১/৫৭. অধ্যায়ঃ
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ৩/৫২৯ - লোভহীন সম্পদে বরকত
অল্পে তুষ্টি, চাওয়া হতে দূরে থাকা এবং মিতাচারিতা ও মিতব্যয়িতার মাহাত্ম্য এবং অপ্রয়োজনে চাওয়ার নিন্দাবাদ
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَمَا مِن دَآبَّةٖ فِي ٱلۡأَرۡضِ إِلَّا عَلَى ٱللَّهِ رِزۡقُهَا﴾[هود: ٦]অর্থাৎ “আর ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী কোন এমন প্রাণী নেই যে, তার রুযী আল্লাহর দায়িত্বে নেই।” (সূরা হূদ ৬ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴿ لِلۡفُقَرَآءِ ٱلَّذِينَ أُحۡصِرُواْ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ لَا يَسۡتَطِيعُونَ ضَرۡبٗا فِي ٱلۡأَرۡضِ يَحۡسَبُهُمُ ٱلۡجَاهِلُ أَغۡنِيَآءَ مِنَ ٱلتَّعَفُّفِ تَعۡرِفُهُم بِسِيمَٰهُمۡ لَا يَسَۡٔلُونَ ٱلنَّاسَ إِلۡحَافٗاۗ﴾[البقرة: ٢٧٣]অর্থাৎ “(দান) অভাবগ্রস্ত লোকদের প্রাপ্য; যারা আল্লাহর পথে এমনভাবে ব্যাপৃত যে, জীবিকার সন্ধানে ভূপৃষ্ঠে ঘোরা-ফেরা করতে পারে না। তারা কিছু চায় না বলে, অবিবেচক লোকেরা তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে। তুমি তাদেরকে তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে; তারা লোকদের কাছে নাছোড়বান্দা হয়ে যাচ্ঞা করে না।” (সূরা বাক্বারাহ ২৭৩ আয়াত)তিনি অন্যত্র বলেন,﴿ وَٱلَّذِينَ إِذَآ أَنفَقُواْ لَمۡ يُسۡرِفُواْ وَلَمۡ يَقۡتُرُواْ وَكَانَ بَيۡنَ ذَٰلِكَ قَوَامٗا ٦٧﴾[الفرقان: ٦٦]অর্থাৎ “যারা ব্যয় করলে অপচয় করে না, কার্পণ্যও করে না; বরং তারা এ দুয়ের মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করে।” (সূরা ফুরকান ৬৭ আয়াত)তিনি অন্য জায়গায় বলেছেন,﴿وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦ مَآ أُرِيدُ مِنۡهُم مِّن رِّزۡقٖ وَمَآ أُرِيدُ أَن يُطۡعِمُونِ٥٧﴾[الذاريات: ٥٦، ٥٧]অর্থাৎ “আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে। আমি তাদের নিকট হতে জীবিকা চাই না এবং এও চাই না যে তারা আমার আহার্য যোগাবে।” (সূরা যারিয়াত ৫৬-৫৭ আয়াত)
উপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম: লোভহীন সম্পদের হাদিস
রিয়াদুস সালেহীন : ৩/৫২৯
রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ৩/৫২৯
وَعَن حَكِيمِ بنِ حِزَامٍ رضي الله عنه، قَالَ: سألتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ ﷺ فَأعْطَانِي، ثُمَّ سَألْتُهُ فَأَعْطَانِي، ثُمَّ سَألْتُهُ فَأعْطَانِي، ثُمَّ قَالَ: «يَا حَكِيم، إنَّ هَذَا المَالَ خَضِرٌ حُلْوٌ، فَمَنْ أخَذَهُ بِسَخَاوَةِ نَفسٍ بُورِكَ لَهُ فِيهِ، وَمَنْ أخَذَهُ بإشرَافِ نَفسٍ لَمْ يُبَارَكْ لَهُ فِيهِ، وَكَانَ كَالَّذِي يَأكُلُ وَلاَ يَشْبَعُ، وَاليَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ اليَدِ السُّفْلَى»قَالَ حَكِيم: فَقُلتُ: يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالحَقِّ لاَ أرْزَأُ أحَداً بَعْدَكَ شَيْئاً حَتَّى أُفَارِقَ الدُّنْيَا، فَكَانَ أَبُو بَكْرٍ رضي الله عنه يَدْعُو حَكيماً لِيُعْطِيَه العَطَاء، فَيَأبَى أنْ يَقْبَلَ مِنْهُ شَيْئاً، ثُمَّ إنَّ عُمَرَ رضي الله عنه دَعَاهُ لِيُعْطِيَه فَأَبَى أنْ يَقْبَلَهُ. فَقَالَ: يَا مَعْشَرَ المُسْلِمِينَ، أُشْهِدُكُمْ عَلَى حَكيمٍ أنّي أعْرِضُ عَلَيْهِ حَقَّهُ الَّذِي قَسَمَهُ اللهُ لَهُ في هَذَا الفَيءِ فَيَأبَى أَنْ يَأخُذَهُ. فَلَمْ يَرْزَأْ حَكِيمٌ أحَداً مِنَ النَّاسِ بَعْدَ النَّبِيِّ ﷺ حَتَّى تُوُفِّي.متفقٌ عَلَيْهِ
