কোরআন তিলাওয়াত ও শিক্ষা
মোট হাদিস ২৯
কোরআন তিলাওয়াত ও শিক্ষার গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কিত হাদিস
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অত্যন্ত লাভজনক একটি ইবাদত। বর্ণিত হাদিসগুলো থেকে জানা যায়, যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে ও সেই অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনা করে, কিয়ামতের দিন তার পিতা-মাতাকে সূর্যের আলোর চেয়েও দীপ্তিময় ও উজ্জ্বল মুকুট পরানো হবে। কুরআন শেখা এবং তা চর্চায় আত্মনিয়োগ করার ফজিলত অনেক বেশি। যারা কুরআন পাঠে পারদর্শী, তারা সম্মানিত ফেরেশতাদের সঙ্গী হবেন; আর যারা কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও আটকে আটকে তিলাওয়াত করেন, তাদের জন্য রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার। আল্লাহর ঘরে সমবেত হয়ে কুরআন পাঠ ও পরস্পরের মধ্যে তা নিয়ে আলোচনা করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত ও মনে পরম শান্তি নেমে আসে এবং ফেরেশতাগণ তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে রাখেন। এমনকি মসজিদে এসে আল্লাহর কিতাবের দুটি আয়াত শিক্ষা করা মূল্যবান সুন্দর দুটি উটনী পাওয়ার চেয়েও উত্তম। এছাড়া উমর (রাঃ) এর একটি হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, পবিত্র কুরআন সাতটি উপভাষায় বা পদ্ধতিতে অবতীর্ণ করা হয়েছে, যাতে সবার জন্য এটি সহজে পাঠ করা সম্ভব হয়।
حَدَّثَنَا مُسْلِمُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ قَتَادَةَ، قَالَ سَأَلْتُ أَنَسًا عَنْ قِرَاءَةِ النَّبِيِّ، ﷺ فَقَالَ كَانَ يَمُدُّ مَدًّا .
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আমি আনাস (রাঃ)-কে নবী (ﷺ) এর কিরাত সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তিনি যেখানে যতটুকু দীর্ঘ করা প্রয়োজন, সেখানে ততটুকু দীর্ঘ করে টেনে পাঠ করতেন।
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنِ الأَعْمَشِ، عَنْ مُسْلِمٍ الْبَطِينِ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ أُوتِيَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ سَبْعًا مِنَ الْمَثَانِي الطُّوَلِ وَأُوتِيَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلاَمُ سِتًّا فَلَمَّا أَلْقَى الأَلْوَاحَ رُفِعَتْ ثِنْتَانِ وَبَقِيَ أَرْبَعٌ .
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সাব‘উ মাসানী (সাত আয়াতবিশিষ্ট) নামক দীর্ঘ সূরা দেয়া হয়েছে এবং মূসা (আঃ)-কে দেয়া হয়েছিল ছয়টি। অতঃপর তিনি তাওরাতের লিখিত ফলকগুলো ছুড়ে ফেলায় দুটি উঠিয়ে নেয়া হয় এবং চারটি অবশিষ্ট থাকে।
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ حُجْرٍ، أَخْبَرَنَا شَرِيكٌ، عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَقْرَأُ فِي الْوِتْرِ بِـ (سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأَعْلَى ) وَ (قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ ) وَ (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ) فِي رَكْعَةٍ رَكْعَةٍ .قَالَ وَفِي الْبَابِ عَنْ عَلِيٍّ وَعَائِشَةَ وَعَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبْزَى عَنْ أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ وَيُرْوَى عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبْزَى عَنِ النَّبِيِّ ﷺ .قَالَ أَبُو عِيسَى وَقَدْ رُوِيَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ أَنَّهُ قَرَأَ فِي الْوِتْرِ فِي الرَّكْعَةِ الثَّالِثَةِ بِالْمُعَوِّذَتَيْنِ وَ (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ) . وَالَّذِي اخْتَارَهُ أَكْثَرُ أَهْلِ الْعِلْمِ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ ﷺ وَمَنْ بَعْدَهُمْ أَنْ يُقْرَأَ بِـ (سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأَعْلَى ) وَ (قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ ) وَ (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ) . يُقْرَأُ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ مِنْ ذَلِكَ بِسُورَةٍ .
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) বিতরের প্রথম রাক’আতে “সাব্বিহিসমা রব্বিকাল আলা”, দ্বিতীয় রাক’আতে “কুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরূন” ও তৃতীয় রাক’আতে “কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ” সূরা পাঠ করতেন।
এ অনুচ্ছেদে ‘আলী, ‘আয়িশাহ্, আবদুর রহমান ইবনু আবযা হতে উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে। অপর এক বর্ণনায় আছে, নবী (ﷺ)-এর বিতরের তৃতীয় রাক’আতে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করতেন। কিছু সাহাবা ও তাবিঈ ইবনু আব্বাসের হাদীস অনুযায়ী ‘আমল করেছেন।
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا أَبُو مُعَاوِيَةَ، عَنِ الأَعْمَشِ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ «مَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ تَعَالَى يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلاَّ نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلاَئِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ».
