১৯/৪৮. অধ্যায়ঃ
জামে‘ আত-তিরমিযী হাদিস ১৬১৭ - ইসলামী যুদ্ধনীতি ও মানবিক সীমা
যুদ্ধের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওসিয়ত (উপদেশ)
ইসলামী যুদ্ধনীতি: বিশ্বাসঘাতকতা, লাশ বিকৃতি ও শিশু হত্যা নিষেধ
জামে‘ আত-তিরমিযী : ১৬১৭
জামে‘ আত-তিরমিযীহাদিস নম্বর ১৬১৭
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ، عَنْ سُفْيَانَ، عَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ مَرْثَدٍ، عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ بُرَيْدَةَ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا بَعَثَ أَمِيرًا عَلَى جَيْشٍ أَوْصَاهُ فِي خَاصَّةِ نَفْسِهِ بِتَقْوَى اللَّهِ وَمَنْ مَعَهُ مِنَ الْمُسْلِمِينَ خَيْرًا وَقَالَ «اغْزُوا بِسْمِ اللَّهِ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ قَاتِلُوا مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ وَلاَ تَغُلُّوا وَلاَ تَغْدِرُوا وَلاَ تُمَثِّلُوا وَلاَ تَقْتُلُوا وَلِيدًا فَإِذَا لَقِيتَ عَدُوَّكَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ فَادْعُهُمْ إِلَى إِحْدَى ثَلاَثِ خِصَالٍ أَوْ خِلاَلٍ أَيَّتَهَا أَجَابُوكَ فَاقْبَلْ مِنْهُمْ وَكُفَّ عَنْهُمُ ادْعُهُمْ إِلَى الإِسْلاَمِ وَالتَّحَوُّلِ مِنْ دَارِهِمْ إِلَى دَارِ الْمُهَاجِرِينَ وَأَخْبِرْهُمْ إِنْ فَعَلُوا ذَلِكَ فَإِنَّ لَهُمْ مَا لِلْمُهَاجِرِينَ وَعَلَيْهِمْ مَا عَلَى الْمُهَاجِرِينَ وَإِنْ أَبَوْا أَنْ يَتَحَوَّلُوا فَأَخْبِرْهُمْ أَنَّهُمْ يَكُونُوا كَأَعْرَابِ الْمُسْلِمِينَ يَجْرِي عَلَيْهِمْ مَا يَجْرِي عَلَى الأَعْرَابِ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْغَنِيمَةِ وَالْفَىْءِ شَيْءٌ إِلاَّ أَنْ يُجَاهِدُوا فَإِنْ أَبَوْا فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ عَلَيْهِمْ وَقَاتِلْهُمْ وَإِذَا حَاصَرْتَ حِصْنًا فَأَرَادُوكَ أَنْ تَجْعَلَ لَهُمْ ذِمَّةَ اللَّهِ وَذِمَّةَ نَبِيِّهِ فَلاَ تَجْعَلْ لَهُمْ ذِمَّةَ اللَّهِ وَلاَ ذِمَّةَ نَبِيِّهِ وَاجْعَلْ لَهُمْ ذِمَّتَكَ وَذِمَمَ أَصْحَابِكَ لأَنَّكُمْ إِنْ تُخْفِرُوا ذِمَّتَكُمْ وَذِمَمَ أَصْحَابِكُمْ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تُخْفِرُوا ذِمَّةَ اللَّهِ وَذِمَّةَ رَسُولِهِ وَإِذَا حَاصَرْتَ أَهْلَ حِصْنٍ فَأَرَادُوكَ أَنْ تُنْزِلَهُمْ عَلَى حُكْمِ اللَّهِ فَلاَ تُنْزِلُوهُمْ وَلَكِنْ أَنْزِلْهُمْ عَلَى حُكْمِكَ فَإِنَّكَ لاَ تَدْرِي أَتُصِيبُ حُكْمَ اللَّهِ فِيهِمْ أَمْ لاَ» . أَوْ نَحْوَ هَذَا .قَالَ أَبُو عِيسَى وَفِي الْبَابِ عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ مُقَرِّنٍ . وَحَدِيثُ بُرَيْدَةَ حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ .حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا أَبُو أَحْمَدَ، عَنْ سُفْيَانَ، عَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ مَرْثَدٍ، نَحْوَهُ بِمَعْنَاهُ وَزَادَ فِيهِ «فَإِنْ أَبَوْا فَخُذْ مِنْهُمُ الْجِزْيَةَ فَإِنْ أَبَوْا فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ عَلَيْهِمْ» .قَالَ أَبُو عِيسَى هَكَذَا رَوَاهُ وَكِيعٌ وَغَيْرُ وَاحِدٍ عَنْ سُفْيَانَ، . وَرَوَى غَيْرُ، مُحَمَّدِ بْنِ بَشَّارٍ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ مَهْدِيٍّ، وَذَكَرَ، فِيهِ أَمْرَ الْجِزْيَةِ .
বুরাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি (বুরাইদা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোন বাহিনীর অধিনায়ক মনোনীত করে কাউকে পাঠানোর সময় বিশেষভাবে তার নিজের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা’আলাকে ভয় করার এবং অধীনস্থ মুসলিম যোদ্ধাদের কল্যাণ কামনা করার পরামর্শ দিতেন। তিনি বলতেনঃ আল্লাহ্ তা’আলার নামে যুদ্ধ শুরু কর, আল্লাহ্ তা’আলার রাস্তায় জিহাদ কর, আল্লাহ্ তা’আলার সাথে অবাধ্যাচরণকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, গনিমতের সম্পদ আত্মসাৎ কর না, বিশ্বাসঘাতকতা করা হতে বিরত থাক, (শত্রুসৈন্যের) মৃতব্যক্তির নাক-কান ইত্যাদি কেটে মৃতদেহ বিকৃত কর না এবং শিশুদের হত্যা কর না।তুমি মুশরিক শত্রুদের সাথে মুখোমুখি হওয়াকালে তাদেরকে তিনটি বিকল্প প্রস্তাবের যে কোন একটি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাবে। তারা এ তিনটি প্রস্তাবের যে কোন একটি মেনে নিলে তা গ্রহণ কর এবং তাদেরকে হামলা করা হতে বিরত থাক। তুমি তাদেরকে ইসলাম ধর্ম কবুল করার জন্য আহ্বান জানাবে এবং হিজরত করে মুহাজিরদের এলাকায় চলে আসতে বলবে। তাদেরকে জানিয়ে দিবে যে, তারা এ প্রস্তাব গ্রহণ করলে তারা মুহাজিরদের সমপরিমাণ অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা লাভ করবে এবং যেসব দায়িত্ব ও কর্তব্য মুহাজিরদের উপর অর্পিত হবে অনুরূপ তাদের উপরও অর্পিত হবে।তারা নিজস্ব অবস্থান পরিবর্তন করতে সম্মত না হলে তুমি তাদেরকে জানিয়ে দিবে যে, তারা বেদুঈনদের অনুরূপ বলে বিবেচিত হবে। যা বেদুঈনদের বেলায় কার্যকর হবে তাদের বেলায়ও তাই প্রযোজ্য হবে। তারা জিহাদে যোগ না দিলে গনিমত ও ফাই হতে কিছুই পাবে না। তারা ইসলাম ধর্ম কবুল করতে রাজি না হলে তুমি তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্ তা’আলার সাহায্য প্রার্থনা কর এবং তাদের বিপক্ষে যুদ্ধ কর।তুমি কোন দুর্গ ঘেরাও করার পর তারা তোমার নিকট আল্লাহ্ ও তাঁর নাবীর যিম্মাদারি (নিরাপত্তা) চাইলে তুমি তাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার যিম্মাদারিও অনুমোদন করবে না আর তাঁর নাবীর যিম্মাদারিও নয়, বরং তাদের জন্য তোমার এবং তোমার সাথীদের যিম্মাদারি মঞ্জুর করবে। কেননা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের যিম্মাদারির খেলাপ করার চেয়ে তোমার ও তোমার সাথীদের যিম্মাদারির খেলাপ করাই তোমাদের জন্য উত্তম।তুমি কোন দুর্গবাসীদের অবরোধ করার পর তারা তোমার নিকট আল্লাহ্ তা’আলার ফায়সালা মোতাবিক দুর্গ হতে বের হয়ে আত্মসমর্পণ করতে চাইলে তুমি তা অনুমোদন করবে না, বরং তুমি তাদেরকে তোমার নিজের ফায়সালা মতো দুর্গ হতে বের করে আত্মসমর্পণ করাবে। কারণ তুমি তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা’আলার সঠিক ফায়সালায় পৌঁছাতে পেরেছ কি-না তা তোমার জানা নেই। অথবা তিনি একই রকম কোন কথা বলেছেন।
