১/১৯. অধ্যায়ঃ
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১/১৭৬ - ভালো রীতি চালু করা ও সাদকাহর প্রেরণা
যে ব্যক্তি ভাল অথবা মন্দ রীতি চালু করবে
মহান আল্লাহ বলেন,﴾وَٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبۡ لَنَا مِنۡ أَزۡوَٰجِنَا وَذُرِّيَّٰتِنَا قُرَّةَ أَعۡيُنٖ وَٱجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِينَ إِمَامًا ٧٤ ﴿ [الفرقان: ٧٣]অর্থাৎ “যারা (প্রার্থনা করে) বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদেরকে আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর কর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শস্বরূপ কর’।” (সূরা ফুরক্বান ৭৪ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴾ وَجَعَلۡنَٰهُمۡ أَئِمَّةٗ يَهۡدُونَ بِأَمۡرِنَا ﴿ [الانبياء: ٧٣]অর্থাৎ “আর আমি তাদেরকে করলাম নেতা, তারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথ প্রদর্শন করত।” (সূরা আম্বিয়া ৭৩ আয়াত)
ভালো রীতি চালু করা: সাদকাহ ও কল্যাণে এগিয়ে আসার শিক্ষা
রিয়াদুস সালেহীন : ১/১৭৬
রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ১/১৭৬
عَنْ أَبِي عَمرٍو جَرِيرِ بنِ عَبدِ اللهِ رضي الله عنه، قَالَ: كُنَّا فِيْ صَدْرِ النَّهَارِ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَجَاءَهُ قَومٌ عُرَاةٌ مُجْتَابي النِّمَار أَوْ العَبَاء، مُتَقَلِّدِي السُّيُوف، عَامَّتُهُمْ مِن مُضَرَ بَلْ كُلُّهُمْ مِنْ مُضَرَ، فَتَمَعَّرَ رَسُولُ الله ﷺ لمَاَّ رَأَى بِهِمْ مِنَ الفَاقَة، فَدَخَلَ ثُمَّ خَرَجَ، فَأَمَرَ بِلاَلاً فَأَذَّنَ وَأَقَامَ، فصَلَّى ثُمَّ خَطَبَ، فَقَالَ: ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفۡسٖ وَٰحِدَةٖ ﴾ إِلَى آخر الآية: ﴿ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَيۡكُمۡ رَقِيبٗا ١ ﴾ [النساء: ١]، والآية الأُخْرَى التي في آخر الحَشْرِ: ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَلۡتَنظُرۡ نَفۡسٞ مَّا قَدَّمَتۡ لِغَدٖۖ ﴾ [الحشر: ١٨] تَصَدَّقَ رَجُلٌ مِنْ دِينَارِهِ، مِنْ دِرهمِهِ، مِنْ ثَوبِهِ، مِنْ صَاعِ بُرِّهِ، مِنْ صَاعِ تَمْرِهِ - حَتَّى قَالَ - وَلَوْ بِشقِّ تَمرَةٍ»فَجَاءَ رَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ بِصُرَّةٍ كَادَتْ كَفُّهُ تَعجِزُ عَنهَا، بَلْ قَدْ عَجَزَتْ، ثُمَّ تَتَابَعَ النَّاسُ حَتَّى رَأيْتُ كَومَيْنِ مِنْ طَعَامٍ وَثِيَابٍ، حَتَّى رَأيْتُ وَجْهَ رَسُولِ الله ﷺ يَتَهَلَّلُ كَأنَّهُ مُذْهَبَةٌ. فَقَالَ رَسُول الله ﷺ: «مَنْ سَنَّ في الإسلامِ سنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أجْرُهَا، وَأجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ، مِنْ غَيرِ أنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورهمْ شَيءٌ، وَمَنْ سَنَّ في الإسْلامِ سُنَّةً سَيِّئَةً كَانَ عَلَيهِ وِزْرُهَا، وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِهِ، مِنْ غَيرِ أنْ يَنْقُصَ مِنْ أوْزَارِهمْ شَيءٌ». رواه مسلم
আবূ ‘আমর জারীর ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আবূ ’আমর জারীর ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) আমরা দিনের প্রথম ভাগে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট ছিলাম। অতঃপর তাঁর নিকট কিছু লোক এল, যাদের দেহ বিবস্ত্র ছিল, পশমের ডোরা কাটা চাদর (মাথা প্রবেশের মত জায়গা মাঝে কেটে) পরে ছিল অথবা ’আবা’ (আংরাখা) পরে ছিল, তরবারি তারা নিজেদের গর্দানে ঝুলিয়ে রেখেছিল। তাদের অধিকাংশ মুদ্বার গোত্রের (লোক) ছিল; বরং তারা সকলেই মুদ্বার গোত্রের ছিল। তাদের দরিদ্রতা দেখে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। সুতরাং তিনি (বাড়ির ভিতর) প্রবেশ করলেন এবং পুনরায় বের হলেন। তারপর তিনি বেলালকে (আযান দেওয়ার) আদেশ করলেন। ফলে তিনি আযান দিলেন এবং ইকামত দিলেন। অতঃপর তিনি নামায পড়ে লোকদেরকে (সম্বোধন ক’রে) ভাষণ দিলেন।