১/৪৫. অধ্যায়ঃ

রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১৪/৩৭৭ - উয়াইস কারনীর মর্যাদা ও মায়ের সেবা

ভাল লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করা, তাঁদের সাহচর্য গ্রহণ করা, তাঁদেরকে ভালবাসা, তাঁদেরকে বাড়িতে দাওয়াত দেওয়া, তাঁদের কাছে দো‘আ চাওয়া এবং বরকতময় স্থানসমূহের দর্শন

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴾ وَإِذۡ قَالَ مُوسَىٰ لِفَتَىٰهُ لَآ أَبۡرَحُ حَتَّىٰٓ أَبۡلُغَ مَجۡمَعَ ٱلۡبَحۡرَيۡنِ أَوۡ أَمۡضِيَ حُقُبٗا ٦٠ ﴿ [الكهف: ٦٠] إِلَى قوله تَعَالَى : ﴾ قَالَ لَهُۥ مُوسَىٰ هَلۡ أَتَّبِعُكَ عَلَىٰٓ أَن تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمۡتَ رُشۡدٗا ٦٦ ﴿ [الكهف: ٦٦]অর্থাৎ “(স্মরণ কর,) যখন মূসা তার সঙ্গীকে বলেছিল, দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে না পৌঁছে আমি থামব না অথবা আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব।” -এখান থেকে আল্লাহর বাণী:- “মূসা তাকে বলল, সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে, তা হতে আমাকে শিক্ষা দেবেন এই শর্তে আমি আপনার অনুসরণ করব কি?” (সূরা কাহফ ৬০-৬৬ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴾ وَٱصۡبِرۡ نَفۡسَكَ مَعَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ رَبَّهُم بِٱلۡغَدَوٰةِ وَٱلۡعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجۡهَهُۥۖ﴿ [الكهف: ٢٨]অর্থাৎ “তুমি নিজেকে তাদেরই সংসর্গে রাখ যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে।” (সূরা কাহফ ২৮ আয়াত

