১/১. অধ্যায়ঃ
اللهم بارك لنا في رجب وشعبان وبلغنا رمضان.
রমজান কাছে এলে আমরা অনেকে নিম্নের দোয়াটি পড়ি, তবে এমন লোক খুব কম আছি যারা এর শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা সম্পর্কে অবগত-“হে আল্লাহ, আপনি রজব ও শাবান মাসে আমাদের জন্য বরকত রাখুন এবং আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছার তাওফিক দিন”।
হাদিসের সনদ: এ হাদিসের সনদে দুটি দোষ বা সমস্যা রয়েছে, হাদিস বিশারদগণের নিকট যার পারিভাষিক নাম হচ্ছে ইল্লত, অর্থাৎ হাদিসে দুটি ইল্লত রয়েছে: প্রথম ইল্লতঃ এ হাদিসের একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন যায়েদা ইব্ন আবির রাকাদ, তার সম্পর্কে হাদিস বিশারদগণের মূল্যায়ন দেখুন: আবু হাতেম বলেছেন: যায়েদা ইব্ন আবির রাকাদ যিয়াদ ইব্ন নুমাইরি থেকে মারফূ সনদে মুনকার হাদিস বর্ণনা করে, জানি না এ সমস্যা তার থেকে না তার উস্তাদ যিয়াদ থেকে। সে যিয়াদ ব্যতীত অন্য কারো থেকে হাদিস বর্ণনা করেছে কিনা তাও জানি না, যার সূত্র ধরে তার হাদিস যাচাই করব। বুখারি বলেছেন: তার হাদিস মুনকার। আবু দাউদ বলেছেন: তার হাদিস সম্পর্কে কিছু জানি না। নাসাঈ বলেছেন: তাকে চিনি না। যাহাবি “দেওয়ানে দুয়াফাতে” বলেছেন: সে কোন দলিল নয়। ইব্ন হাজার বলেছেন: তার হাদিস মুনকার।
شهر رمضان أوله رحمه و أوسطه مغفرة و آخره عتق من النار.
“রমজান মাসের প্রথম অংশ রহমত, মধ্যম অংশ মাগফেরাত ও শেষ অংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তির।”
দেখুন: “কিতাবুদ দুয়াফা” লিল উকাইলি: (২/১৬২), “আল-কামেল ফি দুয়াফায়ির রিজাল” লি ইব্ন আদি: (১/১৬৫), “কিতাবু ইলালিল হাদিস” লি ইব্ন আবি হাতেম: (১/২৪৯), “সিলসিলাতিল আহাদিসুস দায়িফা ওয়াল মাওদুয়াহ” লিল আলবানি: (২/২৬২) ও (৪/৭০) এ হাদিস মুনকার।
مَنْ أَفْطَرَ يَوْمًا مِنْ رَمَضَانَ مِنْ غَيْرِ عُذْرٍ وَلَا مَرَضٍ لَمْ يَقْضِهِ صِيَامُ الدَّهْرِ وَإِنْ صَامَهُ. حديث ضعيف.
