১/৫৬. অধ্যায়ঃ
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১২/৫০৭ - আবূ হুরাইরার ক্ষুধা ও দুধের বরকত
উপবাস, রুক্ষ ও নীরস জীবন যাপন করা, পানাহার ও পোশাক ইত্যাদি মনোরঞ্জনমূলক বস্তুতে অল্পে তুষ্ট হওয়া এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব বর্জন করার মাহাত্ম্য
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,فَخَلَفَ مِنۢ بَعۡدِهِمۡ خَلۡفٌ أَضَاعُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَٱتَّبَعُواْ ٱلشَّهَوَٰتِۖ فَسَوۡفَ يَلۡقَوۡنَ غَيًّا ٥٩ إِلَّا مَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ صَٰلِحٗا فَأُوْلَٰٓئِكَ يَدۡخُلُونَ ٱلۡجَنَّةَ وَلَا يُظۡلَمُونَ شَيۡٔٗا ٦٠﴾[مريم: ٥٩، ٦٠]অর্থাৎ “তাদের পর এল অপদার্থ পরবর্তীগণ, তারা নামায নষ্ট করল ও প্রবৃত্তিপরায়ণ হল; সুতরাং তারা অচিরেই অমঙ্গল প্রত্যক্ষ করবে। কিন্তু তারা নয় যারা তাওবা করেছে, ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে; তারা তো জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর তাদের প্রতি কোন যুলুম করা হবে না।” (সূরা মারয়্যাম ৫৯-৬০ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴿ فَخَرَجَ عَلَىٰ قَوۡمِهِۦ فِي زِينَتِهِۦۖ قَالَ ٱلَّذِينَ يُرِيدُونَ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا يَٰلَيۡتَ لَنَا مِثۡلَ مَآ ُوتِيَ قَٰرُونُ إِنَّهُۥ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٖ ٧٩ وَقَالَ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَ وَيۡلَكُمۡ ثَوَابُ ٱللَّهِ خَيۡرٞ لِّمَنۡ ءَامَنَ وَعَمِلَ صَٰلِحٗاۚ﴾[القصص: ٧٩، ٨٠]অর্থাৎ “কারূন তার সম্প্রদায়ের সম্মুখে জাঁকজমক সহকারে বাহির হল। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা বলল, আহা! কারূনকে যা দেওয়া হয়েছে সেরূপ যদি আমাদেরও থাকত; প্রকৃতই সে মহা ভাগ্যবান। আর যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তারা বলল, ধিক্ তোমাদের! যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ। আর ধৈর্যশীল ব্যতীত তা অন্য কেউ পায় না।” (সূরা কাস্বাস ৭৯-৮০ আয়াত)আরো অন্য জায়গায় তিনি বলেছেন,﴿ ثُمَّ لَتُسَۡٔلُنَّ يَوۡمَئِذٍ عَنِ ٱلنَّعِيمِ ٨﴾[التكاثر: ٨]অর্থাৎ “এরপর অবশ্যই সেদিন তোমরা সুখ-সম্পদ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে।” (সূরা তাকাসুর ৮)অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴿ مَّن كَانَ يُرِيدُ ٱلۡعَاجِلَةَ عَجَّلۡنَا لَهُۥ فِيهَا مَا نَشَآءُ لِمَن نُّرِيدُ ثُمَّ جَعَلۡنَا لَهُۥ جَهَنَّمَ يَصۡلَىٰهَا مَذۡمُومٗا مَّدۡحُورٗا ١٨﴾[الاسراء: ١٨]অর্থাৎ “কেউ পার্থিব সুখ-সম্ভোগ কামনা করলে আমি যাকে যা ইচ্ছা সত্বর দিয়ে থাকি, পরে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত করি; সেখানে সে প্রবেশ করবে নিন্দিত ও অনুগ্রহ হতে দূরীকৃত অবস্থায়।” (সূরা বানী ইস্রাঈল ১৮ আয়াত)
