১২/২৩৪. অধ্যায়ঃ
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ২৯/১৩২১ - শহীদের পাপ মাফ ও ঋণের দায়িত্ব
জিহাদ ওয়াজিব এবং তাতে সকাল-সন্ধ্যার মাহাত্ম্য
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,﴾ وَقَاتِلُوا المُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللهَ مَعَ المُتَّقِينَ ﴿ ( التوبة: ৩৬ অর্থাৎ আর অংশী-বাদীদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ মুত্তাকীগণের সাথে রয়েছেন। (সূরা তওবা ৩৬ আয়াত)তিনি অন্যত্র বলেছেন,﴾كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ﴿ (البقرة: ٢١٦অর্থাৎ তোমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান দেওয়া হল। যদিও এটা তোমাদের কাছে অপছন্দ; কিন্তু তোমরা যা পছন্দ কর না সম্ভবত: তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং তোমরা যা পছন্দ কর সম্ভবত: তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। (সূরা বাকারাহ ২১৬ আয়াত)তিনি আরও বলেছেন,﴾انْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿ [التوبة: ٤١]“দুর্বল হও অথবা সবল সর্বাবস্থাতেই তোমরা বের হও এবং আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ও জান দ্বারা জিহাদ কর।” (সূরা তওবা ৪১ আয়াত)তিনি অন্য জায়গায় বলেছেন,﴾إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ ۚ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ ۖ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ ۚ وَمَنْ أَوْفَىٰ بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ ۚ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ ۚ وَذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ﴿ [التوبة: ١١١]“নিঃসন্দেহে আল্লাহ মুমিনদের নিকট থেকে তাদের প্রাণ ও তাদের ধন-সম্পদসমূহকে জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন; তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, যাতে তারা হত্যা করে এবং নিহত হয়ে যায়। এ (যুদ্ধে)র দরুন (জান্নাত প্রদানের) সত্য অঙ্গীকার করা হয়েছে তাওরাতে, ইঞ্জিলে এবং কুরআনে; আর নিজের অঙ্গীকার পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর অন্য কে আছে? অতএব তোমরা আনন্দ করতে থাক তোমাদের এই ক্রয়-বিক্রয়ের উপর যা তোমরা সম্পাদন করেছ। আর এটা হচ্ছে মহা সাফল্য।” (সূরা তওবা ১১১)তিনি অন্যত্র বলেছেন,﴾لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ ۚ فَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً ۚ وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَىٰ ۚ وَفَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا دَرَجَاتٍ مِنْهُ وَمَغْفِرَةً وَرَحْمَةً ۚ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا﴿ (النساء : ٩٥অর্থাৎ ঈমানদারদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে তারা এবং যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে, তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন; আল্লাহ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ মহা পুরস্কার দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এ তাঁর (আল্লাহর) তরফ হতে মর্যাদা, ক্ষমা ও দয়া। বস্তুতঃ আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা নিসা ৯৫-৯৬ আয়াত)তিনি আরও বলেছেন,﴾ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ هَلۡ أَدُلُّكُمۡ عَلَىٰ تِجَٰرَةٖ تُنجِيكُم مِّنۡ عَذَابٍ أَلِيمٖ ١٠ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتُجَٰهِدُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ بِأَمۡوَٰلِكُمۡ وَأَنفُسِكُمۡۚ ذَٰلِكُمۡ خَيۡرٞ لَّكُمۡ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ١١ يَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡ وَيُدۡخِلۡكُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ وَمَسَٰكِنَ طَيِّبَةٗ فِي جَنَّٰتِ عَدۡنٖۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٢ وَأُخۡرَىٰ تُحِبُّونَهَاۖ نَصۡرٞ مِّنَ ٱللَّهِ وَفَتۡحٞ قَرِيبٞۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ١٣ ﴿ (الصف: ١٠، ١٣অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান বলে দিব না, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করবে? (তা এই যে,) তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানতে। আল্লাহ তোমাদের পাপ-রাশিকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত এবং (প্রবেশ করাবেন) স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। এটাই মহা সাফল্য। আর তিনি তোমাদেরকে দান করবেন বাঞ্ছিত আরও একটি অনুগ্রহ; আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়। আর বিশ্ববাসীদেরকে সুসংবাদ দাও। (সূরা সাফ্ ১০-১৩ আয়াত)এ মর্মে প্রসিদ্ধ বহু আয়াত রয়েছে। আর জিহাদের ফযীলত সংক্রান্ত হাদিসও রয়েছে অগণিত। তন্মধ্যে কতিপয় নিম্নরূপ:-