“যে ব্যক্তি কোন কারণ ছাড়া রমযানের একদিন সাওম ভঙ্গ করল অথবা অসুস্থতা ব্যতীত, পুরো বছরেও তার কাযা হবে না, যদিও সে পুরো বছর সাওম পালন করে।” হাদিসটি দুর্বল। মাসআলা: যদি কোন সাওম পালনকারী রমযানের দিনে শরয়ী কোন কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাস ব্যতীত সাওম ভঙ্গ করে, যেমন পানাহার, অথবা ধুমপান, অথবা যৌনাঙ্গ ব্যতীত স্ত্রীর সাথে মেলা-মেশার কারণে বীর্য বের হল, অথবা স্ত্রীকে উপভোগ করার সময় বীর্য বের হল ইত্যাদি। তার উপর কাযা ওয়াজিব।ইমাম আহমদ ও ইমাম শাফীর এক ফতোয়া অনুযায়ী তাকে এক সাওমের পরিবর্তে একটি সাওম কাযা করতে হবে। কারণ ওযর থাকা সত্বেও আল্লাহ তা‘আলা অসুস্থ ও মুসাফির ব্যক্তির উপর কাযা ওয়াজিব করেছেন, তাই ওযরহীন এর উপর অবশ্যই কাযা ওয়াজিব হবে। অবশিষ্ট দিন তাকে পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে, যেহেতু সে কারণ ছাড়া সাওম ভঙ্গ করেছে। তার উপর কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে না।ইমাম আবু হানিফা, মালেক ও ইমাম শাফীর এক ফতোয়া মোতাবেক তার উপর কাযাসহ কাফ্ফারা ওয়াযিব হবে। তবে কেউ যদি দিনের শুরু থেকে সাওম না রাখে তার উপর কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে না। সাওমের কাফ্ফারা সূরা মুজাদালায় বর্ণিত জিহারের কাফ্ফারার অনুরূপ। অর্থাৎ একটি গোলাম আযাদ করা, অথবা লাগাতার ষাটটি সাওম পালন করা, অথবা ষাটজন মিসকিনকে খাদ্য প্রদান করা। (দেখুন: সূরা মুজাদালা:৩-৪)
ইমাম বুখারি তার সহিহ গ্রন্থে হাদিসটি টিকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রমযান অধ্যায়: (৪/১৯৪), হাদিসটি তিনি দুর্বল ক্রিয়া দ্বারা উল্লেখ করে বলেন: এ হাদিস আবু হুরায়রা থেকে মারফূ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ইমাম আবু দাউদ: (২৩৯৬), তিরমিযি: (৭২৩), ইব্ন মাজাহ: (১৬৭২), ইব্ন খুযাইমাহ: (৩/২৩৮), হাদিস নং: (১৯৮৮), আহমদ: (২/৩৭৬) প্রমুখগণ সাওরি ও শুবা থেকে, তারা উভয়ে হাবিব ইব্ন আবি সাবেত থেকে, সে উমারা ইব্ন উমাইর থেকে, সে আবুল মিতওয়াস থেকে, সে তার পিতা থেকে, সে আবু হুরায়রা থেকে মুত্তাসিল সনদে উল্লেখ করেছেন। তিরমিযি বলেন: এ সনদ ব্যতীত অন্য কোনভাবে আবু হুরায়রার হাদিস জানতে পারেনি, আমি মুহাম্মদ (অর্থাৎ বুখারী) কে বলতে শুনেছি: আবুল মিতওয়াসের নাম ইয়াজিদ ইব্ন মিতওয়াস, এ হাদিস ব্যতীত তার সনদে বর্ণিত অন্য কোন হাদিস সম্পর্কে জানি না। ইব্ন খুযাইমাহ তার সহিহ: (৩/২৩৮), গ্রন্থে হাদিস নং: (১৯৮৮)-তে বলেন: যদি হাদিসটি সহিহ হয়, তবুও আমি ইব্ন মিতওয়াস ও তার পিতার পরিচয় জানি না।
صوموا تصحوا حديث ضعيف.
“সাওম পালন কর সুস্থ থাক।”
দেখুন: “তাখরিজুল ইহইয়া” লিল ইরাকি: (৩/৭৫), “আল-কামেল ফি দুয়াফায়ির রিজাল” লি ইব্ন আদি: (২/৩৫৭), “কিতাবুশ সাজারাহ ফিল আহাদিসিল মুশতাহেরাহ” লি ইব্ন তুলুন: (১/৪৭৯), “আল-ফাওয়েদুল মাজমুআহ ফিল আহাদিসিল মাওদুয়াহ” লিশ শাওকানি: (১/২৫৯), “মাকাসিদুল হাসানাহ” লিস সাখাভি: (১/৫৪৯), “কাশফুল খাফা” লিল আজুলুনি: (২/৫৩৯), “সিলসিলাতিল আহাদিসুস দায়িফা ওয়াল মাওদুয়াহ” লিল আলবানি: (১/৪২০) হাদিসটি দুর্বল
إن لله عند كل فطر عتقاء من النار حديث ضعيف.