আবূ হুরাইরার ক্ষুধা ও আহলে সুফফাকে আগে দেওয়ার শিক্ষা
রিয়াদুস সালেহীন : ১২/৫০৭
রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ১২/৫০৭
وَعَن أَبي هُرَيرَةَ رضي الله عنه، قَالَ: وَاللهِ الَّذِي لاَ إِلٰهَ إِلاَّ هُوَ، إنْ كُنْتُ لأَعْتَمِدُ بِكَبِدِي عَلَى الأَرْضِ مِنَ الجُوعِ، وَإنْ كُنْتُ لأَشُدُّ الحَجَرَ عَلَى بَطنِي مِنَ الْجُوعِ. وَلَقَدْ قَعَدْتُ يَوماً عَلَى طَرِيقِهِمُ الَّذِي يَخْرُجُونَ مِنْهُ، فَمَرَّ بِي النِّبيُّ ﷺ، فَتَبَسَّمَ حِيْنَ رَآنِي، وَعَرَفَ مَا فِي وَجْهِي وَمَا فِي نَفْسِي، ثُمَّ قَالَ: «أَبَا هِرٍّ » قُلْتُ: لَبَّيْكَ يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، قَالَ: «الْحَقْ» وَمَضَى فَاتَّبَعْتُهُ، فَدَخَلَ فَاسْتَأذَنَ، فَأَذِنَ لِي فَدَخَلْتُ، فَوَجَدَ لَبَنَاً في قَدَحٍ، فَقَالَ: « مِنْ أَيْنَ هَذَا اللَّبَنُ ؟ »قَالُوا: أهْدَاهُ لَكَ فُلانٌ -أَو فُلانَةٌ- قَالَ: «أَبَا هِرٍّ» قُلتُ: لَبَّيْكَ يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، قَالَ: «الْحَقْ إِلَى أهْلِ الصُّفَّةِ فَادْعُهُمْ لِي » قَالَ: وَأهْلُ الصُّفَّةِ أضْيَافُ الإِسْلاَمِ، لاَ يَأوُونَ علَى أهْلٍ وَلاَ مَالٍ وَلاَ عَلَى أحَدٍ، وَكَانَ إِذَا أتَتْهُ صَدَقَةٌ بَعَثَ بِهَا إلَيْهِمْ، وَلَمْ يَتَنَاوَلْ مِنْهَا شَيْئاً، وَإِذَا أتَتْهُ هَدِيَّةٌ أرْسَلَ إلَيْهِمْ، وَأصَابَ مِنْهَا، وأشْرَكَهُمْ فِيهَا. فَسَاءَنِي ذَلِكَ، فَقُلْتُ: وَمَا هَذَا اللَّبَنُ في أهْلِ الصُّفَّةِ ! كُنْتُ أحَقُّ أنْ أُصِيبَ مِنْ هَذَا اللَّبَنِ شَرْبَةً أتَقَوَّى بِهَا، فَإذَا جَاءُوا وَأمَرَنِي فَكُنْتُ أنَا أُعْطِيهِمْ؛ وَمَا عَسَى أنْ يَبْلُغَنِي مِنْ هَذَا اللَّبَنِ .وَلَمْ يَكُنْ مِنْ طَاعَةِ اللهِ وَطَاعَةِ رَسُولِ اللهِ ﷺ بُدٌّ، فَأَتَيْتُهُمْ فَدَعَوْتُهُمْ، فَأقْبَلُوا وَاسْتَأذَنُوا، فَأَذِنَ لَهُمْ وَأخَذُوا مَجَالِسَهُمْ مِنَ الْبَيْتِ، قَالَ: «يَا أَبَا هِرٍّ» قُلْتُ: لَبَّيْكَ يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، قَالَ: «خُذْ فَأعْطِهِمْ» قَالَ: فَأخَذْتُ القَدَحَ، فَجَعَلْتُ أُعْطِيهِ الرَّجُل فَيَشْرَبُ حَتَّى يَرْوَى، ثُمَّ يَرُدُّ عَلَيَّ الْقَدَحَ، فَأُعْطِيهِ الرَّجُلَ فَيَشْرَبُ حَتَّى يَرْوَى، ثُمَّ يَرُدُّ عَلَيَّ الْقَدَحَ، فَأُعْطِيهِ الرَّجُلَ فَيَشْرَبُ حَتَّى يَرْوَى، ثُمَّ يَرُدُّ عَلَيَّ الْقَدَحَ حَتَّى انْتَهَيْتُ إِلَى النَّبيِّ ﷺ، وَقَدْ رَوِيَ الْقَوْمُ كُلُّهُمْ، فَأخَذَ الْقَدَحَ فَوَضَعَهُ عَلَى يَدِهِ، فَنَظَرَ إليَّ فَتَبَسَّمَ، فَقَالَ: «أَبَا هِرٍّ» قُلْتُ: لَبَّيْكَ يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، قَالَ: «بَقيتُ أنَا وَأنْتَ» قُلْتُ: صَدَقْتَ يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، قَالَ: «اقْعُدْ فَاشْرَبْ» فَقَعَدْتُ فَشَرِبْتُ، فَقَالَ «اشْرَبْ» فَشَرِبْتُ، فَمَا زَالَ يَقُولُ: «اشْرَبْ» حَتَّى قُلْتُ: لاَ، وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالحَقِّ لاَ أجِدُ لَهُ مَسْلكاً ! قَالَ: «فَأرِنِي» فَأعْطَيْتُهُ الْقَدَحَ، فَحَمِدَ الله تَعَالَى، وَسَمَّى وَشَرِبَ الفَضْلَةَ.رواه البخاري
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
সেই আল্লাহর কসম, যিনি ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই! আমি ক্ষুধার জ্বালায় মাটিতে কলিজা (পেট) লাগাতাম এবং পেটে পাথর বাঁধতাম। একদিন লোকেরা যে রাস্তায় বের হয়, সে রাস্তায় বসে গেলাম। কিছুক্ষণ পর নবী (ﷺ) আমাকে অতিক্রম করা কালীন সময়ে দেখে মুচকি হাসলেন এবং আমার চেহারার অবস্থা ও মনের কথা বুঝে ফেলে বললেন, ’’আবূ হির্র্!’’ আমি বললাম, ’খিদমতে হাযির, হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, ’’আমার পিছন ধর।’’ সুতরাং তিনি চলতে লাগলেন এবং আমি তাঁর অনুসরণ করতে লাগলাম।তিনি (নিজ ঘরে) প্রবেশ করলেন। অতঃপর তিনি আমার জন্য অনুমতি চাইলেন। তারা আমার জন্য অনুমতি দিলে আমি প্রবেশ করলাম। ঘরে এক পিয়ালা দুধ (দেখতে) পেলেন। তিনি বললেন, ’’এ দুধ কোত্থেকে এল?’’ তারা বলল, ’আপনার জন্য অমুক লোক বা মহিলা উপঢৌকন পাঠিয়েছে।’ তিনি বললেন, ’’আবূ হির্র্!’’ আমি বললাম, ’খিদমতে হাযির, হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, ’’আহলে সুফফাদের ডেকে আন।’’তাঁরা ইসলামের মেহমান ছিলেন, তাঁদের কোন আশ্রয় ছিল না। ছিল না কোন পরিবার ও ধন-সম্পদ বা অন্য কিছু। (সাদকাহ ও হাদিয়াতে তাঁদের জীবন কাটত।) তাঁর নিকট কোন সাদকাহ এলে তিনি সবটুকুই তাঁদের নিকট পাঠিয়ে দিতেন। তা থেকে তিনি কিছুই গ্রহণ করতেন না। আর কোন হাদিয়া বা উপঢৌকন এলেও তাঁদের নিকট পাঠাতেন। কিন্তু তা থেকে কিছু গ্রহণ করতেন এবং তাঁদেরকে তাতে শরীক করতেন।(তিনি যখন তাঁদেরকে ডাকতে বললেন,) তখন আমাকে খারাপ লাগল। আমি (মনে মনে) বললাম, ’এই টুকু দুধে আহলে সূফ্ফাদের কী হবে? আমিই তো বেশী হকদার যে, এই দুধ পান করে একটু শক্তিশালী হতাম। কিন্তু যখন তাঁরা আসবেন এবং তিনি আমাকে আদেশ করলে আমি তাঁদেরকে দুধ পরিবেশন করব। তারপর আমার ভাগে এই দুধের কতটুকুই বা জুটবে!’ অথচ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথা মান্য করা ছাড়া অন্য কোন উপায়ও ছিল না। সুতরাং আমি তাঁদের নিকট এসে তাঁদেরকে ডাকলাম। তাঁরা এসে প্রবেশ অনুমতি নিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করে নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন।তিনি বললেন, ’’আবূ হির্র্!’’ আমি বললাম, ’খিদমতে হাযির, হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, ’’পিয়ালা নাও এবং ওদেরকে দাও।’’ সুতরাং আমি পিয়ালাটি নিয়ে এক একজনকে দিতে লাগলাম। তিনি তৃপ্তিসহকারে পান করে আমাকে পিয়ালা ফেরত দিলেন। অতঃপর আর একজনকে দিলাম। তিনি তৃপ্তিসহকারে পান করে আমাকে পিয়ালা ফেরত দিলেন। অতঃপর আর একজনকে দিলাম। তিনি তৃপ্তিসহকারে পান করে আমাকে পিয়ালা ফেরত দিলেন। এইভাবে পরিশেষে নবী (ﷺ) এর নিকট এসে উপস্থিত হলাম। সে পর্যন্ত তাঁদের সবাই পান করে পরিতৃপ্ত হয়ে গেছেন।অতঃপর তিনি পিয়ালাটি নিয়ে নিজের হাতে রাখলেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ’’আবূ হির্র্!’’ আমি বললাম, ’খিদমতে হাযির, হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, ’’এখন বাকী আমি আর তুমি।’’ আমি বললাম, ’ঠিকই বলেছেন হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, ’’বসো এবং পান কর।’’ আমি বসে পান করলাম। তিনি আবার বললেন, ’’পান কর।’’ সুতরাং আমি আবার পান করলাম। অতঃপর তিনি আমাকে পান করার কথা বলতেই থাকলেন।পরিশেষে আমি বললাম, ’না। (আর পারব না।) সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, এর জন্য আমার পেটে আর কোন জায়গা নেই!’ অতঃপর তিনি বললেন, ’’কৈ আমাকে দেখাও।’’ সুতরাং আমি তাঁকে পিয়ালা দিলে তিনি মহান আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং ’বিসমিল্লাহ’ বলে অবশিষ্ট দুধ পান করলেন। (বুখারী) [১]
সহীহুল বুখারী ৫৩৭৫, ৬২৪৬, ৬৪৫২, তিরমিযী ২৪৭৭, আহমাদ ১০৩০১
অনুবাদের উৎস
- সংকলক:
- মুহিউদ্দীন আবূ যাকারিয়্যা ইয়াহইয়া বিন শারফ আন্-নাবাবী (রহ.)
- প্রকাশক:
- তাওহীদ পাবলিকেশন্স
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১২/৫০৭-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে আবূ হুরাইরা (রাঃ) নিজের কঠিন ক্ষুধার কথা বলেন। তিনি ক্ষুধায় পেট মাটিতে লাগাতেন এবং পেটে পাথর বাঁধতেন। রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم তাঁর অবস্থা বুঝে তাঁকে সঙ্গে নিলেন। ঘরে এক পিয়ালা দুধ এলে তিনি আবূ হুরাইরা (রাঃ)-কে আহলে সুফফাকে ডাকতে বললেন। আবূ হুরাইরা (রাঃ) মনে মনে ভাবলেন, এতটুকু দুধে সবার কী হবে, তবুও তিনি আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করলেন। সবাই তৃপ্ত হয়ে পান করার পর তিনিও পান করলেন, তারপর নবীজি صلى الله عليه وسلم আল্লাহর প্রশংসা করে অবশিষ্ট পান করলেন। এই হাদিসে ক্ষুধা, আনুগত্য, ভাগাভাগি, আহলে সুফফার সম্মান এবং নবীজির দয়া স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- নিজের প্রয়োজন থাকলেও রাসূলের নির্দেশ মানা সাহাবীদের বড় গুণ ছিল।
- অভাবের সময় খাবার ভাগ করে নেওয়া সুন্দর চরিত্রের অংশ।
- আহলে সুফফার মতো অভাবী মানুষদের প্রতি যত্ন নেওয়া দরকার।
- খাবার শেষে আল্লাহর প্রশংসা ও বিসমিল্লাহর শিক্ষা এই বর্ণনায় আছে।