শহীদের মর্যাদা ও ঋণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ হাদিস
রিয়াদুস সালেহীন : ২৯/১৩২১
রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ২৯/১৩২১
وَعَن أَبي قَتَادَةَ رضي الله عنه: أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَامَ فِيهِم فَذَكَرَ أَنَّ الجِهَادَ فِي سَبيلِ اللهِ، وَالإيمَانَ بِاللهِ، أَفْضَلُ الأَعْمَالِ، فَقَامَ رَجُلٌ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، أَرأَيْتَ إِنْ قُتِلْتُ فِي سَبِيلِ اللهِ، أَتُكَفَّرُ عَنِّي خَطَايَايَ؟فَقَالَ لهُ رَسُولُ اللهِ ﷺ : «نَعَمْ، إِنْ قُتِلْتَ فِي سَبِيلِ الله وَأَنْتَ صَابِرٌ مُحْتَسِبٌ، مُقْبِلٌ غَيْرُ مُدْبِرٍ»، ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ : «كَيْفَ قُلْتَ؟» قَالَ: أَرَأيْتَ إِنْ قُتِلْتُ فِي سَبِيلِ اللهِ، أَتُكَفَّرُ عَنِّي خَطَايَايَ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ : «نَعَمْ، وَأَنْتَ صَابرٌ مُحْتَسِبٌ، مُقْبِلٌ غَيرُ مُدْبِرٍ، إِلاَّ الدَّيْنَ فَإنَّ جِبْريلَ - عَلَيهِ السَّلاَمُ - قَالَ لِي ذَلِكَ». رواه مسلم
আবূ ক্বাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জনমন্ডলীর মাঝে দাঁড়িয়ে ভাষণ দানকালে বললেন, “আল্লাহর পথে জিহাদ করা ও আল্লাহর পথে ঈমান রাখা সর্বোত্তম কর্ম।” জনৈক ব্যক্তি উঠে বলল, ’হে আল্লাহর রাসূল! আপনি বলুন, যদি আমি আল্লাহর রাহে লড়াই করে শাহাদত বরণ করি, তাহলে কি আল্লাহ আমার সমুদয় পাপ-রাশিকে মিটিয়ে দেবেন?’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, “হ্যাঁ, যদি তুমি আল্লাহর পথে নেকীর কামনায় ধৈর্য-সহ্যের সাথে অগ্রসর হয়ে এবং পশ্চাদপসরণ না করে শহীদ হয়ে যাও, (তাহলে আল্লাহ তোমার সমস্ত পাপরাশি মাফ করে দেবেন।)”তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, “তুমি কি যেন বললে?” সে বলল, ’আপনি বলুন, যদি আমি আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যাই, তাহলে আমার গুনাহ-খাতাসমূহ তার ফলে মিটে যাবে কি?’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, “হ্যাঁ, ধৈর্য-সহ্যের সাথে, অগ্রসর হয়ে এবং পশ্চাদপসরণ না করে (যদি তুমি শহীদ হয়ে যাও তাহলে)। কিন্তু ঋণ ছাড়া। যেহেতু জিবরীল (আঃ) এখনই আমাকে এ কথা বললেন।” (মুসলিম)[১]
মুসলিম ১৮৮৫, তিরমিযী ১৭১২, নাসায়ী ৩১৫৬-৩১৫৮, আহমাদ ২২০৩৬, ২২০৯৭, ২২১২০, দারেমী ২৪১২
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ২৯/১৩২১-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে শহীদের মর্যাদা খুব স্পষ্টভাবে এসেছে। রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم জনসমাগমে বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখা উত্তম আমল। একজন সাহাবী জানতে চাইলেন, আল্লাহর পথে লড়াই করে শহীদ হলে কি তার পাপ মাফ হবে? উত্তরে রাসূল صلى الله عليه وسلم হ্যাঁ বললেন, তবে শর্ত হিসেবে ধৈর্য, সওয়াবের আশা, সামনে এগিয়ে থাকা এবং পেছনে না ফেরার কথা উল্লেখ করলেন। পরে তিনি জিবরীল (আঃ)-এর মাধ্যমে জানালেন, ঋণ এর বাইরে থাকবে। তাই শহীদের পাপ মাফ বিষয়টি বড় আশার কথা হলেও মানুষের হক, বিশেষ করে ঋণ, অবহেলা করার বিষয় নয়। হাদিসটি শাহাদত, নিয়ত, ধৈর্য ও দায়িত্ববোধকে একসাথে শেখায়। এতে বোঝা যায়, আল্লাহর পথে বড় আমলও বান্দার পাওনা আদায়ের দায়িত্বকে মুছে দেয় না।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- আল্লাহর পথে কাজের মূল্য নিয়ত, ধৈর্য ও অটলতার সাথে জড়িত।
- শাহাদত পাপ মাফের কারণ হতে পারে, তবে ঋণের হক আলাদা থাকে।
- মানুষের পাওনা বা ঋণকে ছোট করে দেখা ঠিক নয়।
- সওয়াবের আশা রেখে সত্য পথে স্থির থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
