১২/২৩৪. অধ্যায়ঃ
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ৩১/১৩২৩ - উমাইর ইবনে হুমামের শাহাদত
জিহাদ ওয়াজিব এবং তাতে সকাল-সন্ধ্যার মাহাত্ম্য
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,﴾ وَقَاتِلُوا المُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللهَ مَعَ المُتَّقِينَ ﴿ ( التوبة: ৩৬ অর্থাৎ আর অংশী-বাদীদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ মুত্তাকীগণের সাথে রয়েছেন। (সূরা তওবা ৩৬ আয়াত)তিনি অন্যত্র বলেছেন,﴾كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ﴿ (البقرة: ٢١٦অর্থাৎ তোমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান দেওয়া হল। যদিও এটা তোমাদের কাছে অপছন্দ; কিন্তু তোমরা যা পছন্দ কর না সম্ভবত: তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং তোমরা যা পছন্দ কর সম্ভবত: তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। (সূরা বাকারাহ ২১৬ আয়াত)তিনি আরও বলেছেন,﴾انْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿ [التوبة: ٤١]“দুর্বল হও অথবা সবল সর্বাবস্থাতেই তোমরা বের হও এবং আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ও জান দ্বারা জিহাদ কর।” (সূরা তওবা ৪১ আয়াত)তিনি অন্য জায়গায় বলেছেন,﴾إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ ۚ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ ۖ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ ۚ وَمَنْ أَوْفَىٰ بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ ۚ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ ۚ وَذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ﴿ [التوبة: ١١١]“নিঃসন্দেহে আল্লাহ মুমিনদের নিকট থেকে তাদের প্রাণ ও তাদের ধন-সম্পদসমূহকে জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন; তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, যাতে তারা হত্যা করে এবং নিহত হয়ে যায়। এ (যুদ্ধে)র দরুন (জান্নাত প্রদানের) সত্য অঙ্গীকার করা হয়েছে তাওরাতে, ইঞ্জিলে এবং কুরআনে; আর নিজের অঙ্গীকার পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর অন্য কে আছে? অতএব তোমরা আনন্দ করতে থাক তোমাদের এই ক্রয়-বিক্রয়ের উপর যা তোমরা সম্পাদন করেছ। আর এটা হচ্ছে মহা সাফল্য।” (সূরা তওবা ১১১)তিনি অন্যত্র বলেছেন,﴾لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ ۚ فَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً ۚ وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَىٰ ۚ وَفَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا دَرَجَاتٍ مِنْهُ وَمَغْفِرَةً وَرَحْمَةً ۚ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا﴿ (النساء : ٩٥অর্থাৎ ঈমানদারদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে তারা এবং যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে, তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন; আল্লাহ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ মহা পুরস্কার দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এ তাঁর (আল্লাহর) তরফ হতে মর্যাদা, ক্ষমা ও দয়া। বস্তুতঃ আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা নিসা ৯৫-৯৬ আয়াত)তিনি আরও বলেছেন,﴾ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ هَلۡ أَدُلُّكُمۡ عَلَىٰ تِجَٰرَةٖ تُنجِيكُم مِّنۡ عَذَابٍ أَلِيمٖ ١٠ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتُجَٰهِدُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ بِأَمۡوَٰلِكُمۡ وَأَنفُسِكُمۡۚ ذَٰلِكُمۡ خَيۡرٞ لَّكُمۡ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ١١ يَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡ وَيُدۡخِلۡكُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ وَمَسَٰكِنَ طَيِّبَةٗ فِي جَنَّٰتِ عَدۡنٖۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٢ وَأُخۡرَىٰ تُحِبُّونَهَاۖ نَصۡرٞ مِّنَ ٱللَّهِ وَفَتۡحٞ قَرِيبٞۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ١٣ ﴿ (الصف: ١٠، ١٣অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান বলে দিব না, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে রক্ষা করবে? (তা এই যে,) তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানতে। আল্লাহ তোমাদের পাপ-রাশিকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত এবং (প্রবেশ করাবেন) স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। এটাই মহা সাফল্য। আর তিনি তোমাদেরকে দান করবেন বাঞ্ছিত আরও একটি অনুগ্রহ; আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়। আর বিশ্ববাসীদেরকে সুসংবাদ দাও। (সূরা সাফ্ ১০-১৩ আয়াত)এ মর্মে প্রসিদ্ধ বহু আয়াত রয়েছে। আর জিহাদের ফযীলত সংক্রান্ত হাদিসও রয়েছে অগণিত। তন্মধ্যে কতিপয় নিম্নরূপ:-