হাকীম ইবনু হিযাম (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আমি নবী (ﷺ) এর নিকট কিছু চাইলে তিনি আমাকে দিলেন। আবার চাইলাম, তিনি আমাকে দিলেন। আবার চাইলাম, তিনি আমাকে দিলেন। অতঃপর বললেন, ’’হে হাকীম! এ সম্পদ শ্যামল-সুমিষ্ট। যে ব্যক্তি (লোভহীন) প্রশস্ত হৃদয়ে তা গ্রহণ করবে, তার জন্য তাতে বরকত দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি অন্তরের লোভসহ গ্রহণ করবে, তার জন্য তাতে বরকত দেওয়া হবে না। আর সে হবে এমন ব্যক্তির মত, যে খায় কিন্তু তার ক্ষুধা মেটে না। উপর হাত নিচু হাত হতে উত্তম।’’ (দাতা গ্রহীতা হতে উত্তম।) হাকীম বলেন, আমি বললাম, ’যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম! ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার পর মৃত্যু পর্যন্ত আমি কারো কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করব না।’তারপর আবূ বকর (রাঃ) হাকীমকে অনুদান গ্রহণের জন্য ডাকতেন, কিন্তু তাঁর নিকট থেকে কিছু গ্রহণ করতে অস্বীকার করতেন। অতঃপর উমর (রাঃ) তাঁকে কিছু দেওয়ার জন্য ডাকলেন, কিন্তু তিনি তাঁর নিকট থেকেও কিছু গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। উমর (রাঃ) বললেন, ’’হে মুসলিমগণ! হাকীমের ব্যাপারে আমি তোমাদেরকে সাক্ষী বানাচ্ছি যে, আমি তাঁর কাছে ’ফাই’ থেকে তাঁর প্রাপ্য পেশ করছি, কিন্তু সে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করছে।’’ (সত্য সত্যই) হাকীম নবী (ﷺ) এর পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন মানুষের নিকট থেকে কিছু গ্রহণ করেননি। (বুখারী ও মুসলিম) [১]
সহীহুল বুখারী ১৪২৮, ১৪৭২, ২৮৫০, ৩১৩৪, ৬৪৪১, মুসলিম ১০৩৪, ১০৩৫, তিরমিযী ২৪৬৩, নাসায়ী ২৫৩১, ২৫৩৪, ২৫৪৩, ২৫৪৪, ২৬০১, ২৬০২, ২৬০৩, আবূ দাউদ ১৬৭৬, আহমাদ ৭১১৫, ৭৩০১, ৭৩৮১, ৭৬৮৩, ৮৪৮৭, ৮৫২৬, ৮৮৭৮, দারেমী ১৬৫০, ১৬৫১, ১৬৫২, ১৬৫৩, ২৭৫০ (’ফাই’ সেই মালকে বলা হয়, যা বিনা যুদ্ধে শত্রুপক্ষ ত্যাগ করে পালিয়ে যায় অথবা যা সন্ধির মাধ্যমে লাভ হয়। পক্ষান্তরে যে মাল দস্তুরমত যুদ্ধ করে জয়যুক্ত হয়ে অর্জিত হয় তাকে ’মালে গনীমত’ বলা হয়।)
অনুবাদের উৎস
- সংকলক:
- মুহিউদ্দীন আবূ যাকারিয়্যা ইয়াহইয়া বিন শারফ আন্-নাবাবী (রহ.)
- প্রকাশক:
- তাওহীদ পাবলিকেশন্স
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ৩/৫২৯-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে হাকীম ইবনে হিযাম (রাঃ)-এর ঘটনা এসেছে। তিনি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর কাছে একাধিকবার কিছু চেয়েছিলেন এবং তিনি তাঁকে দিয়েছিলেন। পরে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) সম্পদের স্বভাব বুঝিয়ে বলেন, এই সম্পদ সবুজ-সুমিষ্ট। অর্থাৎ সম্পদ মানুষের কাছে আকর্ষণীয়। যে ব্যক্তি লোভহীন প্রশস্ত হৃদয়ে তা গ্রহণ করবে, তার জন্য তাতে বরকত হবে। আর যে ব্যক্তি অন্তরের লোভ নিয়ে গ্রহণ করবে, তার জন্য বরকত হবে না। তাকে এমন ব্যক্তির সাথে তুলনা করা হয়েছে, যে খায় কিন্তু ক্ষুধা মেটে না। এরপর বলা হয়েছে, উপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম। এই হাদিসে সম্পদ, লোভ, বরকত এবং দানের মর্যাদা একসাথে এসেছে। হাকীম (রাঃ) এই শিক্ষা এত গভীরভাবে গ্রহণ করেন যে নবী (صلى الله عليه وسلم)-এর পরে মৃত্যু পর্যন্ত কারো কাছ থেকে কিছু নেননি।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- সম্পদ আকর্ষণীয় হলেও লোভ নিয়ে গ্রহণ করা ক্ষতিকর।
- লোভহীনভাবে পাওয়া সম্পদে বরকতের আশা করা যায়।
- দাতা হাত গ্রহীতা হাতের চেয়ে উত্তম বলা হয়েছে।
- ভালো উপদেশ মানুষকে জীবনভর বদলে দিতে পারে।