“প্রত্যেক ইফতারের সময় জাহান্নাম থেকে আল্লাহর কিছু মুক্তি প্রাপ্ত বান্দা থাকে।”
দেখুন: “তানজিহুশ শারিয়াহ” লিল কিনানি: (২/১৫৫), “আল-ফাওয়াদুল মাজমুআহ ফিল আহাদিসিল মাওদুয়াহ” লিশ শাওকানি: (১/২৫৭), “কাশফুল ইলাহি আন শাদিদিদ দায়িফ ওয়াল মাওদু ওয়াল ওয়াহি” লিত তারাবুলসি: (১২/২৩০), “জাখিরাতুল হিফাজ” লিল কায়সারানি: (২/৯৫৬), “শুআবুল ঈমান” লিল বায়হাকি: (৩/৩০৪), “আল-কামেল ফি দুয়াফায়ির রিজাল” লি ইব্ন আদি: (২/৪৫৫) হাদিসটি দুর্বল।
لو يعلم العباد مافي رمضان لتمنت أمتي أن يكون رمضان السنة كلها، إن الجنة لتتزين لرمضان من رأس الحول إلى الحول......الخ.
“বান্দারা যদি জানত যে, রমজানে কি রয়েছে, তাহলে তারা আশা করত পুরো বছর যেন রমজান হয়, নিশ্চয় জান্নাতকে বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রমজানের জন্য সুসজ্জিত করা হয়।”
দেখুন: “আল-মাওদুয়াত” লি ইব্ন জাওজি: (২/১৮৮), “তানজিহুশ শারিয়াহ” লিল কিনানি: (২/১৫৩) “আল-ফাওয়াদুল মাজমুআহ ফিল আহাদিসিল মাওদুয়াহ” লিশ শাওকানি: (১/২৫৪), “মাজমাউজ জাওয়ায়েদ” লিল হায়সামি: (৩/১৪১) হাদিসটি দুর্বল।
إن الجنة لتزخرف وتنجد من الحول إلى الحول لدخول رمضان فتقول الحور العين: يا رب، اجعل لنا في هذا الشهر من عبادك أزواجًا.
নিশ্চয় জান্নাত এক বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রমজান আগমনের জন্য সজ্জিত ও পরিপাটি করা হয়। জান্নাতী হুররা বলেঃ “হে আল্লাহ এ মাসে তোমার বান্দাদের থেকে আমাদের জন্য স্বামী নির্বাচন কর।”
ত্বাবারানি “আওসাত” ও “কাবির” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এ হাদিসের সনদে ওলিদ ইবনুল ওলিদ আল-কালানাসি বিদ্যমান, সে দুর্বল।
أن النبي ﷺ كان يقول عند الإفطار : اللهم لك صمت و على رزقك أفطرت حديث ضعيف.
“নবী (ﷺ) প্রত্যেক ইফতারের সময় বলতঃ হে আল্লাহ আপনার জন্য সাওম পালন করছি এবং আপনার রিযকের দ্বারাই ইফতার করছি।”
দেখুন: “খুলাসাতুল বাদরুল মুনির” লি ইব্নুল মুলাক্কিন: (১/৩২৭), হাদিস নং: (১১২৬), “তালখিসুল হাবির” লিল হাফেজ ইব্ন হাজার: (২/২০২), হাদিস নং: (৯১১), “আল-আযকার” লিন নববী: (পৃ.১৭২), “মাজমাউজ জাওয়ায়েদ” লিল হায়সামি: (৩/১৫৬), “দায়িফুল জামে” লিল আলবানি, হাদিস নং: (৪৩৪৯) হাদিসটি দুর্বল।
جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ : إِنِّي رَأَيْتُ الْهِلَال،َ قَالَ : أَتَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ أَتَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ ، قَالَ : نَعَمْ، قَالَ : يَا بِلَالُ أَذِّنْ فِي النَّاسِ أَنْ يَصُومُوا غَدًا.