উয়াইস কারনী: মায়ের সেবা, বিনয় ও দোয়ার মর্যাদা

রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ১৪/৩৭৭

وَعَن أُسَيْرِ بنِ عَمرٍو، وَيُقَالُ : ابنِ جَابِرٍ، قَالَ : كَانَ عُمَرُ بْنُ الخَطَّابِ رضي الله عنه إِذَا أتَى عَلَيهِ أمْدَادُ أهْلِ اليَمَنِ سَألَهُمْ : أفِيكُمْ أُوَيْسُ بْنُ عَامِرٍ ؟ حَتَّى أتَى عَلَى أُوَيْسٍ رضي الله عنه، فَقَالَ لَهُ : أنْتَ أُوَيْسُ ابْنُ عَامِر؟ قَالَ : نَعَمْ، قَالَ : مِنْ مُرَادٍ ثُمَّ مِنْ قَرَنٍ؟ قَالَ : نَعَمْ. قَالَ : فَكَانَ بِكَ بَرَصٌ، فَبَرَأْتَ مِنْهُ إلاَّ مَوْضِعَ دِرْهَمٍ؟ قَالَ : نَعَمْ. قَالَ : لَكَ وَالِدةٌ؟ قَالَ : نَعَمْ. قَالَ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ ﷺ، يَقُولُ: «يَأتِي عَلَيْكُمْ أُويْسُ بْنُ عَامِرٍ مَعَ أمْدَادِ أهْلِ اليَمَنِ مِنْ مُرَادٍ، ثُمَّ مِنْ قَرَنٍ كَانَ بِهِ بَرَصٌ، فَبَرَأَ مِنْهُ إلاَّ موْضِعَ دِرْهَمٍ، لَهُ وَالدةٌ هُوَ بِهَا بَرٌّ لَوْ أقْسَمَ عَلَى الله لأَبَرَّهُ، فإنِ اسْتَطَعْتَ أنْ يَسْتَغْفِرَ لَكَ فَافْعَل» فَاسْتَغْفِرْ لي فَاسْتَغْفَرَ لَهُ، فَقَالَ لَهُ عُمَرُ : أيْنَ تُريدُ؟ قَالَ : الكُوفَةَ، قَالَ : ألاَ أكْتُبُ لَكَ إِلَى عَامِلِهَا؟ قَالَ : أكُونُ في غَبْرَاءِ النَّاسِ أَحَبُّ إِلَيَّ، فَلَمَّا كَانَ مِنَ العَامِ المُقْبِلِ حَجَّ رَجُلٌ مِنْ أشْرَافِهِمْ، فَوافَقَ عُمَرَ، فَسَألَهُ عَنْ أُوَيْسٍ، فَقَالَ : تَرَكْتُهُ رَثَّ البَيْتِ قَليلَ المَتَاعِ، قَالَ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ ﷺ، يَقُولُ: «يَأتِي عَلَيْكُمْ أُوَيْسُ بْنُ عَامِرٍ مَعَ أمْدَادٍ مِنْ أهْلِ اليَمَنِ مِنْ مُرَادٍ، ثُمَّ مِنْ قَرَنٍ، كَانَ بِهِ بَرَصٌ فَبَرَأَ مِنْهُ إلاَّ مَوضِعَ دِرْهَمٍ، لَهُ وَالِدَةٌ هُوَ بِهَا بَرٌّ لَوْ أقْسَمَ عَلَى اللهِ لأَبَرَّهُ، فَإنِ اسْتَطْعتَ أنْ يَسْتَغْفِرَ لَكَ، فَافْعَلْ» فَأتَى أُوَيْساً، فَقَالَ : اسْتَغْفِرْ لِي. قَالَ : أنْتَ أحْدَثُ عَهْداً بسَفَرٍ صَالِحٍ، فَاسْتَغْفِرْ لي. قَالَ : لَقِيتَ عُمَرَ؟ قَالَ : نَعَمْ، فاسْتَغْفَرَ لَهُ، فَفَطِنَ لَهُ النَّاسُ، فَانْطَلَقَ عَلَى وَجْهِهِ.رواه مسلموَفي رِوَايَةٍ لِمُسلِمٍ أَيضاً عَن أُسَيْر بنِ جَابِرٍ رضي الله عنه : أنَّ أهْلَ الكُوفَةِ وَفَدُوا عَلَى عُمَرَ رضي الله عنه، وَفِيهمْ رَجُلٌ مِمَّنْ كَانَ يَسْخَرُ بِأُوَيْسٍ، فَقَالَ عُمَرُ : هَلْ هاهُنَا أَحَدٌ مِنَ القَرَنِيِّينَ؟ فَجَاءَ ذلِكَ الرَّجُلُ، فَقَالَ عمرُ : إنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ ﷺ قَدْ قَالَ: إنَّ رَجُلاً يَأتِيكُمْ مِنَ اليَمَنِ يُقَالُ لَهُ : أُوَيْسٌ، لاَ يَدَعُ باليَمَنِ غَيْرَ أُمٍّ لَهُ، قَدْ كَانَ بِهِ بَيَاضٌ فَدَعَا الله تَعَالَى، فَأذْهَبَهُ إلاَّ مَوضِعَ الدِّينَارِ أَو الدِّرْهَمِ، فَمَنْ لَقِيَهُ مِنْكُمْ، فَلْيَسْتَغْفِرْ لَكُمْوفي رِوَايَةٍ لَهُ : عَن عُمَرَ رضي الله عنه، قَالَ : إنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ ﷺ، يَقُولُ: إنَّ خَيْرَ التَّابِعِينَ رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ : أُوَيْسٌ، وَلَهُ وَالِدَةٌ وَكَانَ بِهِ بَيَاضٌ، فَمُرُوهُ، فَلْيَسْتَغْفِرْ لَكُمْ

উসাইর ইবনু ‘আমর মতান্তরে ইবনু জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

