১/৫৬. অধ্যায়ঃ
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ৭/৫০২ - ক্ষুধা, মেহমানদারি ও নিয়ামতের জবাবদিহি
উপবাস, রুক্ষ ও নীরস জীবন যাপন করা, পানাহার ও পোশাক ইত্যাদি মনোরঞ্জনমূলক বস্তুতে অল্পে তুষ্ট হওয়া এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব বর্জন করার মাহাত্ম্য
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,فَخَلَفَ مِنۢ بَعۡدِهِمۡ خَلۡفٌ أَضَاعُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَٱتَّبَعُواْ ٱلشَّهَوَٰتِۖ فَسَوۡفَ يَلۡقَوۡنَ غَيًّا ٥٩ إِلَّا مَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ صَٰلِحٗا فَأُوْلَٰٓئِكَ يَدۡخُلُونَ ٱلۡجَنَّةَ وَلَا يُظۡلَمُونَ شَيۡٔٗا ٦٠﴾[مريم: ٥٩، ٦٠]অর্থাৎ “তাদের পর এল অপদার্থ পরবর্তীগণ, তারা নামায নষ্ট করল ও প্রবৃত্তিপরায়ণ হল; সুতরাং তারা অচিরেই অমঙ্গল প্রত্যক্ষ করবে। কিন্তু তারা নয় যারা তাওবা করেছে, ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে; তারা তো জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর তাদের প্রতি কোন যুলুম করা হবে না।” (সূরা মারয়্যাম ৫৯-৬০ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴿ فَخَرَجَ عَلَىٰ قَوۡمِهِۦ فِي زِينَتِهِۦۖ قَالَ ٱلَّذِينَ يُرِيدُونَ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا يَٰلَيۡتَ لَنَا مِثۡلَ مَآ ُوتِيَ قَٰرُونُ إِنَّهُۥ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٖ ٧٩ وَقَالَ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَ وَيۡلَكُمۡ ثَوَابُ ٱللَّهِ خَيۡرٞ لِّمَنۡ ءَامَنَ وَعَمِلَ صَٰلِحٗاۚ﴾[القصص: ٧٩، ٨٠]অর্থাৎ “কারূন তার সম্প্রদায়ের সম্মুখে জাঁকজমক সহকারে বাহির হল। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল, আহা! কারূনকে যা দেওয়া হয়েছে সেরূপ যদি আমাদেরও থাকত; প্রকৃতই সে মহা ভাগ্যবান। আর যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা বলল, ধিক্ তোমাদের! যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ। আর ধৈর্যশীল ব্যতীত তা অন্য কেউ পায় না।” (সূরা কাস্বাস ৭৯-৮০ আয়াত)আরো অন্য জায়গায় তিনি বলেছেন,﴿ ثُمَّ لَتُسَۡٔلُنَّ يَوۡمَئِذٍ عَنِ ٱلنَّعِيمِ ٨﴾[التكاثر: ٨]অর্থাৎ “এরপর অবশ্যই সেদিন তোমরা সুখ-সম্পদ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে।” (সূরা তাকাসুর ৮)অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴿ مَّن كَانَ يُرِيدُ ٱلۡعَاجِلَةَ عَجَّلۡنَا لَهُۥ فِيهَا مَا نَشَآءُ لِمَن نُّرِيدُ ثُمَّ جَعَلۡنَا لَهُۥ جَهَنَّمَ يَصۡلَىٰهَا مَذۡمُومٗا مَّدۡحُورٗا ١٨﴾[الاسراء: ١٨]অর্থাৎ “কেউ পার্থিব সুখ-সম্ভোগ কামনা করলে আমি যাকে যা ইচ্ছা সত্বর দিয়ে থাকি, পরে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত করি; সেখানে সে প্রবেশ করবে নিন্দিত ও অনুগ্রহ হতে দূরীকৃত অবস্থায়।” (সূরা বানী ইস্রাঈল ১৮ আয়াত)
নিয়ামতের জবাবদিহি: ক্ষুধার পর খাবার পাওয়ার শিক্ষা
রিয়াদুস সালেহীন : ৭/৫০২
রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ৭/৫০২
وَعَن أَبي هُرَيرَةَ رضي الله عنه، قَالَ: خَرَجَ رَسُول اللهِ ﷺ ذَاتَ يَوْمٍ أَوْ لَيْلَةٍ، فَإذَا هُوَ بأَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنهُمَا، فَقَالَ: «مَا أَخْرَجَكُمَا مِنْ بُيُوتِكُما هَذِهِ السَّاعَةَ ؟ » قَالاَ: الجُوعُ يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ. قَالَ: «وَأَنَا، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لأَخْرَجَنِي الَّذِي أَخْرَجَكُما، قُومَا»، فقَامَا مَعَهُ، فَأتَى رَجُلاً مِنَ الأَنْصَارِ، فَإِذَا هُوَ لَيْسَ في بيْتِهِ، فَلَمَّا رَأَتْهُ المَرْأَةُ، قَالَت: مَرْحَبَاً وَأهلاً.فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللهِ ﷺ ﷺ: «أيْنَ فُلاَنُ؟» قَالَت: ذَهَبَ يَسْتَعْذِبُ لنَا المَاءَ. إِذْ جَاءَ الأَنْصَارِيُّ، فَنَظَرَ إِلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ وَصَاحِبَيْهِ، ثُمَّ قَالَ: الحَمْدُ للهِ، مَا أَحَدٌ الْيَوْمَ أكْرَمَ أضْيَافاً مِنِّي، فَانْطَلَقَ فَجَاءَهُمْ بِعِذْقٍ فِيهِ بُسْرٌ وَتَمْرٌ وَرُطَبٌ، فَقَالَ: كُلُوا، وَأَخَذَ الْمُدْيَةَ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللهِ ﷺ ﷺ: «إيْاكَ وَالْحَلُوبَ» فَذَبَحَ لَهُمْ، فَأكَلُوا مِنَ الشَّاةِ وَمِنْ ذَلِكَ العِذْقِ وَشَرِبُوا . فَلَمَّا أنْ شَبِعُوا وَرَوُوا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ﷺ لأَبي بَكْر وَعُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنهُمَا: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَتُسْأَلُنَّ عَنْ هَذَا النَّعِيمِ يَوْمَ القِيَامَةِ، أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُيُوتِكُمُ الْجُوعُ، ثُمَّ لَمْ تَرْجِعُوا حَتَّى أصَابَكُمْ هَذَا النَّعِيمُ ».رواه مسلم
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোন একদিন অথবা কোন এক রাতে (ঘর থেকে) বের হলেন, অতঃপর অকস্মাৎ আবূ বকর ও উমর (রাঃ) এর সঙ্গে তাঁর দেখা হল। তিনি বললেন, ’’এ সময় তোমরা বাড়ি থেকে কেন বের হয়েছ?’’ তাঁরা বললেন, ’ক্ষুধার তাড়নায় হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, ’’সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। আমিও সেই কারণে বাড়ি থেকে বের হয়েছি, যে কারণে তোমরা বের হয়েছ। তোমরা ওঠো (এবং আমার সঙ্গে চল)।’’ অতঃপর তাঁরা দু’জনে তাঁর সঙ্গে চলতে লাগলেন।তারপর তিনি এক আনসারীর বাড়ি এলেন। আনসারী সে সময় বাড়িতে ছিলেন না। যখন তাঁর স্ত্রী নবী (ﷺ)-কে দেখলেন তখন অভ্যর্থনা ও স্বাগত জানালেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বললেন, ’’অমুক (আনসারী) কোথায়?’’ তিনি বললেন, ’আমাদের জন্য মিঠা পানি আনতে গেছেন।’ এর মধ্যে আনসারী এসে গেলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর সঙ্গীদ্বয়কে দেখে বললেন, ’আলহামদু লিল্লাহ, আজ আমার (বাড়ির) চেয়ে সম্মানিত মেহমান কারো (বাড়িতে) নেই।’অতঃপর তিনি চলে গেলেন এবং খেজুরের একটা কাঁদি আনলেন, যাতে কাঁচা, শুকনো এবং পাকা (টাটকা) খেজুর ছিল। অতঃপর আনসারী বললেন, ’আপনারা খান এবং তিনি নিজে ছুরি ধরলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বললেন, ’’দুধালো ছাগল জবাই করো না।’’ অতঃপর তিনি (ছাগল) জবাই করলেন। তাঁরা ছাগলের (মাংস) খেলেন, ঐ খেজুর কাঁদি থেকে খেজুর খেলেন এবং পানি পান করলেন।তারপর তাঁরা যখন (পানাহার করে) পরিতৃপ্ত হলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবূ বকর ও উমর (রাঃ) কে বললেন, ’’সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে! নিশ্চয় তোমাদেরকে কেয়ামতের দিন নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ক্ষুধা তোমাদেরকে বাড়ি থেকে বের করেছিল, কিন্তু এখন এ নিয়ামত উপভোগ করে নিজেদের (বাড়ি) ফিরে যাচ্ছ।’’ (মুসলিম) [১] উক্ত আনসারীর নাম ছিলঃ আবুল হাইসাম তাইয়িহান; যেমন তিরমিযীতে আছে। আর উক্ত জিজ্ঞাসাবাদ গণনার উদ্দেশ্যে করা হবে, ধমকি বা শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়।
মুসলিম ২০৩৮, তিরমিযী ২৩৬৯, ইবনু মাজাহ ৩১৮০
অনুবাদের উৎস
- সংকলক:
- মুহিউদ্দীন আবূ যাকারিয়্যা ইয়াহইয়া বিন শারফ আন্-নাবাবী (রহ.)
- প্রকাশক:
- তাওহীদ পাবলিকেশন্স
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ৭/৫০২-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم, আবূ বকর (রাঃ) ও উমার (রাঃ) ক্ষুধার কারণে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন। পরে এক আনসারী সাহাবীর ঘরে তাঁরা খেজুর, ছাগলের মাংস ও পানি পেলেন। আনসারী সাহাবী তাঁদের সম্মানিত মেহমান মনে করে আনন্দের সাথে আপ্যায়ন করলেন। রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم দুধালো ছাগল জবাই করতে নিষেধ করলেন, যা খাবারের ব্যবহারে সতর্কতার শিক্ষা দেয়। পানাহার শেষে তিনি মনে করিয়ে দিলেন, এই নিয়ামত সম্পর্কেও কিয়ামতের দিন প্রশ্ন করা হবে। তাই খাবার, পানি, মেহমানদারি, নিরাপত্তা—এসবকে ছোট ভাবা ঠিক নয়। নিয়ামতের জবাবদিহি মনে রাখলে মানুষ কৃতজ্ঞ ও সংযত হয়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- খাবার ও পানি আল্লাহর বড় নিয়ামত, এগুলোকে ছোট করে দেখা উচিত নয়।
- মেহমানকে সম্মান করা সাহাবীদের সুন্দর আচরণের অংশ ছিল।
- নিয়ামত ভোগের পর কৃতজ্ঞতা ও জবাবদিহির কথা মনে রাখা দরকার।
- প্রয়োজনের সময়ও সম্পদ ব্যবহারে বিবেচনা থাকা ভালো।