“এক বেদুঈন নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে বলেঃ আমি চাঁদ দেখেছি, তিনি বললেনঃ তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল? সে বললঃ হ্যাঁ, তিনি বললেনঃ হে বেলাল মানুষকে জানিয়ে দাও, তারা যেন আগামী কাল সাওম পালন করে।
আবু দাউদ: (২৩৪০), তিরমিযী: (৬৯১), নাসায়ি ফিল কুবরা: (২৪৩৩), (২৪৩৪), (২৪৩৫) (২৪৩৬), ইব্ন মাজাহ: (১৬৫২), তারা হাদিসটি বর্ণনা করেন সাম্মাক ইব্ন হারব সূত্রে, সে ইকরিমা থেকে, সে ইব্ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে। সাম্মাক ইব্ন হারব সূত্রে বর্ণিত ইকরিমার হাদিসে ইজতেরাব রয়েছে, কখনো সে ইত্তেসাল সনদে বর্ণনা করে, কখনো মুরসাল সনদে। যারা মুরসাল বর্ণনাকে গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে ইমাম তিরমিযি অন্যতম, তিনি বলেন: ইব্ন আব্বাসের হাদিসে ইখতিলাফ রয়েছে, সুফইয়ান সাওরি প্রমুখগণ সাম্মাক সূত্রে ইকরিমা থেকে, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুরসাল সনদে বর্ণনা করেছেন। সাম্মাকের অধিকাংশ ছাত্র সাম্মাকের সনদে ইকরিমা থেকে, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুরসাল বর্ণনা করেন। শায়খ আলবানি “ইরওয়াউল গালিল”: (৯০৭) গ্রন্থে হাদিসটি দুর্বল বলেছেন।
عَنْ عَامِرِ بْنِ مَسْعُودٍ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : "الْغَنِيمَةُ الْبَارِدَةُ الصَّوْمُ فِي الشِّتَاءِ .
আমের ইব্ন মাসউদ নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেনঃ “শীতকালীন সাওম হচ্ছে ঠান্ডা গনিমত”। অর্থাৎ কষ্টহীন পুণ্য।
১. এ হাদিস ইব্ন মাসউদ থেকে আহমদ: (৪/৩৩৫), তিরমিযি: (৭৯৪), ইব্ন মাজাহ: (৩/৩০৯) প্রমুখগণ বর্ণনা করেছেন। এ সনদে দুটি ইল্লত: নুমাইর ইব্ন আরিব অপরিচিত। দ্বিতীয়ত হাদিসটি মুরসাল।২. আনাস থেকে ত্বাবারানি ফিল কাবির: (৭১৬), শাজারি তার আমালি গ্রন্থে: (২/১১১) এবং ইব্ন আদি: (৩/১২১০) বর্ণনা করেছেন। এ সনদে তিনটি ইল্লত: সায়িদ ইব্ন বাশীর আযদি দুর্বল। ওলিদ ইব্ন মুসলিম ‘আনআনা’ দ্বারা বর্ণনা করেছে, এবং হাদিসটি মওকুফ।৩. জাবের থেকেও ইব্ন আদি বর্ণনা করেছেন: (৩/১০৭৫), এ সনদে চারটি ইল্লত: আব্দুল ওয়াহহাব বালখি, সে হাদিসের ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত, বরং আবি হাতেম তাকে মিথ্যুক বলেছেন। ওলিদ ইব্ন মুসলিমের ‘আনাআনা’। শামিদের থেকে বর্ণনার ক্ষেত্রে জুহাইর ইব্ন মুহাম্মদ তামিমির দুর্বলতা, আর এটা সে শামিদের থেকেই। সনদের বৈপরীত্য। দেখুন: যাখিরাতুল হুফ্ফাজ: (৩৪৩৭), আসনাল মাতালেব: (৮৩৬), তাবইদুস সাহিফা: (২৮), হাদিসটি দুর্বল।