তিনি বললেন, ’’হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন ও তা হতে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যিনি তাদের দু’জন থেকে বহু নরনারী (পৃথিবীতে) বিস্তার করেছেন। সেই আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচ্ঞা কর এবং জ্ঞাতি-বন্ধন ছিন্ন করাকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।’’ (সূরা নিসা ১ আয়াত)অতঃপর দ্বিতীয় আয়াত যেটি সূরা হাশরের শেষে আছে সেটি পাঠ করলেন, ’’হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক যে, আগামীকালের (কেয়ামতের) জন্য সে কি অগ্রিম পাঠিয়েছে। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।’’ (সূরা হাশর ১৮ আয়াত)’’সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন নিজ দীনার (স্বর্ণমুদ্রা), দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা), কাপড়, এক সা’ গম ও এক সা’ খেজুর থেকে সাদকাহ করে।’’ এমনকি তিনি বললেন, ’’খেজুরের আধা টুকরা হলেও (তা যেন দান করে)।’’ সুতরাং আনসারদের একটি লোক (চাঁদির) একটি থলে নিয়ে এল, লোকটির করতল যেন তা ধারণ করতে পারছিল না; বরং তা ধারণ করতে অক্ষমই ছিল। অতঃপর (তা দেখে) লোকেরা পরস্পর দান আনতে আরম্ভ করল। এমনকি খাদ্য সামগ্রী ও কাপড়ের দু’টি স্তূপ দেখলাম। পরিশেষে আমি দেখলাম যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেহারা যেন সোনার মত ঝলমল করছে।অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ’’যে ব্যক্তি ইসলামে ভাল রীতি চালু করবে, সে তার নিজের এবং ঐ সমস্ত লোকের সওয়াব পাবে, যারা তার (মৃত্যুর) পর তার উপর আমল করবে। তাদের সওয়াবের কিছু পরিমাণও কম করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো মন্দ রীতির প্রচলন করবে, তার উপর তার নিজের এবং ঐ লোকদের গোনাহ বর্তাবে, যারা তার (মৃত্যুর) পর তার উপর আমল করবে। তাদের গোনাহর কিছু পরিমাণও কম করা হবে না।’’[১]
মুসলিম ১০১৭, তিরমিযী ২৬৭৫, নাসায়ী ২৫৫৪, ইবনু মাজাহ ২০৩, আহমাদ ১৮৬৭৫, ১৮৬৯৩, ১৮৭০১, ১৮৭২৪, দারেমী ৫১২, ৫১৪
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১/১৭৬-এর সারসংক্ষেপ
মূল বিষয়: সাদকাহ। এই হাদিসে দরিদ্র একদল মানুষের অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর চেহারায় কষ্টের ছাপ পড়ার কথা এসেছে। তিনি নামাজের পর মানুষকে আল্লাহভীতি স্মরণ করিয়ে দেন এবং সাদকাহ করতে বলেন—দ্বীনার, দিরহাম, কাপড়, গম, খেজুর, এমনকি আধা খেজুর হলেও। এরপর একজন আনসারী একটি ভারী থলে নিয়ে এলে লোকেরা একের পর এক দান আনতে থাকে। খাদ্য ও কাপড়ের স্তূপ জমে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল হয়। তারপর তিনি বলেন, ইসলামে ভালো রীতি চালু করলে নিজের সওয়াব এবং পরে যারা তা করবে তাদের সওয়াবের মতো সওয়াব পাওয়া যায়; আর মন্দ রীতি চালু করলে নিজের গুনাহ ও অনুসারীদের গুনাহের ভারও আসে। হাদিসটি ভালো উদ্যোগের শক্তি ও দায়িত্ব দুটোই শেখায়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- অসহায় মানুষ দেখলে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যে এগিয়ে আসা উচিত।
- ভালো কাজে একজনের উদ্যোগ অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করতে পারে।
- ভালো রীতি চালু করলে তার সওয়াব ছড়িয়ে পড়তে পারে।
- মন্দ রীতি চালু করলে তার ক্ষতির দায়ও ভারী হয়।