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) বলেছেন, যখন কোন সম্প্রদায় আল্লাহর কোন ঘরে সমবেত হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং পরস্পরে তা নিয়ে আলোচনা করে, তখন তাদের উপর শান্তি বর্ষিত হয়, তাদেরকে রহমত ঢেকে নেয়, ফেরেশতাগণ তাদেরকে ঘিরে রাখে, এবং আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাদের কাছে তাদের প্রশংসা করেন।
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ أَبِي شُعَيْبٍ الْحَرَّانِيُّ، حَدَّثَنَا عِيسَى بْنُ يُونُسَ، حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي ذِئْبٍ، عَنِ الْمَقْبُرِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ «﴾ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ﴿ أُمُّ الْقُرْآنِ وَأُمُّ الْكِتَابِ وَالسَّبْعُ الْمَثَانِي».
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ সূরা “আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন” হচ্ছে উম্মুল কিতাব, উম্মুল কোরআন এবং বারবার পঠিতব্য সাতটি আয়াত।
حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ دَاوُدَ الْمَهْرِيُّ، أَخْبَرَنَا ابْنُ وَهْبٍ، حَدَّثَنِي عُمَرُ بْنُ مَالِكٍ، وَحَيْوَةُ، عَنِ ابْنِ الْهَادِ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِبْرَاهِيمَ بْنِ الْحَارِثِ، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ «مَا أَذِنَ اللَّهُ لِشَىْءٍ مَا أَذِنَ لِنَبِيٍّ حَسَنِ الصَّوْتِ يَتَغَنَّى بِالْقُرْآنِ يَجْهَرُ بِهِ».
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ মহান আল্লাহ অন্য কিছু এতো মনোযোগ দিয়ে শুনেন না, যেভাবে তিনি নবীর সুমধুর কণ্ঠে স্পষ্ট উচ্চারণে কোরআন পাঠ শুনেন।
حَدَّثَنَا مُسْلِمُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، حَدَّثَنَا هِشَامٌ، وَهَمَّامٌ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ زُرَارَةَ بْنِ أَوْفَى، عَنْ سَعْدِ بْنِ هِشَامٍ، عَنْ عَائِشَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ " الَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَهُوَ مَاهِرٌ بِهِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ وَالَّذِي يَقْرَؤُهُ وَهُوَ يَشْتَدُّ عَلَيْهِ فَلَهُ أَجْرَانِ».
'আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কুরআন পাঠে দক্ষ ব্যক্তি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতাদের সঙ্গী হবে। আর যে ব্যক্তি কুরআন পড়ার সময় আটকে যায় এবং কষ্ট করে তিলাওয়াত করে তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব।
حَدَّثَنَا الْقَعْنَبِيُّ، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، أَنَّ رَجُلاً، سَمِعَ رَجُلاً، يَقْرَأُ ﴾ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ﴿ يُرَدِّدُهَا فَلَمَّا أَصْبَحَ جَاءَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهُ وَكَانَ الرَّجُلُ يَتَقَالُّهَا فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ " وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّهَا لَتَعْدِلُ ثُلُثَ الْقُرْآنِ " .
আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
একদা এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে বারবার সূরা ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’ পাঠ করতে শুনে ঘটনাটি ভোর বেলায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট এসে উল্লেখ করলো। লোকটি যেন এ সূরা বারবার পাঠ করাকে তুষ্ট মনে করলো। নবী (ﷺ) বললেনঃ ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! এ সূরাটি পুরো কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান।
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَى، عَنْ سُفْيَانَ، حَدَّثَنِي عَاصِمُ بْنُ بَهْدَلَةَ، عَنْ زِرٍّ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ " يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا فَإِنَّ مَنْزِلَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَا " .
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ (কিয়ামতে) কোরআন অধ্যয়নকারীকে বলা হবে, কোরআন পাঠ করতে করতে উপরে উঠতে থাকো। তুমি দুনিয়াতে যেভাবে ধীরেসুস্থে পাঠ করতে সেভাবে পাঠ করো। কেননা তোমার তিলাওয়াতের শেষ আয়াতেই (জান্নাতে) তোমার বাসস্থান হবে।
حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ خَالِدِ بْنِ مَوْهَبٍ الرَّمْلِيُّ، حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنِ ابْنِ أَبِي مُلَيْكَةَ، عَنْ يَعْلَى بْنِ مَمْلَكٍ، أَنَّهُ سَأَلَ أُمَّ سَلَمَةَ عَنْ قِرَاءَةِ، رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَصَلاَتِهِ فَقَالَتْ وَمَا لَكُمْ وَصَلاَتَهُ كَانَ يُصَلِّي وَيَنَامُ قَدْرَ مَا صَلَّى ثُمَّ يُصَلِّي قَدْرَ مَا نَامَ ثُمَّ يَنَامُ قَدْرَ مَا صَلَّى حَتَّى يُصْبِحَ وَنَعَتَتْ قِرَاءَتَهُ فَإِذَا هِيَ تَنْعَتُ قِرَاءَتَهُ حَرْفًا حَرْفًا .
উম্মু সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
একদা তিনি উম্মু সালামাহ (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সালাত ও কিরাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তাঁর সালাত সম্পর্কে জেনে তোমাদের কি দরকার? তিনি সালাত আদায় করতেন এবং সালাত আদায়ের সমপরিমাণ সময় ঘুমাতেন, আবার যেটুকু সময় ঘুমাতেন সে পরিমাণ সময় সালাত আদায় করতেন। আবারো সালাত আদায়ের সমপরিমাণ সময় ঘুমাতেন। এভাবেই ভোর হয়ে যেতো। তিনি তাঁর কিরাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, তিনি কিরাতে এক একটি হরফ স্পষ্ট উচ্চারণ করতেন।