উমর (রাঃ)-এর নিকট যখনই ইয়ামান থেকে সহযোগী যোদ্ধারা আসতেন, তখনই তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করতেন, ’তোমাদের মধ্যে কি উয়াইস ইবনু ’আমের আছে?’ শেষ পর্যন্ত (এক দলের সঙ্গে) উয়াইস (ক্বারনী) (রহঃ) (মদ্বীনা) এলেন। অতঃপর উমর (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ’তুমি কি উয়াইস ইবনু আমের?’ তিনি বললেন, ’হ্যাঁ।’ উমর (রাঃ) বললেন, ’মুরাদ (পরিবারের) এবং ক্বার্ন্ (গোত্রের)?’ উয়াইস বললেন, ’হ্যাঁ।’ তিনি (পুনরায়) জিজ্ঞেস করলেন, ’তোমার শরীরে শ্বেত রোগ ছিল, তা এক দিরহাম সম জায়গা ব্যতীত (সবই) দূর হয়ে গেছে?’ উয়াইস বললেন, ’হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ’তোমার মা আছে?’ উয়াইস বললেন, ’হ্যাঁ।’তিনি বললেন, ’আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, ’’মুরাদ (পরিবারের) এবং ক্বার্ন্ (গোত্রের) উয়াইস ইবনু আমের ইয়ামানের সহযোগী ফৌজের সঙ্গে তোমাদের কাছে আসবে। তার দেহে ধবল দাগ আছে, যা এক দিরহাম সম স্থান ছাড়া সবই ভাল হয়ে গেছে। সে তার মায়ের সাথে সদাচারী হবে। সে যদি আল্লাহর প্রতি কসম খায়, তবে আল্লাহ তা পূরণ করে দেবেন। সুতরাং (হে উমর!) তুমি যদি নিজের জন্য তাকে দিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনার দো’আ করাতে পার, তাহলে অবশ্যই করবে।’’ সুতরাং তুমি আমার জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা কর।’ শোনামাত্র উয়াইস উমরের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন।অতঃপর উমর তাঁকে বললেন, ’তুমি কোথায় যাবে?’ উয়াইস বললেন, ’কূফা।’ তিনি বললেন, ’আমি কি তোমার জন্য সেখানকার গভর্নরকে পত্র লিখে দেব না?’ উয়াইস বললেন, ’আমি সাধারণ গরীব-মিসকীনদের সাথে থাকতে ভালবাসি।’ অতঃপর যখন আগামী বছর এল তখন কূফার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হজ্জে এল। সে উমর (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তিনি তাকে উয়াইস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, ’আমি তাঁকে এই অবস্থায় ছেড়ে এসেছি যে, তিনি একটি ভগ্ন কুটির ও স্বল্প সামগ্রীর মালিক ছিলেন।’উমর (রাঃ) বললেন, ’আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, ’’মুরাদ (পরিবারের) এবং ক্বার্ন্ (গোত্রের) উয়াইস ইবনু আমের ইয়ামানের সহযোগী ফৌজের সঙ্গে তোমাদের নিকট আসবে। তার দেহে ধবল রোগ আছে, যা এক দিরহামসম স্থান ছাড়া সবই ভালো হয়ে গেছে। সে তার মায়ের সাথে সদাচারী (মা-ভক্ত) হবে। সে যদি আল্লাহর উপর কসম খায়, তাহলে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেবেন। যদি তুমি তোমার জন্য তার দ্বারা ক্ষমাপ্রার্থনার দো’আ করাতে পার, তাহলে অবশ্যই করবে।’’অতঃপর সে (কূফার লোকটি হজ্জ সম্পাদনের পর) উয়াইস (ক্বারনীর) নিকট এল এবং বলল, ’আপনি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।’ উয়াইস বললেন, ’তুমি এক শুভযাত্রা থেকে নব আগমন করেছ। অতএব তুমি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর।’ অতঃপর তিনি বললেন, ’তুমি উমরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছ?’ সে বলল, ’হ্যাঁ।’ সুতরাং উয়াইস তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। (এসব শুনে) লোকেরা (উয়াইসের) মর্যাদা জেনে নিল। সুতরাং তিনি তার সামনের দিকে (অন্যত্র) চলে গেলেন। (মুসলিম)মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় উসাইর ইবনু জাবের (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, কুফার কিছু লোক উমর (রাঃ)-এর নিকট এল। তাদের মধ্যে একটি লোক ছিল, সে উয়াইসের সাথে উপহাস করত। উমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ’এখানে ক্বার্ন গোত্রের কেউ আছে কি?’ অতঃপর ঐ ব্যক্তি এল। উমর (রাঃ) বললেন, ’রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ’’তোমাদের নিকট ইয়ামান থেকে উয়াইস নামক একটি লোক আসবে। সে ইয়ামানে কেবলমাত্র তার মা-কে রেখে আসবে। তার দেহে ধবল রোগ ছিল। সে আল্লাহর কাছে দো’আ করলে আল্লাহ তা এক দ্বীনার অথবা এক দিরহাম সম স্থান ব্যতীত সবই দূর করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমাদের কারো যদি তার সাথে সাক্ষাৎ হয়, তাহলে সে যেন তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।’’অন্য এক বর্ণনায় আছে, উমর (রাঃ) বলেন, ’আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট শুনেছি, তিনি বলেছেন, ’’সর্বশ্রেষ্ঠ তাবেঈন হল এক ব্যক্তি, যাকে উয়াইস বলা হয়। তার মা আছে। তার ধবল রোগ ছিল। তোমরা তাকে আদেশ করো, সে যেন তোমাদের জন্য (আল্লাহর নিকট) ক্ষমাপ্রার্থনা করে।’’ [১]