জান্নাতের আশা ও উমাইর ইবনে হুমামের শাহাদতের হাদিস
রিয়াদুস সালেহীন : ৩১/১৩২৩
রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ৩১/১৩২৩
وَعَن أَنَسٍ رضي الله عنه، قَالَ: اِنْطَلَقَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ﷺ وَأَصْحَابُهُ حَتَّى سَبَقُوا المُشْرِكِينَ إِلَى بَدْرٍ، وَجَاءَ المُشْرِكُونَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ﷺ : «لاَ يَقْدِمَنَّ أَحَدٌ مِنْكُمْ إِلَى شَيْءٍ حَتَّى أَكُونَ أنَا دُونَهُ».فَدَنَا المُشْرِكُونَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ﷺ : «قُومُوا إِلَى جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالأَرْضُ» قَالَ: يَقُولُ عُمَيْرُ بن الحُمَامِ الأَنْصَارِيُّ رضي الله عنه: يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، جَنَّةٌ عَرْضُهَا السَّماوَاتُ وَالأَرْضُ؟ قَالَ: «نَعَمْ» قَالَ: بَخٍ بَخٍ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ﷺ : «مَا يَحْمِلُكَ عَلَى قَولِكَ بَخٍ بَخٍ؟» قَالَ: لاَ وَاللهِ يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ إِلاَّ رَجَاءَ أَنْ أَكُونَ مِنْ أَهْلِهَا، قَالَ: «فَإِنَّكَ مِنْ أَهْلِهَا».فَأَخْرَجَ تَمَرَاتٍ مِنْ قَرَنِهِ، فَجَعَلَ يَأكُلُ مِنْهُنَّ، ثُمَّ قَالَ: لَئِنْ أَنَا حَيِيتُ حَتَّى آكُلَ تَمَرَاتِي هَذِهِ إِنّهَا لَحَياةٌ طَوِيلَةٌ، فَرَمَى بِمَا كَانَ مَعَهُ مِنَ التَّمْرِ، ثُمَّ قَاتَلَهُمْ حَتَّى قُتِلَ. رواه مسلم
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বীয় সহচরবৃন্দের সাথে (বদরাভিমুখে) রওনা দিলেন। পরিশেষে মুশরিকদের পূর্বেই তাঁরা বদর স্থানে পৌঁছে গেলেন। তারপর মুশরিকগণ সেখানে এসে পৌঁছল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, “তোমরা অবশ্যই কেউ কোন বিষয়ে আগে বেড়ে কিছু করবে না; যতক্ষণ আমি নির্দেশ না দেব অথবা আমি স্বয়ং তা করব।” সুতরাং যখন মুশরিকরা নিকটবর্তী হল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, “তোমরা সেই জান্নাতের দিকে ওঠো, যার প্রস্থ হল আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সমান।”বর্ণনাকারী বলেন, উমাইর ইবনে হুমাম আনসারী (রাঃ) নিবেদন করলেন, ’হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাতের প্রস্থ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সমান?’ তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” উমাইর বললেন, ’বাঃ বাঃ!’ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, “বাঃ বাঃ’ শব্দ উচ্চারণ করার জন্য তোমাকে কোন জিনিস উদ্বুদ্ধ করল?” উমাইর বললেন, ’আল্লাহর শপথ! হে আল্লাহর রাসূল! তার (জান্নাতের) অধিবাসী হওয়ার কামনা ছাড়া আর কিছুই নয়।’ তিনি বললেন, “তুমি তার অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত।”অতঃপর তিনি কতিপয় খেজুর স্বীয় তূণ থেকে বের করে খেতে শুরু করলেন। তারপর বললেন, ’যদি আমি এগুলি খেতে থাকি, তবে দীর্ঘক্ষণ জীবিত থাকতে হবে (এত দেরি সহ্য হবে না)।’ বিধায় তিনি তাঁর কাছে যত খেজুর ছিল, সব ফেলে দিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়লেন। অবশেষে শহীদ হয়ে গেলেন। (মুসলিম)[১]
মুসলিম ১৯০১, আবূ দাউদ ২৬১৮, আহমাদ ১১৯৯০
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ৩১/১৩২৩-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে বদরের ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এসেছে। রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم সাহাবীদের আগে থেকে নির্দেশ দিলেন, তিনি নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কেউ যেন নিজে থেকে কিছু না করে। পরে শত্রুরা কাছে এলে তিনি জান্নাতের দিকে এগিয়ে যেতে বললেন, যার প্রস্থ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমান। উমাইর ইবনে হুমাম (রাঃ) তা শুনে জান্নাতের অধিবাসী হওয়ার আশা প্রকাশ করলেন। রাসূল صلى الله عليه وسلم তাঁকে জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত বলে সুসংবাদ দিলেন। এরপর তিনি হাতে থাকা খেজুর খেতে দেরি মনে করলেন, তা ফেলে যুদ্ধ করলেন এবং শহীদ হলেন। হাদিসটি নেতৃত্ব মানা, জান্নাতের প্রতি আশা এবং আল্লাহর পথে সাহসী অগ্রসরতার শিক্ষা দেয়। একই সঙ্গে এতে বোঝা যায়, যুদ্ধের ক্ষেত্রেও শৃঙ্খলা ও নবী صلى الله عليه وسلم-এর নির্দেশের গুরুত্ব ছিল।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- রাসূল صلى الله عليه وسلم-এর নির্দেশ মানা সাহাবীদের আচরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
- জান্নাতের আশা মুমিনকে সৎ কাজে দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে।
- উমাইর (রাঃ) দেরি না করে আল্লাহর পথে এগিয়ে যান।
- শাহাদতের আকাঙ্ক্ষা এখানে জান্নাতের প্রতি বিশ্বাসের সাথে যুক্ত।