সহীহ্, ইবনু মা-জাহ (২৮৫৮), মুসলিম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, নু’মান ইবনু মুকাররিন (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি হাসান সহীহ্। উপরোক্ত হাদীসের অনুরূপ আলকামা ইবনু মারসাদ (রহঃ) হতেও বর্ণিত হয়েছে। এই বর্ণনায় আরো আছেঃ তারা (ইসলাম ধর্ম কবুল করতে) অস্বীকার করলে তাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় কর। তারা তাও ফিরিয়ে দিলে তাদের বিরুদ্ধে (যুদ্ধ করার জন্য) আল্লাহ্র সাহায্য প্রার্থনা কর। সহীহ্, দেখুন পূর্বের হাদীস আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, এ হাদীসটি ওয়াকী ও একাধিক বর্ণনাকারী সুফিয়ানের নিকট হতে বর্ণনা করেছেন। আবদুর রাহমান ইবনু মাহ্দীর সূত্রে মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার ব্যতীত অন্য বর্ণনাকারীগণ এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং তাতেও জিয্রার (খাজনা) উল্লেখ আছে।
জামে‘ আত-তিরমিযী হাদিস ১৬১৭-এর সারসংক্ষেপ
এই দীর্ঘ হাদিসে বাহিনীর অধিনায়ককে দেওয়া রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর নির্দেশনা বর্ণিত হয়েছে। প্রথমে সেনাপতিকে নিজের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করতে এবং অধীনস্থ মুসলিমদের কল্যাণ দেখতে বলা হয়। যুদ্ধের মধ্যেও গনীমতের সম্পদ আত্মসাৎ, বিশ্বাসঘাতকতা, মৃতদেহ বিকৃতি এবং শিশু হত্যা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শত্রুপক্ষের সামনে সরাসরি যুদ্ধের আগে তাদের নির্ধারিত বিকল্প গ্রহণের আহ্বান জানাতে বলা হয়। কোনো গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব মানলে হামলা বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নামে নিশ্চিত দাবি না করে নিজেদের দায়িত্বে চুক্তি করতে বলা হয়েছে। একইভাবে নিজের সিদ্ধান্তকে নিশ্চিতভাবে ‘আল্লাহর ফয়সালা’ বলা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়, কারণ মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত সঠিক কি না জানে না। ইসলামী স্কলারদের মতে, এগুলো বৈধ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের অধীন যুদ্ধনীতির বিধান; ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারী সহিংসতার অনুমতি নয়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- যুদ্ধের মধ্যেও বিশ্বাসঘাতকতা, সম্পদ আত্মসাৎ, লাশ বিকৃতি ও শিশু হত্যা নিষিদ্ধ।
- প্রতিপক্ষ গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব মানলে তার বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করতে হবে।
- নিজের সিদ্ধান্তকে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর ফয়সালা বলে চালানো উচিত নয়।
- নেতৃত্বে তাকওয়া ও অধীনস্থ মানুষের কল্যাণের চিন্তা থাকা দরকার।
