবিরা) গুনাহে জড়িত ব্যক্তি ফাসিক্ব-মু‘মিন থাকবে সে কাফির হয়ে যাবে না। পক্ষান্তরে কারো মাঝে যদি শুধু তাসদীক না পাওয়া যায় তাহলে সে মুনাফিক্ব আর ইক্বরার বা স্বীকৃতি না পাওয়া গেলে কাফির। কিন্তু যদি শুধুমাত্র ‘আমালগত ত্রুটি থাকে তাহলে সে ফাসিক্ব যে জাহান্নামে চিরদিন অবস্থান করা থেকে পরিত্রাণ পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর খারিজী এবং মু‘তাজিলীরা যৌগিক ঈমানের সকল অংশকে সমান হিসেবে গণ্য করে এভাবে যে, ঈমানের কিছু অংশ বাদ পড়লে সমস্তটাই বাদ বলে পরিগণিত হবে। আর ‘আমালটি তাদের নিকট ঈমানের একটি রুকন যেমনটি সলাতের বিভিন্ন রুকন রয়েছে।তাই ‘আমাল পরিত্যাগকারী তাদের নিকট ঈমান বহির্ভূত লোক। খারিজীদের মতে কাবীরাহ্ (কবিরা) গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি অনুরূপ ‘আমাল পরিত্যাগকারী ব্যক্তি কাফির যে জাহান্নামে চিরকাল অবস্থান করবে। আর মু‘তাজিলাদের মতে সে মু‘মিনও নয় কাফিরও নয় বরং তাকে ফাসিক্ব বলা হবে যে চিরস্থায়ী জাহান্নামী।
ঈমানের স্বাদ পাওয়ার তিনটি গুণ
মিশকাতুল মাসাবীহ : ৮-[৭]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৮-[৭]
وَعَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ : ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ مَنْ كَانَ اللّهُ وَرَسُوْلُهٗ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَمَنْ أَحَبَّ عَبْدًا لَا يُحِبُّهٗ اِلَّا لِلّهِ وَمَنْ يَكْرَهٗ أَنْ يَعُوْدَ فِى الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللّهُ مِنْهُ كَمَا يَكْرَه أَنْ يُلْقى فِي النَّارِ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যে লোকের মধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ ঘটে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছে।(১) তার মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালবাসা দুনিয়ার সকল কিছু হতে অধিক প্রিয়।(২) যে লোক কোন মানুষকে কেবলমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই ভালবাসে।(৩) যে লোক কুফরী হতে নাজাতপ্রাপ্ত হয়ে ঈমান ও ইসলামের আলো গ্রহণ করার পর পুনরায় কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে এত অপছন্দ করে যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে। [১]
[১] সহীহ : বুখারী ২১, মুসলিম ৪৩, নাসায়ী ৪৯৮৮, তিরমিযী ২৬২৪, ইবনু মাজাহ ৪০৩৩, আহমাদ ১২৭৬৫।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৮-[৭]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে ঈমানের স্বাদ পাওয়ার তিনটি গুণ বলা হয়েছে। প্রথমত, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সব কিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসা। দ্বিতীয়ত, কাউকে ভালোবাসলে শুধু আল্লাহর জন্য ভালোবাসা। তৃতীয়ত, আল্লাহ কুফরী থেকে মুক্ত করার পর আবার কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপছন্দ করা। এখানে ঈমানের স্বাদ বলতে এমন এক আন্তরিক অবস্থা বোঝানো হয়েছে, যেখানে মানুষ তার বিশ্বাসকে বোঝা মনে করে না; বরং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, রাসূলের প্রতি ভালোবাসা এবং সত্যের প্রতি অটলতা তার জীবনের বড় শক্তি হয়ে যায়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- আল্লাহ ও রাসূলের ভালোবাসা ঈমানকে গভীর করে।
- মানুষকে ভালোবাসা আল্লাহর জন্য হলে তা পবিত্র হয়।
- কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে অপছন্দ করা ঈমানের দৃঢ়তার লক্ষণ।
- ঈমানের স্বাদ অন্তরের ভালোবাসা ও অটলতার সাথে জড়িত।