মুসলিম ২৫৪২, আহমাদ ২৬৮, দারেমী ৪৩৯

রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১৪/৩৭৭-এর সারসংক্ষেপ

এই দীর্ঘ হাদিসে উয়াইস ইবনু আমেরের মর্যাদা, মায়ের সাথে সদাচার এবং বিনয়ের বড় শিক্ষা আছে। উমার (রাঃ) ইয়ামান থেকে আসা লোকদের মাঝে উয়াইসকে খুঁজতেন, কারণ রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) তাঁর পরিচয় জানিয়েছিলেন। তাঁর শরীরে শ্বেত রোগ ছিল, আল্লাহর দোয়ায় তা প্রায় দূর হয়েছিল। তাঁর মা ছিল এবং তিনি মায়ের সাথে সদাচারী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) উমার (রাঃ)-কে বলেছিলেন, যদি সম্ভব হয়, উয়াইসকে দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া করাতে। উয়াইস নিজে বড় মর্যাদার মানুষ হয়েও সাধারণ গরীবদের মাঝে থাকতে পছন্দ করতেন এবং খ্যাতি এড়িয়ে চলতেন। এই হাদিস শেখায়, আল্লাহর কাছে মর্যাদা বাহ্যিক সম্পদে নয়; মায়ের সেবা, বিনয়, দোয়া এবং আন্তরিকতায় হতে পারে।

এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা

  • মায়ের সাথে সদাচার আল্লাহর কাছে মর্যাদার কারণ হতে পারে।
  • বড় মর্যাদা থাকলেও বিনয়ী থাকা উয়াইস কারনীর সুন্দর গুণ।
  • নেক মানুষের কাছে দোয়া চাওয়া বৈধ ও উপকারী হতে পারে।
  • খ্যাতি এড়িয়ে সাধারণ মানুষের মতো থাকা অনেক সময় বিনয়ের পরিচয়।

এই সম্পর্কিত হাদিসসমূহ

সেটিংস

ভাষা

ফন্ট সেটিংস

আরবি ফন্ট ফেস

আরবি ফন্ট সাইজ

২৪

অনুবাদ ফন্ট সাইজ

১৮

রিডিং লেআউট

আল হাদিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন

App Banner

ইসলামের জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হোন

আপনার নিয়মিত সহায়তা আমাদের দ্বীনি ভাই-বোনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সাহয্য করবে। আমাদের মিশনে আপনিও অংশ নিন এবং বড় পরিবর্তনের অংশীদার হোন।

সাপোর্ট করুন