১২/২৩৪. অধ্যায়ঃ
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১৪/১৩০৬ - জিহাদের সমতুল্য আমল
জিহাদ ওয়াজিব এবং তাতে সকাল-সন্ধ্যার মাহাত্ম্য
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,﴾ وَقَاتِلُوا المُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللهَ مَعَ المُتَّقِينَ ﴿ ( التوبة: ৩৬ অর্থাৎ আর অংশী-বাদীদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ মুত্তাকীগণের সাথে রয়েছেন। (সূরা তওবা ৩৬ আয়াত)তিনি অন্যত্র বলেছেন,﴾كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ﴿ (البقرة: ٢١٦অর্থাৎ তোমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান দেওয়া হল। যদিও এটা তোমাদের কাছে অপছন্দ; কিন্তু তোমরা যা পছন্দ কর না সম্ভবত: তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং তোমরা যা পছন্দ কর সম্ভবত: তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। (সূরা বাকারাহ ২১৬ আয়াত)তিনি আরও বলেছেন,﴾انْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿ [التوبة: ٤١]“দুর্বল হও অথবা সবল সর্বাবস্থাতেই তোমরা বের হও এবং আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ও জান দ্বারা জিহাদ কর।” (সূরা তওবা ৪১ আয়াত)তিনি অন্য জায়গায় বলেছেন,﴾إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ ۚ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ ۖ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ ۚ وَمَنْ أَوْفَىٰ بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ ۚ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ ۚ وَذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ﴿ [التوبة: ١١١]“নিঃসন্দেহে আল্লাহ মুমিনদের নিকট থেকে তাদের প্রাণ ও তাদের ধন-সম্পদসমূহকে জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন; তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, যাতে তারা হত্যা করে এবং নিহত হয়ে যায়। এ (যুদ্ধে)র দরুন (জান্নাত প্রদানের) সত্য অঙ্গীকার করা হয়েছে তাওরাতে, ইঞ্জিলে এবং কুরআনে; আর নিজের অঙ্গীকার পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর অন্য কে আছে? অতএব তোমরা আনন্দ করতে থাক তোমাদের এই ক্রয়-বিক্রয়ের উপর যা তোমরা সম্পাদন করেছ। আর এটা হচ্ছে মহা সাফল্য।” (সূরা তওবা ১১১)তিনি অন্যত্র বলেছেন,﴾لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ ۚ فَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً ۚ وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَىٰ ۚ وَفَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا دَرَجَاتٍ مِنْهُ وَمَغْفِرَةً وَرَحْمَةً ۚ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا﴿ (النساء : ٩٥অর্থাৎ ঈমানদারদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে তারা এবং যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে, তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন; আল্লাহ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ মহা পুরস্কার দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এ তাঁর (আল্লাহর) তরফ হতে মর্যাদা, ক্ষমা ও দয়া। বস্তুতঃ আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা নিসা ৯৫-৯৬ আয়াত)তিনি আরও বলেছেন,﴾ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ هَلۡ أَدُلُّكُمۡ عَلَىٰ تِجَٰرَةٖ تُنجِيكُم مِّنۡ عَذَابٍ أَلِيمٖ ١٠ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتُجَٰهِدُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ بِأَمۡوَٰلِكُمۡ وَأَنفُسِكُمۡۚ ذَٰلِكُمۡ خَيۡرٞ لَّكُمۡ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ١١ يَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡ وَيُدۡخِلۡكُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ وَمَسَٰكِنَ طَيِّبَةٗ فِي جَنَّٰتِ عَدۡنٖۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٢ وَأُخۡرَىٰ تُحِبُّونَهَاۖ نَصۡرٞ مِّنَ ٱللَّهِ وَفَتۡحٞ قَرِيبٞۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ١٣ ﴿ (الصف: ١٠، ١٣অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান বলে দিব না, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করবে? (তা এই যে,) তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানতে। আল্লাহ তোমাদের পাপ-রাশিকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত এবং (প্রবেশ করাবেন) স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। এটাই মহা সাফল্য। আর তিনি তোমাদেরকে দান করবেন বাঞ্ছিত আরও একটি অনুগ্রহ; আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়। আর বিশ্ববাসীদেরকে সুসংবাদ দাও। (সূরা সাফ্ ১০-১৩ আয়াত)এ মর্মে প্রসিদ্ধ বহু আয়াত রয়েছে। আর জিহাদের ফযীলত সংক্রান্ত হাদিসও রয়েছে অগণিত। তন্মধ্যে কতিপয় নিম্নরূপ:-
জিহাদের সমতুল্য আমল সম্পর্কে নবীজির শিক্ষা
রিয়াদুস সালেহীন : ১৪/১৩০৬
রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ১৪/১৩০৬
وَعَنهُ، قَالَ: قِيلَ: يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، مَا يَعْدِلُ الجِهَادَ فِي سَبِيلِ اللهِ؟ قَالَ: «لاَ تَسْتَطِيعُونَهُ». فَأَعَادُوا عَلَيْهِ مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلاَثاً كُلُّ ذَلِكَ يَقُولُ: «لاَ تَسْتَطِيعُونَهُ» ! ثُمَّ قَالَ: «مَثَلُ المُجَاهِدِ فِي سَبيلِ اللهِ كَمَثلِ الصَّائِمِ القَائِمِ القَانِتِ بِآيَاتِ اللهِ لاَ يَفْتُرُ مِنْ صِيَامٍ، وَلاَ صَلاَةٍ، حَتَّى يَرْجِعَ المُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللهِ». متفقٌ عَلَيْهِ، وهذا لفظ مسلمٍ.وفي رواية البخاري: أَنَّ رَجُلاً قَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ يَعْدِلُ الجِهَادَ؟ قَالَ: لاَ أَجِدُهُ» ثُمَّ قَالَ: «هَلْ تَسْتَطِيعُ إِذَا خَرَجَ المُجَاهِدُ أَنْ تَدْخُلَ مَسْجِدَكَ فَتَقُوْمَ وَلاَ تَفْتُرَ، وَتَصُومَ وَلاَ تُفْطِرَ»؟ فَقَالَ: وَمَنْ يَسْتَطِيعُ ذَلِكَ ؟!
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করা হল, ’হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদ করার সমতুল্য আমল কি? তিনি বললেন, “তোমরা তা পারবে না।” তারা তাঁকে দু’-তিনবার ঐ একই কথা জিজ্ঞাসা করতে থাকল, আর তিনি প্রত্যেকবারে বললেন, “তোমরা তার ক্ষমতা রাখ না।” তারপর বললেন, “আল্লাহর পথে জিহাদ-কারীর দৃষ্টান্ত ঠিক সেই রোজাদার ও আল্লাহর আয়াত পাঠ করে নামাজ আদায়কারীর মত, যে রোজা রাখতে ও নামাজ পড়তে আদৌ ক্লান্তি-বোধ করে না। (এরূপ ততক্ষণ পর্যন্ত গণ্য হয়) যতক্ষণ না মুজাহিদ জিহাদ থেকে ফিরে আসে।” (বুখারী-মুসলিম, শব্দগুলি মুসলিমের) [১]বুখারীর এক বর্ণনায় আছে, একটি লোক বলল, ’হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি আমল বাতলে দিন, যা জিহাদের সমতুল্য হবে।’ তিনি বললেন, “আমি এ ধরনের আমল তো পাচ্ছি না।” তারপর তিনি বললেন, “তুমি কি এরূপ করতে পারবে যে, মুজাহিদ যখন বের হয়ে যাবে, তখন থেকে তুমি মসজিদে ঢুকে অ-ক্লান্তভাবে নামাজে নিমগ্ন হবে এবং অবিরাম রোজা রাখবে।” সে বলল, ’ও কাজ কে করতে পারবে?’
সহীহুল বুখারী ২৭৮৫, মুসলিম ১৮৭৮, তিরমিযী ১৬১৯, নাসায়ী ৩১২৮, আহমাদ ৮৩৩৫, ৯১৯২, ৯৬০৪, ৯৬৭৪, ২৭২০৮
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১৪/১৩০৬-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আল্লাহর পথে জিহাদের সমতুল্য কোন আমল আছে কি না। তিনি বারবার বললেন, তোমরা তা পারবে না। পরে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, আল্লাহর পথে জিহাদকারীর দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মতো, যে একটানা রোজা রাখে, আল্লাহর আয়াত পড়ে নামাজে দাঁড়ায় এবং ক্লান্ত হয় না—যতক্ষণ না মুজাহিদ ফিরে আসে। বুখারীর বর্ণনায় আরও পরিষ্কারভাবে এসেছে, মুজাহিদ বের হওয়ার পর কেউ কি মসজিদে ঢুকে বিরামহীন নামাজ পড়তে ও অবিরাম রোজা রাখতে পারবে? প্রশ্নকারী নিজেই বলল, এটা কে পারবে? এতে জিহাদের বড় মর্যাদা বোঝা যায়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- আল্লাহর পথে জিহাদের মর্যাদা হাদিসে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
- রোজা, নামাজ ও কুরআন পাঠ বড় আমল হলেও ধারাবাহিকতা কঠিন।
- নেক আমলের মূল্য বুঝতে নবীজি সহজ উদাহরণ দিয়েছেন।
